Monday, April 11, 2016

শুভ বাংলা নববর্ষ

শুভ বাংলা নববর্ষ
ড.আলী ফোরকান
১ বৈশাখ , ১৪২৩। আজ পহেলা বৈশাখ। নয়া বাংলা সন-১৪২৩ এর প্রথম দিন। অবসান ঘটেছে বাংলা ১৪২২ এর। সময় নিত্য প্রবাহমান। সময় পরিক্রমায় বছর ঘুরে ধরায় এসেছে আবার পয়লা বৈশাখ। দুয়ারে এসেছে বাংলা নববর্ষ ১৪২৩। শুভ হোক সমাগত নতুন বছর। সবার জন্য বয়ে আনুক অনাবিল শুচি-স্নিগ্ধ শুভ্রতা। আনন্দ প্রত্যাশা পাওয়ার মহা আয়োজনে কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠুক সবার জীবন। সময়ের আবর্তে বিদায়ী বছরের বিদায়ী বছরের অন্তিম প্রহর আর প্রতাসন্ন নববর্ষের প্রথম বহরের মাঝে খুব একটা তফাৎ নেই। বিদায়ী বছরের অন্তিম মুহুর্তে আমরা নব প্রেরণায় উজ্জীবিত হই। নতুন আশায় নতুন প্রেরণায় কল্পকামনার স্বপ্ন দেখি। কায়মনোবাক্যে বিধাতার কাছে প্রার্থনা করি- নতুন বছরের প্রতিটি ক্ষণ যেন শ্বেত শুভ্র পায়রার ডানায় করে আসুক সাফল্যের সুন্দরের আনন্দের পরিতৃপ্ত, পরিপূর্ণতার বারতা।
পয়লা বৈশাখ বাংলার ঐতিহ্য, বঙ্গ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। ষড় ঋতু আর সুজলা-সুফলা শষ্য শ্যামলায় ভরপুর আমাদের দেশের বছর শুরু হয় বৈশাখ মাসে।
গাঁয়ে বসবাসকারী মানুষই বেশি বাংলা বর্ষ পরিক্রমার ব্যাপারে অধিকতর আগ্রহী। প্রতিটি বাংলা মাসের শেষে তারা সুযোগ-সুবিধা মতো নতুন দিনের প্রতীক্ষা করে, প্রতিটি প্রহর-ক্ষণের শুভাশুভ মেনে চলে। গাঁয়ের মানুষের প্রতিটি কাজের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে বাংলা দিন পঞ্জিকার বিধি নিষেধ। শহরের মানুষের কাছে বাংলা দিন পঞ্জি অনেকটা যেন বিশেষ উপলক্ষে পরার মতো পোশাক মাত্র। এর সাথে হৃদয়ের আবেগ-অনুভুতির যোগ যতটা না আছে, তার চেয়ে আনুষ্ঠানিকতাবোধ। নেহাত করতে হয় তাই করি, না করলেও যেন কারো কোন কিছু যায় আসে না। ঢাকা রমনার বটমূলে, চট্টগ্রামের ডিসি হিলে, খুলনার শহীদ হাদিস পার্কসহ বিভিন্ন শহরের বিভিন্ন বটছায়ায় আড্ডা না দিলে যেন পয়লা বৈশাখ উদযাপন হয় না। আনুষ্ঠানিকতার এখানে কোন কার্পণ্য নেই। আনুষ্ঠানিকতার বাইরে পহেলা বৈশাখের মূল তাৎপর্য উপলব্ধি করা, অন্যের সংস্কৃতি নিয়ে বেহায়ার মতো লাফালাফি না করে নিজের সংস্কৃতিতে সঠিকভাবে আত্মস্থ করার ক্ষেত্র। কিন্তু বর্তমান পয়লা বৈশাখ নামে আমরা যা করছি, সংস্কৃতির দেউলিয়াত্ব, পর চর্চা এবং অন্যের সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ। সরকারি পর্যায়েও লোক দেখানো কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বড় বড় গবেষক, ভাষাবিদ, পন্ডিতদের আনা হয়।
একটা সময় ছিল, যখন প্রকৃত অর্থেই পয়লা বৈশাখ উদযাপিত হতো। দেশের মানুষ এই বিশেষ দিনটিকে ঘিরে সারা বছরের স্বপ্নসৌদ গড়ে তুলত। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকগণ তাদের যাবতীয় হিসাব-নিকাশ বাংলা দিনপঞ্জি অনুসারে করে থাকে। গাঁয়ের মানুষ প্রতিটি বাংলা মাসের শেষ দিন চূড়ান্ত হিসাব করে, খদ্দের ও তার সাধ্যমত দেনা মেটায়। কিছু বাকি পড়লে সেটা পরবর্তীতে মাসের হিসাবের সাথে যুক্ত হয়। এভাবে বারো মাসের কিছু কিছু বাকি জমতে জমতে বিরাট পাওনায় পরিণত হয়। যা হয়তো এমনিতে শোধ দিতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় খদ্দেরকে। পয়লা বৈশাখে খদ্দেররা বকেয়া টাকা পরিশোধ করে থাকে। এখানেই নববর্ষের সঙ্গে ক্রেতা-বিক্রেতার আত্মিক যোগ। যত সম্ভব দেনা উসুলের জন্য দোকানি তার ক্রেতাদের আনুষ্ঠানিক দাওয়াত দেয় বৈশাখের প্রথম দিনে। এর নাম হাল খাতা। “হাল” এখানে নতুনের অর্থে ব্যবহার হয়।
তবে বাংলা সনের মূল স্রষ্টা আমির ফতেউল্লা সিরাজী। কিন্তু বাংলা নববর্ষের প্রচলন করে ছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর। তিনিই প্রথম বাংলা নতুন সনের প্রবর্তন করেছিলেন। সম্রাট আকবর নিজ সিংহাসনে আরোহণের অভিষেককে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এ সনের প্রতর্বন করেন। “তারিখ-এ ইলাহী” বলে কথিত এ সাল সম্রাটের জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ সেনাপতি হিমু দিল্লী ও আগ্রা জয় করে নিজেকে রাজচক্রবর্তী ঘোষণা করেছিলেন। সম্রাট আকবর তা অনায়াসে পানি পথের দ্বিতীয় যুদ্ধে প্রতিহত করেছিলেন। হিমুর পরাজয়ের পর মুঘল সম্রাজ্যে স্থায়ীত্বের সাথে বাংলা সন ও বাংলা নববর্ষ বিশেষ এক মহিমা ও গৌরবের স্থান পেল। বর্তমানে দেশে অনেক উৎসব আছে। কিন্তু বাংলা নববর্ষ পেয়েছে এক বিশেষ মহিমা। কারণ এই উৎসব জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের। সবচেয়ে মজার বিষয়, এই একটি দিনে আমরা সবাই “ভীষণ বাঙালী” হয়ে ওঠার চেষ্টা করি। আমরা বাঙালী, আমাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি আছে। আমাদের একটি সুসমৃদ্ধ লোকজ ঐতিহ্য আছে। বাংলা নববর্ষ তার একটি অংশ মাত্র। কিন্তু এই নববর্ষে- আমরা কি আমাদের সংস্কৃতি ধরে রাখতে পেয়েছি। বিদেশী সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে বাংলার এ ঐতিহ্য বিকৃত হয়ে অপসংস্কৃতি এসে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে গহব্বরে।
তলিয়ে যাচ্ছে সাগরের গহীন তলদেশে। আমরা আজ এই দিনে আমরা বাঙালী, আমাদের বাঙালী সংস্কৃতির ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই। তাহলে আমাদের সংস্কৃতি থেকে অপসংস্কৃতির রাহু মুক্ত হবে।
লেখক,গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
( রূপসা ডিগ্রী কলেজ)

0 comments:

Post a Comment