পবিত্র আশুরার গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য
ড.ফোরকান আলী
মহররম মাসের দশম দিবসটি আশুরা নামে অভিহিত হয়। আশুরা একটি স্বাতন্ত্রধর্মী মহিমান্বিত দিবস। শুধুমাত্র ইসলামের ইতিহাসেই নয়। সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসেও ১০ মহররম পবিত্র আশুরা অনন্য সাধারণ দিবসরূপে পরিচিহ্নিত হয়ে থাকে। এটিই একমাত্র দিবস যা তিনটি সম্প্রদায় যথাযোগ্য মর্যাদায় নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতায় প্রতিপালন করে থাকে। মুসলমান, ইহুদি ও খ্রিস্টান তিনটি ধর্মের অনুসারী সকলেই প্রাচীনকাল থেকে এই মহান দিবসের তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য অনুধাবন করে দিবসটি উদযাপন করে মর্মে ইতিহাসে সাক্ষ্য-প্রমাণ বিদ্যমান। পবিত্র আশুরার গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অনেক। আশুরা ঘটনাবহুল একটি শোকের ইতিহাস। কারবালা প্রান্তরের সংঘটিত ৬১ হিজরীর লোমহর্ষক ত্যাগের ইতিহাস। হযরত ইমাম হুসাইন (রা:)এর সপরিবারে শাহাদাত লাভের ইতিহাস। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কারবালায় সপরিবারে শাহাদাতবরণ করেছিলেন। মহান আল্লাহর প্রিয় নবী মুস্তফা (সা.) এর প্রিয় দৌহিত্র। মা ফাতিমার (রা.) কলিজার টুকরা। হযরত আলী (রা.) নয়নমনি প্রাণপ্রিয় সন্তান। অন্যায় ও অসত্যের ব্যাপারে আপোষহীন, সহজাত সত্যনিষ্ঠা ও অবিচল সততাধারী ইমাম হোসাইন (রা.)। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর জীবনের বৈশিষ্ট্য ছিল পরিপূর্ণ দৃঢ় সততায় সমৃদ্ধ। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর জীবনের যত মূল্যবোধ ছিল, সেগুলো স্বয়ং রাসূলে খোদার আদর্শ ও শিক্ষা থেকে প্রাপ্ত। নবী (সা.) শিক্ষা মানেই হলো পবিত্র কুরআনের শিক্ষা। আর কুরআনের শিক্ষা হলো অনৈসলামি বা খোদাদ্রোহী ব্যক্তির কাছে মাথানত না করা। শাহাদাৎকামিতা, নিজস্ব আদর্শকে সমুন্নত রাখার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকা। ইতিহাসের জঘন্য, লোকহর্ষক, হৃদয় বিদারক ও নিষ্ঠুরতম ঘটনা হলো, নবী দৈহিত্র সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাত বরণ। আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা আমাদের ঈমানের অঙ্গ। তাই আমরা কারবালা দিবসে ইমামের শাহাদাত স্মরণে সত্য ও ন্যায়ের উপর অটল থাকার জীবনপণ শপথ গ্রহণ করে উজ্জীবিত হই। হযরত আলী (রা.) শাহাদতের মধ্য দিয়ে খোলাফায়ে রাশেদীন যুগের অবসান ঘটে। বিশিষ্ট সাহাবী এবং ওহী লেখক হরত মু’আবিয়া (রা.) খলীফা হন। মু’আবিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ইয়াযীদ মসনদে আরোহণ করে। ইয়াযীদ ছিল দুর্দান্ত প্রকৃতির লোক। ইসলামের শত্রুরা বিশেষ করে ইয়াহুদী ও মুনাফিক চক্র ইয়াযীদের সাথে হাত মিলায়। সইয়াযীদ ক্ষমতার অন্ধমোহে দিশেহারা হয়ে যায়। ইসলামের সূচনাকাল থেকে যে মুনাফিক ও ইয়াহুদী চক্র ইসলামের ধ্বংস সাধনে লিপ্ত ছিল। সেই চক্রের প্রেতাত্মারা ভর করে ইয়াযীদের উপর। সে একে একে স্বৈরাচারী কা- কারখানা করতে থাকে। এরই প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেন সত্যের সৈনিক ইমাম হুসাইন (রা.)। তিনি সত্য, ন্যায়, সুন্দর এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কালেমার পতাকা সুউন্নত, হক ও ইনসাফ চলমান রাখার লক্ষ্যে ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে জান কোরবান করেন। যে অপূর্ব দৃষ্টান্ত, তা যুগ যুগ ধরে স্বাধীনতাকামী মানুষকে ন্যায় ও সত্যের সংগ্রামের অনুপ্রেরণা যোগায়। তাই যুগ ও কালের বিবর্তনে যখনই আশুরা মুসলিম মিল্লাতের সামনে এসে হাজির হবে। তখনই অলক্ষ্যে ঘোষিত হতে থাকবে সত্য ও ন্যায়ের মর্মবাণী। অসত্য ও অন্ধকার থেকে মুক্তি, নিষ্কৃতি ও বিজয় লাভের খোশখবরী। এই মহান আশুরার দিবস সত্যিকার অর্থে উদযাপন করতে হলে প্রয়োজন হয় না কোনো মর্সিয়া বা মাতম, দুলদুল, তাজিয়া বা জানজিরার। জাতীয় কবি নজরুলের ভাষায় : ‘ফিরে এল আজ সেই মহররম মাহিনা/ত্যাগ চাই, মর্সিয়া, ক্রন্দন চাহি না’। এই অনন্য সাধারণ দিবসকে মাহাত্ম্যশোভিত করার জন্য প্রয়োজন ত্যাগ-তিতিক্ষার। আর সততা ও চেতনার। এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ওপর অবিচল বিশ্বাসের। অসত্যের বিরুদ্ধে আমরণ জিহাদের। পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় এই পবিত্র মহররম মাসে বিশ্ব ইতিহাসে এমন সব ঘটনার অবতারণা ঘটেছে যার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে অবাক বিস্ময়ে হতবাক না হয়ে পারা যায় না। কেননা, এ মাসের প্রথম তারিখটি বছরের প্রারম্ভ বলে স্বীকৃত। ৯ ও ১০ তারিখে রোজা রাখার কথা হাদিস শরীফে ঘোষিত হয়েছে। এ মাসের ১৬ তারিখে বাইতুল মুকাদ্দাসকে কিবলা মনোনয়ন করা হয়েছিল। ১৭ তারিখ আবরাহার হস্তিবাহিনী মক্কার উপকণ্ঠে ছাউনি গেড়েছিল। ১০ তারিখে আশুরা বা কারবালাবার্ষিকী পালিত হয়। হজরত মুসা (আ.) এ দিনে তাওরাত কিতাব লাভ এবং অভিশপ্ত ফেরাউন স্বীয় দলবলসহ সাগরবক্ষে ধ্বংস। হজরত ইব্রাহীম (আ.) পাপিষ্ঠ নমরূদের অনলকু- হতে নিষ্কৃতি লাভ। হজরত ইউসুফ (আ.) অন্ধকার কূপ হতে উদ্ধার। হজরত ঈসা (আ.) কে আল্লাহপাক চতুর্থ আসমানে উঠিয়ে নেয়া। হজরত আইয়ুব (আ.)-এর আরোগ্য লাভ। হজরত ইউনুছ (আ.) মাছের পেট হতে মুক্তি। হজরত ইদ্রিস (আ.) সশরীরে জান্নাতে প্রবেশ। আবার আশুরার দিন শুক্রবারেই কেয়ামত সংঘটিত হবে। এতসব ঘটনার চিত্র যে মাসটি স্বীয় বুকে ধারণ করে আছে এর গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য যে অপরিসীম তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহপাক বিশ্বজগত সৃষ্টির সূচনা করেন আশুরাতে। আদি পিতা আদম (আ.) কে সৃষ্টি এবং তাঁর স্ত্রী হযরত হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে অবতরণ ও মেহেরবান আল্লাহ তাঁদের তওবা কবুল করেন আশুরাতে। পৃথিবীতে প্রথম বৃষ্টি বর্ষিত হয় আশুরাতে। এমনি আরো অসংখ্য ঘটনার নীরব সাক্ষী আশুরা। উপরোক্ত বর্ণনাভিত্তিতে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, পবিত্র আশুরার মাহাত্ম্য, মহিমা, তাৎপর্য ও গরিমা শুধু কারবালার মর্মান্তিক বেদনাবিধূর ঘটনা কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়নি। বহু নবী-রাসূলের মহিমাম-িত কর্মকা-ে উদ্ভাসিত বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী স্বীকৃত এই মহান পবিত্র দিবস আশুরা। বস্তুত, কারবালার করুণ ইতিহাস আমাদের নিকট এক চিরন্তন শিক্ষার বাণী বহন করে ফেরে। এর একদিকে রয়েছে শোকাবহ, অশ্রুসজল কাহিনী। অপরদিকে মহান আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণা এবং সেই সঙ্গে ন্যায়, সত্য ও সততার প্রতি পরম নিষ্ঠা ও প্রত্যয়। হজরত ইমাম হোসেনের অতুলনীয় শাহাদাত কোনো পরাজয়ের প্রতিফলন নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর জন্য পরম বিজয়ের সংকেত। মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহরের অনুপম ভাষায় : ‘কতলে হুসাইন আসলমে মরগে ইয়াজিদ হ্যায়/ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হর কারবালাকে বাদ’। হযরত ইমাম হোসেনের (রা.) শাহাদাত বস্তুত নরপিশাচ ইয়াজিদের মৃত্যু, প্রতিটি কারবালা দিবসের পর ইসলাম উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) হিজরত করে মদীনায় আগমন করার পর মদীনার ইহুদিদের নিকট হতে জানতে পারলেন যে, এই আশুরার দিন হজরত মুসা (আ.) ফিরআউনের বন্দিদশা হতে ইসরাইল সন্তানদের উদ্ধার করেছিলেন এবং ফেরাউন সসৈন্যে ডুবে মরেছিল। সেই কারণে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ হজরত মুসা (আ.) এ দিনে রোজা পালন করেছিলেন এবং একই কারণে ইহুদিরা আশুরার রোজা রাখে। তখন রাসূল (সা.) বললেন, ‘তোমাদের অপেক্ষা হজরত মুসা (আ.)-এর সাথে আমাদের সম্পর্ক অগ্রাধিকারমূলক এবং নিকটতম। রাসূল (সা.) তখন হতে নিজে আশুরার রোজা রাখলেন এবং উম্মতকে এ দিনে রোজা পালনের নির্দেশ দিলেন। যা আমাদের জন্য মুস্তাহাব হিসেবে স্বীকৃত। এ রোজা হলো ইয়াওমুল আশুরা তথা মহররমের দশ তারিখের রোজা। তবে যেহেতু ইহুদিরা দশ তারিখ রোজা রাখে, সে জন্য প্রিয়নবী (সা.) ১০ তারিখের রোজার সাথে মিলিয়ে আরো একটি অর্থাৎ ৯ ও ১০ তারিখ দু’টি রোজা রাখার জন্য বলেছেন। লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
Sunday, October 25, 2015
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
0 comments:
Post a Comment