Monday, July 6, 2015

দৃষ্টিপাত : ঢাকার যানজট যেভাবে নিরসন হতে পারে

দৃষ্টিপাত : ঢাকার যানজট যেভাবে নিরসন হতে পারে
ড.ফোরকান আলী
ঢাকা এখন  ট্রাফিক জ্যাম বা যানজটের শহর। এ নিয়ে আমরা প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রে খবর, নিবন্ধ লক্ষ্য করে থাকি। পাশাপাশি যানজট নিরসনে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের কিছু উদ্যোগে ও দেখি। এ সংক্রান্ত খবরও মাঝেমধ্যে লক্ষ্য করি। কিন্তু এ কথা সবাই মানবেন যে, যানজট কিছুতেই কমছে না। অব্যাহতভাবে বেড়েই চলছে। যানজট নিরসনে সরকার সম্প্রতি কিছু উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। এরমধ্যে জোর-বেজোর সংখ্যার প্রাইভেট কার অল্টারনেটিভ ডে হিসেবে করে রাস্তায় বের হওয়া। প্রতি প্রাইভেট কারে ন্যূনতম চার/পাঁচজন যাত্রী থাকা। সিএনজি গ্যাস প্রাপ্যতার বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ প্রভৃতি। যানজটের বিষয় নিয়ে আমার লেখার ইচ্ছে ছিল না। অনেকেই বলে থাকেন আমাদের দেশে লিখে কিছু হয় না। এ কথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। তবে লেখার বিষয়বস্তু সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি জ্ঞাত হতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বা ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করতে পারেন। আবার এ কথাও অস্বীকার করা যায় না। যে প্রকাশিত খবর বা প্রবন্ধ, নিবন্ধ সম্পর্কে শুধু জ্ঞাত হওয়াই নয়। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বা ব্যক্তি যদি সংবেদনশীল হন। তবেই একটা প্রতিক্রিয়া বা কর্মতৎপরতা দৃশ্যমান হয়। বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশে সংবেদনশীল প্রশাসনের অভাব রয়েছে। তারপরও কোনো বিষয়ে লেখা, কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার চেষ্টা থেমে নেই। একেবারে নৈরাশ্যবাদী হলে তো সমাজ চলে না। স্বভাবগতভাবেই মানুষ পরিবর্তনের আশায় থাকে। একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য মানুষ প্রতীক্ষা করে। সুতরাং যানজটে যারা নিত্য নাকাল তারা প্রতিদিনই আশায় থাকে ‘আজ গন্তব্যে একটু আগে যাওয়া যাবে’। কিন্তু বাস্তব যেন বড় কঠিন! প্রতিদিনই গাড়ির চাকা যেন ঘুরেই না। একটি উচ্চতর গবেষণা কাজে গত প্রায় দেড় মাস সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত আমি প্রতিদিন গবেষণার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য ঢাকায় বিভিন্ন গ্রন্থাগার, অফিস, প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করেছি। গণমানুষের পরিবহন বাসগুলোতে আসা-যাওয়া করতে করতে যানজটে কবলিত যাত্রী সাধারণের খেদোক্তি, উষ্মা, রাগ, প্রশাসন ও সরকারকে তুলোধুনো করার কথোপকথন শুনেছি। যাত্রী সাধারণের কথোপকথন এবং এ সম্পর্কে বাইরের কয়েকটি রাষ্ট্রের কিছু দৃষ্টান্ত জেনে যানজট নিরসনের কয়েকটি উপায় নিয়ে এই নিবন্ধটি লেখার ইচ্ছে হয়েছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে যাত্রীপরিবহনের তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। এই প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা বেড়েই চলছে। মানুষের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি সাশ্রয়ী সিএনজি গ্যাস মানুষকে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনায় আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। যানজটে ঢাকা যখন স্থবির তখন লক্ষ্য করা যায় সারি সারি প্রাইভেট গাড়ির লাইন। যাত্রী পরিবহন সেই তুলনায় খুব কম। এটা বাস্তব যে, ঢাকায় যে পরিমাণ মানুষের যাতায়াত, বসবাস সেই তুলনায় যাত্রী পরিবহনের স্বল্পতা রয়েছে। এ জন্য অফিস ছুটির পর বাসে উঠতে পারা পরম সৌভাগ্য বলে মনে হয়। রীতিমতো যুদ্ধ করে বাসে ওঠার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় চলে যায়। সামনে পেছনে তাকালে দেখা যায় শুধু প্রাইভেট গাড়ি আর গাড়ি। ঐ গাড়িতে একজন কী দুজন বসে আছেন, ঘুমিয়ে আছেন। আর মাঝে স্থবির হয়ে আছেন যাত্রী পরিবহনে হাজারো যাত্রী। আমরা জানি, কল্যাণকর রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গণমানুষের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও সমস্যা লাঘবে প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। প্রাইভেট গাড়ির ভিড়ে এভাবে যাত্রী পরিবহনগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবির হয়ে থাকবে। এটা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। ব্যক্তিগত গাড়ি কেনায় নিরুৎসাহিত করার জন্য সকল প্রকার ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে সিএনজি গ্যাস পাবার সুবিধা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা সম্ভব হয়। তবেই সামর্থ্য থাকলেই গাড়ি কেনার প্রবণতা কমে যাবে। এছাড়াও ব্যক্তিগত গাড়ি ঢাকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিধান চালু করা প্রয়োজন। তাহলে ঢাকার যানজট বহুলাংশে কমে আসবে। ঢাকার প্রবেশ দ্বার উত্তরে আমিন বাজার, আবদুল্লাহপুর, পশ্চিমে নবাবগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ, দক্ষিণে কাঁচপুর, যাত্রাবাড়ী, পূর্বে নরসিংদীর পলাশ থানার ঘোড়াশাল ব্রিজ দিয়ে ঢাকায় প্রবেশের পূর্বেই ব্যক্তিগত গাড়িগুলো সেখানে নির্দিষ্ট একটি জায়গায় পার্কিং করবে। এই প্রাইভেট গাড়ির অভিজাত যাত্রীগণও ঢাকায় প্রবেশ করবেন সাধারণ যাত্রী পরিবহনে। ঐসব জায়গায় আমিন বাজারে ট্রাক টার্মিনালের ন্যায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় কার টার্মিনাল গড়ে তুলতে হবে। সেখানে গাড়ি যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণে লোকজন থাকবে। এজন্য ব্যক্তিগত গাড়িওয়ালাদের ঘণ্টা হিসেবে নির্দিষ্ট হারে টাকা প্রদান করতে হবে। পরিবার-পরিজন নিয়ে যারা ব্যক্তিগত গাড়িতে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন তাদের নিজ গাড়ি নিয়েই ঢাকা প্রবেশে বা গন্তব্যে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য ঢাকায় প্রবেশ ফি হিসেবে নিদির্ষ্ট পরিমাণে টাকা প্রদান করতে হবে। আবার খোদ যারা ঢাকার অধিবাসী এবং ব্যক্তিগত গাড়ি আছে তারা তো ঢাকার মধ্যে গাড়ি চালাবেনই। সেক্ষেত্রে এই গাড়িওয়ালাদের ঢাকায় গাড়ি ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণে মাসিক ফি দিতে হবে। আবারো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, কোনো ব্যক্তিগত গাড়িকে সিএনজি গ্যাস দেয়া হবে না। ফুয়েলে এইসব গাড়ি চলাচল করবে। যাত্রী পরিবহনের জন্য সিএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি যাত্রী ভাড়া কোনো অবস্থাতেই বাড়াতে দেয়া যাবে না। ফুটপাতগুলো পুরোপুরি হকারমুক্ত রাখতে হবে। অনেকেই বলে থাকেন প্রশাসন আরো বিকেন্দ্রীকরণ করে ঢাকার বাইরে পাঠালে ঢাকার ওপর চাপ কমবে। আমরাও তা মনে করি। এ ছাড়াও ঢাকার অলিতে গলিতে যে স্কুল-কলেজ গড়ে উঠেছে ঐসব স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী পরিবহন বাসের ব্যবস্থা করবে। কোনো শিক্ষার্থী নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়িতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসবে না। শিক্ষার্থীদের নিরাপদে আসা-যাওয়া নিশ্চিত করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। এই ব্যবস্থাটি চালু করা সম্ভব হলে যানজট নিরসনে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে। অসুস্থ ছেলেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় ডাক্তারের কাছে নেয়ার সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় যে থেমে থাকতে হয়। তার কষ্ট ভুক্তভোগী মাত্রই উপলব্ধি করতে পারেন। যাত্রী পরিবহনগুলোতে রীতিমতো বির্তক হয়। সরকারের এখন কোন ক্ষেত্রটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত? সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের অভিমত বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং যানজট নিরসন। সুতরাং যানজট এখন আর হালকা বিষয় নয়। আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে ‘বলা সহজ, করা কঠিন’। আমি এই প্রবাদের মমার্থ পুরোপুরি বিশ্বাস করি। উপর্যুক্ত প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন অনেক কঠিন। নীতিমালা তৈরি, পার্কিংয়ের জন্য স্থান নির্বাচন, জমি অধিগ্রহণ, প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল গড়ে তোলা ইত্যাদি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ ছাড়াও উপর্যুক্ত প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করতে গেলে দেশের ধনিক শ্রেণী সরকারের ওপর রেগে যাবে। তারা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। এ জন্য এই উদ্যোগ গ্রহণে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সাহস। সরকার খুব সাহসী না হলে এই উদ্যোগ কোনো দিনই কোনো সরকারই গ্রহণ করবে না। তবে কী এই যানজট থেকে মুক্তি মিলবে না? যেভাবে প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা বেড়ে চলছে। তাতে দু চারটা ফ্লাইওভার নির্মাণ করলেই যানজট সহনীয় মাত্রায় আসবে না। যানজট নিরসনে সরকার যে বিধি ব্যবস্থা প্রবর্তনের চিন্তাভাবনা করছে। সেই সঙ্গে উপর্যুক্ত প্রস্তাবনা বিবেচনা করা হলে যানজট থেকে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যেতে পারে। এ জন্য কোনো না কোনো সরকারকে সাহস নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা সরকারকে উপর্যুক্ত প্রস্তাবনা গ্রহণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। কোন সরকার এগিয়ে আসবে, আমরা তা জানি না। তবে আমরা প্রতীক্ষায় রইলাম। লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ

0 comments:

Post a Comment