প্রাকৃতিক দুর্যোগ ধেয়ে আসছে : বাংলাদেশ কি প্রস্তুত
ড.ফোরকান আলী
প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে টিকে আছে বাংলদেশ। প্রকৃতির বিরূপ মনোভাবের কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হুেচ্ছ। এ ক্ষতি দেশটির উন্নয়ন তৎপরতাকে পিছিয়ে দিচেছ। কখনো কখনো প্রলয়ংকারী বন্যা এদেশের বিস্তিন্ন এলাকা বিরাণ ভূমিতে পরিণত করে। এটা শুধু দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। আর পরিবেশের ক্ষতির কথা বলাই বাহুল্য। বন্যায় কোটি কোটি মানুষের করুƒণ আর্তনাদে বাতাস ভারি হয়ে উঠে। ঘরবাড়ি, সহায় সম্বলহীন হারা মানুষের বুকফাঁটা কান্নার ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠে শহর, বন্দর ও গ্রামে। কোটি কোটি মানুষের কান্নার জল বানের স্রোতে একাকার হয়ে যায়।
এদেশে বন্যার ইতিহাস যুগ যুগের ইতিহাস। কবে থেকে এই অঞ্চলে বন্যা শুরুূ হয়েছিল তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। অতীতের রেকর্ডে দেখা যায়, ১৭৬৭ সালে এদেশে একটি ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। এ সময় এই অঞ্চলে ভূকিম্প ও হয়। এরপর ১৯১৭ সালে একটি বড় বন্যা হয়েছিল। রেকর্ডে ১৯৪৩ সালেও একটি বড় বন্যার উল্লেখ রয়েছে। মূলত ১৯৫৪ সাল থেকে বন্যার দোর্দন্ড দাপট শুর হয়। তখন থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩২ টি বড় ধরণের বন্যা হয়েছে। এরমধ্যে ১৭টিকে মহাপ্রলয়ংকরী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৫৪, ৫৫, ৫৬, ৬২, ৬৮, ৭০, ৭১, ৭৩, ৭৪, ৭৫, ৭৬, ৮০, ৮৪, ৮৭, ৮৮ এবং ৯৮ এর বন্যাগুলোকে মহাপ্রলয়ংকরী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ৯টি বন্যা হয়েছে। দেশটি জন্মও নিয়েছে প্রলয়ংকরী বন্যার বোঝা মাথায় নিয়ে। একদিকে যুদ্ধের সময় পাকিস্থান বাহিনীর দ্বারা ক্ষত-বিক্ষত। অপরদিকে কড়ালগ্রাসী বন্যার ছোবল দেশটির অর্থনীতিকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। ১৯৭১ সাল থেকে ৮৮ সাল পর্যন্ত একমাত্র ৮৫ সাল বাদে প্রতি বছরই বন্যা হয়েছে। এরপর দুতিন বছর বড় ধরনের বন্যা না হলেও বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ছোবল দেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষের ঘরবাড়ি সহায় সম্পত্তি কেড়ে নিয়েছে। আবার ১৯৯৮ সালে আরো একটি মহাপ্লাবন দেশের অর্থনীতির চাকাকে বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে গেছে।
এসব মহাপ্লাবনের ক্ষতির পরিমাণ নিরূপন করা খুবই কঠিন। তারপরও তখনকার সরকারের অনুমান নির্ভর হিসেবে দেখা যায়, ১৯৫৪ সালের বন্যায় ১ কোটি ২৩ লাখ একর জমির ফসল বিনষ্ট হয়। তখনকার টাকার অংকে সম্পদ ধ্বংসের পরিমান ছিল ১২০ কোটি টাকা। এই বন্যায় ১১২ জনের প্রাণহানি ঘটে। ১৯৫৫ সালের বন্যায় ১ কোটি ৬৮ লাখ একর জমির ফসল বিনষ্ট হয়েছে। এরমূল্য দাঁড়ায় ১২৯ কোটি টাকা। এই বন্যায় ১১৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। ৫৬ সালের বন্যায় ১৯ লাখ একর জমির ফসল বিনষ্ট হয়। ক্ষতির পরিমাণ টাকার অংকে ছিল ৯০ কোটি টাকা। ১৯৬০ সালের বন্যায় ৮টি বৃহত্তর জেলার ৪০ শতাংশ ফসল বিনষ্ট হয়েছিল। ৬১ সালেল বন্যায় ৬টি জেলার ৩০ শতাংশ ফসল বিনষ্ট হয়েছিল। ৬২ সালের সর্বনাশা বন্যা তছনছ করেছে পুরো দেশকে। এই বন্যায় ১৪ হাজার ৪০০ বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয়েছে। মানুষ মারা গেছে ১৭৭ জন। এই বন্যায় ফসল নষ্ট হয় ৩ কোটি ৩১ লাখ মন। ১৯৬৩ ও ৬৪ সালের বন্যায় ৩ লাখ ২১ হাজার টন খাদ্যশস্য এবং ১৭ হাজার টন বেল পাট নষ্ট হয়। ৬৬ সালের বন্যায় ১২ হাজার ৯০০ বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয়। ৬৮ সালের বন্যায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টন খাদ্যশস্য এবং ১ লাখ ১১ হাজার টন বেল পাট নষ্ট হয়। এই বন্যায় লোক মারা যায় ১২৬জন। এই বন্যার টাকার হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১১৬ কোটি টাকা। ১৯৬৯ সালের বন্যায় ১৬ হাজার বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয়। এই বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১১৩ কোটি টাকা। ১৯৭০ সালের মহাপ্রলয়ংকরী বন্যা ও জলোচ্ছাসে শুধু লোকই মারা যায় সরকারি হিসেবে ৫ লাখ। এই বন্যায় ১৬ হাজার বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয় এবং ১২ লাখ ৯৮হাজার টন খাদ্যশস্য নষ্ট হয়। ১৯৭১ সালে আরো একটি মহাপ্রলয়ংকরী বন্যা হয়। এই বন্যায় ১৪ হাজার বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয় এবং ১২ লাখ টন ফসল নষ্ট হয়। এ বছর মানুষ মারা যায় ১২০জন। ২ লাখ ১৯ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ নষ্ট এবং ২ হাজার গবাদি পশুর মৃত্যু হয়। এভাবে ৭২, ৭৩ ও ৭৪ সালে বন্যায় বিপুল ক্ষতি হয়। ১৯৮৮ সালেল মহাপ্লবনের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছি। স্মরণকালের ভয়াবহতম বন্যয় দেশের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৩০ হাজার বর্গমাইল তলিয়ে যায়। বন্যার করাল গ্রাসে সরকারি হিসেবে অনুযায়ী লোক মারা যায় ৩৩৩জন। আর বেসরাকরি হিসেবে এই সংখ্যা ৬ শ'য়ের বেশি। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৪৭টি জেলা বন্যায় প্লাবিত হয়েছিল্ ৪৬৮ টি উপজেলার ২৯৩ টি সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ লোকের সংখ্যা সরকারি হিসেবে ২ কোটি ১০ লাখ। বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা তিন কোটি। বিগত ৩৫ বছরে বন্যা বলিত হয়নি এমন সব উঁচু এলাকাও তলিয়ে গিয়েছিল ৮৮ এর মহাপ্লাবনে। এই মহাপ্লাবনে দেশের প্রায় ৮০ লাখ ঘরবাড়ি সম্পুর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়েছিল। বন্যায় এক কোটি কৃষক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। প্রায় ২০ লাখ একর জমির ফসল পুরোপুরি এবং ১৫লাখ একরজমির ফসল আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বন্যায় সরকারি হিসেবে ফসল ক্ষতি হয়েছিল ২০ লাখ টন। প্রলয়ংকরি বন্যার ছোবলে দেশের ৬ হাজার কিলোমিটার মহাসড়কের মধ্যে এক হাজার ১৭৫ কিলোমিটার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোটিার সড়কের মধ্যে এক হাজার ৪০০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দেশের ২৪৬ টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং প্রায় আড়াই হাজার ফুট রেলপথ বন্যায় ভেসে গেছে। সরকারি সূত্রে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ পুনঃমেরামতের জন্য তখন প্রায় ৪০ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। এছাড়াও কয়েক হাজার গবাদিপশুর মৃত্যু ঘটেছিল। বন্যায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়েছে। বন্যায় রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সমগ্র দেশের সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এই বন্যায় রাজধানীরও অনেক এলাকা ডুবে গিয়েছিল। ধানমন্ডি শেরে বাংলা নগর, গুলিস্থান ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কিছু অংশ ছাড়া প্রায় সব এলাকাই জলমগ্ন হয়েছিল। তখনকার হিসেবে ৬০ লাখ লোকের রাজধানী ঢাকা শহরের প্রায় ৫০ লাখই পানিবন্দী ছিল। ঢাকায় প্রায় ৪০০ ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছিল। এসব ত্রাণ শিবিরে প্রায় ৫ লাখ বন্যার্ত আশ্রয় নিয়েছিল। বন্যার পানি বিমান বন্দরের রানওয়েতে উঠে যাওয়ার কারণে ঢাকা আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দরে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আবহাওয়া অফিস, স্পার্শো ভবন, আগারগাঁও সম্প্রচার ভবন, পঙ্গু হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল প্রভৃতি স্থানে পানি উঠে গিয়েছিল। পঙ্গু হাসপাতালে রোগী ভর্তিই বন্ধ রাখা হয়েছিল। মিটফোর্ট হাসপাতালে সকল অপারেশন স্থগিত রাখা হয়েছিল। শ্যামলী এলাকায় আবাসিক ভবেনর একতলা র্পযন্ত তলিয়ে গিয়েছিল। ডুবে যাওয়া ঢাকা শহরে তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছিল। ওয়াসার ২৭টি গভীর নলকুপ বিকল হয়ে পড়েছিল। ফলে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ২০ থেকে ২৫ ভাগ কমে গিয়েছিল। বন্যাকবলিত ঘিঞ্জি এলাকাগুলোতে পরিবেশ শীতল হয়ে উঠেছিল। কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছিল ডায়রিয়া, পেটের পীড়া। ১৯৮৭, ৮৮ সালের বন্যার মতো ৯৮ সালের বন্যাও দীর্ঘ সময় স্থায়ী ছিল। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় বিপুল ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সরকারের তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূরক কম ছিল। তারপরেও বন্যায় অর্থনীতির সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় কৃষিখাত। এছাড়া যেগাযোগ ব্যবস্থাসহ অকৃষিখাতের অবকাঠামোও যথেষ্ট ক্ষতি হয়। ১৯৯৮ সালের বন্যার কিছু খতিয়ান এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলা ভাষার সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক আনন্দ বাজার পত্রিকায় এই বন্যাকে ১০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, ভয়ংকর এই বন্যায় বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫২টি জেলাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সে সময় দেশের ১২ কোটি মানুষের মধ্যে তিন কোটি মানুষই ছিল বন্যা কবলিত। দেশের মোট ৬৫ হাজার হেক্টর জমি দীর্ঘদিন ধরে বন্যায় ডুবে ছিল। অন্যান্য ক্ষতির হিসেব বাদ দিলেও কেবল খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২১৮ লাখ মেট্রিক টন। বন্যায় মানুষ মারা গিয়েছিল ১ হাজার ৫০০ জন। গবাদি পশুর মৃত্যুর সংখ্যা ২২ হাজার। এবারের বন্যা চলেছে ৮০ দিন ধরে। দেশের তিন লাখ নলকূপ নষ্ট হয়ে হওয়ায় পানীয় জলের সংকট চরমভাবে দেখা দিয়েছিল। বন্যায় ক্ষতির পরিমান দাঁড়ায় ৩০৭৯ কোটি টাকা। এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে সরকারকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। এছাড়া ২০০০ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে এক আকস্মিক বন্যায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ৭টি এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় ২টি জেলার ৪১টি উপজেলার ২৮০টি ইউনিয়নে বন্যয় ৩০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে। ৮ লাখের বেশিমানুষ গৃহহীন হওয়ার পাশাপাশি উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। বেসরাকরি হিসেবে মানুষ মারা গিয়েছিল ১৩০ জন। এদের বেশির ভাগ মানুষ সাপের কামড়ে, পানিতে ডুবে এবং পেটের পীড়ায় ভুগে মারা গেছে। সরকারি বিবৃতিতে জেলা তথ্য কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ৫৮ হাজার ৯০৫টি পরিবারের ৩১ লাখ ৯২ হাজার ৭৮৬ জন বন্যায় সরাসরি ক্ষতিগস্থ হয়। ৮ লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়ে ৮ শতাধিক আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য হয়েছিল। অপরদিকে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরে বাংলাদেশের উপরদিয়ে সিডর প্রবাহিত হয়। এর আঘাতের কবলে পড়ে দেশের ২২টি জেলা। সিডরে প্রায় ১৫০০০ হাজার লোক মারা যায়। এছাড়া ২০০৯ সালের ২৫মের আইলা মাত্র দেড় বছরের মাথায় দ্বিতীয় আঘাতে সম্পদ ও মনবল দুই হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে দক্ষিণাঞ্চলসহ উপকুলীয় এলাকার মানুষ। যে ক্ষত এখনো কাটিয়ে উঠতে পাওে নি। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় এটি ১৩১ বছরের ইতিহাসে বড় দশটি ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে অন্যতম। এদিকে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন বাংলাদেশের মতো ভাটীর দেশের জন্য আগামীতে রয়েছে আরো অনেক অজানা শঙ্কা। এক্ষুনি প্রস্তুতি নিতে হবে। আমরা আশাকরি সরকার দেশের সর্বময় জনগণের সম্পৃক্ততায় সার্বিক বন্যা ও দূর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিবেন।
লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
মোবাইল:০১৭১১৫৭৯২৬৭
ড.ফোরকান আলী
প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে টিকে আছে বাংলদেশ। প্রকৃতির বিরূপ মনোভাবের কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হুেচ্ছ। এ ক্ষতি দেশটির উন্নয়ন তৎপরতাকে পিছিয়ে দিচেছ। কখনো কখনো প্রলয়ংকারী বন্যা এদেশের বিস্তিন্ন এলাকা বিরাণ ভূমিতে পরিণত করে। এটা শুধু দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। আর পরিবেশের ক্ষতির কথা বলাই বাহুল্য। বন্যায় কোটি কোটি মানুষের করুƒণ আর্তনাদে বাতাস ভারি হয়ে উঠে। ঘরবাড়ি, সহায় সম্বলহীন হারা মানুষের বুকফাঁটা কান্নার ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠে শহর, বন্দর ও গ্রামে। কোটি কোটি মানুষের কান্নার জল বানের স্রোতে একাকার হয়ে যায়।
এদেশে বন্যার ইতিহাস যুগ যুগের ইতিহাস। কবে থেকে এই অঞ্চলে বন্যা শুরুূ হয়েছিল তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। অতীতের রেকর্ডে দেখা যায়, ১৭৬৭ সালে এদেশে একটি ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। এ সময় এই অঞ্চলে ভূকিম্প ও হয়। এরপর ১৯১৭ সালে একটি বড় বন্যা হয়েছিল। রেকর্ডে ১৯৪৩ সালেও একটি বড় বন্যার উল্লেখ রয়েছে। মূলত ১৯৫৪ সাল থেকে বন্যার দোর্দন্ড দাপট শুর হয়। তখন থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩২ টি বড় ধরণের বন্যা হয়েছে। এরমধ্যে ১৭টিকে মহাপ্রলয়ংকরী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৫৪, ৫৫, ৫৬, ৬২, ৬৮, ৭০, ৭১, ৭৩, ৭৪, ৭৫, ৭৬, ৮০, ৮৪, ৮৭, ৮৮ এবং ৯৮ এর বন্যাগুলোকে মহাপ্রলয়ংকরী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ৯টি বন্যা হয়েছে। দেশটি জন্মও নিয়েছে প্রলয়ংকরী বন্যার বোঝা মাথায় নিয়ে। একদিকে যুদ্ধের সময় পাকিস্থান বাহিনীর দ্বারা ক্ষত-বিক্ষত। অপরদিকে কড়ালগ্রাসী বন্যার ছোবল দেশটির অর্থনীতিকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। ১৯৭১ সাল থেকে ৮৮ সাল পর্যন্ত একমাত্র ৮৫ সাল বাদে প্রতি বছরই বন্যা হয়েছে। এরপর দুতিন বছর বড় ধরনের বন্যা না হলেও বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ছোবল দেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষের ঘরবাড়ি সহায় সম্পত্তি কেড়ে নিয়েছে। আবার ১৯৯৮ সালে আরো একটি মহাপ্লাবন দেশের অর্থনীতির চাকাকে বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে গেছে।
এসব মহাপ্লাবনের ক্ষতির পরিমাণ নিরূপন করা খুবই কঠিন। তারপরও তখনকার সরকারের অনুমান নির্ভর হিসেবে দেখা যায়, ১৯৫৪ সালের বন্যায় ১ কোটি ২৩ লাখ একর জমির ফসল বিনষ্ট হয়। তখনকার টাকার অংকে সম্পদ ধ্বংসের পরিমান ছিল ১২০ কোটি টাকা। এই বন্যায় ১১২ জনের প্রাণহানি ঘটে। ১৯৫৫ সালের বন্যায় ১ কোটি ৬৮ লাখ একর জমির ফসল বিনষ্ট হয়েছে। এরমূল্য দাঁড়ায় ১২৯ কোটি টাকা। এই বন্যায় ১১৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। ৫৬ সালের বন্যায় ১৯ লাখ একর জমির ফসল বিনষ্ট হয়। ক্ষতির পরিমাণ টাকার অংকে ছিল ৯০ কোটি টাকা। ১৯৬০ সালের বন্যায় ৮টি বৃহত্তর জেলার ৪০ শতাংশ ফসল বিনষ্ট হয়েছিল। ৬১ সালেল বন্যায় ৬টি জেলার ৩০ শতাংশ ফসল বিনষ্ট হয়েছিল। ৬২ সালের সর্বনাশা বন্যা তছনছ করেছে পুরো দেশকে। এই বন্যায় ১৪ হাজার ৪০০ বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয়েছে। মানুষ মারা গেছে ১৭৭ জন। এই বন্যায় ফসল নষ্ট হয় ৩ কোটি ৩১ লাখ মন। ১৯৬৩ ও ৬৪ সালের বন্যায় ৩ লাখ ২১ হাজার টন খাদ্যশস্য এবং ১৭ হাজার টন বেল পাট নষ্ট হয়। ৬৬ সালের বন্যায় ১২ হাজার ৯০০ বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয়। ৬৮ সালের বন্যায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টন খাদ্যশস্য এবং ১ লাখ ১১ হাজার টন বেল পাট নষ্ট হয়। এই বন্যায় লোক মারা যায় ১২৬জন। এই বন্যার টাকার হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১১৬ কোটি টাকা। ১৯৬৯ সালের বন্যায় ১৬ হাজার বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয়। এই বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১১৩ কোটি টাকা। ১৯৭০ সালের মহাপ্রলয়ংকরী বন্যা ও জলোচ্ছাসে শুধু লোকই মারা যায় সরকারি হিসেবে ৫ লাখ। এই বন্যায় ১৬ হাজার বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয় এবং ১২ লাখ ৯৮হাজার টন খাদ্যশস্য নষ্ট হয়। ১৯৭১ সালে আরো একটি মহাপ্রলয়ংকরী বন্যা হয়। এই বন্যায় ১৪ হাজার বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয় এবং ১২ লাখ টন ফসল নষ্ট হয়। এ বছর মানুষ মারা যায় ১২০জন। ২ লাখ ১৯ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ নষ্ট এবং ২ হাজার গবাদি পশুর মৃত্যু হয়। এভাবে ৭২, ৭৩ ও ৭৪ সালে বন্যায় বিপুল ক্ষতি হয়। ১৯৮৮ সালেল মহাপ্লবনের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছি। স্মরণকালের ভয়াবহতম বন্যয় দেশের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৩০ হাজার বর্গমাইল তলিয়ে যায়। বন্যার করাল গ্রাসে সরকারি হিসেবে অনুযায়ী লোক মারা যায় ৩৩৩জন। আর বেসরাকরি হিসেবে এই সংখ্যা ৬ শ'য়ের বেশি। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৪৭টি জেলা বন্যায় প্লাবিত হয়েছিল্ ৪৬৮ টি উপজেলার ২৯৩ টি সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ লোকের সংখ্যা সরকারি হিসেবে ২ কোটি ১০ লাখ। বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা তিন কোটি। বিগত ৩৫ বছরে বন্যা বলিত হয়নি এমন সব উঁচু এলাকাও তলিয়ে গিয়েছিল ৮৮ এর মহাপ্লাবনে। এই মহাপ্লাবনে দেশের প্রায় ৮০ লাখ ঘরবাড়ি সম্পুর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়েছিল। বন্যায় এক কোটি কৃষক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। প্রায় ২০ লাখ একর জমির ফসল পুরোপুরি এবং ১৫লাখ একরজমির ফসল আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বন্যায় সরকারি হিসেবে ফসল ক্ষতি হয়েছিল ২০ লাখ টন। প্রলয়ংকরি বন্যার ছোবলে দেশের ৬ হাজার কিলোমিটার মহাসড়কের মধ্যে এক হাজার ১৭৫ কিলোমিটার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোটিার সড়কের মধ্যে এক হাজার ৪০০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দেশের ২৪৬ টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং প্রায় আড়াই হাজার ফুট রেলপথ বন্যায় ভেসে গেছে। সরকারি সূত্রে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ পুনঃমেরামতের জন্য তখন প্রায় ৪০ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। এছাড়াও কয়েক হাজার গবাদিপশুর মৃত্যু ঘটেছিল। বন্যায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়েছে। বন্যায় রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সমগ্র দেশের সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এই বন্যায় রাজধানীরও অনেক এলাকা ডুবে গিয়েছিল। ধানমন্ডি শেরে বাংলা নগর, গুলিস্থান ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কিছু অংশ ছাড়া প্রায় সব এলাকাই জলমগ্ন হয়েছিল। তখনকার হিসেবে ৬০ লাখ লোকের রাজধানী ঢাকা শহরের প্রায় ৫০ লাখই পানিবন্দী ছিল। ঢাকায় প্রায় ৪০০ ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছিল। এসব ত্রাণ শিবিরে প্রায় ৫ লাখ বন্যার্ত আশ্রয় নিয়েছিল। বন্যার পানি বিমান বন্দরের রানওয়েতে উঠে যাওয়ার কারণে ঢাকা আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দরে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আবহাওয়া অফিস, স্পার্শো ভবন, আগারগাঁও সম্প্রচার ভবন, পঙ্গু হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল প্রভৃতি স্থানে পানি উঠে গিয়েছিল। পঙ্গু হাসপাতালে রোগী ভর্তিই বন্ধ রাখা হয়েছিল। মিটফোর্ট হাসপাতালে সকল অপারেশন স্থগিত রাখা হয়েছিল। শ্যামলী এলাকায় আবাসিক ভবেনর একতলা র্পযন্ত তলিয়ে গিয়েছিল। ডুবে যাওয়া ঢাকা শহরে তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছিল। ওয়াসার ২৭টি গভীর নলকুপ বিকল হয়ে পড়েছিল। ফলে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ২০ থেকে ২৫ ভাগ কমে গিয়েছিল। বন্যাকবলিত ঘিঞ্জি এলাকাগুলোতে পরিবেশ শীতল হয়ে উঠেছিল। কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছিল ডায়রিয়া, পেটের পীড়া। ১৯৮৭, ৮৮ সালের বন্যার মতো ৯৮ সালের বন্যাও দীর্ঘ সময় স্থায়ী ছিল। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় বিপুল ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সরকারের তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূরক কম ছিল। তারপরেও বন্যায় অর্থনীতির সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় কৃষিখাত। এছাড়া যেগাযোগ ব্যবস্থাসহ অকৃষিখাতের অবকাঠামোও যথেষ্ট ক্ষতি হয়। ১৯৯৮ সালের বন্যার কিছু খতিয়ান এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলা ভাষার সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক আনন্দ বাজার পত্রিকায় এই বন্যাকে ১০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, ভয়ংকর এই বন্যায় বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫২টি জেলাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সে সময় দেশের ১২ কোটি মানুষের মধ্যে তিন কোটি মানুষই ছিল বন্যা কবলিত। দেশের মোট ৬৫ হাজার হেক্টর জমি দীর্ঘদিন ধরে বন্যায় ডুবে ছিল। অন্যান্য ক্ষতির হিসেব বাদ দিলেও কেবল খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২১৮ লাখ মেট্রিক টন। বন্যায় মানুষ মারা গিয়েছিল ১ হাজার ৫০০ জন। গবাদি পশুর মৃত্যুর সংখ্যা ২২ হাজার। এবারের বন্যা চলেছে ৮০ দিন ধরে। দেশের তিন লাখ নলকূপ নষ্ট হয়ে হওয়ায় পানীয় জলের সংকট চরমভাবে দেখা দিয়েছিল। বন্যায় ক্ষতির পরিমান দাঁড়ায় ৩০৭৯ কোটি টাকা। এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে সরকারকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। এছাড়া ২০০০ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে এক আকস্মিক বন্যায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ৭টি এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় ২টি জেলার ৪১টি উপজেলার ২৮০টি ইউনিয়নে বন্যয় ৩০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে। ৮ লাখের বেশিমানুষ গৃহহীন হওয়ার পাশাপাশি উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। বেসরাকরি হিসেবে মানুষ মারা গিয়েছিল ১৩০ জন। এদের বেশির ভাগ মানুষ সাপের কামড়ে, পানিতে ডুবে এবং পেটের পীড়ায় ভুগে মারা গেছে। সরকারি বিবৃতিতে জেলা তথ্য কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ৫৮ হাজার ৯০৫টি পরিবারের ৩১ লাখ ৯২ হাজার ৭৮৬ জন বন্যায় সরাসরি ক্ষতিগস্থ হয়। ৮ লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়ে ৮ শতাধিক আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য হয়েছিল। অপরদিকে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরে বাংলাদেশের উপরদিয়ে সিডর প্রবাহিত হয়। এর আঘাতের কবলে পড়ে দেশের ২২টি জেলা। সিডরে প্রায় ১৫০০০ হাজার লোক মারা যায়। এছাড়া ২০০৯ সালের ২৫মের আইলা মাত্র দেড় বছরের মাথায় দ্বিতীয় আঘাতে সম্পদ ও মনবল দুই হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে দক্ষিণাঞ্চলসহ উপকুলীয় এলাকার মানুষ। যে ক্ষত এখনো কাটিয়ে উঠতে পাওে নি। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় এটি ১৩১ বছরের ইতিহাসে বড় দশটি ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে অন্যতম। এদিকে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন বাংলাদেশের মতো ভাটীর দেশের জন্য আগামীতে রয়েছে আরো অনেক অজানা শঙ্কা। এক্ষুনি প্রস্তুতি নিতে হবে। আমরা আশাকরি সরকার দেশের সর্বময় জনগণের সম্পৃক্ততায় সার্বিক বন্যা ও দূর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিবেন।
লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
মোবাইল:০১৭১১৫৭৯২৬৭
0 comments:
Post a Comment