পানি সংকট : আগামীর বিশ্ব ও বাংলাদেশ
ড.ফোরকান আলী
অতি সস্তার অবস্থা প্রকাশ করতে একটা প্রবাদ আছে। জলের দামে কেনা। কিন্তু ব্যাপক প্রচলিত এই কথার সত্যতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। দিন যতোই যাচ্ছে জনসংখ্যা ততোই বাড়ছে। সেই সঙ্গে পানির চাহিদাও বাড়ছে । পানি ছাড়া মানব জীবন কল্পনা করা যায় না। মানব জীবনে পানির বহুবিধ ব্যবহারের কারণে বলা হয়। পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু সেই পানির অভাবে যে বিশ্বের প্রায় সাড়ে ছয়শত কোটি মানুষের জীবন হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে। তা আমরা সহজে কল্পনা করতে পারি না। ভূপৃষ্ঠের চারভাগের তিনভাগই পানি বেষ্টিত। অর্থাৎ মোট ভূ-খ-ের ৭৫% পানি। ভূ-পৃষ্ঠের ৯৭ভাগ পানি লবণাক্ত। ফলে তা খাওয়ার উপযোগী নয়। ২ ভাগ পানির উৎস বরফ কিংবা তুষারপাত। আর মাত্র একভাগ খাবার পানি নিয়েই যতো কাড়াকাড়ি। এই একভাগ খাবার পানির মোট পরিমাণ হচ্ছে ৯২ লাখ ৫০ হাজার ট্রিলিয়ন গ্যালন। এই পানি দিয়ে কেবল তৃষ্ণা মেটানোই হয় না। ফসল ফলাতে, বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেনের অভাব মেটাতে গাছ উৎপাদনে, গোসল, গৃহস্থালির কাজে এবং সবচেয়ে আলোচিত খাত শিল্পপণ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়। শিল্পপণ্য উৎপাদনে যে পরিমাণ পানির ব্যবহার হচ্ছে তা পানি সংকটকে আরো ত্বরান্বিত করছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় একটি সুতার টি-শার্ট বানাতে লাগে ২০০০ লিটার পানি। শিল্প কারখানা যে শুধু বিপুল পরিমাণ খাবার পানি নষ্ট করছে তা নয় বরং পানির উৎসও দূষিত করে ফেলছে। কারখানার ব্যবহৃত রাসায়নিক বর্জ্য যা খাবার পানির সঙ্গে মিশে পানিকে দূষিত করে ফেলছে। অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে শিল্পায়নের উপর জোর দেয়া হচ্ছে। আর পরিকল্পনাহীনভাবে সেগুলো পানি দূষণ করে চলছে। পানি দূষণের কারণে পানিতে বাসকারী জীবজন্তুর পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। কৃষিকাজের উপরেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এক গবেষণায় জানিয়েছে, ২০ বছর পর বিশ্বের কমপক্ষে ৩৯০ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য হাহাকার করবে। ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা বেড়ে ৮৩০ কোটি হবে। এই দুই শতকে পানির চাহিদা বাড়বে ৩০ ভাগ। খাদ্য চাহিদা বাড়বে ৩০ ভাগ। বর্ধিত জনগোষ্ঠীর অতিরিক্ত খাদ্য ও পণ্য উৎপাদনের জন্য পানির ব্যবহার বাড়বে ৭০ ভাগ দিন দিন পানির চাহিদা বেড়েই চলছে। কিন্তু সে তুলনায় পানির উৎস বাড়ছে না বরং কমছে। বিশুদ্ধ খাবার পানির উৎসে ঢুকেছে রোগ জীবাণু। ফলে মানুষ তা পান করে রোগাক্রান্ত হচ্ছে। পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রভৃতি কারণে বিশুদ্ধ খাবার পানির আকাল দেখা দিচ্ছে বিশ্বজুড়ে। দ্রুত নামছে ভূ-গর্ভস্থ বিশুদ্ধ পানির স্তর। বিপরীতে বাড়ছে লবণাক্ত সমুদ্রের পানির উচ্চতা। ফলে সমতল ভূমির নিরাপদ পানির উৎসগুলো বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সামুদ্রিক দুর্যোগে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে নদী খাল বিলের পানির সঙ্গে মিশে তা লবণাক্ত করে ফেলছে। জ্বালানি তেলও খাদ্যের পর পানি সংকট যুক্ত হওয়ায় সমস্যা আরো ঘনীভূত হচ্ছে। পানি নিয়ে শুরু হয়ে গেচ্ছে নীরব যুদ্ধ। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর কমপক্ষে ১০০ কোটি মানুষ এখন খাওয়ার পানির সংকটে। একজন ব্যক্তির প্রতিদিন যে পরিমাণ পানি পান করা উচিত তা মিলছে না। বিশেষ করে উন্নয়নশীল কিছু দেশের বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোর উপরও। কারণ তারা তাদের খাদ্য ও পণ্যের জন্য উন্নয়নশীল দেশের উপর নির্ভরশীল। জ্বালানি তেলের অঞ্চলের উপর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে যেমন আজকের বিশ্ব রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে। জঙ্গিবাদের অজুহাতে যেমন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মধ্যপ্রাচ্যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। তেমনি আগামীর বিশ্ব রাজনীতির পট পানি নিয়ে পরিচালিত হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। জ্বালানি তেল পাচারের জন্য যেভাবে লাইন তৈরি করা হয়েছে। তেমনি করে পানি পাচারের জন্যও পাইপ লাইন তৈরি হবে। আর্ন্তজাতিক বাজারেও বিপনন হবে বিশুদ্ধ পানি। জাহাজের পর জাহাজ ভরে পানির বাণিজ্য হবে। কোনো কোনো দেশে ইতোমধ্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য শতশত মাইল পাইপ লাইন বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এমন দিন আসছে যখন খাল খনন নদী ড্রেজিং, পাম্প সংস্থাপন করেও পানির সংকট মেটানো যাবে না। বিশ্ব পানি দিবসে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, বিশ্বে প্রতি বছর যুদ্ধসহ সব ধরনের দাঙ্গা সংঘাতে যতো মানুষ মারা যায় অনিরাপদ পানি পান করে ও পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে তার চেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়। ইউনিসেফের মতে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার মোট জনসংখ্যার ৩৯ শতাংশ অর্থাৎ ঐ অঞ্চলের ১৫ কোটি মানুষ তাদের প্রয়োজন মতো পানি পায় না। আফ্রিকার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে খাবার পানির অভাব। তাদের হিসেব মতে ১৯৯৯ সালে ঐ এলাকায় পানি সংকটে থাকা লোকের সংখ্যা ছিলো ১২ কোটি ৬০ লাখ। ২০০৮ সালে সে সংখ্যা সাড়ে ১৫ কোটিতে পৌঁছেছে। সংস্থাটির মতে আফ্রিকার মোট ৫০টি দেশের মধ্যে মাত্র ৬টি দেশ খাবার পানির চাহিদা মেটাতে সক্ষম। আফ্রিকার ১০টি দেশ যে নীল নদের পানির উপর নির্ভরশীল সে পানি ও কৃত্রিম বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির অভাব একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের উপর বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নির্ভর করছে। এটা মানবিক ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। পানির ওপর ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে। কাজেই এখন থেকেই পানির ব্যবহারে ব্যক্তি-সচেতনতা বাড়াতে হবে। অকারণে পানির অপচয় রোধ করতে হবে। পানি দূষিত হয় এমন সব কার্যক্রম যতোদূর সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। পানি সম্পদের ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা সৃষ্টি করতে হবে। নিরাপদ পানির উৎসের সঙ্গে পাইপলাইনের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। পানির উৎস যতো দূরেই থাকুক না কেন। পানির সরবরাহ ঠিক রাখতে আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের চেয়ে এশিয়া মহাদেশ এখনো সুবিধাজনক স্থানে রয়েছে। এশিয়া মহাদেশের নিরাপদ বিশুদ্ধ খাবার পানির উৎস হতে পারে হিমালয়। তাই বিশাল পর্বতমালার পাদদেশে গভীর জলাশয় সৃষ্টি করে অঞ্চলিক পাইপলাইনের মাধ্যমে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে এখনই আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। বিশুদ্ধ খাবার পানির উপর থেকে চাপ কমাতে কারখানায় ব্যবহারের জন্য খাবার পানির উৎস ছাড়া অন্য কোনো উৎস হতে পানি আনার পদ্ধতি আবিস্কার করতে হবে। লবণাক্ত পানি কারখানায় ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হবে। আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহার্য পানি প্রক্রিয়াজাত করে পুনর্ব্যবহার উপযোগী করতে হবে। পানি সম্পদ সমৃদ্ধ বাংলাদেশে বিপন্নখাতগুলোর মধ্যে পানি অন্যতম। দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা উত্তরাঞ্চলের শুষ্কতা এবং মধ্য ভাগের বিরাট অঞ্চলের পানি আর্সেনিক বিষাক্ত । এখন খোদ রাজধানীতেই হচ্ছে কারবালার দশা। ভেঙে পড়ছে পানি শোধন ও সরবরাহ ব্যবস্থা। অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি এতোসব বিপর্যয়কে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলছে। পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ১৩টি মন্ত্রণালয় ও ৪০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান জড়িত। পানি দুর্নীতির সঙ্গে তাদের কমবেশি সম্পর্ক অছে। শিল্প কারখানার পরিত্যক্ত বর্জ্যে ঢাকার চারপাশের নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। নদীগুলোতে পঁচা পানিতে উৎকট গন্ধ ছড়াচ্ছে। নদী পারাপারের সময় যাত্রীদের দম বন্ধ হয়ে আসে। দুর্গন্ধে নদীর পাড়ে বাস করাও কষ্টকর। জানা যায় ৪০-৫০ বছর আগে এই নদীগুলো থেকে বিদেশি জাহাজ নাবিকরা পানির স্বচ্ছতা দেখে নিজ দেশে নিয়ে যেতো। হাজার হাজার টন শিল্পবর্জ্য প্রতিনিয়ত পানির সঙ্গে মিশে দূষিত করছে। কারখানায় ইটিপি বা বর্জ্য শোধন প্রকল্প বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। নদীর পানির স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখতে হবে। ঢাকা এবং বাংলাদেশকে বাসযোগ্য করতে পানি সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে হবে। লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
ড.ফোরকান আলী
অতি সস্তার অবস্থা প্রকাশ করতে একটা প্রবাদ আছে। জলের দামে কেনা। কিন্তু ব্যাপক প্রচলিত এই কথার সত্যতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। দিন যতোই যাচ্ছে জনসংখ্যা ততোই বাড়ছে। সেই সঙ্গে পানির চাহিদাও বাড়ছে । পানি ছাড়া মানব জীবন কল্পনা করা যায় না। মানব জীবনে পানির বহুবিধ ব্যবহারের কারণে বলা হয়। পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু সেই পানির অভাবে যে বিশ্বের প্রায় সাড়ে ছয়শত কোটি মানুষের জীবন হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে। তা আমরা সহজে কল্পনা করতে পারি না। ভূপৃষ্ঠের চারভাগের তিনভাগই পানি বেষ্টিত। অর্থাৎ মোট ভূ-খ-ের ৭৫% পানি। ভূ-পৃষ্ঠের ৯৭ভাগ পানি লবণাক্ত। ফলে তা খাওয়ার উপযোগী নয়। ২ ভাগ পানির উৎস বরফ কিংবা তুষারপাত। আর মাত্র একভাগ খাবার পানি নিয়েই যতো কাড়াকাড়ি। এই একভাগ খাবার পানির মোট পরিমাণ হচ্ছে ৯২ লাখ ৫০ হাজার ট্রিলিয়ন গ্যালন। এই পানি দিয়ে কেবল তৃষ্ণা মেটানোই হয় না। ফসল ফলাতে, বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেনের অভাব মেটাতে গাছ উৎপাদনে, গোসল, গৃহস্থালির কাজে এবং সবচেয়ে আলোচিত খাত শিল্পপণ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়। শিল্পপণ্য উৎপাদনে যে পরিমাণ পানির ব্যবহার হচ্ছে তা পানি সংকটকে আরো ত্বরান্বিত করছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় একটি সুতার টি-শার্ট বানাতে লাগে ২০০০ লিটার পানি। শিল্প কারখানা যে শুধু বিপুল পরিমাণ খাবার পানি নষ্ট করছে তা নয় বরং পানির উৎসও দূষিত করে ফেলছে। কারখানার ব্যবহৃত রাসায়নিক বর্জ্য যা খাবার পানির সঙ্গে মিশে পানিকে দূষিত করে ফেলছে। অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে শিল্পায়নের উপর জোর দেয়া হচ্ছে। আর পরিকল্পনাহীনভাবে সেগুলো পানি দূষণ করে চলছে। পানি দূষণের কারণে পানিতে বাসকারী জীবজন্তুর পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। কৃষিকাজের উপরেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এক গবেষণায় জানিয়েছে, ২০ বছর পর বিশ্বের কমপক্ষে ৩৯০ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য হাহাকার করবে। ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা বেড়ে ৮৩০ কোটি হবে। এই দুই শতকে পানির চাহিদা বাড়বে ৩০ ভাগ। খাদ্য চাহিদা বাড়বে ৩০ ভাগ। বর্ধিত জনগোষ্ঠীর অতিরিক্ত খাদ্য ও পণ্য উৎপাদনের জন্য পানির ব্যবহার বাড়বে ৭০ ভাগ দিন দিন পানির চাহিদা বেড়েই চলছে। কিন্তু সে তুলনায় পানির উৎস বাড়ছে না বরং কমছে। বিশুদ্ধ খাবার পানির উৎসে ঢুকেছে রোগ জীবাণু। ফলে মানুষ তা পান করে রোগাক্রান্ত হচ্ছে। পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রভৃতি কারণে বিশুদ্ধ খাবার পানির আকাল দেখা দিচ্ছে বিশ্বজুড়ে। দ্রুত নামছে ভূ-গর্ভস্থ বিশুদ্ধ পানির স্তর। বিপরীতে বাড়ছে লবণাক্ত সমুদ্রের পানির উচ্চতা। ফলে সমতল ভূমির নিরাপদ পানির উৎসগুলো বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সামুদ্রিক দুর্যোগে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে নদী খাল বিলের পানির সঙ্গে মিশে তা লবণাক্ত করে ফেলছে। জ্বালানি তেলও খাদ্যের পর পানি সংকট যুক্ত হওয়ায় সমস্যা আরো ঘনীভূত হচ্ছে। পানি নিয়ে শুরু হয়ে গেচ্ছে নীরব যুদ্ধ। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর কমপক্ষে ১০০ কোটি মানুষ এখন খাওয়ার পানির সংকটে। একজন ব্যক্তির প্রতিদিন যে পরিমাণ পানি পান করা উচিত তা মিলছে না। বিশেষ করে উন্নয়নশীল কিছু দেশের বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোর উপরও। কারণ তারা তাদের খাদ্য ও পণ্যের জন্য উন্নয়নশীল দেশের উপর নির্ভরশীল। জ্বালানি তেলের অঞ্চলের উপর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে যেমন আজকের বিশ্ব রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে। জঙ্গিবাদের অজুহাতে যেমন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মধ্যপ্রাচ্যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। তেমনি আগামীর বিশ্ব রাজনীতির পট পানি নিয়ে পরিচালিত হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। জ্বালানি তেল পাচারের জন্য যেভাবে লাইন তৈরি করা হয়েছে। তেমনি করে পানি পাচারের জন্যও পাইপ লাইন তৈরি হবে। আর্ন্তজাতিক বাজারেও বিপনন হবে বিশুদ্ধ পানি। জাহাজের পর জাহাজ ভরে পানির বাণিজ্য হবে। কোনো কোনো দেশে ইতোমধ্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য শতশত মাইল পাইপ লাইন বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এমন দিন আসছে যখন খাল খনন নদী ড্রেজিং, পাম্প সংস্থাপন করেও পানির সংকট মেটানো যাবে না। বিশ্ব পানি দিবসে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, বিশ্বে প্রতি বছর যুদ্ধসহ সব ধরনের দাঙ্গা সংঘাতে যতো মানুষ মারা যায় অনিরাপদ পানি পান করে ও পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে তার চেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়। ইউনিসেফের মতে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার মোট জনসংখ্যার ৩৯ শতাংশ অর্থাৎ ঐ অঞ্চলের ১৫ কোটি মানুষ তাদের প্রয়োজন মতো পানি পায় না। আফ্রিকার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে খাবার পানির অভাব। তাদের হিসেব মতে ১৯৯৯ সালে ঐ এলাকায় পানি সংকটে থাকা লোকের সংখ্যা ছিলো ১২ কোটি ৬০ লাখ। ২০০৮ সালে সে সংখ্যা সাড়ে ১৫ কোটিতে পৌঁছেছে। সংস্থাটির মতে আফ্রিকার মোট ৫০টি দেশের মধ্যে মাত্র ৬টি দেশ খাবার পানির চাহিদা মেটাতে সক্ষম। আফ্রিকার ১০টি দেশ যে নীল নদের পানির উপর নির্ভরশীল সে পানি ও কৃত্রিম বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির অভাব একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের উপর বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নির্ভর করছে। এটা মানবিক ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। পানির ওপর ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে। কাজেই এখন থেকেই পানির ব্যবহারে ব্যক্তি-সচেতনতা বাড়াতে হবে। অকারণে পানির অপচয় রোধ করতে হবে। পানি দূষিত হয় এমন সব কার্যক্রম যতোদূর সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। পানি সম্পদের ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা সৃষ্টি করতে হবে। নিরাপদ পানির উৎসের সঙ্গে পাইপলাইনের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। পানির উৎস যতো দূরেই থাকুক না কেন। পানির সরবরাহ ঠিক রাখতে আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের চেয়ে এশিয়া মহাদেশ এখনো সুবিধাজনক স্থানে রয়েছে। এশিয়া মহাদেশের নিরাপদ বিশুদ্ধ খাবার পানির উৎস হতে পারে হিমালয়। তাই বিশাল পর্বতমালার পাদদেশে গভীর জলাশয় সৃষ্টি করে অঞ্চলিক পাইপলাইনের মাধ্যমে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে এখনই আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। বিশুদ্ধ খাবার পানির উপর থেকে চাপ কমাতে কারখানায় ব্যবহারের জন্য খাবার পানির উৎস ছাড়া অন্য কোনো উৎস হতে পানি আনার পদ্ধতি আবিস্কার করতে হবে। লবণাক্ত পানি কারখানায় ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হবে। আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহার্য পানি প্রক্রিয়াজাত করে পুনর্ব্যবহার উপযোগী করতে হবে। পানি সম্পদ সমৃদ্ধ বাংলাদেশে বিপন্নখাতগুলোর মধ্যে পানি অন্যতম। দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা উত্তরাঞ্চলের শুষ্কতা এবং মধ্য ভাগের বিরাট অঞ্চলের পানি আর্সেনিক বিষাক্ত । এখন খোদ রাজধানীতেই হচ্ছে কারবালার দশা। ভেঙে পড়ছে পানি শোধন ও সরবরাহ ব্যবস্থা। অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি এতোসব বিপর্যয়কে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলছে। পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ১৩টি মন্ত্রণালয় ও ৪০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান জড়িত। পানি দুর্নীতির সঙ্গে তাদের কমবেশি সম্পর্ক অছে। শিল্প কারখানার পরিত্যক্ত বর্জ্যে ঢাকার চারপাশের নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। নদীগুলোতে পঁচা পানিতে উৎকট গন্ধ ছড়াচ্ছে। নদী পারাপারের সময় যাত্রীদের দম বন্ধ হয়ে আসে। দুর্গন্ধে নদীর পাড়ে বাস করাও কষ্টকর। জানা যায় ৪০-৫০ বছর আগে এই নদীগুলো থেকে বিদেশি জাহাজ নাবিকরা পানির স্বচ্ছতা দেখে নিজ দেশে নিয়ে যেতো। হাজার হাজার টন শিল্পবর্জ্য প্রতিনিয়ত পানির সঙ্গে মিশে দূষিত করছে। কারখানায় ইটিপি বা বর্জ্য শোধন প্রকল্প বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। নদীর পানির স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখতে হবে। ঢাকা এবং বাংলাদেশকে বাসযোগ্য করতে পানি সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে হবে। লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
0 comments:
Post a Comment