সংবিধান সমুন্নত রাখা জরুরি
ড.ফোরকান আলী
অনেক পুরোনো ঘটনা মাঝে মাঝে নতুন করে শিরোনাম হয়। যেমন বেশ কিছুদিন আগে, দু’জন নবনিযুক্ত বিচারপতির শপথবাক্য পাঠ করানো নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। বাক-বিতন্ডা হয়েছে। যে প্রধান বিচারপতির শপথবাক্য পাঠ করানোর কথা ছিল, তিনি সেটা না করেই অবসরে চলে গেছেন। পরবর্তী প্রধান বিচারপতি উত্তরাধিকারসূত্রে এ দায়িত্ব পেয়েছেন এবং তিনি তার দায়িত্ব পালন করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি কিছু কথা বলেছেন, যা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, তিনি সংবিধানকে সমুন্নত রেখেছেন। ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, বিচারপতি নিয়োগদান রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব। যে রীতি-পদ্ধতি বা আলোচনাক্রমে নিয়োগদান করতে হয়, তাও যথারীতি পালন করা হয়েছে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ নিয়োগ নিয়ে কোন বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেননি। নিয়োগ যথারীতি গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে। অতএব বৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারককে শপথবাক্য পাঠ না করালে সংবিধান সমুন্নত থাকে না। শপথ পাঠ না করানো একটি খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। প্রধান বিচারপতি কর্তৃক বৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে শপথ না পড়ানোর একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। অবশ্য বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে নয়। এটি ছিল পাকিস্তান আমলে বৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত প্রাদেশিক গভর্নরের শপথ সংক্রান্ত বিষয়। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস। ৩ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধু আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করলেন। শান্তিপূর্ণ অসহযোগিতা। পূর্ব পাকিস্তান তখন কার্যত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্বাধীনভাবে চলছে। পাকিস্তানি আইন বাংলাদেশে কেউ মানছে না। সিভিল সার্ভিস, পুলিশ, সব প্রশাসন, শিল্প-বাণিজ্য তথা সমগ্র জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় সানন্দে পাকিস্তানি আইন অমান্য করে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে কাজ করছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে তখন পাকিস্তান সরকারের বৈধভাবে নিয়োজিত প্রাদেশিক গভর্নরকে শপথবাক্য পাঠ করাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তৎকালীন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। এটি ছিল পাকিস্তানি আইন অমান্য করার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী সেদিন আইন অমান্য করেছিল পাকিস্তানি আইন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য, স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য। নতুন দেশ গড়তে হলে পুরনো দেশ ভাঙতে হয়। তাই প্রধান বিচারপতিও ভাঙনের পক্ষে ছিলেন। জনগণের সম্মানে অথবা জনগণের ভয়ে। হাইকোর্টও জনতার কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন।
দৃঢ়সংকল্প স্বাধীনতাকামী জাতির পরাধীনতার আইন ভঙ্গকরণ কি স্বাধীন দেশে গ্রহণযোগ্য? সেদিন পাকিস্তানি আইন ভাঙা হয়েছিল। আজ কি বাংলাদেশের আইন ভাঙা উচিত? তাহলে তো দেশ থাকে না। আমাদের প্রধান বিচারপতির সংবিধান সমুন্নত রাখার সংকল্প এ পরিপ্রেক্ষিতেই বিচার্য। রাষ্ট্র একটি সত্তা, যার সংজ্ঞা হল সংবিধান। সব দেশের জন্য এ কথা সত্য। বাংলাদেশের জন্য একটু বেশি করেই। কারণ ভারত, পাকিস্তানের মতো অনেক দেশ শান্তিতে ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে স্বাধীন হয়ে সংবিধান রচনা করেছে। নিকট অতীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বেচ্ছায় ভেঙে অনেক রাষ্ট্রের জš§ দিয়েছে। কিন্তু বাঙালির কপালে তেমন শান্তি জোটেনি। একাত্তরের মার্চে আমাদের শান্তিপূর্ণ অসহযোগের জবাবে নেমে এসেছিল পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর ১০ এপ্রিল জনপ্রতিনিধিরা মুজিবনগরে ‘প্রোক্লামেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স’ রচনা করেছিলেন। এ প্রোক্লামেশনই স্বাধীন জাতির সংবিধানের ভ্রƒণ। একে রক্ষার জন্য লাখ লাখ বাঙালি প্রাণ দিয়েছে। নিগৃহীত হয়েছে। প্রোক্লামেশন বাস্তবায়িত হয়েছে। তারপর ন্যূনতম সময়ে প্রোক্লামেশনের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান। এ সংবিধান রক্তøাত। এ সংবিধানের পবিত্রতা তাই অনেক বেশি। এ সংবিধানকে সমুন্নত রাখা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজšে§র পবিত্র দায়িত্ব। প্রশ্ন উঠতে পারে, বিচারক নিয়োগে যদি ভুল হয়ে থাকে তাহলেও কি সংবিধান সমুন্নত রাখার যুক্তিতে তা মেনে নিতে হবে? ভুল তো মানুষেরই হয়। নিয়োগদাতা যেমন ভুল করতে পারেন, তেমনি সমালোচনাকারীরও ভুল হতে পারে। ভুল মনে হলে সমালোচনার দরজা খোলা থাকা উচিত। সমালোচনা হওয়াও উচিত। কিন্তু বিচারালয়ে বিক্ষোভ হতে পারে না। সমালোচনা আর বিক্ষোভ এক নয়। সমালোচনা মতপ্রকাশের অধিকার, যা গণতান্ত্রিক। আর সহিংস বিক্ষোভ (তাও বিচারালয়ে) আইন অমান্যের পন্থা, যা একটি সন্ত্রাসী কার্যক্রম। বিচারক নিয়োগ নিয়ে ভুলভ্রান্তি আগেও হয়েছে। আওয়ামীলীগ সরকারের পুর্বেকার সরকার গুলোর আমলে সর্বগ্রাসী দলীয়করণের যন্ত্রণা থেকে হাইকোর্টও রেহাই পাননি। জাল সার্টিফিকেট নিয়ে বিচারপতি হয়েছেন, এ দৃষ্টান্তও রয়েছে। তার একমাত্র যোগ্যতা, তিনি দলীয় সমর্থক। এসব ভ্রান্তি অন্যায়। তবু ঘটেছে। তবে সমালোচনার প্রক্রিয়ায় এটি ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনতে হবে। লক্ষ্য থাকবে, অচিরেই ভ্রান্তি থেকে মুক্তি। এ উদ্দেশ্যে কোন কোন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ বিচারপতি নিয়োগের জন্য একটি নীতিমালা আইন আকারে প্রণয়নের সুপারিশ করেছেন। এটি একটি পজিটিভ সুপারিশ। এ সুপারিশকে ঘিরে সমালোচনা, সচেতনতা ও চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে। সেটি হবে সুনাগরিকের কাজ। কিন্তু সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনকালে প্রধান বিচারপতির সামনে সন্ত্রাসী বিক্ষোভ প্রদর্শন অনৈতিক। এ ধরনের বেআইনি বিক্ষোভ যাতে বিচারালয়ে সংঘটিত না হয়, সেজন্যও নীতিমালা প্রণয়নের কথা ভাবা যায়। মানুষের যৌক্তিক চিন্তাশীলতা থেকে সভ্যতা সৃষ্টি হয়। আর পেশিশক্তির অশালীন চর্চা সভ্যতা বিনির্মাণে বিরাট প্রতিবন্ধকতা।
মূর্খতা সভ্যতা অর্জনের বাধা। কিন্তু জ্ঞানপাপ তার চেয়েও ভয়ংকর বাধা। কোন কিছু পাঠ করা এবং পঠন থেকে জ্ঞান অর্জন করা এক কথা নয়। আইনের বই পাঠ করা এবং আইনের শিক্ষা অর্জন করাও সমার্থক নয়। আইনের শিক্ষায় মার্জিত হয়ে উঠলে কেউ আইনকে অপমান করতে পারে না। আইনের দ্বারা ফয়সালাকৃত বিষয় রাস্তায় মারামারি করে সমাধানের কথা উচ্চারণ করতে পারে না। একজন প্রয়াত বিজ্ঞ ব্যক্তি একদা আমাকে বলেছিলেন, ‘অশিক্ষিত মানুষ সমাজ উন্নয়নে দুর্বল সহায়ক আর কুশিক্ষিত মানুষ সমাজ উন্নয়নের বড় শত্রু।’ সভ্যতা যেমন ক্রমপরিশীলনের একটি প্রক্রিয়া, তেমনি আইনের শাসনও ক্রমঅর্জনের প্রক্রিয়া। আইন জারি করলেই আইনের শাসন হয় না। আইন মান্য করার কৃষ্টি সৃষ্টি করতে হয়, যা একটি ক্রমাগত অনুশীলন প্রক্রিয়া। এ কৃষ্টি রাতারাতি গড়ে ওঠে না। সচেতনতা সৃষ্টি করতে হয়। ক্রমাগত লালন করতে হয়। পালনের বিঘœতা চিহ্নিত করতে হয়। দূর করতে হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে কৃষ্টি গড়ে ওঠে। হ্যাঁ, আইনও ভুল হতে পারে। আইন তো মানুষেরই তৈরি। সর্বোচ্চ সতর্কতা সত্ত্বেও আইনে ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। আইনের শাসনের কৃষ্টি গঠন করতে হলে আইন ভঙ্গ করা চলবে না। যুক্তি সহকারে সমালোচনা করতে হবে। আইনপ্রণেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ঐকমত্যের দিকে এগোতে হবে। তারপর আইন সংশোধন করতে হবে। সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত আইন মেনে চলতে হবে। অনৈতিক সন্ত্রাসীরাও অশুভ শক্তির সহায়তায় আইনের প্রশ্রয় নিয়ে থাকে। যেমন বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীরা ইনডেমনিটি আইনের প্রশ্রয় পেয়েছিল। আইনটি অনৈতিক, ঘৃণ্য। তবু যেহেতু এটি ‘আইন’ ছিল, তাই ঘৃণ্য আইনটি অপসারণ করেই ঘাতকদের বিচার করা হয়েছিল। ঘৃণ্য আইনটি অবশ্য ভুলের জন্য নয়, চক্রান্তের কারণেই করা হয়েছিল। আইন সভ্যতার ফসল হলেও দস্যুরা সুযোগ পেলে এ ফসল লুণ্ঠন করে থাকে। আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছি, এমন দাবি করা যাবে না। তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অমসৃণ পথে হোঁচট খেতে খেতে অদম্য ইচ্ছা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি, এমন দাবি করা চলে। পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট আইনকে পদপিষ্ট করে অশুভ শক্তি দৈত্যরূপে আবির্ভূত হয়েছিল, অস্ত্রের ‘আইন’ দিয়ে নৈতিক আইনকে পরাভূত করেছিল, পশুশক্তি দিয়ে অসহায় মানুষকে নির্জীব করে রেখেছিলÑ এসব কথা যেমন সত্য; তেমনি একথাও সত্য, বেআইনি অশুভ শক্তি স্থায়ী হতে পারেনি। হকচকিয়ে যাওয়া নীরব জনতার চেতনা ফিরে আসার পর ঐক্যের সরবতায় ধীরে ধীরে বেআইনি ‘আইন’ অপসারিত হচ্ছে। নৈতিকতার আইন, যুক্তির আইন, সর্বজন গ্রহণযোগ্য আইন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে স্বমহিমায়।
প্রধান বিচারপতি আরেকটি প্রণিধানযোগ্য কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, দু’জন বিচারপতিকে শপথবাক্য পাঠ করালে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কমে যাবে; কিন্তু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার বিপরীতে সংবিধান সমুন্নত রাখার দায়িত্ব অনেক বড়। তাই তিনি দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা আইন অঙ্গনের অনেক দূরে অবস্থান করছি। দূর থেকে অবলোকন করে মনে হচ্ছে, তার জনপ্রিয়তা কমবে না, বরং বেড়ে যাবে (যদিও জনপ্রিয়তা তার বিচারের মাপকাঠি নয়)। কিছু রাজনৈতিক বিদ্বেষী অপরাজনীতির কারণে (তার প্রতি বিদ্বেষের কারণে নয়) সেদিন শপথ অনুষ্ঠানে বেআইনি ও অনৈতিক শো-ডাউন করেছে। তাদের সংখ্যা বেশি নয়। আবার তাদের মধ্যে যাদের বিবেক রয়েছে, তারা লজ্জিতও হবে। ফলে তাদের এই হিংসাত্মক কর্ম ক্রমেই নেতিয়ে পড়বে। পক্ষান্তরে কোটি কোটি নীরব জনসাধারণ স্বস্তি পাবে এই ভেবে যে, তারা এমন একজন বিচারপতি পেয়েছেন, যার দায়িত্ববোধ ব্যক্তিস্বার্থ চিন্তার ওপরে। বিচারপতি খায়রুল হক একজন বিবেকবান সৎসাহসী ব্যক্তি। এ পরিচয় জনগণ আগেই পেয়েছে। অনেক বিচারপতিই সামরিক আইনকে জায়েজ করেছিলেন। তিনিই ছিলেন ব্যতিক্রমী। প্রতিকূল পরিবেশেও তিনি সংবিধানকে সমুন্নত রেখেছিলেন। রায় দিয়েছিলেন, সামরিক আইন সংবিধানের পরিপন্থী। রায়ে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, মুশতাক, জিয়া ও এরশাদের ক্ষমতারোহণ ছিল বেআইনি। পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের ঐতিহাসিক রায় তার বিচারিক জীবনের পেশাগত উৎকর্ষতা নির্দেশ করে। এছাড়াও বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণার মামলা ও ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতার স্মৃতি সংরক্ষণ মামলার রায় তাকে জাতীয় ইতিহাসে বিশেষ স্থান দান করেছে। তিনিই উচ্চ আদালতের প্রথম বিচারপতি, যিনি বাংলা ভাষায় সম্পূর্ণ রায় প্রদান করেছেন। জটিল আইনি রায় প্রদানে বাংলা ভাষার ব্যবহার শুধু তার ভাষাগত ব্যুৎপত্তি নির্দেশ করে না, সেই সঙ্গে মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রকাশ করে। রাষ্ট্রভাষায় সরকারি কার্য পরিচালনার আইনি নির্দেশের প্রতি অবিচল নিষ্ঠাও প্রকাশ পেয়েছে তার ব্যতিক্রমী অনুশীলনে। সবকিছু মিলে আগে থেকেই বিচারিক জীবনে এক অনন্য অবস্থানে আসীন হয়েছিলেন তিনি। এমন একজন দেশপ্রেমিক, নিষ্ঠাবান ও সৎসাহসী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ বিচারালয়ের প্রধান বিচারপতি হিসেবে পাওয়া জাতির কাছে এক বিরল স্বস্তি। তার কার্যকাল হয়তো খুব বেশিদিন হবে না। অবসর গমনের আগে স্বল্প সময়ে তাই তার কাছে আইনের শাসনে বিশ্বাসীদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
0 comments:
Post a Comment