বাংলার সংস্কৃতির পর্বে পর্বে রূপান্তরের কথা
বাংলার সংস্কৃতির পর্বে পর্বে রূপান্তরের কথা
ড.ফোরকান আলী
গত পাচঁই জুন ছিল বাংলা কবিতা আলাপের অনুষ্ঠান। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা নিয়ে পাস করা এক ঝাক তরুন-প্রবীণ লেখকদের এ সংগঠনে আমার থাকার কথা ছিল। এদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষক। এছাড়া এ সংঠনে রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেক বুদ্ধিজীবি। বিশিষ্ঠ সংগঠক স্বরুপ হাসান শাহীন ভাইয়ের একান্ত ইচ্ছা ছিল আমি যেন অনুষ্ঠানে থাকি। তাঁর ধারণা আমি বাংলা নিয়ে না পড়লেও বাংলায় আমার অনেক দখল রয়েছে। তাদের সবার একান্ত অনুরোধ ছিল বাংলার সংস্কৃতি নিয়ে যেন কিছু লেখি। প্রিয় পাঠক সমাজ আমাদের দেশের সংস্কৃতি কি ভাবে বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে। এরই কিছু অংশ আমি আমার মতো করে উপস্থাপন করলাম। দেশে অবশ্য ছিল আদি অনার্য জীবনধারা। সংস্কৃতিধারার সঙ্গে উপমহাদেশের উত্তরাপথ থেকে আগত। কালবিবর্তনে মিশ্রিত ‘হয়ে ওঠা’ এক দেশজ সংস্কৃতির লালন। এ অবশ্য শত শত বর্ষব্যাপী নানা বিচিত্র ক্রিয়াকান্ডের ফসল। তারপর বাঁক নেয়া অন্যতর বৃত্তান্ত বলা হয়ে থাকে। হাজার বছরের বাংলা। তবে আদপে অবশ্য যা কিনা বোঝাতে চাইছি, তা হচ্ছে কাল বহমানতায় কয়েক হাজার বছরের আমাদের এই দেশ বাংলাদেশ। বর্তমান প্রসঙ্গে আলোচিতব্য বিষয়Ñ এই বাংলার সংস্কৃতি পর্বে পর্বে এখানকার সংস্কৃতির রূপান্তর। শতাব্দীর পর শতাব্দীর পালাবদলে বহির্বাংলা থেকে নানা বিচিত্র রক্তধারা, ভাষা, ধর্মবিশ্বাস, সংস্কার আর সংস্কৃতির প্রবাহ এসেছে। এসে মিশেছে দেশজ, লোকজ উপদান-উপকরণের সঙ্গে। তবে অবশ্য সহজে সম্পর্কিত হয়নি এই প্রক্রিয়া। সংঘাতে-সমন্বয়ে, ক্রিয়ায়-প্রতিক্রিয়ায় শেষাবধি গড়ে উঠেছে নতুন সংস্কৃতি। আমাদের বাংলাদেশ ভূখন্ডে সংকর জনগোষ্ঠীর সংকর সংস্কৃতি। দেশে অবশ্য ছিল আদি অনার্য জীবনধারাÑ সংস্কৃতিধারার সঙ্গে উপমহাদেশের উত্তরাপথ থেকে আগত এবং কালবিবর্তনে মিশ্রিত ‘হয়ে ওঠা’ এক দেশজ সংস্কৃতির লালন। এ অবশ্য শত শত বর্ষব্যাপী নানা বিচিত্র ক্রিয়াকান্ডের ফসল। তারপর বাঁক নেয়া অন্যতর বৃত্তান্ত।
দুই.
ইতিহাসের ছাত্র মাত্রেই অবগত আছেন, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তুর্কী অভিযান এদেশে কালান্তরের নির্দেশক। সে অভিযান শুধু একটি সামরিক কিংবা রাজনৈতিক ঘটনাতেই পরিসমাপ্তি হয়নিÑ প্রথমে তা দেশব্যাপী সাধারণের জীবনেও ব্যাপক রূপান্তরের সূচনা করে। প্রাক্তুর্কী অভিযানের কালপর্বে এ দেশের মানুষের জীবনযাত্রার যে পরিচয় পাই তখন রাষ্ট্রব্যবস্থায় সর্বনিয়স্ত সামন্ততন্ত্র এবং সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার ঘনিষ্ঠতম সহায়ক ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদ। ধর্মের নামে, সামাজিক বিধিবিধানের নামে সাধারণ মানুষের জীবনে ব্রাহ্মণের প্রবল প্রতাপ বিরাজ করত। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তারা কৌলীন্য প্রথা চালু করেন। অন্যদিকে বাণিজ্য নিয়ে বণিক সম্প্রদায়ের তখন নোতুন উšে§ষ হচ্ছে। সেন রাজত্বের আমলে নবোত্থিত এই বণিক শক্তিকে খর্ব করার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। সমাজে তখন সামন্ত ব্রাহ্মণ্য নেতৃত্বে শ্রেণী বৈষম্য বিস্তার লাভ করেছে। তবে সমাজের ওপর তলায় সামন্ত-বণিক শ্রেণীতে দ্বন্দ্ব হলেও সাধারণের জীবনে সে দ্বন্দ্বের যে ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল এমন মনে হয় না। তৎকালে সাধারণ বাঙালির নিরুত্তাপ জীবনযাত্রা কৃষিপ্রধানÑ গ্রামকেন্দ্রিক। আর ছিল জেলে, ডোম, বাগদী, মাঝি, এদের যার যার পেশা এবং সেই পেশাকেন্দ্রিক তাদের সমাজ। বিভিন্ন প্রকার ব্রত, পার্বণাদি লোকাচারে আবদ্ধ ছিল সাধারণ সমাজ জীবন।
তিন.
১২০০ খৃ: অ: নাগাদ তুর্কী অভিযানের সঙ্গে এই নিরুত্তাপ সমাজ জীবন বিপুলভাবে নাড়া খায় এবং প্রায় দুশ’ বছর ধরে রাষ্ট্রে সমাজ, ধর্মীয় বিশ্বাসে, সংস্কারে আলোড়ন ঘটে যায়। এ আলোড়ন কতটা গভীরে অনুপ্রবেশ করেছিল তার স্বাক্ষর পরবর্তীকালীন কয়েক শতাব্দীব্যাপী বাংলাদেশের জনমানুষের ইতিহাস। তবে সে যাই হোক, তুর্কী বিজয়ের দরুন বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংঘাত-সমন্বয়ের অনিবার্য প্রক্রিয়া সব সংঘটিত হলেও কৃষিপ্রধান বাঙালি সমাজের মৌল পরিবর্তনসাধিত হয়নি। আবার বিদেশাগত মুসলিম অভিযানের কিছুকাল পর থেকেই দেশীয় মানসে হিন্দু-মুসলমান ধর্মীয় ভাবনা, সমাজ-আচরণ ইত্যাদির মধ্যে পারস্পরিক গ্রহণ-বর্জন-সমন্বয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। সাহিত্যের ক্ষেত্রে তখন বিভিন্ন রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু-মুসলমান সমভাবে কাব্যরস আস্ব^াদন করার সুযোগ পাচ্ছে। ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে মোগল বিজয়ের সঙ্গে বাংলার দিগন্ত বহির্ভবনের কাছে উšে§াচিত হল। তারপর থেকে ইংরেজ শক্তির প্রভাব বিস্তারের সময় পর্যন্ত মধ্যবর্তীকালে এদেশের জীবনে নবতর রূপান্তর সংঘটিত হয়। এ সময়ে ভূমি ব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য সংস্কার মোগল রাজপ্রতিনিধি তোডরমল¬ কর্তৃক নোতুন জমার বন্দোবস্ত প্রবর্তন। ফলে দেশে এক নোতুন ভূম্যধিকারী সামন্ত শ্রেণীর উদ্ভব হয়। অপরপক্ষে এই কালে বিদেশী বণিকের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়Ñ তার দরুন নানা দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সেতুবন্ধ স্থাপিত হয়। সমাজ জীবনে সওদাগর শ্রেণীর প্রভাব বৃদ্ধির সঙ্গে স্বভাবতই তার কিছুটা প্রভাব এসে পড়ে পুরাতন দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। দেশের নানা কেন্দ্রে ক্রমে গড়ে উঠতে থাকে শহর-বন্দর-গঞ্জ এবং এক ধরনের দরবারী সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করে মুর্শিদাবাদ, ঢাকা, কৃষ্ণনগর ইত্যাদি শহরকে কেন্দ্র করে। তবে বলা দরকার, এ সবকিছু সমাজের প্রত্যক্ষ গোচর উপরি অংশের ব্যাপার। সমাজ গভীরে তার তেমন প্রতিক্রিয়া ছিল না। তবে ব্যাপকতর ক্ষেত্রে গ্রামীণ জীবনাচরণ, গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারা সেই সনাতনের খাত বেয়েই প্রবহমান ছিল। অধিকাংশের জীবনের জন্যই সত্য ছিল মধ্যযুগীয় আচার-অনুষ্ঠান, সংস্কার-কুসংস্কার। অষ্টাদশ-উনবিংশ শতাব্দী নাগাদ সাংস্কৃতিক চেতনায় আধুনিকত্বের পদধ্বনি শ্রুত হতে থাকল। তবে অবশ্যই তা নোতুন নগরী। কলকাতায় এবং কলকাতা ও ইংরেজি কেতায় সদ্য গড়ে ওঠা উচ্চবিত্ত-নবজাগ্রত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনে। এই শ্রেণী নগরকেন্দ্রিক, পাশ্চাত্য বিদ্যায় শিক্ষিত এবং ইংরেজ প্রশাসন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপরে নির্ভরশীল। একই সঙ্গে আমরা পুনরায় লক্ষ্য করব, দেশের ব্যাপক গ্রামীণ জনপদে মধ্যযুগের অনুসৃতিতে লোক সংস্কৃতির ধারাও অব্যাহত গতিতে প্রবহমান। ১৯৪৭ পর্যন্ত বিদেশী প্রশাসনের প্রভাবাধীন কালে এইভাবে দুই সংস্কৃতির পরিমন্ডলে আমরা মানুষ হয়েছি। আমাদের অধিকাংশের জীবনের শিকড় প্রোথিত গ্রামের মাটিতেÑনোতুন শিক্ষা এবং পেশা আমাদের একাংশকে শহর-বন্দর-নগরবাসী করেছে। বাংলাদেশের মানুষের জীবনাচরণের মূল বৈশিষ্ট্য এখানে নিহিত।
চার
আমরা জানি বিচিত্র উপকরণে গঠিত মানুষের সংস্কৃতি। এই সব উপকরণের মধ্যে প্রধানত উল্লেখ্য, ক. বিশেষ জনপদের ভূগোল-প্রকৃতি, খ. সেই বিশেষ জনগোষ্ঠীর উৎপাদন পদ্ধতি ও উৎপাদনের বণ্টন ব্যবস্থা এবং গ. তার মানুষ ভাবনা-বিশ্বাস, সংস্কার, ধর্মচেতনা। এ সব উপকরণের অবদানেই তো গড়ে ওঠে মানুষের জীবন। অতএব সব মিলিয়েই তার সংস্কৃতি। বাংলাদেশের সংস্কৃতির স্বরূপ অনুসন্ধানকর্মে এ বিষয়ে সচেতন থাকা একান্ত বাঞ্ছনীয়।
প্রসঙ্গত একটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করতে চাইছি। প্রাচীন কালাবধি বাংলাদেশের মাটিতে কদাপি কোনও বিশেষ ধর্মবিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে মূল এবং বিশুদ্ধ আকারে স্থায়ী হয়নি। (কোনও দেশেই তা সম্ভব নয়। মহাকালের প্রভাবে তার চেহারা পাল্টায়)। এ কারণে জিজ্ঞাসাÑ বিচ্ছিন্ন হিন্দু সংস্কৃতি কিংবা বিচ্ছিন্ন মুসলিম সংস্কৃতি অথবা তদর্থে বিচ্ছিন্ন কোনও বিশেষ ধর্মীয় সংস্কৃতি এদেশের জনমানুষের জীবনে কতটা বিরাজমান? কত স্পষ্ট রেখায় তা চিহ্নিতকরণ সম্ভব? বরং তিন হাজার বছরের বাংলাদেশের ইতিহাসে তো দেশীয় মানস, লোকজ সংস্কারকেই শেষ অবধি জয়ী হতে দেখি। এজন্য এদেশের বিশুদ্ধ বৌদ্ধ মতবাদ স্থায়ী হয়নি। নির্ভেজাল ব্রাহ্মণ্যবাদ জয়ী হয়নি। অবিকৃত, মূল ইসলাম ব্যাপকতা লাভ করেনি। এর প্রমাণ রয়েছে হাজার বছরের বাংলাসাহিত্যে, বাংলাগানে। গীতিকা-গাথা সাহিত্যে যে জীবনের পরিচয় পাই মূলত তা লোকজীবন। লোকায়ত প্রেমের কাহিনী এ সাহিত্যে বিধৃত। কীর্তন-বাউল-মারফতী গানেরও অন্তর্নিহিত তত্ত্বটুকু হচ্ছে শুদ্ধ মানব-সত্যের কথা। আসল বাংলা সাহিত্যে, গানে যা পাই তা হচ্ছে সমন্বয়ের বলিষ্ঠ জীবনবোধ। লোকজীবনের মূল প্রাণকেন্দ্র থেকে তা উৎসারিত। বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিক আত্মীয়তা এই সংস্কৃতির সঙ্গে। কেননা আমরা তো কাল-বিচ্ছিন্ন নই, প্রবাহ-বিচ্ছিন্ন নই। অতএব আবহমানকাল ধরে প্রবহমান যে সংস্কৃতিধারা, বহু বিচিত্র প্রভাব এবং প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দেশের মাটিতে আপন পরিবেশে লালিত ও পরিপুষ্ট যে বিশেষ সংস্কৃতিÑ সবকিছুকেই মিলিয়ে নিয়ে সেই যে ঐশ্বর্যসমৃদ্ধ জঙ্গম সংস্কৃতি, আজকের বাংলাদেশের মানুষের তাতে সহজ উত্তরাধিকার।
লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
0 comments:
Post a Comment