Monday, June 29, 2015

কৃষি সম্পর্কিত গবেষনা প্রয়োজন

কৃষি  সম্পর্কিত গবেষনা  প্রয়োজন
ড.ফোরকান আলী
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। পাংশা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসে বসে আলাপ হচ্ছিল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে। আলাপের মধ্যেই একজন সাদামাটা গোছের কৃষক এসে ঘরে ঢুকলেন। স্বাভাবিক সালাম বিনিময়ের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি তার প্রয়োজনীয় কথাটা জানিয়ে দিলেন। অর্থাৎ পিঁয়াজের জমিতে কতখানি সার দিতে হবে। তখন বোরো মৌসুমের কিছুদিন পার হয়েছে মাত্র। আবার পিঁয়াজ-রসুন আবাদেরও সময়। হয়তো তার তাড়া ছিল। আমার বেশ মনে আছে, উপজেলা কৃষি অফিসার বেশ স্বাভাবিক হাসি দিয়ে কৃষি গবেষণা থেকে প্রকাশিত একখানা হাত বই বের করলেন। তারপর কাগজে ঘজ ঘজ করে সারের ডোজ লিখে দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গেই সেই চাষি যেমনটি এসেছিলেন তেমনটি চলে গেলেন। আমার মনে হলো এ কাজটির জন্য কৃষি অফিসার মহোদয় অপেক্ষা করছিলেন। আর তিনি সেটা শেষ করেই যেন এক পরিতৃপ্তির ঢেকুর দিলেন।
উপজেলা কৃষি অফিসার একজন বিসিএস কর্মকর্তা। উপজেলার কৃষিসংক্রান্ত সব কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি দায়ী। এ কাজে তাকে আরও কয়েকজন বিসিএস কৃষি কর্মকর্তা এবং কয়েক ডজন ডিপ্লোমা কৃষিবিদ কর্মকর্তা সাহায্য করে থাকেন। উপজেলার বয়স্ক কর্মকর্তাদের মধ্যে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা একজন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পদোন্নতি এমনি ধীর গতির যে এন্ট্রি পয়েন্ট থেকে এ পদবিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে চাকরি জীবনের বাকি থাকে মাত্র কয়েক বছর। তারপরও কিমাশ্চর্য্যম। এ কর্মকর্তারা চেয়ারে বসে দিব্যি তাদের মেজাজ ধরে রেখে সাধারণ সেবা দিয়ে যায়। অথচ এর উল্টোটাও হতে পারতো। বিসিএস অফিসার হিসেবে তারা কিছুটা অহঙ্কারী হতে পারতেন। সময়মতো পদোন্নতি না পাওয়ায় গ্রাহেকদের প্রতি তিরিক্ষে মেজাজ দেখাতে পারতেন। কিন্তু কোনটাই তারা করেন বলে আমার মনে হয়নি। আমার নজরে কখনো পড়েনি। হয়তো মনে মনে অনেকেই বিরক্ত হয়ে থাকতে পারেন। যাহোক এ ভালো ব্যবহারের প্রতিফল কিন্তু মোটেই খারাপ না। অন্তত আমাদের পাংশা উপজেলার পিয়াজ চাষ সম্প্রসারণের ব্যাপারে তা বলা যায়। এ উপজেলার ব্যাপক এলাকায় এখন পিয়াজ চাষ হচ্ছে (এখন কালুখালী উপজেলাসহ)। আমার মনে হয়েছে ধানের চেয়েও এ ফসলের গুরুত্ব আমাদের এখানে বেশি। এজন্য পিয়াজ আবাদে লাভের চেয়ে এ ধরনের বিনয়ী কৃষি কর্মকর্তাদের অবদান কম না। অথচ এসব নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় বলে মনে হয় না। এ কারণেই আমরা ঢাকা-গাজীপুরে বসে তাদের বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগই শুনি। যেমন তাদের মাঠে পাওয়া যায় না, তারা ঠিক মতো মাঠের খবর নেয় না। এই সব। অথচ আমরা যখন মাঠে যাই, সব সময় যে খবর দিয়ে যাই এমন না; তারপরও এসব কর্মকর্তাকে জায়গা মতো পাইনে এমন কথা বলতে পারব না। আমার অনেক বছরের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সংখ্যা এখনো বেশি। তবে পরিস্থিতির চাপে তাদের অনেকেই নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেন না। যাহোক এর ব্যতিক্রম যে নেই তা বলব না। দৈবক্রমে এসব ব্যতিক্রমই মিডিয়াতে এসে যায়।
যাহোক এত গেল মাঠপর্যায়ের কথা। কিন্তুএর ওপরেও অনেক ধাপ আছে। ভাগ্যবান কিছু কৃষি কর্মকর্তা তাদের বয়স বাঁচিয়ে এ ধাপগুলো পার হতে পারেন। তাদের কেউ উপ-পরিচালক, কেউ অতিরিক্ত পরিচালক-পরিচালক হওয়ার সুযোগ পান। মহাপরিচালক হওয়ার সুযোগ পান মাত্র একজন। হাতেগোনা কিছু কর্মকর্তা ফ্লোর ক্রসিংয়ের সুযোগ পান। অর্থাৎ উপজেলা কর্মকর্তার লেবেল থেকে ডেপুটি সেক্রেটারি হওয়ার সুযোগ। কিন্তু তাদেরও হাতে বেশি সময় না থাকায় জয়েন্ট সেক্রেটারির পরবর্তী ধাপ ডিঙানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। যাহোক এ ধরনের সিঁড়ি ভাঙার সুযোগে বেশির ভাগ কর্মকর্তাদেরই মাঠ থেকে দূরে যাওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু বহু বছরের জল-কাদায় ঋদ্ধ এ কর্মকর্তাদের অধিকাংশ চাইলেও তা পারেন না। হতে পারে দু-একজনের জন্য। এ দু-একজন কিন্তু তাদের অফিসের গন্ডি পেরুতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তবে মাঝে মধ্যে জানালা গলিয়ে যে মাঠ দেখার চেষ্টা যে করেন না এমন না। আবার এরাই কথা বলেন বেশি। কাজ করেন কম। এরা অধীন কর্মকর্তাদের শাসিয়ে মজা পান। বেশি করে নথিপত্র চালাচালি করেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আদেশ-উপদেশ জারি করেন। আর নিজেরা কার চেয়ে বড় এবং কতখানি বড় তা নিয়ে প্রায়ই হীনম্মন্যতায় ভোগেন।
এ কথাগুলো বলার কারণ হলো এমন দু-একজন বড় কর্মকর্তার সঙ্গে দৈবাৎ ইন্টার‌্যাকশনের সুযোগ আমার হয়েছে। আমি ছাড়াও আমার মতো যারা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তাদের সবারই কমবেশি এমন ধরনের অভিজ্ঞতা আছে। কারণ আমাদের দেশে যারা গবেষণা করে থাকেন তারা কোন ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তা নন। তাদের চাকরি পাওয়ার ধরন আলাদা, চাকরি করার ধরনও আলাদা। তারা কিছুটা বুদ্ধিদীপ্ত বলে পরিচিত হলেও তাদের খুব একটা স্মার্ট বলা যাবে না। তাদের খবরদারি করা সহজ। তাদের থেকে কাজ আদায় করাও সহজ। বোধহয় পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই গবেষণা কর্মকর্তারা একই মেজাজের হয়ে থাকেন। তাদের কাছ থেকে নগদানগদ প্রতিফল পাওয়ার তাগিদেই বোধ হয় এমনিতর পদ্ধতির প্রচলন। তাই গবেষকরা না ঘরকা না ঘটকা। সরকার তাদের যে স্কেলেই বেতন দিয়ে থাক না কেন ক্যাডার সার্ভিসের সব কর্মকর্তাই গবেষকদের একটু বৈষম্যের দৃষ্টি দিয়ে দেখেন বলে আমার মনে হয়। এমনকি কৃষি ক্যাডারের কর্মকর্তারা এর থেকে ভিন্ন ভাবে দেখেন বলে আমার মনে হয় না। যাহোক নিচের পর্যায়ে এ পরিস্থিতি মানিয়ে নিতে তেমন অসুবিধা হয় না। বা নতুন প্রজন্মের কৃষি কর্মকর্তারা তাদের গবেষক ভাইদের উদার দৃষ্টি দিয়েই বিচার করে থাকেন। সমস্যা দেখা দেয় কৃষি ক্যাডারের ওপর লেবেলের কর্মকর্তাদের নিয়ে। ঘটনাক্রমে গবেষক অনেক কর্মকর্তা হয়তো স্কেলের মাপে বয়সী একজন কৃষি ক্যাডার কর্মকর্তার চেয়ে বেশ ওপরে। সমস্যার শুরুটা সেখানেই। একজন গবেষক হয়তো ভাবছেন আমিই বড়, যেহেতু আমি ওপরের স্কেলে বেতন পাই। বা আমার বেশি বেশি লেখাপড়া আছে। আবার বয়সী ক্যাডার কর্মকর্তা নিচের স্কেলে থেকেও ভাবেছেন গবেষকরা তো ক্যাডারভুক্ত নয়। তাই তাদের তেমন তোয়াজ করার কিছু নেই। বিষয়টা বাইরের কর্মকর্তাদের কাছে তেমন মাথা ব্যথার না। কিন্তু একই লক্ষ্যে (খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি) নিবেদিত ভিন্ন ধরনের কর্মকর্তাদের মধ্যে এ ধরনের দোটানা ভাব কাজ করা শুভ লক্ষণ নয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সুবাদে আমরা আজ ভাবতে বাধ্য যে সরকারিভাবে কিছুটা সহানুভূতি পেলেও সত্যিকারের কোন মর্যাদা আমাদের নেই। আমাদের এ ভাবাটাকে অন্যরা হীনম্মন্যতা বলে ধরে নিতে পারেন। তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। ক্ষেত্র বিশেষে আমরা সহজ হতে চাইলেও ক্যাডারভুক্ত (কৃষি) ওপরের লেবেলের কর্মকর্তারা তা সহজভাবে নেন না। ফলে গবেষণা বা সম্প্রসারণের কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভাবের আদান-প্রদানে বেশ সমস্যা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে আজকালকার ডিজিটাল এবং তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানের বেলায় সত্যি সমস্যা হয়। সাম্প্রতিক একটা কথা বলতেই হয়। এখন বেশ গরম পড়তে শুরু করেছে। তাই ধানের বীজতলা শুকিয়ে ইনজুরির সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। এ আশঙ্কায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক আমার সঙ্গে মোবাইলে কোন ভূমিকা ছাড়াই সমাধান চেয়ে বসেন। যোগাযোগের মাধ্যম ছিল তৃতীয় পক্ষ। তিনি আমার বিস্তারিত পরিচয় দিয়েই মোবাইলটা আমাকে দেন। অথচ ওই অতিরিক্ত পরিচালক মহোদয় তার একজন অধীন কর্মচারীর মতোই আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমি তার কাছে শুরুতেই জানতে চেয়েছিলাম, এখন সেখানে নিচের তাপমাত্রা কত? তার প্রতিক্রিয়া হলো, ’ট্যাম্পারেচার মাপা আমার ডিপার্টমেন্টের কাজ না।’ আমি জানি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর নানা সূত্র থেকে দেশের জরুরি সব আবহাওয়ার উপাত্ত পেয়ে থাকে। আমি বললাম, প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তাপমাত্রা জানা জরুরি। তিনি জবাব দিলেন, ‘আমি নিজে হাতে নেই ন্যাহি।’ আমি বললাম, উপপরিচালক মহোদয়ের অফিসে থাকে। আপনি জেনে আমাকে একটু বলার চেষ্টা করেন। তিনি বললেন, ‘এইডা আমার বিষয় না।’ এরপর তার কথার ধরন ধরেই আমি বললাম, আপনার জানা থাকলে ভালো হতো। তিনি বেশ তাচ্ছিল্য ভরে বললেন, ’১২ অইতে পারে।’ আমি বললাম, ‘আমার সঠিকভাবে জানা দরকার।’ তিনি বিরক্তি সহকারে বললেন, ‘আপনি কই আছেন।’ আমি বললাম, ‘গাজীপুরে’। তিনি একই সুরে বললেন, আপনি এইহ্যানে (জায়গার নাম উহ্য রাখা হলো) আইসা বুইজ্যা যান। আমার নিশ্চয়ই আরও কিছু বলার ছিল। তিনি তার অপেক্ষা না করেই টেলিফোন রেখে দিলেন বা বন্ধ করে দিলেন। মোটামুটি এ ছিল একজন অতিরিক্ত পরিচালক এবং একজন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার সংলাপ। একজন ধান গবেষক হিসেবে আমাকে অবশ্যই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে। নইলে আমার পরামর্শ যথাযথ নাও হতে পারে। তাই আমার জানার আগ্রহ ছিল। আর একজন অতিরিক্ত পরিচালক তার আমলাতন্ত্রের আড়ালে নিজেকে আমার কাছে প্রকাশ করতে অস্বস্তি বোধ করছিলেন। মাঝখান দিয়ে কী হলো? সমস্যার সঙ্গে প্রকৃত বোঝাপড়া করা গেল না। অথচ একজন কৃষিবিদ হিসেবে আমাকে তখনকার তাপমাত্রাসহ প্রেক্ষাপটটা ব্যাখ্যা করতে পারতেন। নিজে না পারলে তার অধীন কোন কর্মকর্তাকে মোবাইলটি দিতে পারতেন। অথবা সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা সংক্রান্ত উপাত্ত না দিতে পারলেও কিছুটা সময় নিয়ে তা বলতে পারতেন। এর কোনটাই না করে তিনি অজানা-অচেনা একজন গবেষণা কমকর্তার সঙ্গে অযাচিত ব্যবহার করলেন। আমার এখন জিজ্ঞাসা, কৃষি গবেষক এবং ক্যাডারভুক্ত উচ্চপদস্থ কৃষি কর্মকর্তাদের মধ্যে অফিসিয়াল সম্পর্কটা কেমন হওয়া উচিত। আমি মনে করি সংশ্লিষ্ট নির্বাহীদের এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে আসা উচিত।
প্রসঙ্গত কিছু কথা এসে যায়। পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. বিধান চন্দ্র মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও রোগী দেখতেন। আমাদের একসময়ের রাষ্ট্রপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীও নাকি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে বঙ্গভবনে তার মানবীয় পেশা বজায় রেখেছিলেন। এমপি শিশু চিকিৎসক ডা. এমএস আকবর (মাগুরা) রেডক্রসসহ বিভিন্ন দায়িত্বে থাকার পরও প্রতি সপ্তাহে মাগুরায় ফিরে যান বাচ্চাদের চিকিৎসাসেবা দেয়ার জন্য। আরও হয়তো অনেকেই অনেক কিছু করে থাকেন। এসব মানুষ তো ভালো জায়গায় ছিলেন বা আছেন। তারা কিন্তু সহজেই আমলাতান্ত্রিক ভাবধারায় নিজেদের আবদ্ধ রাখতে পারতেন। কিন্তু তারা তা করেননি। অথচ আমাদের এ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ পেশাজীবী হওয়া সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক মনোভাব এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ফলে আমরা কৃষির জন্য ভালো কিছু চাইলেও কিছু কিছু মানুষের জন্য তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মানুষের মহত্ব তার গুণে। গুণ না থাকলে কেউ বড় বলে গন্য হয় না। কোন উচ্চ আসনে বসলে সে বিরাট কিছু হয়ে যায় না। যেমন প্রাসাদের উচ্চ শিখরে কাক বসলে কেউ তাকে কখনো পাখি বলে না। লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ


0 comments:

Post a Comment