পানি সংকট নিরসনে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্দ্যোগ
ড.ফোরকান আলী
পানির অপর নাম জীবন। আর এই জীবন সংকটের মুখোমুখি বিশ্বের প্রায় দুইশ’ কোটি মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি একুশ শতকে সবচে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে যে সমস্যাটি বিশ্ববাসীকে মোকাবেলা করতে হবে, তা হচ্ছে এই পানি। জাতিসংঘের এক তথ্য চিত্রে জানা গেছে, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ হয় পর্যাপ্ত পানি পায় না অথবা তাদের কাছে পৌঁছায় না যথাযথ মানের পানি। আগামীতে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর মোট ৯শ’ ৩০ কোটি মানুষের মধ্যে ৭শ’ কোটিই পড়বেন পানির সমস্যায়। তার মানে প্রতি তিন জন মানুষের মধ্যে দুইজনই নিরাপদ পানির সংকটে ভুগবে। তখন বিশ্বব্যাপী দেখা দেবে ভয়াবহ পানি সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে বিশ্বে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে পানির চাহিদা। উন্নত জীবনযাপনের প্রয়োজনেও মানুষের দৈনিক মাথাপিছু পানির চাহিদা বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু নানা অপচয় ও বিভিন্নমুখী হস্তক্ষেপের কারণে অনেকস্থানে সুপেয় পানির উৎস সঙ্কুচিত, দূষিত এবং ধ্বংস হচ্ছে। ফলে সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। যা অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের প্রাণীজগৎ তথা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দেবে। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। যার ফলে পানির গুরুত্ব স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃতি পেয়েছে।
বিশ্বব্যাপী পানি নিয়ে এই কেমন ভয়াবহ চিত্র; তার চেয়ে ভয়াবহ চিত্র অপেক্ষা করছে বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে। প্রাকৃতিকভাবে যেসব এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপদ সুপেয় পানির উৎস ছিল সে জায়গাগুলোতেও বর্তমানে পানি সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এ সঙ্কট আমাদের মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার ফলে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। পানির ভয়াবহ অবস্থার জন্য সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এশিয়ার উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলো। যার প্রভাব পড়ছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সামগ্রিক উন্নয়নের ওপর। এমনকি নদীমাতৃক বাংলাদেশেও মনুষ্যসৃষ্ট নানাবিধ কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটছে। আর সুপেয় পানির সংকট জনজীবনে বিপর্যয় ডেকে আনছে। বিশেষত: আইলা বিদ্বস্ত খুলনা ও বাগের হাটের মানুষের পানির জন্য হা হা কার স্বচক্ষে না দেখলে কেউ উপলদ্ধি করতে পারবে না। এছাড়া চট্টগ্রাম ও কক্্রবাজারের উকূলীয় এলাকায় মিঠা পানির অভাবে জীববৈচিত্র হারিয়ে যেতে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম,খুলনা ও বাগেরহাটের উকূলীয় অঞ্চলের মানুষ এক কলসী সুপেয় পানির জন্য সারাদিন লাইন ধরে দাড়িয়ে থেকে ও অনেক সময় পানি পাচ্ছে না।অনেকে বলছেন চাহিদার চেয়ে সরবরাহ অনেক কম। এছাড়া প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বিশেষ করে বিভিন্ন অঞ্চলে নলকূপের পানি আর্সেনিক দূষণের কারণে দেশে নিরাপদ পানি সংকট উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। আর রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে দ্রুত বাড়ছে নিরাপদ পানির চাহিদা। চাহিদা মেটাতে নলকূপের মাধ্যমে ভূ-অভ্যন্তর থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। অন্যদিকে নানা কারণে নদ-নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত পানি সংকট আরও ঘণীভূত হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) সাম্প্রতিক এক জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বঙ্গোপসাগরের পাানির গড় উচ্চতার তুলনায় ইতোমধ্যে ১৪০-১৬০ ফুট নীচে নেমে যাওয়ার কারণে সাগরের লোনা পানি অপেক্ষাকৃত দ্রুতগতিতে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে ঢাকা শহরের ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশের আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। ‘দি প্রোগ্রাম অব ফোরকাষ্টিং স্যালাইন ওয়াটার ইরিগেশন, ইরিগেশন ওয়াটার কোয়ালিটি এন্ড ওয়াটার লগিং ইন সাউদার্ন এরিয়া’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এ জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদি এখনই এ বিষয়ে সমন্বিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়; তাহলে আগামী ৮ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ ফাঁকা জায়গা লবণাক্ত পানিতে পূর্ণ হয়ে যাবে। এর ফলে, ঢাকা শহরে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট আরও প্রকট হবে। পানযোগ্য সুপেয় পানির অভাবে শহরের জনজীবনে মারাত্মক অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এর আগে ঢাকার উত্তরাঞ্চলসহ চারিদিক থেকে ভূগর্ভস্থ পানি এসে ঢাকার ভূ-অভ্যন্তরের ফাঁকা স্থান পূরণ করত। কিন্তু বিগত কয়েক বছর যাবত অপেক্ষাকৃত কম বৃষ্টিপাত, অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং এরসাথে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ধীরে ধীরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দক্ষিণের লবণ পানি দ্রুত গতিতে উত্তর দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। জরিপে বলা হয়, রাজবাড়ী ও ফরিদপুরসহ পদ্মার দক্ষিণ পাড়ের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এখনো সমুদ্রের পানির গড় উচ্চতার উপরে থাকলেও মানিকগঞ্জ ও ঢাকা জেলার কিছু কিছু স্থানের পানির স্তর সমুদ্রের নীচে অবস্থান করছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের ক্ষুদ্র সেচ তথ্য সার্ভিস থেকে বলা হয়েছে, ভূগর্ভ থেকে প্রতিবছর যে পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে তা বৃষ্টি ও বন্যার মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে না বলেই এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
ওয়াসার সরবরাহ করা পানির ৮৭ শতাংশই তোলা হচ্ছে মাটির নিচ থেকে। ওয়াসা ছাড়াও ভূগর্ভের পানি তোলা হচ্ছে বৈধ-অবৈধ গভীর নলকূপের মাধ্যমে। ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। জলাধার, খাল ভরাট করে ফেলায় ভূগর্ভে পানি আবার ফিরে যেতে পারছে না। কমছে ওয়াসার গভীর নলকূপগুলোর উত্তোলন ক্ষমতা। তৈরি করছে পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা। এ অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দেখা দেবে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। ভবন দেবে যাওয়া ও ধসে পড়ার ঝুঁকিও বাড়বে।
ভূগর্ভের পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে আগামী ১০ বছরে ১৩৭ কোটি লিটার পানি শোধনের মাধ্যমে সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াসা। এর মধ্যে রয়েছে পাগলায় ৪৫ কোটি লিটার, খিলক্ষেতে ৫০ কোটি লিটার এবং সায়েদাবাদের ২টি ইউনিটে ৪২ কোটি লিটার নদীর পানি পরিশোধনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে। তবে এসব প্রকল্প বাস্ত বায়নের জন্য তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে দাতাদের দিকে। রাজধানীর আশপাশের নদীর পানি মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কারণে দাতারা এ খাতে অর্থ জোগান দিতে আগ্রহী নয়। ওয়াসা সূত্রে প্রকাশ, বেশ কয়েকটি দাতাদেশ কিংবা সংস্থার সাথে নদীর পানি শোধনে শোধনাগার স্থাপনে অর্থ জোগান দেয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে দাতাদের প্রথম শর্ত নদীদূষণ বন্ধ করতে হবে। এদিকে একে তো পানি সংকট, তার উপর দুর্গন্ধময়। ওয়াসার এই পানি খাওয়া তো দূরের কথা সাংসারিক অন্যান্য কাজেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। নগরবাসীদের মধ্যে অনেকের ধারণা পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের সাথে ওয়াসার পাইপের সংযোগ হওয়ায় এমন দুর্গতির সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা সহজ অভিযোগ ওয়াসা কর্তৃপক্ষ অপরিশোধিত, পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি খাওয়াচ্ছে নগরবাসীকে। পানি নিয়ে এই দুর্বিষহ ভোগান্তির পরিসমাপ্তি কামনা করেছেন অনেকেই।
কিন্তু ওয়াসার পানি নিয়ে দুসংবাদ হচ্ছে ময়লা দুর্গন্ধ পানি এবারও সরবরাহ করতে বাধ্য হচ্ছে তারা। চাঁদনীঘাট শোধনাগারে বুড়িগঙ্গার পানি প্রাক-শোধনের ব্যবস্থা নেই। এ অবস্থা প্রতিরোধে অবিলম্বে ভূগর্ভ থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলন বন্ধ করে সেচ কাজের জন্য ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। এজন্য সারাদেশে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মজা খাল-নদী পুনর্খনন করে পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে পানি সঙ্কট তীব্রতর হয়ে ওঠে। একদিকে পানির স্বল্পতা, অন্যদিকে যে স্বল্প পরিমাণ পানি আছে তাও দূষিত। আর এ পানি ব্যবহার করে মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে। এদিকে দেশের প্রধান প্রধান নদীর উৎসমূলে অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে নদীতে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ না থাকায় সর্বত্র পানি সংকট তীব্রতর হচ্ছে। রাজধানী জুড়ে দেখা দেবে তীব্র পানির সংকট। বাধ্য হয়ে দুষিত পানি পান করতে হচ্ছে রাজধানীবাসী। আক্রান্ত হচ্ছে নানাবিধ জটিল রোগে। গরম বাড়ার সাথে সাথে আইসিডিডিআরবিতে পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে শুরু হয়েছে। জনজীবনে নিদারুন ভোগান্তির আশু সম্ভাবনা ও দেখা দিচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকে সুপেয় বাজারজাত পানি উচ্চমুল্যে ব্যবহার করছে। ইদানিং সেটির উপর আস্থা রাখাও বড় কঠিন। শুধুমাত্র রাজধানীতে নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এ মৌসুমে পানির খুব বড় রকমের সংকট থাকে। মওসুম শুরুর আগেই সংকট নিরসনে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্দ্যোগ। লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
০১৭১১৫৭৯২৬৭
0 comments:
Post a Comment