Saturday, May 30, 2015

ধূমপানে প্রতি বছর ১ লাখ লোক মারা যায়: নতুনযোগ হচ্ছে ২৫ লাখ

ধূমপানে প্রতি বছর ১ লাখ লোক মারা যায়: নতুনযোগ হচ্ছে ২৫ লাখ
ড. ফোরকান আলী
প্রতি বছর তামাক ব্যবহারের ফলে ১২ লাখ মানুষ ৮টি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর ফলে রোগীর চিকিৎসা, অকালমৃত্যু, পঙ্গুত্বের কারণে বছরে দেশের অর্থনীতিতে ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। অন্যদিকে তামাক খাত থেকে বছরে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আয় হয়। সুতরাং তামাক ব্যবহারের ফলে দেশের অর্থনীতিতে বছরে নিট ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশে শুধু ধূমপানজনিত বিভিন্ন রোগের কারণে প্রতি বছর এক আখ লোক মারা যায়। বিশ্বব্যাংকের এক হিসাবে বলা হয়েছে, অপুষ্টির কারণে যে ৭০০ জন শিশু প্রতিদিন মারা যাচ্ছে তার ৩৫০ জনকে বাঁচানো সম্ভব যদি প্রতিদিন মানুষ তামাক ব্যয়ের মাত্র ৬৯ শতাংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ধূমপান না করেও ধূমপায়ীর মতো সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অধূমপায়ীরা। তার কারণ অধূমপায়ী একজন ধূমপায়ীর সঙ্গে বা পাশে থেকে সেই ধোঁয়া গ্রহণ করেন। এদিকে ইভালুয়েশন অফ টোবাকো কন্ট্রোল পলিসিস ইন বাংলাদেশ শীর্ষক এক কর্মশালায় বক্তারা বলেছেন, বিশ্বে প্রতিবছর আশংকাজনক হারে বেড়ে চলেছে ধূমপায়ীদের সংখ্যা। এদের মধ্যে যুবসমাজ বেশি। বাংলাদেশে আকস্মিকভাবে ধূমপায়ীর সংখ্যা বেড়েছে। গত পাঁচ বছরের বাংলাদেশে নতুন করে ২৫ লাখ ধূমপায়ী যোগ হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে আয়োজিত এ কর্মশালার বক্তারা এসব কথা বলেন। ইন্টারনাশনাল টোবাকো কন্ট্রোল পলিসি ইভ্যালুয়েশন প্রজেক্ট (আইটিসি প্রজেক্ট), কানাডার ওয়াটারলু ইউনির্ভাসিটি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি গবেষণা ব্যুরো যৌথভাবে এই কর্মশালার আয়োজন করে। কর্মশালায় ধূমপানের পরিণতি কী হয় এ সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন এবং একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন ‘ইন্টারন্যাশনাল টোবাকো কন্ট্রোল পলিসি’র প্রধান কানাডিয়ান অধ্যাপক জিওফেরী টি ফং। কর্মশালায় আলোচকরা বলেন, প্রতি বছর বিশ্বে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপায়ীর সংখ্যা আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে যা উদ্বেগের বিষয়। গত বছরে বাংলাদেশে ধূমপায়ীর সংখ্যা ১.৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। আর বিশ্বে প্রতিবছর ধূমপায়ীর সংখ্যা অর্ধ মিলিয়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে ধূমপায়ীর সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে আলোচকরা গবেষণা করে দেখেছেন এর মূল কারণ তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি না পাওয়া। গবেষণায় দেখা যায়, ধূমপায়ীদের অধিকাংশই যুব সমাজ। জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সদস্য, মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস) এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরুপ রতন চৌধুরী জানান, তামাক নিয়ন্ত্রণের ফলে অনেক লোক চাকরি হারাবেÑ তামাক কোম্পানিগুলোর এ ধরনের বক্তব্য সঠিক নয়। যদি কোনো ব্যক্তি তামাক ক্রয় বন্ধ করে, অবশ্যই সে ওই টাকা দিয়ে অন্য কোনো পণ্য ক্রয় করবে যার ফলশ্রুতিতে চাহিদার সৃষ্টি হবে এবং পণ্যের বাজার বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ যদি তামাকের ব্যবহার না করে তবে ১৮.৭ শতাংশ বেশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। ধূমপানের স্বাস্থ্যগত ক্ষতির ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ১৯৮৬ সালে স্যার রিচার্ড ঢাল উল্লে¬খ করেছিলেন, প্রতিদিন ১ ঘণ্টা ১ জন ধূমপায়ীর সঙ্গে ১টি রুমে বসবাস করার অর্থ একজন অধূমপায়ীর শতকরা ১০০ ভাগ ফুসফুসের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা। যা ২০ বৎসর একটি এসবেসটস জাতীয় পদার্থের তৈরি গৃহে বসবাস করার সমান। তামাক শুকানোর জন্য জ্বালানি ব্যবহারের ফলে যে গাছকাটা চলছে তাতে বন ধ্বংস হচ্ছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি বছর তামাক উৎপাদনের কারণে ২ লাখ হেক্টর বন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। এই বন ধ্বংসের পরিমাণ বিশ্বে ১.৭ ভাগ, কিন্তু ৬৬টি তামাক উৎপাদনকারী দেশের জাতীয় অবনায়নের হার ৪.৬ ভাগ। হিসেবে দেখা গেছে, আগামী ২৫ বছরে তামাকজনিত রোগের ফলে ২৫ কোটি শিশু ও কিশোরীর অকাল মৃত্যু হবে। ফলে বিশ্বব্যাপী ধূমপানজনিত মৃত্যুহার এইডস, যক্ষ্মা, প্রসবকালীন মৃত্যু, যানবাহন দুর্ঘটনা, আÍহত্যা ও নরহত্যাসহ সকল মৃত্যুহারকেও ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের ব্যাপকতা আশঙ্কাজনক। বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৩৬.৮ শতাংশ (৩ কোটি ১৮ লাখ জন) কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করছেন। ৪১ শতাংশ পুরুষ (১ কোটি ৮৪ লাখ জন) ও ১.৮ শতাংশ মহিলা (৭ লাখ ৪৯ হাজার জন) ধূমপান করছেন। ১৪.৮ শতাংশ পুরুষ (৬৬ লাখ ৩৮ হাজার জন) ও ২৪.৪ শতাংশ মহিলা (১ কোটি ১ লাখ জন) চর্বণযোগ্য তামাক ব্যবহার করছেন। তামাক ব্যবহারের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩০ বছরের বেশি বযস্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫৭ হাজার জন মৃত্যুবরণ করেন এবং ৩ লাখ ৮২ হাজার জন পঙ্গুত্ববরণ করেন। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করে। এর মধ্যে ২০-৩৪ বৎসরের জনসংখ্যা ২৩.৭ শতাংশ, ৩৫ থেকে ৪৯ বৎসর বয়সের জনসংখ্যা ৪১ শতাংশ এবং ৫০ ঊর্ধ্বের জনসংখ্যা ১২.৩ শতাংশ ধূমপায়ী। ধূমপায়ীদের শতকরা প্রায় ৫০ ভাগই মারা যান মধ্যবয়সে। বাংলাদেশে একটি পরিসংখ্যানে বলা হয়েছেÑ ধূমপানের কারণে প্রতি বছর ১ লাখ লোক মারা যায়, যা মোট মৃত্যুহারের ১৬ শতাংশ। আর ধূমপানের কারণে প্রতি বছর রোগাক্রান্ত হয় ১২ লাখ লোক। তামাকের ব্যবহারের ফলে আমাদের শরীরে ২৫টি মারাÍক রোগের সৃষ্টি হতে পারে তার মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, শিশুমৃত্যু ইত্যাদি প্রধান। পরোক্ষ ধূমপানের ফলে ধূমপায়ী না হয়েও অনেকেই এর কুফল ভোগ করেন। বাংলাদেশ ৪০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। ২৫ শতাংশ মানুষ চরম দরিদ্র। দেশে বাড়ছে তামাকজনিত রোগে মৃত্যুর হার, যার সিংহভাগই দরিদ্র মানুষ। সুতরাং এদেরকে বাঁচানো আমাদের সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য। বিশ্বব্যংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ধূমপানের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০২০ সালে ধূমপানের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর ১ কোটি লোক মারা যাবে। যার মধ্যে ৭০ লাখই মারা যাবে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে। বাংলাদেশে ধূমপানকে যদি নিষিদ্ধ করতে পারি এবং জনগণকে যদি বোঝানো যায় ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকরÑ তবে আগামী ৪০ বছরে হয়তো দেশে ৮ লাখ লোকের অকাল মৃত্যু আমরা রোধ করতে পারবো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক হিসেবে ১ হাজার টন তামাক উৎপাদনে ১ হাজার জন মানুষের মৃত্যু হয়। ২০০০ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক ও ধূমপানের কারণে প্রায় ৪২ লাখ লোক অপরিণত বয়সে মারা গেছে। যার মধ্যে ৩৪ লাখ পুরুষ এবং ৮ লাখ মহিলা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বর্তমানে প্রতি বছর মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ লাখ। চিকিৎসক এবং গবেষকদের মতে, তামাকের বিভিন্ন উপাদান যেমন সিগারেট, জর্দা, খৈনী, দোক্তা, গুল ও সাদাপাতা ইত্যাদির ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মুখের ক্যান্সার, মাড়ির রোগ, বিভিন্ন ধরনের সাদা ক্ষত বা ঘা। সিগারেটের প্রতিটি প্যাকেটে তামাকের মধ্যে আছে নিকোটিন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে যা একটি আসক্তিকর উপাদান। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আরো দেখা গেছে, তামাকের উপকরণগুলোর মধ্যে সিগারেট, জর্দা, খৈনী, দোক্তা, গুল ইত্যাদিতে রয়েছে প্রায় ৪ হাজার রাসায়নিক পদার্থÑ যার মধ্যে ৬০টি উপাদান নিশ্চিতভাবে ক্যান্সার রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী। যেমনÑ আর্সেনিক, ডিজিটি, নিকোটিন, কার্বন মনোক্সাইড, আলকাতরা, ফরমালডিহাইড, একোনিয়া, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি। আমরা আশাকরি আমাদের আগামী প্রজম্মের জন্য আমরা তামাক মুক্ত দেশগড়ার প্রত্যায়ে এগিয়ে আসবো। লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
০১৭১১৫৭৯২৬৭

0 comments:

Post a Comment