Sunday, June 28, 2015

আমাদের উচ্চশিক্ষা ও অদৃশ্য উপনিবেশ

আমাদের উচ্চশিক্ষা ও অদৃশ্য উপনিবেশ
ড. ফোরকান আলী
প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি, সমাজ, ইতিহাস রয়েছে। আর তার অর্গানিক জ্ঞানের সঙ্গে বিদেশি বিদ্যা যদি আত্তীকৃত না হয়। তবে ওই বিদ্যা ব্যক্তির আত্মীক বিকাশ ঘটাতে পারে, এমন মনে হয় না। কৌশলগত জ্ঞান আর দক্ষতা বাড়ানোতে বিদেশি বিদ্যার ভূমিকা আছে, সন্দেহ নেই। সশরীর উপনিবেশ দেশে না থাকলেও অশরীর উপনিবেশ যে এখনও আছে। তা হলফ করে বলা যায়। অদৃশ্য সেই উপনিবেশের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় এ দেশের মানুষের বিদেশমুগ্ধতা দেখে। পরদেশি তত্ত্ব, পণ্য, শিল্প-সাহিত্য আর বিদ্যাশিক্ষায় তার নির্বিচার আস্থা। ক্ষমতার ক্ষেত্রে তো শতভাগ। সেই ক্ষমতা যদি অনেক বড় হয় তবে তো কথাই নেই। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা শক্তি-উপাসনার সঙ্গে বাঙালির এই শাক্ত-স্বভাবের গভীর কোনো যোগাযোগ হয়তো আছে। মূর্ত উপনিবেশ না থাকলেও উপনিবেশিতের মানসচিত্রের ছাপগুলো রয়ে গেছে এ দেশের নানা ব্যবস্থার ভেতর। নয়া উপনিবেশ এসেছে ‘বিজ্ঞান’, ‘প্রগতি’, ’উন্নয়ন’- এসব কথা। তার তত্ত্ব আর চর্চার ভেতর দিয়ে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দেখানো জগৎ এখন এক ও অনিবার্য। তার বাইরে মানুষের জন্য অন্য কোনো জগতের- সমাজ ও সংস্কৃতির ভাবনা ও সম্ভাবনা যেন হাস্যকর কিছু। বিজ্ঞানের সহযোগী আর পুঁজির স্বভাবে গড়া ভাবাদর্শেই ’উন্নয়ন’ সম্ভব। এর বাইরে গেলেই তা হবে প্রগতির অন্তরায়। বলা যায়, বিজ্ঞান, প্রগতি আর উন্নয়নের ধারণা এখন একটা মেটান্যারেটিভ। আমাদের উচ্চশিক্ষাকেও যার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চলতে হচ্ছে। উপনিবেশ আছে সেখানেও। ফকির লালন সাঁই আমাদের কানার হাট-বাজার বলে এক বাজারের ধারণা দিয়েছিলেন। তারও চেয়ে অন্ধ এক বাজার এসে হাজির হয়েছে আমাদের লোকালয়ে। যার নাম বিশ্ববাজার। আমাদের সেই বাজারের উপযোগী হয়ে উঠতে হয়। না হলে উন্নয়ন হয় না, প্রগতির পথেও থাকা হয় না। আমাদের উচ্চশিক্ষার উন্নয়নে সেই মেটান্যারেটিভের নিরিখ ঠিক আছে কি-না আমরা তা খেয়ালে রাখি, বিশ্বব্যাংকও তার তদারকি করতে আসে। ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন উচ্চশিক্ষার যে ২০ বছর মেয়াদি কৌশলপত্র দিয়েছিল, তাতে বিশ্ববাজারের কথা গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে। সাবধান-বাণীর মতো, যেন সেটা কোনো দৈবনির্দেশ। এই কৌশলপত্রটি প্রণীত হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের ভরণপোষণে। ব্যাংকটি আমাদের উচ্চশিক্ষার কৌশলপত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত করেছিল একটি আর্ন্তজাতিক পরামর্শক দলকে। উচ্চশিক্ষার দরকার কিসে? এই প্রশ্নে কৌশলপত্র বলছে, শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে পারে। এমন একটি সমর্থ জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করা। বৈশ্বিক কর্মযজ্ঞের সঙ্গে শিক্ষার দূরত্বকে কমিয়ে আনা এবং এর জন্য বৈশ্বিক মানের উপযোগী একটি শিক্ষার সুব্যবস্থা করা। উচ্চশিক্ষার এই ভূমিকা বর্ণনার পাশাপাশি কৌশলপত্রটি কোনো রাখঢাক না রেখে স্পষ্ট করে বলছে। উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থাটিকে হতে হবে একটি উন্নয়ন যন্ত্র। সত্য যে, যন্ত্রের প্রয়োজনকে অস্বীকার করা যাবে না। যন্ত্র দিয়ে যা বেরুবে, তা অবশ্যই কোনো প্রোডাক্ট। যা দিয়ে জাতীয় ক্ষেত্রে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি হবে। কিন্তু সংশয় অন্যত্র। বিশ্ববাজারের উপযোগী এ রকম একটা শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে যে ব্যক্তি-প্রোডাক্ট তৈরি করবে। সে দক্ষভাবে তার কাজ সম্পাদন করবে অবশ্যই। তবে একই সঙ্গে সে হবে পুঁজিবাজারের একটি উপাদান- মেশিনের খুচরো যন্ত্রাংশের মতো। একেকজন উচ্চ বেতনভোগী দাস হয়তো-বা। যুগের ঝড়ো বাতাসই নিজের শূন্যগর্ভে যার মৃত্যুকে নিশ্চিত করবে। বাজারের বাইরের কোনো দুনিয়ায় তার পুনর্জন্মের কোনো সম্ভাবনা নেই। বাজারমুখী এই শিক্ষাব্যবস্থায় এমন কোনো অনিশ্চয়তার স্থান নেই। যাতে পশ্চিমা জ্ঞান ও পুঁজিবাজারকে অস্বীকারের সম্ভাবনা তাতে থাকতে পারে। উপনিবেশিত যেমন নিজের ইতিহাস, মূল্যচেতনা আর বিদ্যার প্রতি সুবিচার করে না। বাজার উপযোগী হতে গিয়ে উচ্চশিক্ষার কৌশলপত্রটিও সেটা করেনি।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রগুলোতে যত বেশি সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকবে। অদৃশ্য উপনিবেশের লাভ তত বেশি। বিশ্বব্যাংকের তদারকিতে তৈরি উচ্চশিক্ষার কৌশলপত্রেও দেখা যাচ্ছে। স্বায়ত্তশাসনের বিপরীতে তারা উচ্চশিক্ষায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে আগ্রহী। ক্ষমতার এ পরিবর্ধনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যে ফর্মুলাগুলো দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই তা কার্যকর করার প্রক্রিয়া চলছে। দেখা যাচ্ছে, ‘সার্স কমিটি’র খুঁজে দেওয়া উপাচার্যকে দিয়েই চলছে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। এই খুঁজে আনা উপাচার্য ঊর্ধ্বতনের কৃপায় উপাচার্য হওয়ার কারণে আনুগত্যের প্রশ্নটিকে ঘুমে-জাগরণে মনে রাখছেন। আমরা কিছুকাল আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘ভোটার’ নিয়োগের জরুরতের কথা শুনতাম। এখন তা বদলে গিয়ে ’দলীয় পা-া’ নিয়োগের তোড়জোড়ের কথা শুনি। গত ক’বছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে বলেই ধারণা করা যায়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের সুবিধাও ক্রমে দূরের স্বপ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের উচ্চশিক্ষার ভাষা ইংরেজি হবে, না মাতৃভাষা বাংলা হবে সেই বিতর্ক ইংরেজ আমল থেকেই চলে আসছে। সে সময় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ’উচ্চশিক্ষাকে আমাদের দেশের ভাষায় দেশের জিনিস করিয়া লইতে হইবে।’ ইংরেজি শেখার গুরুত্বকে স্বীকার করেই তিনি পাশ্চাত্য জ্ঞানকে নিজের ভাষায় আত্তীকরণের প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন। না হলে বিদেশি মালের ব্যবসা শহরের ঘাটেই আটকা পড়ে থাকবে। ভাষার প্রশ্নেই অদৃশ্য উপনিবেশকে বোধকরি সব থেকে স্পষ্ট করে বোঝা যায়। উচ্চশিক্ষার ভাষা যে মাতৃভাষাই হবে। সেই দাবি তুললে হাল-আমলেও ঔপনিবেশিক চোখের প্রকাশ্য ভ্রূকুটি দেখতে পাওয়া যায়। ইদানীংকার বেশিরভাগ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ দশার ওপর টানানো আছে ইংরেজি ভাষায় পাঠদানের চকচকে সাইনবোর্ড। উচ্চশিক্ষায় শ্রেণীর ভেদরেখা স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ। নিম্নবর্গের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে উচ্চশিক্ষা। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তো নয়ই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও আর সব শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকছে না। বিদ্যাশিক্ষা ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজার, বিশ্বমানের বাসনা যেমন অর্গানিক জ্ঞান থেকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে বিযুক্ত করেছে। তেমনি এখন উচ্চশিক্ষার অধিকার থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে নিম্নশ্রেণীভুক্ত মানুষকে। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শকরা বলছেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ফিসহ অন্যান্য খরচ-খরচাকে ‘র‌্যাশনালাইজ’ করা দরকার। এছাড়া জিডিপির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত নিজেদের আয় বাড়ানো। এই পরামর্শ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নানা স্তরে শুরু হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোর উন্নয়ন খরচ এবং ভর্তি ফি দিতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থীই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেন না। কোনো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি, সমাজ, ইতিহাস আর তার অর্গানিক জ্ঞানের সঙ্গে বিদেশি বিদ্যা যদি আত্তীকৃত না হয়, তবে ওই বিদ্যা ব্যক্তির আত্মীক বিকাশ ঘটাতে পারে, এমন মনে হয় না। কৌশলগত জ্ঞান আর দক্ষতা বাড়ানোতে বিদেশি বিদ্যার ভূমিকা আছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু তা ব্যক্তির ভেতরের নীতিভাব সৃষ্টি করতে পারবে। এমন অনুমান করা দুঃসাধ্য। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর ডিগ্রি বাগানোর সঙ্গে নিজের কৌম থেকে দূরত্ব সৃষ্টির একটা আনুপাতিক সম্পর্ক আছে যেন। দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা উচ্চশিক্ষা নিতে পশ্চিমে যান। তাদের একটা অংশ স্কলারশিপের অর্থসহ নিখোঁজ হয়ে যান। বিশ্ববিদ্যালয় তাদের আর খোঁজ পায় না। যারা ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরেন, তাদের অনেকেই ‘দ্বিজ’ হয়ে আসেন। পশ্চিমের মনোভূমিতে তারা দ্বিতীয় জন্ম নিয়ে ঘরে ফেরেন। আমাদের দেশে ঔপনিবেশিক ন্যারেটিভের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিশ্ববাজারের উপযোগী হয়ে গড়ে ওঠা উচ্চশিক্ষার প্রোডাক্ট বিদেশের বাজারেও ভালো দামে বিক্রি হয়। আবার দেশি মনকে বিদেশি জন্ম দিয়ে তারা যখন দেশে পাঠান। তখন মনের আধারে তারা নিয়ে আসেন অদৃশ্য উপনিবেশকে। লেখক:গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ

0 comments:

Post a Comment