মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ সঠিক ইতিহাস রচিত হোক
ড.ফোরকান আলী
মুক্তিযুদ্ধের পাঁচল্লিশ বছর পূর্ণ হতে চললো। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দেশে প্রচুর কথা হয়, লেখাও হয়। বলতে দ্বিধা নেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দেশে অপরাজনীতিও কম করা হয়নি। কিন্তু যে কাজটি মোটেও করা হয়নি বা হচ্ছে নাÑ তা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করা। আমার এমন কথায় কেউ কেউ বিরক্ত হতে পারেন। বলতে পারেন যে, মুক্তিযুদ্ধের ওপর কম করে হলেও এক হাজারের মতো বই লেখা হয়েছে। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ১৬ খন্ডের দলিলপত্রের কথাও কেউ কেউ বলতে পারেন। সবই মেনে নিচ্ছি। কিন্তু তারপরও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে বলতে পারি, আমরা এখনো মুক্তিযুদ্ধের একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় হাতই দেইনি। বাজারে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে লেখা অনেক বইই পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এসবই লেখা হচ্ছে বিভিন্ন জনের মনের তাগিদ থেকে মুক্তিযুদ্ধের কোনো ঘটনায় তাদের অংশগ্রহণকে তুলে ধরার জন্য কিংবা তাদের বিবেচনায় উপস্থাপনার জন্য। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে দেশটি স্বাধীন হলো। স্বাধীনতা লাভ করলো সেই দেশের সরকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার উদ্যোগ অনেকবার নিয়েও তা এখনো পর্যন্ত বাস্তবায়ন করতে পারেনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলা একাডেমীর মাধ্যমে একবার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ১৯৭৫-এর পর সেই উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দলিলপত্র সংগ্রহের চিন্তা থেকে হাসান হাফিজুর হরমানকে সম্পাদক করে ১৬ খন্ড প্রকাশ করা হয়। ১৬ খন্ডের দলিলপত্র প্রকাশ এ ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের কাজ নিঃসন্দেহে। তবে তা কোনো অবস্থাতেই এখানেই শেষ করে দেয়া উচিত হয়নি। কেননা, উক্ত ১৬ খন্ডের দলিলপত্রই শেষ নয়। বলা চলে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় এগুলোই তথ্য-উপাত্তের জন্য যথেষ্টও নয়। অভিজ্ঞতা বলছে আরো অনেক তথ্য-উপাত্তই এই ১৬ খন্ডের বাইরে রয়ে গেছেÑ যা তখন হয়তো সংগ্রহ বা সংকলন করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া এসব দলিলপত্রের সবগুলোই নির্ভুলভাবে তখন করা গেছে। কিংবা এগুলোর ওপর নির্ভর করে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লেখা সম্ভব হবেÑ তা কিন্তু বলা কঠিন। কোনো কোনো তথ্যের যাচাই-বাছাই নিষ্পন্ন করা হয়নি, ফলে কিছু সমস্যা এ ক্ষেত্রে রয়েই গেছে। এ ক্ষেত্রে বুঝতে হবে। তথ্য-উপাত্তই ইতিহাস নয়। ইতিহাস রচনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। আমরা এ পর্যন্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়েই ব্যস্ত আছি, কথা বলছি। আবার মাঝেমধ্যে দেখা যায় যে, কোনো কোনো সরকার তথ্য-উপাত্ত পরিবর্তন করার উদ্যোগ নিয়ে থাকে। বিশেষত স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মহল খুবই ব্যস্ত। তারা অনেকটা শিকারির মতো আচরণ শুরু করেছে। যখনই তারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় তখনই স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে নিজেদেও মতো করে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যায়। সে ক্ষেত্রে তারা ১৯৭১-এর বাস্তবতা সম্পর্কে নানা ধরনের কাল্পনিক ঘটনা ও তথ্যসূত্র সৃষ্টি করে। বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা হচ্ছে, এসব ঘটনা ও তথ্য সৃষ্টিকারীতে এমনসব ব্যক্তি যোগদান করে থাকেন কোরাস গেয়ে ওঠেনÑ যারা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সবকিছু দেখেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, ঘটনাবলী তারা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার স্বাদ এবং দল করার কারণে তারা এখন সেই ইতিহাসকে ভিন্নভাবে বলছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মনের মাধুরী মিশিয়ে বলার চেষ্টা করছেন। বস্তুত বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেকেই আটকে আছেন স্বাধীনতার ঘোষণার বিতর্কে। এটিকে গলাবাজি করে যেন দলীয় শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর জন্য রক্ষা করতে হবে। তাতেই যেন দলীয় রাজনীতি ‘সফল’ হবে বলে মনে করা হয়Ñ তেমনটিই প্রতিভাত হচ্ছে। আসলে এভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দখল করা যেতে পারে, কিন্তু সম্মান দেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে অতীত ইতিহাস কেউ দখল করতে পারে না। ইতিহাস জায়গা-সম্পত্তি নয় যে তা শরীরের শক্তি দিয়ে দখল করা যায়, ভোগ করা যায়। এটি যারা করে থাকে তারা ইতিহাস কী বিষয় তা-ই জানে না। হতে পারে তাদের কেউ কেউ ইতিহাস বিষয়ের ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কিন্তু ইতিহাসজ্ঞান সম্পর্কে তাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক অভাব কতোটা প্রকট তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশে স্বাধীনতা-উত্তর বেশির ভাগ সময়ই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে অতিকথন হয়েছে। নোংরা রাজনীতিও হয়েছে, ভূমিদস্যুর মতো দখলবাজির নানা ধরনের হীন কর্মকান্ড ও চলেছে। কোনো মূর্খ, বর্বর, হায়েনার কর্মকান্ডের সঙ্গে এসব গলাবাজি, ইতিহাস বিকৃতিবাজির তুলনা হতে পারে। তবে কোনো সভ্য, আধুনিক জ্ঞানপিপাসু জাতিগোষ্ঠীর বোধ, বিশ্বাস ও আচরণ এগুলো কোনো মতেই হতে পারে না। অথচ এ দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের মতো এমন বিশাল মাপের ঘটনা সংঘটিত করেছে। এটিকে সফল করেছে। নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের যে বীরত্ব তৈরি করেছেÑ তার কোনো তুলনাই খুঁজে পাওয়া যায় না আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসে। এতো বিশাল মাপের মুক্তিযুদ্ধকে একদল ‘রাজনীতিবিদ’ বছরের পর বছর কলঙ্কিত করে চলছে। এখানেই আমাদের যতো কষ্টের এবং দুঃখের কথা। এই দুঃখ দিন দিন বেড়েই যেন চলছে। কেননা, মুক্তিযুদ্ধের নানা বিষয় নিয়ে যেমনিভাবে কেউ কেউ মনগড়া মন্তব্য করছেন, আবার মুক্তিযুদ্ধে অসম বীরত্ব রাখা কোনো কোনো যোদ্ধার পরবর্তী জীবন, রাজনৈতিক অবস্থান, কথাবার্তা, আচার-আচরণও মানুষকে দারুণভাবে বিস্মিত করছে। এ ধরনের নানা দুঃখজনক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই আমরা যেন মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে দেশে চলছি।
এমনটি করা সম্ভব হচ্ছে কারো কারো পক্ষে এ কারণে যে, পাঁচল্লিশ বছর পূর্তির পাদদেশে দাঁড়িয়েও আমরা দেখছি যে, দেশে মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাস রচনার কাজে হাত দেয়া সম্ভব হয়নি। আমরা মুক্তিযুদ্ধের সমগ্রতাকে ১৯৭১-এর বাস্তবতায় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আজো তুলে ধরতে পারিনি। আমাদের দেশে এখনো রাজনীতিবিদরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশি বেশি কথা বলা মানেই যেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলা মনে করে থাকেন। এটিকে বস্তুনিষ্ঠভাবে লেখা, পঠন-পাঠনের বিষয় হিসেবে দেখেন না। সে কারণেই মুক্তিযুদ্ধের একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না। পৃথিবীর সব দেশেই নিজ নিজ স্বাধীনতা, বিপ্লব বা গণতন্ত্রে উত্তরণের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী যে কোনো পর্বের ইতিহাস বেশ গুরুত্বের সঙ্গে লেখানোর উদ্যোগ গৃহীত হতে দেখা যায়। দুই-তিন শত বছর আগের এমন ইতিহাস তখনো সর্বোচ্চ জ্ঞানতাত্ত্বিক মানদন্ডে সেইসব দেশে রচনা করা হয়েছে। পরবর্তী সময়েও হয়েছে, এখনো নতুন নতুন তথ্য ও ব্যাখ্যায় রচনা করা হচ্ছে। জাতীয় জীবনের সর্বোচ্চ মর্যাদার ঘটনাকে সব চাইতে বেশি মর্যাদা দিয়ে দেখা, উপস্থাপন করা সব রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে আধুনিক সব রাষ্ট্রই মান-সম্মতভাবে জাতীয় ইতিহাস রচনার উদ্যোগ নিয়ে থাকে। আমরা তেমনটি করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার প্রমাণ দেখাতে পারিনি। ফলে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধসহ জাতীয় জীবনের মহৎ অর্জনগুলো নিয়ে নানা ধরনের অনাকাক্সিক্ষত বিতর্ক সৃষ্টি করার সুযোগ পাচ্ছে। নতুন প্রজন্মকে পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্ত করছে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি এক ধরনের বিরূপ ধারণা এবং অহেতুক জিজ্ঞাসা তৈরি করার অপচেষ্টা করছে, তেমন সুযোগ করে দিচ্ছে। যদি এরই মধ্যে প্রকৃত দেশপ্রেমিক মেধাবী, যোগ্য ও দক্ষ ইতিহাসবেত্তার অংশগ্রহণে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসটি রচনা করা সম্ভব হতো তা হলে ইতিহাসতত্ত্ব সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান নেই এমনসব ব্যক্তির পক্ষে কোনো বাগাড়ম্বর কথা বলা মোটের ওপর কঠিনই হতো। সে ধরনের দুঃসাহস তখন অনেকেই দেখাতো না। সে জন্যই জরুরি কাজ হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের একটি নির্ভর করার মতো পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় এখনই হাত দেয়া। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বক্তৃতাবাজি আর নয়, এবার আসুন জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারণা লাভ করি, চর্চা করি, তবেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
0 comments:
Post a Comment