ছাত্র রাজনীতি ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
ড. ফোরকান আলী
আমাদের দেশে যারা ছাত্র রাজনীতির পক্ষে কথা বলেন, তারা বর্তমান ছাত্র রাজনীতির গৌরবের কথা বলেন না বা ছাত্র রাজনীতি দেশ ও সমারেজ কল্যাণে পরিচালিত, এ ধরনের কোন যুক্তি প্রদর্শন করেন না। ছাত্র রাজনীতির পক্ষে কথা বলতে গিয়ে, তারা ছাত্র রাজনীতির দূর বা নিকট অতীত গৌরবের কথাই বলেন। ছাত্র রাজনীতির গৌরবজনক ইতিহাসের কথা বলতে গিয়ে, তারা ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন, ৬৬-৬৯ এর আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলন, ৭০ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, এইসব কথাই বলে থাকেন। তাদেরকে যদি বর্তমান ছাত্র রাজনীতির কথা বলতে বলা হয়, তাহলে তারা নিঃসন্দেহে ছাত্র রাজনীতির মধ্যে কোন গৌরবের কথা বলবেন না, বরং ছাত্র রাজনীতির নামে যে সন্ত্রাস চাঁদাবাজি, দলীয় লেজুরবৃত্তি চলছে তার কথাই বলবেন। ছাত্র রাজনীতির সরাসরি সুবিধাভোগী ছাড়া, এই দেশের, এই সমাজের কোন সাধারণ মানুষ, ছাত্র-চাত্রী, শিক্ষক, পেশাজীবী কেউই ছাত্র রাজনীতির পক্ষে কথা বলবেন না। বরং দেশের সামগ্রিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে, ছাত্র রাজনীতির বর্তমান অবক্ষয়ের কথাই বলবেন।
দেশের ছাত্র রাজনীতি নিয়ে লেখার ইচ্ছে মনের মধ্যে সুপ্ত ছিল বহুদিন ধরেই। দীর্ঘদিন ধরেই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার কারনে, ছাত্র রাজনীতিকে খুব কাছে থেকে অবলোকন করার কারণে একদিকে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে লেখার অনেক উপাদান যেমন পেয়েছি, একই দিকে খুব কাছ থেকে ছাত্র নেতা, মাস্তান নির্ভর ছাত্র রাজনীতি লিখতে গিয়ে এমন অনেকের মুখ ও কর্মকাণ্ড মানসপটে ভেসে উঠেছে, যাতে করে এই বিষয় নিয়ে লেখার ইচ্ছে দমন করেছি।
অনেক অনিচ্ছাও প্রবল পারিবারিক বাধা সত্ত্বেও দ্বিতীয়বারের মতো একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন শিক্ষককতা করতে গিয়ে বার বার মনের ভেতর একটা প্রশ্নই উঠে আসছে ছাত্র রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্র রাজনীতির সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে কোন ভূমিকা কি পালন করতে পারবো? সাধারণত: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাত্র রাজনীতি থেকে বঞ্চিত। তবে কিছু শিক্ষার্থী সন্ত্রাসের সাথে জড়িয়ে পড়ে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যারা সন্ত্রাসের শিকার, সন্ত্রাসের কারণে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ তাদের জন্য কি কিছু করতে পারবো? যদি নাই পারি তাহলে, কেনই বা শিক্ষকতার পেশা গ্রহণ করলাম?
প্রথমেই বলে নেই, বর্তমান ছাত্র রাজনীতির এই চরম অধঃপতনের জন্য আমি ছাত্রদের দায়ী করব না। এর জন্য মূলত দায়ী দেশের রাজনীতিবিদগণ। যারা শিক্ষক রাজনীতি করেন, তাদের মাঝেও এমন কতিপয় আছেন তারা ছাত্রদের তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেন। ছাত্র রাজনীতির অধঃপতনের জন্য দায়ী এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী। যারা তাদের ব্যবসা পাওয়ার জন্যে ছাত্রদের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেন। ছাত্র রাজনীতি করতে এসে যারা তথাকথিত মাস্তান বা ক্যাডার হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিল শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করতে এদের অনেকের সাথেই আমি কথা বলেছি। তাদের প্রতি আমার একটাই বক্তব্য ছিল এবং তা হলো, স্বাভাবিক সুস্থ জীবনে ফিরে আসার আহবান। আমার আহবান কতটুকু সফল হয়েছিল তা বলতে পারবো না। তবে তাদের অসহায়ত্বের কথা, তাদের নষ্ট হয়ে যাওয়ার অনেক কথা জেনে তাদের জন্য কষ্ট হয়েছে। তাদের প্রতি ঘৃণা জন্মেনি- বরং ঘৃনা জন্মেছে তাদের গডফাদার রাজনীতিবিদ ও অন্যান্যের প্রতি, যারা তাদের এই ঘৃণিত ও জীবন ধ্বংসকারী পথে টেনে নিয়ে এসেছে।
আমি আমার উপরের বক্তব্যের সমর্থনে নিম্নে কতিপয় ঘটনার কথা উল্লেখ করবো। যিন দীর্ঘদিন ঢকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের প্রকটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বক্তব্য গুলো পাঠক সমাজের জন্য তুলে দরলাম। ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকের কতিপয় ঘটনা আমি উল্লেখ করবো। এই সময়কারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ডীনে’র কক্ষ জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। ভাঙচুর করা হলো তার অফিস কক্ষ। তাকে ফেলে হয়তো খুন করা হতো। এই ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই আমার অফিস কক্ষে এলো একজন ছাত্র-নেতা। তার কথাবার্তা শুনে মনে হলো, এর কি কোন প্রয়োজন ছিল? শিক্ষক রাজনীতির সমস্যা তো আমরা শিক্ষকরাই সমাধান করতে পারি। কিন্তু তোমরা কেন শিক্ষক রাজনীতির কারণে একজন ডীনে’র কক্ষ জ্বালিয়ে দিলে? ছাত্র নেতার অকপট উত্তর, স্যার আপনারা আগে ভাল হন, তাহলে এই ধরনের ঘটনা ঘটবে না। আপনার ভাল না হলে এই ধরনের গটনা ঘটতেই থাকবে। তার কথার অর্থ কি তা বোধহয় কারো অনুধাবন করতে কষ্ট হবে না। একই সময়কালের অপর একটি ঘটনা-দুপুর দেড়টার দিকে প্রকটর অফিসে বসে আছি। একজন সাংবাদিক (বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার) আমার কক্ষে এলো। পরদিন শিক্ষক সমিতির জরুরিসভা। জরুরি কোন ঘটনা ঘটেনি। ঘটেছিল বেশ পূর্বে। শিক্ষক সমিতির নিকট সভা দাবি করা হলৌ সেই সময়ে সভা না দিয়ে অনেক বিলম্বে সভা দেওয়া হলো। যখন সভা দেওয়া হলো তখন আর জরুরি সভার প্রয়োজন ছিল না। সাংবাদিক ছাত্রটি আমাকে বললো, স্যার আজ কি শিক্ষক সমিতির জরুরি সভা? আমি বললাম, হ্যাঁ,। সে বললো জরুরি কোন ঘটনা তো নেই,তবে আলোচনা হবে কোন জরুরি বিষয়ে। তার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালে, সে বললো জরুরি ঘটনা ঘটেনি-তবে ঘটবে। কয়েক মিনিট পরেই সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যানের কক্ষের পাশে বেশ কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটলো। সাংবাদিকটি বললো, স্যার দেখলেন, জরুরি ঘটনা ঘটে গেলো এই বরেই সে ঘটনাস্থলের দিকে গেলো। আমিও তার সাথে সাথেই সেখানে গেলাম। দেখলাম- দেয়ালের বেশ উপরে বোমা মারার চিহ্ন। যাওয়ার পথে কয়েকজন যুবককে দৌড়ে যেতে দেখলাম। যার মধ্যে ছিল সাংবাদিকতা বিভাগের একজন ছাত্র, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু সন্ত্রাসী ঘটনার সাথে জড়িত। সন্ধ্যায় শিক্ষক সমিতির জরুরি সভাতে এই ঘটনা নিয়ে তুলকালাম আলোচনা চললো, নিন্দা জানানো হলো কঠোর ভাষায়। উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানো হলো। ঢাকা পরে গেলো নিকট অতীতে সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনার বিষয়। আমার নিকট পরিষ্কার হয়ে গেলো হিং টিং ছট এর অর্থ। সাংবাদিকতা বিভাগের একজন প্রভাবশালী শিক্ষককে ঘটনার কথা বললাম এবং যে সন্দেহভাজনকে দেখেছিলাম, তার কথা বললাম। শিক্ষক মহোদয়ের অবস্থান উত্তর,কি বলেন, ওতো খুব ভাল ছেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছত্র-নেতা যাকে খারাপ বলে জানে, বিভাগের শিক্ষক সার্টিফিকেট দিলেন, তার চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র। অনেক সন্ত্রাসী ঘটনার নায়ক সেই ছাত্র কখনো কারো কানো অত্যন্ত প্রিয় পাত্র।
নষ্ট হয়ে যাওযা ছাত্র-তরুন-যুবকেরা, এর অর্থে নষ্ট হয়ে যাওয়া রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের তুলনায় অনেক ভাল। কারণ এরা দোষ স্বীকার করে, নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য অনুতপ্ত হয়। ভাল পথে, আলোর পথে ফিরতে চায়। কিন্তু আমি এ পর্যন্ত কোন নষ্ট রাজনীতিবিদ, নষ্ট বুদ্ধিজীবি, নষ্ট পেশাজীবিদের বলতে শুনিনি, আমি নষ্ট হয়ে গিয়েছি, আমি ভাল হতে চাই, আমি আলোর পথে ফিরতে চাই। বরং এদের সব সময় নষ্টের পক্ষে সাফাই গাইতে দেখেছি।
১৯৮৬ সালের দিকের ঘটনা। কোন এক কাজে প্রশাসনিক ভবনে গিয়েছি। উপাচার্য অফিসের পাশে বেশ জটলা। একজন ঠিকাদার বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ মাস্তান পরিবেষ্টিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিকাদারকে আগে থেকেই চিনতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পূর্বেই সে ও আমি একই পাড়ায় ব সাবস করতাম। ভীড় দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারীকে ভিড়ের কারণ জিজ্ঞেস করলাম। সে জানালো টেন্ডার জমা দেওয়া ও খোলার দিন আজ। ঠিকাদার, এইসব মাস্তানকে তার পক্ষে কাজ পাওয়ার জন্য ভাড়া করে এনেছে। মোট কথা, সে একাই তিনটি টেন্ডার দিয়েছে। মাস্তান নিয়ে এসেছে যাতে করে অন্য কেউ টেন্ডার জমা না দিতে পারে।
আর একজন ছাত্র-নেতার সাথে ছাত্র রাজনীতির সাথে সন্ত্রাস ও তার সাথে জাতীয় রাজনীতি কিভাবে জড়িত সেই বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিলো। সে আমাকে একটি লোমহর্ষক কাহিনী জানালো। সেই কাহিনীর সাথে জড়িত দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ। ঘটনাটা ছিল এই রকম-
কোন একটি রাজনৈতিক দলের অফিস আক্রমণ করে ধ্বংস করে দিতে হবে। শীর্ষ মহল থেকে হলের ক্যাডার বাহিনীর নেতাকে খবর দেওয়া হলো, বাহিনী নিয়ে কোন এক জায়গায় হাজির হতে। রাজনৈতিক শীর্ষ নেতা সেখানেই উপস্থিত ছিলেন। ক্যাডার বাহিনীকে পাশে দাঁড়ানো দুটো জীপ দেখিয়ে নেতা বললেন, ওই জীপে সব মাল আছে। জীপ নিয়ে যাও এবং অমুক রাজনৈতিক দলের অফিস মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে এসো। হুকুম পাওয়া মাত্র আধা ঘন্টার মধ্যে ক্যাডার বাহিনী অফিসে হামলা চালিয়ে শত শত রাউন্ড গুলি ও হাতবোম মেরে হাজির হলো নেতার সামনে। নেতা ভীষণ খুশি। দশ হাজার টাকার কয়েকটি বান্ডিল তুলে দিল ক্যাডার বাহিনীর হাতে এবং বললো, আজ আমি ভীষণ খুশি। যাও তোমরা ফুর্তি কর। এই রকম হাজার হাজার কাহিনী ছড়িয়ে আছে ছাত্র রাজনীতির সন্ত্রাসী ঘটনার পিছনে। জলজ্যান্ত সন্ত্রাসী ঘটনা, এমনকি নিজের চোখের সামনে সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনাকে অবলীলায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিবিদরা।
আমি ছাত্র রাজনীতির বিরোধী নই। তবে নিঃসন্দেহে ছাত্র রাজনীতির নামে যা হচ্ছে আমি তার ঘোরতর বিরোধী। আমি মনে করি ছাত্র রাজনীতি আবর্তিত হতে পারে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি কেন্দ্র করেÑ
১। ছাত্র সংগঠনগুলো কোন রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তি করবে না। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ছাত্রদের ব্যবহার করবে না। সন্ত্রাসনির্ভর ছাত্র রাজনীতি রাজনৈতিক দলের কোন উপকারে আসছেনা। বরং রাজনৈতিক দলগুলির ভরাডুবির পিছনে ছাত্র রাজনীতির মূল ভূমিকা পালন করছে, এটা রাজনীতিবিদদের অনুধাবন করতে হবে। ১৯৯৬ এর নির্বাচনে বিএনপির বিপর্যয় ও ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের ভরাডুবির পিছনে তাদের ছাত্র সংগঠনের কর্মকান্ড যে দায়ী, তা এক বাক্যে সকলেই স্বীকার করবেন।
২। ছাত্র রাজনীতি আবর্থিত হবে ছাত্রদের সামগ্রিক কল্যাণে ধর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে। স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি ছাত্র কল্যাণের লক্ষ্যে পরিচালিত না হয়ে যে লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছে, তার সাথে ছাত্রদের স্বার্থের কোন যোগসাজশ নেই। তবে কোন ছাত্র সংগঠন যদি কোন রাজনৈতিক দলের আদর্শকে সমর্থন করেও ধারণ করে, সে ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নিকট তারা সেই আদর্শের কথা তুলে ধরতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হল দখল, পড়াশোনা না করে, ক্লাসে উপস্থিত না হয়ে প্রতদিন মিছিল-শ্লোগান, বিকেলে একদল মাস্তান টাইপের ছেলেকে সাথে নিয়ে টিএসসি এলাকায় মহড়া দেয়াকে ছাত্র রাজনীতি বলা যায় না।
৩। ছাত্র সংগঠনগুলো হতে পারে সমাজের ভ্যানগার্ড। তারা পালন করতে পারে যে ভূমিকাগুলি সেগুলো হলোÑ
(ক) ছত্ররা যেকোন মহলের অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ড ও প্রবণতাকে বিরোধীতা করবে। সরকার বা যেকোন রাজনৈতিক দল যদি অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ড পরিচালনা করে বা অগণতান্ত্রিক প্রবণতার দিকে ধাবিত হয়, তাহলে ছাত্র সংগঠন এই অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ড ও প্রবণতার বিপক্ষে দাঁড়াবে, এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করবে।
(খ) ছাত্ররা ঘুষ, দুর্নীতি, কালোবাজারী, মজুতদারী ও চোরাকাবারির বিপক্ষে অবস্থান নেবে। সমাজে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে, তারা তার প্রতিরোধ করবে এবং এর বিপক্ষে জনমত গঠন করবে। ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, কালোবাজারী, চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবে।
(গ) ছাত্ররা সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কারী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলবে।
(ঘ) দেশের স্বার্থ বিরোধী যেকোন তৎপরতার বিরুদ্ধে ছাত্ররা আন্দোলন গড়ে তুলবে এবং এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করবে।
তবে এসবকিছুই করতে হবে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি। অথচ আজকের ছাত্র রাজনীতির অর্থ হচ্ছে, যারা ছাত্র রাজনীতি করবে, তাদের লেখাপড়ার প্রয়োজন নেই, তাদের ক্লাস করার প্রয়োজন নেই, স্বাভাবিক নিয়মে পরীক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ছাত্র রাজনীতিবিদ মানেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা, মধূর ক্যান্টিনে দলবল নিয়ে অবস্থান করা, মিছিল করা, শ্লোগান দেওয়া। শ্লোগানে ছাত্রদের স্বার্থের কথা নেই। আছে প্রভু রাজনৈতিক দল, তাদের নেতা নেত্রীদের বন্দনা, অথবা শ্রমিক-মজুরদের কথা, যাদের সাথে এদের নেই কোন যোগাযোগ বা সামাজিক সাংস্কৃতিক নৈকট্য।
আর একটি কথা না বললেই নয় এবং তা হলো আজকে গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলে, ছাত্র রাজনীতির নামে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনগুলি যেসব কর্মকান্ড চালাচ্ছে, যেমন ক্লাস চলাকালীন অবস্থায় একাডেমিক ভবনের সামনে মাইক বাজিয়ে বক্তৃতা দেওয়া,সম্মেলন করা, গানবাজনা করা, ঢাক-ঢোল বাজানো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ডাকা, চাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরেও ছাত্র নেতা হওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মাকনুন অমান্য করা, ছাত্র না হয়েও হলে থাকা ইত্যকার ঘটনার কোন উদাহরণ বিশ্বের অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে কি? ইংল্যান্ড আমেরিকা, কানাডা, ফ্রান্স, জাপান অস্ট্রেলিয়া সব বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে গণতান্ত্রিক অধিকারে কথা বলে এই ধরনের কার্যকলাপ চালানো যায় কি? গণতন্ত্রের অর্থ হলো দেশের ও প্রতিষ্ঠানের আইন কানুন ও নিয়মনীতি মেনে চলা। অথচ আমাদের দেশে গণতন্ত্রের অর্থ হলো আইন ও নিয়ম না মানা। গণতান্ত্রিক অধিকারের অর্থ হলো কর্তৃপক্ষের সাথে বেয়াদবী করা, তাদের লক্ষ্য করে অশালীন ভাষায় শ্লোগান দেওয়া, বক্তৃতা দেওয়া। ছাত্রদের যে এমন আচরণ মানায় না- তা অনুধাবন ছাত্ররা না করলে, আর কারা করবে? লেথক:গবেষক ও সাবেক অধৗক্ষ
০১৭১১৫৭৯২৬৭
ড. ফোরকান আলী
আমাদের দেশে যারা ছাত্র রাজনীতির পক্ষে কথা বলেন, তারা বর্তমান ছাত্র রাজনীতির গৌরবের কথা বলেন না বা ছাত্র রাজনীতি দেশ ও সমারেজ কল্যাণে পরিচালিত, এ ধরনের কোন যুক্তি প্রদর্শন করেন না। ছাত্র রাজনীতির পক্ষে কথা বলতে গিয়ে, তারা ছাত্র রাজনীতির দূর বা নিকট অতীত গৌরবের কথাই বলেন। ছাত্র রাজনীতির গৌরবজনক ইতিহাসের কথা বলতে গিয়ে, তারা ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন, ৬৬-৬৯ এর আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলন, ৭০ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, এইসব কথাই বলে থাকেন। তাদেরকে যদি বর্তমান ছাত্র রাজনীতির কথা বলতে বলা হয়, তাহলে তারা নিঃসন্দেহে ছাত্র রাজনীতির মধ্যে কোন গৌরবের কথা বলবেন না, বরং ছাত্র রাজনীতির নামে যে সন্ত্রাস চাঁদাবাজি, দলীয় লেজুরবৃত্তি চলছে তার কথাই বলবেন। ছাত্র রাজনীতির সরাসরি সুবিধাভোগী ছাড়া, এই দেশের, এই সমাজের কোন সাধারণ মানুষ, ছাত্র-চাত্রী, শিক্ষক, পেশাজীবী কেউই ছাত্র রাজনীতির পক্ষে কথা বলবেন না। বরং দেশের সামগ্রিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে, ছাত্র রাজনীতির বর্তমান অবক্ষয়ের কথাই বলবেন।
দেশের ছাত্র রাজনীতি নিয়ে লেখার ইচ্ছে মনের মধ্যে সুপ্ত ছিল বহুদিন ধরেই। দীর্ঘদিন ধরেই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার কারনে, ছাত্র রাজনীতিকে খুব কাছে থেকে অবলোকন করার কারণে একদিকে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে লেখার অনেক উপাদান যেমন পেয়েছি, একই দিকে খুব কাছ থেকে ছাত্র নেতা, মাস্তান নির্ভর ছাত্র রাজনীতি লিখতে গিয়ে এমন অনেকের মুখ ও কর্মকাণ্ড মানসপটে ভেসে উঠেছে, যাতে করে এই বিষয় নিয়ে লেখার ইচ্ছে দমন করেছি।
অনেক অনিচ্ছাও প্রবল পারিবারিক বাধা সত্ত্বেও দ্বিতীয়বারের মতো একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন শিক্ষককতা করতে গিয়ে বার বার মনের ভেতর একটা প্রশ্নই উঠে আসছে ছাত্র রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্র রাজনীতির সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে কোন ভূমিকা কি পালন করতে পারবো? সাধারণত: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাত্র রাজনীতি থেকে বঞ্চিত। তবে কিছু শিক্ষার্থী সন্ত্রাসের সাথে জড়িয়ে পড়ে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যারা সন্ত্রাসের শিকার, সন্ত্রাসের কারণে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ তাদের জন্য কি কিছু করতে পারবো? যদি নাই পারি তাহলে, কেনই বা শিক্ষকতার পেশা গ্রহণ করলাম?
প্রথমেই বলে নেই, বর্তমান ছাত্র রাজনীতির এই চরম অধঃপতনের জন্য আমি ছাত্রদের দায়ী করব না। এর জন্য মূলত দায়ী দেশের রাজনীতিবিদগণ। যারা শিক্ষক রাজনীতি করেন, তাদের মাঝেও এমন কতিপয় আছেন তারা ছাত্রদের তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেন। ছাত্র রাজনীতির অধঃপতনের জন্য দায়ী এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী। যারা তাদের ব্যবসা পাওয়ার জন্যে ছাত্রদের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেন। ছাত্র রাজনীতি করতে এসে যারা তথাকথিত মাস্তান বা ক্যাডার হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিল শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করতে এদের অনেকের সাথেই আমি কথা বলেছি। তাদের প্রতি আমার একটাই বক্তব্য ছিল এবং তা হলো, স্বাভাবিক সুস্থ জীবনে ফিরে আসার আহবান। আমার আহবান কতটুকু সফল হয়েছিল তা বলতে পারবো না। তবে তাদের অসহায়ত্বের কথা, তাদের নষ্ট হয়ে যাওয়ার অনেক কথা জেনে তাদের জন্য কষ্ট হয়েছে। তাদের প্রতি ঘৃণা জন্মেনি- বরং ঘৃনা জন্মেছে তাদের গডফাদার রাজনীতিবিদ ও অন্যান্যের প্রতি, যারা তাদের এই ঘৃণিত ও জীবন ধ্বংসকারী পথে টেনে নিয়ে এসেছে।
আমি আমার উপরের বক্তব্যের সমর্থনে নিম্নে কতিপয় ঘটনার কথা উল্লেখ করবো। যিন দীর্ঘদিন ঢকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের প্রকটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বক্তব্য গুলো পাঠক সমাজের জন্য তুলে দরলাম। ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকের কতিপয় ঘটনা আমি উল্লেখ করবো। এই সময়কারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ডীনে’র কক্ষ জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। ভাঙচুর করা হলো তার অফিস কক্ষ। তাকে ফেলে হয়তো খুন করা হতো। এই ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই আমার অফিস কক্ষে এলো একজন ছাত্র-নেতা। তার কথাবার্তা শুনে মনে হলো, এর কি কোন প্রয়োজন ছিল? শিক্ষক রাজনীতির সমস্যা তো আমরা শিক্ষকরাই সমাধান করতে পারি। কিন্তু তোমরা কেন শিক্ষক রাজনীতির কারণে একজন ডীনে’র কক্ষ জ্বালিয়ে দিলে? ছাত্র নেতার অকপট উত্তর, স্যার আপনারা আগে ভাল হন, তাহলে এই ধরনের ঘটনা ঘটবে না। আপনার ভাল না হলে এই ধরনের গটনা ঘটতেই থাকবে। তার কথার অর্থ কি তা বোধহয় কারো অনুধাবন করতে কষ্ট হবে না। একই সময়কালের অপর একটি ঘটনা-দুপুর দেড়টার দিকে প্রকটর অফিসে বসে আছি। একজন সাংবাদিক (বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার) আমার কক্ষে এলো। পরদিন শিক্ষক সমিতির জরুরিসভা। জরুরি কোন ঘটনা ঘটেনি। ঘটেছিল বেশ পূর্বে। শিক্ষক সমিতির নিকট সভা দাবি করা হলৌ সেই সময়ে সভা না দিয়ে অনেক বিলম্বে সভা দেওয়া হলো। যখন সভা দেওয়া হলো তখন আর জরুরি সভার প্রয়োজন ছিল না। সাংবাদিক ছাত্রটি আমাকে বললো, স্যার আজ কি শিক্ষক সমিতির জরুরি সভা? আমি বললাম, হ্যাঁ,। সে বললো জরুরি কোন ঘটনা তো নেই,তবে আলোচনা হবে কোন জরুরি বিষয়ে। তার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালে, সে বললো জরুরি ঘটনা ঘটেনি-তবে ঘটবে। কয়েক মিনিট পরেই সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যানের কক্ষের পাশে বেশ কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটলো। সাংবাদিকটি বললো, স্যার দেখলেন, জরুরি ঘটনা ঘটে গেলো এই বরেই সে ঘটনাস্থলের দিকে গেলো। আমিও তার সাথে সাথেই সেখানে গেলাম। দেখলাম- দেয়ালের বেশ উপরে বোমা মারার চিহ্ন। যাওয়ার পথে কয়েকজন যুবককে দৌড়ে যেতে দেখলাম। যার মধ্যে ছিল সাংবাদিকতা বিভাগের একজন ছাত্র, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু সন্ত্রাসী ঘটনার সাথে জড়িত। সন্ধ্যায় শিক্ষক সমিতির জরুরি সভাতে এই ঘটনা নিয়ে তুলকালাম আলোচনা চললো, নিন্দা জানানো হলো কঠোর ভাষায়। উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানো হলো। ঢাকা পরে গেলো নিকট অতীতে সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনার বিষয়। আমার নিকট পরিষ্কার হয়ে গেলো হিং টিং ছট এর অর্থ। সাংবাদিকতা বিভাগের একজন প্রভাবশালী শিক্ষককে ঘটনার কথা বললাম এবং যে সন্দেহভাজনকে দেখেছিলাম, তার কথা বললাম। শিক্ষক মহোদয়ের অবস্থান উত্তর,কি বলেন, ওতো খুব ভাল ছেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছত্র-নেতা যাকে খারাপ বলে জানে, বিভাগের শিক্ষক সার্টিফিকেট দিলেন, তার চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র। অনেক সন্ত্রাসী ঘটনার নায়ক সেই ছাত্র কখনো কারো কানো অত্যন্ত প্রিয় পাত্র।
নষ্ট হয়ে যাওযা ছাত্র-তরুন-যুবকেরা, এর অর্থে নষ্ট হয়ে যাওয়া রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের তুলনায় অনেক ভাল। কারণ এরা দোষ স্বীকার করে, নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য অনুতপ্ত হয়। ভাল পথে, আলোর পথে ফিরতে চায়। কিন্তু আমি এ পর্যন্ত কোন নষ্ট রাজনীতিবিদ, নষ্ট বুদ্ধিজীবি, নষ্ট পেশাজীবিদের বলতে শুনিনি, আমি নষ্ট হয়ে গিয়েছি, আমি ভাল হতে চাই, আমি আলোর পথে ফিরতে চাই। বরং এদের সব সময় নষ্টের পক্ষে সাফাই গাইতে দেখেছি।
১৯৮৬ সালের দিকের ঘটনা। কোন এক কাজে প্রশাসনিক ভবনে গিয়েছি। উপাচার্য অফিসের পাশে বেশ জটলা। একজন ঠিকাদার বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ মাস্তান পরিবেষ্টিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিকাদারকে আগে থেকেই চিনতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পূর্বেই সে ও আমি একই পাড়ায় ব সাবস করতাম। ভীড় দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারীকে ভিড়ের কারণ জিজ্ঞেস করলাম। সে জানালো টেন্ডার জমা দেওয়া ও খোলার দিন আজ। ঠিকাদার, এইসব মাস্তানকে তার পক্ষে কাজ পাওয়ার জন্য ভাড়া করে এনেছে। মোট কথা, সে একাই তিনটি টেন্ডার দিয়েছে। মাস্তান নিয়ে এসেছে যাতে করে অন্য কেউ টেন্ডার জমা না দিতে পারে।
আর একজন ছাত্র-নেতার সাথে ছাত্র রাজনীতির সাথে সন্ত্রাস ও তার সাথে জাতীয় রাজনীতি কিভাবে জড়িত সেই বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিলো। সে আমাকে একটি লোমহর্ষক কাহিনী জানালো। সেই কাহিনীর সাথে জড়িত দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ। ঘটনাটা ছিল এই রকম-
কোন একটি রাজনৈতিক দলের অফিস আক্রমণ করে ধ্বংস করে দিতে হবে। শীর্ষ মহল থেকে হলের ক্যাডার বাহিনীর নেতাকে খবর দেওয়া হলো, বাহিনী নিয়ে কোন এক জায়গায় হাজির হতে। রাজনৈতিক শীর্ষ নেতা সেখানেই উপস্থিত ছিলেন। ক্যাডার বাহিনীকে পাশে দাঁড়ানো দুটো জীপ দেখিয়ে নেতা বললেন, ওই জীপে সব মাল আছে। জীপ নিয়ে যাও এবং অমুক রাজনৈতিক দলের অফিস মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে এসো। হুকুম পাওয়া মাত্র আধা ঘন্টার মধ্যে ক্যাডার বাহিনী অফিসে হামলা চালিয়ে শত শত রাউন্ড গুলি ও হাতবোম মেরে হাজির হলো নেতার সামনে। নেতা ভীষণ খুশি। দশ হাজার টাকার কয়েকটি বান্ডিল তুলে দিল ক্যাডার বাহিনীর হাতে এবং বললো, আজ আমি ভীষণ খুশি। যাও তোমরা ফুর্তি কর। এই রকম হাজার হাজার কাহিনী ছড়িয়ে আছে ছাত্র রাজনীতির সন্ত্রাসী ঘটনার পিছনে। জলজ্যান্ত সন্ত্রাসী ঘটনা, এমনকি নিজের চোখের সামনে সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনাকে অবলীলায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিবিদরা।
আমি ছাত্র রাজনীতির বিরোধী নই। তবে নিঃসন্দেহে ছাত্র রাজনীতির নামে যা হচ্ছে আমি তার ঘোরতর বিরোধী। আমি মনে করি ছাত্র রাজনীতি আবর্তিত হতে পারে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি কেন্দ্র করেÑ
১। ছাত্র সংগঠনগুলো কোন রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তি করবে না। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ছাত্রদের ব্যবহার করবে না। সন্ত্রাসনির্ভর ছাত্র রাজনীতি রাজনৈতিক দলের কোন উপকারে আসছেনা। বরং রাজনৈতিক দলগুলির ভরাডুবির পিছনে ছাত্র রাজনীতির মূল ভূমিকা পালন করছে, এটা রাজনীতিবিদদের অনুধাবন করতে হবে। ১৯৯৬ এর নির্বাচনে বিএনপির বিপর্যয় ও ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের ভরাডুবির পিছনে তাদের ছাত্র সংগঠনের কর্মকান্ড যে দায়ী, তা এক বাক্যে সকলেই স্বীকার করবেন।
২। ছাত্র রাজনীতি আবর্থিত হবে ছাত্রদের সামগ্রিক কল্যাণে ধর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে। স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি ছাত্র কল্যাণের লক্ষ্যে পরিচালিত না হয়ে যে লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছে, তার সাথে ছাত্রদের স্বার্থের কোন যোগসাজশ নেই। তবে কোন ছাত্র সংগঠন যদি কোন রাজনৈতিক দলের আদর্শকে সমর্থন করেও ধারণ করে, সে ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নিকট তারা সেই আদর্শের কথা তুলে ধরতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হল দখল, পড়াশোনা না করে, ক্লাসে উপস্থিত না হয়ে প্রতদিন মিছিল-শ্লোগান, বিকেলে একদল মাস্তান টাইপের ছেলেকে সাথে নিয়ে টিএসসি এলাকায় মহড়া দেয়াকে ছাত্র রাজনীতি বলা যায় না।
৩। ছাত্র সংগঠনগুলো হতে পারে সমাজের ভ্যানগার্ড। তারা পালন করতে পারে যে ভূমিকাগুলি সেগুলো হলোÑ
(ক) ছত্ররা যেকোন মহলের অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ড ও প্রবণতাকে বিরোধীতা করবে। সরকার বা যেকোন রাজনৈতিক দল যদি অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ড পরিচালনা করে বা অগণতান্ত্রিক প্রবণতার দিকে ধাবিত হয়, তাহলে ছাত্র সংগঠন এই অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ড ও প্রবণতার বিপক্ষে দাঁড়াবে, এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করবে।
(খ) ছাত্ররা ঘুষ, দুর্নীতি, কালোবাজারী, মজুতদারী ও চোরাকাবারির বিপক্ষে অবস্থান নেবে। সমাজে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে, তারা তার প্রতিরোধ করবে এবং এর বিপক্ষে জনমত গঠন করবে। ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, কালোবাজারী, চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবে।
(গ) ছাত্ররা সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কারী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলবে।
(ঘ) দেশের স্বার্থ বিরোধী যেকোন তৎপরতার বিরুদ্ধে ছাত্ররা আন্দোলন গড়ে তুলবে এবং এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করবে।
তবে এসবকিছুই করতে হবে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি। অথচ আজকের ছাত্র রাজনীতির অর্থ হচ্ছে, যারা ছাত্র রাজনীতি করবে, তাদের লেখাপড়ার প্রয়োজন নেই, তাদের ক্লাস করার প্রয়োজন নেই, স্বাভাবিক নিয়মে পরীক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ছাত্র রাজনীতিবিদ মানেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা, মধূর ক্যান্টিনে দলবল নিয়ে অবস্থান করা, মিছিল করা, শ্লোগান দেওয়া। শ্লোগানে ছাত্রদের স্বার্থের কথা নেই। আছে প্রভু রাজনৈতিক দল, তাদের নেতা নেত্রীদের বন্দনা, অথবা শ্রমিক-মজুরদের কথা, যাদের সাথে এদের নেই কোন যোগাযোগ বা সামাজিক সাংস্কৃতিক নৈকট্য।
আর একটি কথা না বললেই নয় এবং তা হলো আজকে গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলে, ছাত্র রাজনীতির নামে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনগুলি যেসব কর্মকান্ড চালাচ্ছে, যেমন ক্লাস চলাকালীন অবস্থায় একাডেমিক ভবনের সামনে মাইক বাজিয়ে বক্তৃতা দেওয়া,সম্মেলন করা, গানবাজনা করা, ঢাক-ঢোল বাজানো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ডাকা, চাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরেও ছাত্র নেতা হওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মাকনুন অমান্য করা, ছাত্র না হয়েও হলে থাকা ইত্যকার ঘটনার কোন উদাহরণ বিশ্বের অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে কি? ইংল্যান্ড আমেরিকা, কানাডা, ফ্রান্স, জাপান অস্ট্রেলিয়া সব বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে গণতান্ত্রিক অধিকারে কথা বলে এই ধরনের কার্যকলাপ চালানো যায় কি? গণতন্ত্রের অর্থ হলো দেশের ও প্রতিষ্ঠানের আইন কানুন ও নিয়মনীতি মেনে চলা। অথচ আমাদের দেশে গণতন্ত্রের অর্থ হলো আইন ও নিয়ম না মানা। গণতান্ত্রিক অধিকারের অর্থ হলো কর্তৃপক্ষের সাথে বেয়াদবী করা, তাদের লক্ষ্য করে অশালীন ভাষায় শ্লোগান দেওয়া, বক্তৃতা দেওয়া। ছাত্রদের যে এমন আচরণ মানায় না- তা অনুধাবন ছাত্ররা না করলে, আর কারা করবে? লেথক:গবেষক ও সাবেক অধৗক্ষ
০১৭১১৫৭৯২৬৭
0 comments:
Post a Comment