Sunday, May 10, 2015

যতটা দেব, ততটাই যেন পাই




যতটা দেব, ততটাই যেন পাই
অপরুদ্ধ
চারদিকে এখন শুধু আনন্দ আর আনন্দ। ভারতের সংসদে ছিটমহল সম্পর্কিত বিল উত্থাপন হয়েছে। আসলে কি বিল উত্থাপিত হয়েছে এদেশের প্রায় ১৬ বা সাড়ে ১৬ কোটি মানুষ জানে না। তার পরও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে তাঁরা আশাবাদি। এ ছাড়া বলা হচেছ, তিন মাসের মধ্যে তিস্তা চুক্তি সম্পাদিত হবে। তখন যে আমরা পানির সমান ভাগ পাব, সে নিশ্চয়তা কোথায়? ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় বহু প্রতীক্ষিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়ায় ট্রানজিটের বিষয়টি নিয়ে আর অগ্রসর হয়নি বাংলাদেশ। এর মানে এই নয়, ট্রানজিটের বিনিময়ে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিটি হতে যাচিছল। অর্থাৎ ‘তোমরা আমাদের তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা দিলে আমরা তোমাদের ট্রানজিট সুবিধা দেব’Ñ ব্যাপারটা এমন নয়। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের গণমাধ্যমে বিষয়টি অনেকটা সেভাবেই তুলে ধরার প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে। ভারতীয় গণমাধ্যমে মমতা ব্যানার্জির ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার যে ঝড় ওঠে তার সুরটা ছিল এরকমÑ তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির ব্যাপারে মমতার একগুয়েমির কারণে ভারত এ যাত্রায় ট্রানজিট সুবিধা পেল না। যেন একটির বিনিময়ে আরেকটি! আসলে তিস্তা ভারত ও বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত একটি অভিন্ন নদী। এর পানির ন্যায্য ভাগ পাওয়াটা উভয় দেশের অধিকারের বিষয়। এক দেশের কারণে অন্য দেশে অভিন্ন নদীর পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে ন্যায়বিচারের জন্য সেটা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উত্থাপন অথবা সংশ্লিষ্ট কনভেনশনের আওতায় তার ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু ট্রানজিট দেয়া বা না-দেয়া সম্পূর্ণ একটি দেশের নিজস্ব বিষয়। আমরা ভারত বা কোন দেশকে ট্রানজিট দিতে বাধ্য নই। কাজেই ব্যাপারটা একটির বিনিময়ে আরেকটিÑ এভাবে দেখার সুযোগ নেই। তবে বর্তমান সময়টিকে বলা হয় কানেকটিভিটির যুগ। পারস্পরিক যোগাযোগ তথা সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নয়নের ধারণা এখন বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিচ্ছিন্ন থাকা মানেই পিছিয়ে পড়া। বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে আমরা যদি লাভবান হই, তাহলে কেন আমরা সে পথে অগ্রসর হব না? ট্রানজিটের বিষয়টিকে সেভাবেই দেখা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আমরা কী দিচ্ছি আর এর বিনিময়ে কী পাচ্ছি, তার হিসাব-নিকাশ হওয়া উচিত অনুপুঙ্খভাবে। বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে সব দিক খতিয়ে দেখেই নেয়া উচিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। মনে রাখা জরুরি, এক্ষেত্রে হিসাবে একবার ভুল হয়ে গেলে পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই। আর সে ভুলের মাশুল দিতে হবে চুক্তি সম্পাদনকারী সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলটিকেই। সেটা দীর্ঘকালীন সমালোচনারও কারণ হতে পারে। কেননা জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসের কোন ক্ষমা নেই।
ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাকি ভূখণ্ডের পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যোগাযোগের সুযোগ পাওয়াটা ভারতের জন্য প্রায় অপরিহার্যÑ সেটা ট্রানজিট, ট্রানশিপমেন্ট, করিডোর যে আকারেই হোক না কেন। সীমিত আকারে অনানুষ্ঠানিকভাবে এ যোগাযোগ ইতিমধ্যেই চালু আছে। এটা পুরোদমে চালু করতে যে অবকাঠামো দরকার তা এ মুহূর্তে বাংলাদেশের নেই। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী নিজেই এ কথা বলেছেন। বিষয়টি ভারতও অনুধাবন করে নিশ্চয়ই। ভারত যে বাংলাদেশকে একশ’ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা দিতে চেয়েছে, সেটা মূলত বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য এবং এক্ষেত্রে ভারতের কারিগরি সহায়তা ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের শর্ত রয়েছে। অর্থাৎ ট্রানজিট সুবিধার বিষয়টি মাথায় রেখেই এ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলা যায়। লক্ষ্য করার বিষয়, এ টাকাটা অনুদান নয়Ñ ঋণ, যা বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হবে। অবশ্য এর ফলে বাংলাদেশের অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে আমাদের জনগণও এ থেকে উপকৃত হব, যদিও ভারত কবে নাগাদ এ ঋণ দেবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। এটা সবাই স্বীকার করেন, ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার পর আমাদের মহাসড়কের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে, বাড়বে যানজট। নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টিও পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়ার নয়। মনমোহন সিংয়ের সফর উপলক্ষে আসা কয়েকজন ভারতীয় সাংবাদিকও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এ আশংকার কথা বলেছেন। প্রশ্ন হল, ভারতের সুবিধার্থে আমরা এত ছাড় দেব, বিনিময়ে আমরা কতটা কী পাব? আমরা যে ছাড় দেব, তার সমতুল্য ছাড় ভারতও আমাদের দেবে, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। ভারত সেটা এমনি এমনি দিয়ে দেবে, এমনটি মনে করার কারণ নেই। সব দেশই তার জাতীয় স্বার্থকে বড় করে দেখে। এক্ষেত্রে ন্যায্য বিনিময় পেতে দরকষাকষির বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু ট্রানজিটের মতো একটি বড় সুবিধা আমরা ভারতকে দিচ্ছি, সেহেতু দরকষাকষির কলকাঠিটা এখন আমাদের কূটনীতিকদের হাতে। তাদের দক্ষতা ও বিচক্ষণতার ওপর নির্ভর করছে কতটা কী পাব আমরা। তিস্তার পানির ন্যায়সঙ্গত ভাগ পাওয়াটা এক্ষেত্রে দরকষাকষির একটি দাবি হতে পারেÑ সবটা নয়। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ভারতের একটি বড় মাথাব্যথার কারণ দূর করেছে। দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিল, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বাংলাদেশে আশ্রয় পায়। তাদের প্রতি পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের ইন্ধন থাকার অভিযোগও ছিল। তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার ভারতের এসব অভিযোগ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। একটি প্রতিবেশী দেশে কোন দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আশ্রয়-প্রশ্রয় পেলে সে দেশটি তা ভালোভাবে নেবে না, এটাই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে তার নিরাপত্তা তথা জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন জড়িত। বাংলাদেশে মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন সময় এদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী উলফা নেতাদের দিল্লির হাতে তুলে দিয়েছে সরকার, দু’দেশের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকা সত্ত্বেও। এমনকি বাংলাদেশের কারাগারে বন্দি উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকেও দিল্লির হাতে তুলে দেয়া হবে বলে খবর বেরিয়েছে। এটা ভারতের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও এ ধরনের পদক্ষেপে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকি রয়েছে।এত ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ভারতের কাছ থেকে আমাদের দাবি কেবল তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা হতে পারে না। তিস্তার ন্যায়সঙ্গত ভাগ পাওয়া তো অবশ্যই জর“রি, সেই সঙ্গে অন্য সমস্যাগুলোরও ন্যায়সঙ্গত সমাধান হতে হবে। অভিন্ন নদীগুলোর উজানে ব্যারেজ ও বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় উজানে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের অনেক নদ-নদী মরে যাচ্ছে। বর্ষায় নদীগুলোয় পলি পড়ে ভরাট হচ্ছে। নাব্যতা হারানোর ফলে দেখা দিচ্ছে বন্যা। নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ার মারাত্মক প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন ও পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর। এক্ষেত্রে ভারত ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবে, এ নিশ্চয়তা আমরা পেতে চাই। শোনা যাচ্ছে, তিস্তা চুক্তি না হওয়ায় নাকি মমতা ব্যানার্জির মান ভাঙানোর চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজনের কথাও ভাবা হচ্ছে। সে খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বী দল দুটির নামকরণ শেখ হাসিনা ও মমতা ব্যানার্জির নামেও নাকি হতে পারে। এটা যথার্থ কূটনীতি নয়। শেখ হাসিনা একটি স্বাধীন দেশের (বাংলাদেশ) প্রধানমন্ত্রী আর মমতা ব্যানার্জি ভারতের একটি রাজ্যের (পশ্চিমবঙ্গ) মুখ্যমন্ত্রী। পদ দুটি সমপর্যায়ের নয়। হতে পারে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়ার জন্য মমতা ব্যানার্জি দায়ী। তবে সেটা দেখার বিষয় আমাদের নয়। এটা ভারতের কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিজস্ব বিষয়। বাংলাদেশের লেনদেন বা চুক্তি যা হওয়ার হবে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে, কোন রাজ্য সরকারের সঙ্গে নয়। মমতার মান ভাঙানোর দায় সেদেশের কেন্দ্রীয় সরকারের, আমাদের নয়। কূটনীতিটা হওয়া উচিত সমপর্যায়ে। ট্রানজিটে আমাদের লাভের হিসাব-নিকাশও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। ভারত আমাদের যেসব পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে, তা প্রবেশে অশুল্ক বাধা দূর করার নিশ্চয়তা দিতে হবে দিল্লিকেই। নিষ্পত্তি করতে হবে ছিটমহল বিনিময়সহ সীমান্ত নিয়ে যাবতীয় সমস্যার। ভারত আমাদের বৃহত্তম প্রতিবেশীই শুধু নয়, বাংলাদেশের তিন দিক ঘিরে দেশটির অবস্থান। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কোন বিকল্প আমাদের নেই। দুর্ভাগ্যজনক যে, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও নানা কারণে দু’দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে অবিশ্বাস ও সন্দেহÑ যা সম্পর্কোন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত। বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর নিষ্পত্তির মাধ্যমে এ সন্দেহ-অবিশ্বাস দূর হয়ে পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠলে দু’দেশই লাভবান হবে। দেয়া-নেয়ার পরিমাণ সমান হলেই সেটা সম্ভব। লেখক: সাংবাদিক

0 comments:

Post a Comment