Saturday, May 9, 2015

কবি নজরুলকে দলীয়করণের চেষ্টা করবেন না


কবি নজরুলকে দলীয়করণের চেষ্টা করবেন না
ড.ফোরকান আলী
এবারে নববর্ষ পালিত হয়েছে উৎসাহ আর আনন্দের সঙ্গে। রবীন্দ্র সার্ধশতবর্ষ পালিত হয়েছে সাড়ম্বরে। আর নজরুল জয়ন্তী পালিত হয়েছে উদ্দীপনার সঙ্গে। টেলিভিশনে এসব অনুষ্ঠান দেখে শুধু উপভোগই করিনি, গর্ববোধ করেছি। শুধু ছন্দপতনের মতো মনে হয়েছে প্রাক্তন মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ সাহেবের বক্তব্য। উনি প্রধান বিরোধী দলের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন শিক্ষক। সত্যি বলতে তার কাছ থেকে এরকম কথা আমি আশা করিনি। তিনি বলেছেন যে, তিনি নজরুল জয়ন্তী উদযাপনের কোনো উদ্যোগ দেখছেন না। উদ্যোগ না দেখলে তা তিনি বলবেন এবং সেটা বলবার অধিকার তাঁর রয়েছে। কিন্তু তার পর তিনি সরকারকে এ জন্য দোষারূপ করেছেন। এইসব অনুষ্ঠান বিভিন্ন সংগঠন করে থাকে। সরকার মুখ্য ভূমিকা পালন করে না। ঠিক আছে, বিরোধী দলের একজন নেতা হিসেবে সুযোগ পেয়ে তিনি সরকারের একটু সমালোচনা করেছেন। এ জন্য মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। এরপর তিনি বলেছেন যে রবীন্দ্রজয়ন্তী মহাসমারোহে পালন করা হয়েছে। এখানেই তিনি থামেননি। এরপর তিনি বলেছেন যে সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ করা হয়েছে। তাঁর সম্পূর্ণ বক্তব্যটি টিভিতে দেখায়নি। কাজেই কাকে তিনি এই মহাঅপরাধের জন্য দায়ী করেছেন তা শুনিনি। তবে বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আমাদের আপত্তি এইখানে যে, কেউ কেউ নজরুলকে রবীন্দ্রনাথের সমান বলে প্রমাণ করতে চান। এঁরা দুজনেই বিশাল। দুজনেই মহান। দুজনকে নিয়েই আমাদের অহঙ্কার। দুজনেই আমাদের আলোকবর্তিকা। এঁদের দুজনের মধ্যে তুলনা করার কোনো প্রয়োজন নেই যদি না আপনার কোনো উদ্দেশ্য না থাকে। সবচেয়ে আপত্তির বিষয় এই যে, এই তুলনার আড়ালে একটা সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য থাকে। গ্রিক দার্র্শনিক প্রোটাগোরাস বলেছেন, ‘ম্যান ইজ দ্য মেজার অফ এভরিথিং’। তাঁর এই কথা প্রতিধ্বনিত হয়েছিল চ-িদাসের কণ্ঠে, ‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। নজরুল তাঁর সারা জীবনের সাহিত্যকর্মে এই মনুষ্যত্বেরই জয়গান গেয়ে গেছেন, “গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নাহি কিছু মহীয়ান’’।
আসুন আমরা নজরুলকে একজন মহান মানুষ হিসেবে দেখি। তাঁর সাহিত্যকর্মের সামগ্রিক গুণকে প্রশংসা করি। এই বিশাল মানুষটির বিশাল হৃদয় আমাদের হৃদয়কে প্রসারিত করুক। সুবিধামতো নজরুলের সৃষ্টির অংশবিশেষ ব্যবহার করে আমরা যেন নিকটতম সুবিধাবাদের পরিচয় না দেই। এই বিশাল মানুষটির কোনো একটি দিক সুবিধামতো বেছে নিয়ে তার অসৎব্যবহার করে সুযোগসন্ধানী বলে নিজেদের অপমানীত না করি।
নজরুল অবশ্যই নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। কাজী আবদুল ওদুদ সাহেবের ভাষায় তিনি ছিলেন ‘প্যান্থিয়াজমের’’ অনুসারী।প্যানথিয়াজমের মর্মকথা হচ্ছে এই যে, সৃষ্টিকর্তার প্রকাশ তাঁর স্মৃতির মধ্যে। ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সাহেব বলেছিলেন যে, একদল বিকৃত মস্তিষ্ক মানুষ নজরুলকে নাস্তিক বলে অভিহিত করেছিল। এইসব ব্যক্তিরা নানাভাবে নজরুলের জীবনকে বিষায়িত করেছিল। কবি জসীমউদ্দীন সাহেব তাঁর ‘যাঁদের দেখেছে’ বইটিতে লিখেছেন যে ফরিদপুর তাঁর নিজের দেশ। তাই ফরিদপুর সম্বন্ধে খারাপ কিছু লিখতে তাঁর বুক ফেটে যায়। তারপর তিনি লিখেছেন যে, একবার নজরুল ফরিদপুর থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সারাদিন তাঁরা নির্বাচনের প্রচারে ব্যস্ত থাকতেন। তখনকার দিনে ফরিদপুরে ভালো কোনো হোটেল ছিল না। যেখানে কবি নজরুলকে খাওয়ানো যেতো। জসীমউদ্দীন সাহেব লিখেছেন, যে ফরিদপুরের মানুষ কবিকে সারাদিন এক গ্লাস পানি পর্যন্ত খেতে দেয়নি। নজরুলের অপরাধ, তিনি শ্যামা সঙ্গীত লিখেছেন। তিনি তো কাফের। এমন উদাহরণ আরো আছে। কবির ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতাটি পড়লে পরিষ্কার ধারণা করা যায়। বন্ধু আনোয়ার হোসেন সাহেবকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘মুসলমান সমাজ আমাকে আঘাতের পর আঘাত দিয়েছে নির্মমভাবে। তবু আমি দুঃখ করিনি। তার কারণ বাংলার অশিক্ষিত মানুষরা গোঁড়া এবং শিক্ষিত মুসলমানেরা ঈর্ষাপরায়ণ।’ তারপর নিজেকে এবং কবিতাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন, ‘আমি শরিয়তের বাণী বলিনিÑ আমি কবিতা লিখেছি। ধর্মের বা শাস্ত্রের মাপকাঠি দিয়ে কবিতাকে মাপতে গেলে ভীষণ হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। ধর্মের কড়াকড়ির মধ্যে কবি বা কবিতা বাঁচেও না, জন্মও লাভ করতে পারে না। তার প্রমাণÑ আরব দেশ। ইসলাম ধর্মের কড়াকড়ির পর থেকে আর সে থেকে কবি জন্মাল না।’আচার-অনুষ্ঠানই শুধু ধর্ম নয়। ধর্ম মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে এটাই তিনি আশা করেছিলেন এবং নিরাশ হয়েছিলেন। আনোয়ার সাহেবকে আর একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাদের বাঙালি মুসলমানের সমাজ, নামাজ পড়ার সমাজ। যতো রকম পাপ আছে করে যাও তার জবাবদিহি করতে হয় না এ সমাজে। কিন্তু নামাজ না পড়লে তার কৈফিয়ত তলব হয়। আসলে এমন কোনো জাতি, এমন কোনো ধর্ম, এমন কোনো দল আছে কি যেখানে সবাই ভালো বা সবাই মন্দ। নজরুলকে যদি আমরা সত্যই ভালোবেসে থাকি বা শ্রদ্ধা করে থাকি তবে তিনি যাঁদের শ্রদ্ধা করতেন বা ভালোবাসতেন তাঁদের আমরা ভালোবাসবো। করাচি থেকে তাঁর প্রথম লেখাটি নজরুল পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে পাটিয়ে দেন ‘সবুজপত্র’ পত্রিকায় পৌঁছে দেয়ার জন্য। সেই পত্রিকায় অমনোনীত হলে পবিত্র বাবু কবিতাটি ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় দেন এবং সেটি প্রকাশিত হয়। এই সময়ে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় নজরুলের কাছে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত ছিলেন না। নজরুল নিশ্চয়ই পবিত্র বাবুর সহৃদয়তার কথা জানতেন। নইলে একজন অপরিচিত ব্যক্তির কাছে কেন তিনি কবিতাটি পাঠাবেন! তারা শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা যখন কোনো পত্রিকা ছাপছিল না তখন এই পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় ‘কল্লোল’ পত্রিকায় তা ছাপাবার ব্যবস্থা করেন এবং তারাশঙ্কর বাবুকে লিখেন, ‘আপনি এতোদিন চুপ করিয়া ছিলেন কেন’? কল্লোল সম্পাদক দীনেশ দাশকে নজরুল একটি বই উৎসর্গ করেন এবং উৎসর্গ পত্রে লিখেন, ‘আমার ঝড়ের রাতের বন্ধু’। কল্লোলের সহ-সম্পাদক গোকুল নাগের মৃত্যু উপলক্ষে নজরুল একটি হৃদয়গ্রাহী কবিতা লিখেন যার কয়েকটি পঙ্ক্তি হলো,“স্রষ্টা সম নীরবে যারা / সৃজন করেছে জাতি, / সৃজন করিছে মানুষ, / অচেনা রহিল তারা’’। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত ‘কল্লোল যুগ’ গ্রন্থে স্মৃতিচারণকালে বলেছেন যে, তাঁর বিবাহের সময় তিনি তাঁর ভাবি শ্বশুর মহাশয়কে লিখেছিলেন যে নজরুল বরযাত্রীদের একজন হয়ে আসবে। যদি নজরুলের সঙ্গে একসঙ্গে সবার একসঙ্গে খাবার ব্যবস্থা না হয় তবে বরযাত্রীরা সবাই নজরুলের সঙ্গে বসে খাবে। রবীন্দ্রনাথ হিন্দু সমাজের এই রক্ষণশীল আচারকে নিন্দা করেছেন। কিন্তু অচিন্ত্য সেনগুপ্তদের মতো যাঁরা সৎসাহসের পরিচয় দিয়াছিলেন সেই সব ভালো মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের কর্তব্য। কাজী আব্দুল ওদুদ, এস ওয়াজেদ আলী, সুফি মোতাহার হোসেন, কমরেড মোজাফফর আহম্মদ প্রমুখ প্রগতিশীল মুসলিমা নজরুলকে সমর্থন করেছেন। আবার সজনীকান্ত দাস, পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো রক্ষণশীল হিন্দুরা রবীন্দ্রনাথ, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ হিন্দুদের কটু ভাষায় সমালোচনা করেছেন। নজরুলের জীবনে একটা বিরাট সমর্থন এসেছিল মোজাফফর আহমদের কাছ থেকে।কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নজরুলকে। এই অপচেষ্টার সূচনা পাকিস্তান সরকারের প্ররোচণায় হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত স্নেহ করতেন নজরুলকে। এ বছর নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের ৯০তম বার্ষিকী মহাসমারোহে পালিত হবে বলে জানিয়াছেন নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলাম। বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের পর দিন নজরুল জোড়াসাঁকোতে গিয়ে কবিগুরুকে তাঁর বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন। নজরুলকে খ-িত করে যাঁরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে চায় তাদের কথায় আমরা যেন কর্ণপাত না করি। আমরা যেন মানুষ নজরুলকে শ্রদ্ধা করি। তাঁর কথা উদ্ধৃত করে আমরা আজ শেষ করি, ‘যাঁরা আমার নামে অভিযোগ করেন তাঁদের মতো হলুম না বলে তাঁদেরকে অনুরোধ, আকাশের পাখিকে, বনের ফুলকে, গানের কবিকে তাঁরা যেন সকলের করে দেখেন।’ লেথক: গবেষত

0 comments:

Post a Comment