এমন মৃত্যুÑহত্যা কি প্রতিহত করা যায় না?
অনেক মৃত্যু আছে, যা সহ্য করা যায় না কিছুতেই। মন মানে না অমন শোক। এই তো সেদিন মারা গেলেন দেশের এক প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং সৃজনশীল চলচ্চিত্র নির্মাতা মুক্তিযোদ্ধা বাদল রহমান। আমাদের প্রিয়জন এক। মাত্র ৬২ বছর বয়সে প্রচণ্ড হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন। বাদল শুনেছি বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটা দেখেই হাসপাতালে ভর্তি হবেন, ভেবেছিলেন। কিন্তু আক্রমণটা এতোই ব্যাপক ছিল যে তিনি সে সময়টাও পেলেন না। আবার কবি, ছড়াকার, গণসঙ্গীত রচয়িতা আখতার হুসেনের স্ত্রী এই তো বাদলের কদিন আগেই মারা গেলেন। এদের চেয়েও বয়সে তরুণ যুবক সোহেল, আমার আত্মীয়। সে তো বেঘোরে প্রাণ দিতে চলেছে। লাইফ সাপোর্টে স্কয়ার হাসপাতালে রয়েছে। চিকিৎসকদের রায়, চূড়ান্ত পরিণতিতে সোহেলের আর কোনো চিকিৎসা নেই কারণ ভোরবেলা এক ট্রাক বোধহয় তাকে মেরে দিয়ে চলে গিয়েছে। রাস্তায় পড়েছিল দেহখানা। চটজলদি তাকে ঢাকা এনে স্কয়ারে ভর্তি করেছিল। এখন আত্মীয়-স্বজনের মন মানতে চায় না বলে ঐ কঠিন জটিল চূড়ান্ত অবস্থায় তাকে আজো রাখা হয়েছে। আবার এক নির্মম মৃত্যুর খবর পড়তে হলো কাগজে। এক মা তার দুই সন্তানকে নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেও বোধহয় কোনো লাভ হয়নি বলে নিজে আত্মাহুতি দিয়েছেন। সঙ্গে দুই সন্তানকেও নিয়ে একেবারে চলে গেলেন। স্বামী তার পরকীয়া প্রেমে মজেছিল। তাকেই বিয়ে করেছে। আবার শ্বশুর-শাশুড়িও নাকি বাড়ি ছেড়ে দেয়ার আলটিমেটাম দিয়েছিল। তাই ােভে মনের দুঃখে বাচ্চাদের নিয়েই আলটিমেটামের আগেই ঘর নয় জগত সংসার ছেড়েই চলে গেছেন। এ কী মর্মান্তিক!
আরো মর্মান্তিক, মেয়ের মা বাদী হয়ে আটজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন কিন্তু পুলিশ আসামিদের খুঁজে পায়নি (এ লেখার সময় পর্যন্ত)।
এ লেখা শেষ করার আগেই খবর পেলাম, পড়লাম। ঘাতক বাস কেড়ে নিয়েছে দুজনকে, যারা হতেন মা-বাবা কিছুদিনের মধ্যেই। কী নৃশংসই না এ হত্যাকাণ্ড! কেন এমন হয়? এ বিরাট প্রশ্ন। এসব মৃত্যুকে তো রোধ করা যাবে না। জানি দুর্ঘটনা আচানকই ঘটে কিন্তু নিয়ন্ত্রক থাকে মানুষ। কেন সেই মানুষেরা সতর্ক হয়ে চলে না? ওরা দোঁহে মিলে প্রতিদিনই কর্মস্থলে যেতেন একত্রেই, মোটরবাইকে। কিন্তু যে দুর্ঘটনায় এরা প্রাণ বলি দিলেন, তার ‘স্রষ্টা’ কে? বেপরোয়া গাড়ি চালানো। চালায় কে? মানুষই তো। তবে মানুষ কেন সচেতন, নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না? নিশ্চয়ই অসতর্কতা, অন্যমনস্কতা কিংবা বাহনের কোনো যান্ত্রিক ত্র“টি। এগুলো তো মানুষই সমাধান করতে পারে, যারা তাদের দায়িত্ব হিসেবে গাড়ি চালান, তারাই।
কদিন আগেই তো দেখলাম নিমতলী ‘হত্যাকাণ্ড’। দায়িত্ব জ্ঞানহীনতার চরম এই দৃষ্টান্ত, যা ইতিপূর্বে ঘটেনি। এমন মর্মান্তিক নৃশংস মানুষ হত্যার পেছনে কারণ কী? বসতি এলাকায় বিস্ফোরক দ্রব্যের কারখানা প্রতিষ্ঠার কি কোনো নিয়ম আছে। কারা এই কলকারখানা স্থাপন করেছিল, কারা তাদের এই জনবসতি এলাকায় কারখানা বসাবার নির্দেশ দিয়েছিল? উভয়েই কি অভিযুক্ত নয়? বিশেষ করে যারা নির্দেশ দিয়েছে তারা? যে যাই করে থাকুক এতোগুলো প্রাণের মূল্য কে দেবে? কার শাস্তি হওয়া উচিত? হবে কি সেই শাস্তি?
অদ্ভুত ব্যাপার, বাড়ি হেলে পড়ছে। পড়েই যাচ্ছে ঐ গরিব মানুষের বস্তির ওপর আবার যারা বাস করেন ঐ বাড়িতেই তাদেরও জীবনাশঙ্কা থেকেই যায়। রাজধানী শহর ঢাকায় কেন এমন হয়? এখানে তো বাড়ি বানাতে হলে যথাযথ কর্তৃপরে অনুমতি নিতে হয়, নকশা অনুমোদনের ব্যবস্থা রয়েছে, নির্মাণ সঠিক নির্দেশনায় হচ্ছে কিনা, তাও দেখার লোকজন আছে, সংস্থা আছে। তবু কেন এমন হয়? কাদের দায়িত্ব এগুলো দেখার? নাকি সবাই চোখ বন্ধ করে থাকে উৎকোচের ভারে? ঘুষ একটা আকর্ষণীয় বিষয়, যা সকলকে না পারলেও অনেক েেত্রই প্রভাব বিস্তার করে এবং মানুষকে তার নীতিবোধ থেকে সরিয়ে নেয়। অকর্ম, কুকর্ম করার সুযোগ করে নেয়, করে দেয়ও। আর ঘুষের ঘৃণ্য প্রভাবে পড়ে মানুষের মন বিগড়ে যায়, পথভ্রষ্ট হয় এবং কর্তব্য নিষ্ঠা থেকে বিচ্যুত হয়। এতে কিছুই মনে করেন না কেউ। এ যাবৎ যে দুর্ঘটনাগুলো এই ঘুষের কারণে ঘটেছে, তার কোনো সুরাহা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এসব বেঘোরে প্রাণ হত্যার বিচারে কারো কি ফাঁসি কিংবা যাবজ্জীবন হয়েছে? না তাও শুনিনি। তবে সে জন্য দায়ী হবে কারা? সে তো সরকারই। সরকার কঠোর হাতে কেন দমন করতে পারে না এমন ভয়াবহ অপরাধ। সরকারে যারা ছিলেন অতীতে, এ কি তাদেরই দুর্বলতা? এ দুর্বলতার মূলে কি সেই ‘ঘুষ’? তাহলে তো সবখানেই দূর্যোগ, সংকট। সরষেতেই ভূত থাকে তবে ভূতকে তাড়াবেন কি দিয়ে?
একজন কেন ভালোবাসবে না, তার জন্যও মেয়েদের কেন প্রাণ দিতে হয়? সমাজে কি এই সামান্য নিরাপত্তা নেই? থাকবেও না? একতরফা প্রেমে নাকি অন্য কোনো মতলব থাকে এর পেছনে কে জানে? বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হলে বখাটে সেই ছেলেটি হন্যে হয়ে যায় পাগলা কুকুরের মতো। যা খুশি তাই করতে উদ্যত হয়। ফলে জিঘাংসা প্রচণ্ড রকমে প্রকাশ পায়। খুন, গুম, অপহরণ করা খুবই সামান্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। যাকে ভালোবাসে, রিফিউজড হলে তাকে এসিড মারে কী করে, ভাবতে অবাক লাগে। ভালোবাসার পাত্রীর এতো বড় তি করতে ঐ প্রেমিক প্রবরের কি একটুও বুকে লাগে না? তাহলে কিসের প্রেম-ভালোবাসা? এ মৃত্যু প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসা থেকে আদৌ ভালোবাসা থেকে নয়।
ইভটিজিংয়ে জর্জরিত হয়ে যে কোনো মেয়েকে ছন্নছাড়া প্রাণ দিতে হয় কেন? যারা বখাটে, তরুণ, গৃহে উপেতি, ভগ্ন পরিবারের সন্তানÑ এমন তরো ভীষণ চাপে পড়ে বিপথগামী হয় যারা, তারাই এমন করে পাড়ার মেয়েদের কিংবা স্কুল-কলেজের সামনে ঘুরে ফেরে। ওদের মধ্যে কোনো মনুষ্যত্ব থাকে না। মতলব নিয়ে পাড়া-মহল্লায়, স্কুল-কলেজের সামনে ঘুরে বেড়ায় নষ্টামি করার উদ্দেশ্যে। উদ্দেশ্য থাকে অপহরণ, ধর্ষণ এবং হত্যা। এই বিবৃত মানসিকতা যে ভগ্ন পরিবারের কারণে জন্মেছে তাকে রোধ করারও খুব একটা প্রয়াস ঘরে তো নেই, সমাজেও নেই। ফলে এরা লাগামছাড়া হয়ে যায়। বেপরোয়া হয়ে যা চায়, তাই করতে চেষ্টা করে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যদি থাকতো প্রতিরোধের, তবে তো মনে একটা সান্ত্বনা থাকতো। কচিপ্রাণ এমন করে ঝরে যেতো না।
এতোসব মৃত্যু! মৃত্যু আর হত্যার এই নিরন্তর ঘটনাকে আমরা রোধ করতে পারছি না আজো। কেন পারছি না জানি না। কিন্তু ঘরের কোণে বসে আহা, ইস করতে থাকি নিত্যদিন। নিঃশঙ্ক পথচলাকে নিশ্চিত করতে একজন খ্যাতিমান চলচ্চিত্র শিল্পী স্ত্রীকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারাবার পর থেকে ‘নিরাপদ সড়ক’Ñ এর দাবিতে মাঝেমধ্যে সোচ্চার হোন বটে, কিন্তু তার এই মহতী উদ্যোগের কি কোনো সুরাহা হয়েছে? কেউ কি এর প্রতি সহযোগিতা দিয়ে সত্যি সত্যিই পথচলাকে ভীতিমুক্ত করতে পেরেছে?
এমন মৃত্যুÑ যা কখনো কখনো হত্যা, তার প্রতি ােভ আমাদের, আমরা বিুব্ধ, অথচ কেউই তেমন উদ্যোগী নই এ মৃত্যু না হত্যাকে প্রতিহত করতে। কেউ ‘নিরাপদ সড়ক’ চাইছেন কিন্তু তার সঙ্গে আমরা কজনই বা যাচ্ছি, দাঁড়াচ্ছি রাস্তায়? অথচ মারা যাচ্ছেন নিহত হচ্ছেন আমাদের কারো না কারো আত্মীয়, পরিজন, স্বজন। কেন এমন হয়? এমন তো ছিলাম না আমরা! আমরাই তো এ দেশকে সহস্র কোটিগুণ শক্তিশালী ভয়ঙ্কর ঘাতক-অপশক্তিকে খতম করে নবজীবন প্রতিষ্ঠা করেছিলাম একাত্তরে। আমরা কেন পারবো না এমন জীবনবিধ্বংসী অপঘাতকে রোধ করতে? নিশ্চয়ই পারবো কিন্তু আমাদের সেই চৈতন্যেবোধ যেন নেই। নেই কেন? তার বুঝি একটিই কারণ মানুষের মধ্যে সেই রাজনৈতিক তৎপরতা নেই যার মাধ্যমে শক্তির অভ্যুদয় ঘটে।
এমন অপঘাতে মৃত্যু-হত্যার বিরুদ্ধে ছিলেন বাদল রহমান। তার আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে হৃদরোগের প্রচণ্ড ও আকস্মিক আক্রমণে। এমনই সাহসী মানুষ অনেকটাই বেপরোয়া লড়াকু চরিত্রের, তাকেও বেঘোরে অকালে প্রাণ দিতে হলো। এ কি সহ্য করা যায়! ৬২ বছর বয়স। হৃদ্যিক রোগ-জটিলতা ছিল। কিন্তু তবু ওর বলিষ্ঠ মানসিকতা ছিল অনুস্মরণীয়। মৃত্যুর মাত্র তিনদিন আগে বাদল তার ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটির যুগ্ম সম্পাদক মামুনকে নিয়ে এসেছিলেন আমার কাছে। দুটো বিষয় আলোচনার জন্য। অনেকদিন পর ওকে দেখে আমিও উৎফুল্ল। কুশল বিনিময়ে ওর অসুস্থতার কথা জানলাম। আমার কথাও শুনলো এবারে এলো আদত কথায়। এক. শিল্পকলা একাডেমীতে নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগ আছে কিন্তু নাট্যকলায় সক্রিয় হলেও চলচ্চিত্র অংশ নির্বাকই রয়ে গেছে। তাকে কিভাবে সরব ও সক্রিয় করা যায়। দুই. প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব বেবী ইসলাম সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন, তার একটি স্মরণসভা শিল্পকলা একাডেমী এবং ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ যৌথভাবে আয়োজন করতে পারে কি না? এ দুটো বিষয়েই আন্তরিক সম্মতি জানিয়ে আমি তাকে পরামর্শ দেয়ার জন্য একদিন বসতেও বললাম। অবকাঠামো কী হতে পারে, সে চিন্তাও ওরই মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে বললাম, খ্যাতিমান প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান, চলচ্চিত্রকার সালাউদ্দিন জাকিও আমাকে টেলিফোন করেছিলেন। ইতিপূর্বে তানভীর মোকাম্মেলের সঙ্গেও একবার কথা হয়েছিল। সে কথাও জানালাম। বাদল কথা দিয়েছিল বেবী ভাইয়ের স্মরণসভা শেষ হলে পর একদিন বসবেন এইসব খুটিনাটি নিয়ে। কিন্তু বাদল রহমান না বলেকয়েই চলে গেলেন। বয়সে আমার কতো ছোট তবুও।
শুনেছি শিশুদের জন্য একটি ছবি করবার জন্য সরকারি অনুদানও পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সে ছবি বঙ্গবন্ধুর উপর প্রযোজনার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। অসমাপ্ত থেকে গেলো।ঃ এমন মৃত্যু যে কতোটা শোকের-কষ্টের, তা কেবল পরিচিত স্বজনরাই অনুধাবন করতে পারবেন। তাই বাদলের চলে যাওয়া আমাদের কাছে খুবই যন্ত্রণার। তার পাশে ঐ দুর্ঘটনা কিংবা অপঘাতে মৃত্যু অথবা পরিকল্পিত হত্যা প্রচণ্ড বেদনাদায়ক তো বটেই। প্রচণ্ড ােভেরও। কী করে সহ্য করা যায়Ñ বলুন তো বোদ্ধা পাঠক! সব মৃত্যুই ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির বা সমাজেরও অপূরণীয় তি। কারণ সব মানুষই তো নিজ নিজ েেত্র প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয়।
এমন মৃত্যু কিংবা হত্যাকে প্রতিহত জব্দ করতে মানুষেরই আন্তরিকতার প্রয়োজন। কেবল মুখে আহা, উহু করলে কি হবে, এ জন্য প্রয়োজন সংঘবদ্ধ প্রয়াস এবং আন্তরিকতার। এ মানসিকতাকে অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে। তবে এমন মৃত্যু ও হত্যাকে প্রতিরোধ করতে পারবো।
Saturday, April 11, 2015
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
0 comments:
Post a Comment