Sunday, April 12, 2015

বৈশাখী’তে দেখি বাঙালিত্বের উদ্বোধন

বৈশাখী’তে দেখি বাঙালিত্বের উদ্বোধন
ড.ফোরকান আলী
হাজার বছর ধরে বহমান লোকায়ত গ্রামীণ বাংলার পটে সব কথা। এইখানেতে বড় হয়ে আসে ষড়ঋতুর বাংলাদেশ, নদীমাতৃক বাংলাদেশ এবং কৃষিনির্ভর বাংলাদেশ। অতএব সেই মোতাবেক অর্থাৎ কি-না অমনতর স্বতঃস্ফূর্ততার তাগিদেই তৃণমূল সর্বজন বাঙালি মানুষের বারো মাসে তেরো পার্বণ পেরিয়ে এলাম আমাদের বাংলা সন ১৪২১; গতকাল গেছে বর্ষশেষে চৈত্রসংক্রান্তির পালা। এবং প্রকৃতির নিয়মেই আজ থেকে আমাদের নতুন ১৪২২’র যাত্রা হ’ল শুরু। আজ পয়লা বৈশাখ। আর বাংলাদেশ-বাঙালি আমাদের বর্ষবরণ, বৈশাখীর আবাহনী। কথা- তাই নিয়ে। বলাই তো গেল, এবং মনে করি যে, সচেতন সবারই অবশ্য জানা ওই অনিবার্য সত্যটা- ‘প্রকৃতির নিয়ম’। তাই যখন স্বভাবতই জিজ্ঞাসা তবে-কেন এমন উদ্যোগ, আয়োজনে বৈশাখীর উদযাপন; আর আমাদের আপন বাংলা সন নিয়ে ‘কথা’, জবাবের খোঁজ পেতে চাইছি।
প্রস্তাব যে, আগেই বরং জানান দিয়ে রাখা যাক; গোড়ার আর শেষের জবাবটি:- আমাদের হাজার বছরের বাঙালিত্বে, তৃণমূল উৎসব বাঙালিত্বে; আর সবটা মিলিয়ে আপন আইডেনটিটির বাঙালিত্বে, এবং আপন বাংলা সনে একান্ত করেই মেশামেশি। আদপে বলতে চাই যে, আমাদের সন নিয়ে কথা, আর তাই থেকে দেশ বাংলার, নেশন স্টেট বাংলার জনমানুষের আÍপরিচিতি যতটা জানা, দুনিয়ার ইতিহাসে এমনতর দ্বিতীয় নজির আর নেই। কালে-কালান্তরে, দেশে-দেশান্তরে অবশ্যই সন-সাল-অব্দ-বছরের হিসাব নাম পরিচিতি রয়েছে। এবং প্রধানতই সেই সব হয় রাজ-রাজড়ার সিংহাসন আরোহণ, যুদ্ধজয় অভিযানের সাথে সম্পর্কিত; কিংবা অপরপে ধর্মপ্রচারকের, তাদের কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পর্কিত। প্রসঙ্গের জের টেনে দুটো তাৎপর্যের ওপরে গুরুত্ব আরোপ করতে চাইছি।
এক. হাজার বছর ধরে বহমান লোকায়ত গ্রামীণ বাংলার পটে সব কথা। এইখানেতে বড় হয়ে আসে ষড়ঋতুর বাংলাদেশ, নদীমাতৃক বাংলাদেশ এবং কৃষিনির্ভর বাংলাদেশ। অতএব সেই মোতাবেক অর্থাৎ কি-না অমনতর স্বতঃস্ফূর্ততার তাগিদেই তৃণমূল সর্বজন বাঙালি মানুষের বারো মাসে তেরো পার্বণ। মানুষে মানুষে মিলনের মেলা যেমন কি-না পৌষমেলা, বর্ষশেষে চৈত্রসংক্রান্তির চৈতিমেলা। আর অবশ্য ফিরে ফিরেই বৈশাখী, পয়লা বৈশাখের মেলা। ল্য করব সেই দিনে হালখাতাও বটে। কৃষি সংস্কৃতির।
আরেক পিঠে বছরকার বেনেতি হিসাব মিলিয়ে নেয়নি এবং আরেক নতুনের শুরু। অতঃপর মুখ্য অপরটি। আমাদের অমনতর ধারণাতে-ভাবনাতে কি সচেতন কনভিকশন-এ দীা দিল এই যে, বছরজুড়ে বাংলা সন; আর প্রতীকী সনের শুরুর পালাতে এই যে পয়লা বৈশাখ- এ দুয়ে মিলিয়ে তবে আমাদের বাঙালিত্বের এক ‘বিশেষ ঠিকানা’?
প্রাসঙ্গিক এমনতর একটা তথ্য পাওয়া যায়।- উনিশ-বিশ শতকের ক্রান্তিকালে তখন অন্তত নগরকেন্দ্রিক ‘নবজাগরণ’ দানা বাঁধছে। সবটা গ্রাস করে নেয়নি। ইংরেজিয়ানার মোকাবেলায় আপন বাঙালিত্বের সন্ধান। রাজনারায়ণ বসু তার ‘আÍচরিত’ গ্রন্থের মারফত জানাচ্ছেন : ‘‘জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভার সভ্যেরা গুড নাইট না বলিয়া ‘সুরজনী’ বলিতেন। ১লা জানুয়ারি দিবসে পরস্পর অভিনন্দন না করিয়া ১লা বৈশাখ করিতেন।” এদিকে ইংরাজ রাজত্বে স্কুলে-কলেজে অবশ্য দীর্ঘকাল ধরেই ১লা জানুয়ারিতে ছুটি; কেননা ওইদিন ইংরেজি ক্যালেন্ডার মোতাবেক ‘নিউ ইয়ারস ডে’। আর এই আমাদের বেলাতে? কালের পালাবদলে ইতিমধ্যে এসে গেছে কেমন উদ্ভট সেই পাকিস্তানিত্বের আছর।
যেসব খারাপ দিন গেছে সেই কালে বাংলা নববর্ষ উদযাপন? পয়লা বৈশাখ? তথাকথিত শিশুরাষ্ট্র পাকিস্তানের আপন-সাজা মুরব্বিরা বলতেন, ‘নাজায়েজ’। ওই সমুদয় মাতব্বর, সরকারি লিগি স্টাবলিশমেন্টের সাথে জোট বেঁধেছিলেন ইসলামের নামে, পাকিস্তান মার্কা তাহজীব তমদ্দুনের হেফাজতির নামে, হাজার-দেড় হাজার মাইলের ফারাকে মুসলিম উম্মাহকে জোরদার করার নামে। মতার সিংহাসনে দখলদার ওরা, আর ওদের লেজুরধারী দালালগোষ্ঠী ফতোয়ামতো জারি করতেন, আপন অভিজ্ঞতা থেকেই জানাচ্ছি, আমাদের ’বৈশাখী’র পয়লা বৈশাখের আয়োজন অনুষ্ঠান এসবই নাকি কুফরি কারবার গুনাহর শামিল। তারপরও এখন তবে আÍশ্লাঘার বিষয়টি বলি, সেকালে আমরা যারা তরুণ কিশোর, প্রধানতই ছাত্র, সুস্থ চেতনার প,ে বৈশাখী প্রতীকীতে বাঙালিত্বের নিশান উড়িয়ে আমরা প্রতিরোধের লড়াইতে শামিল হয়েছিলাম।
অবকাশ পাওয়া গেছে, খানিকটা স্মৃতিচারণ/নস্টালজিয়া’র বাসনাতে পেয়ে বসেছে। সেই শুরুর শুরুতে ছাত্র বয়সে কতজনা ছিলাম আমরা? আঙুলে গোনা বড়জোর জনাকতক। তারপর দিনবদলের পালায় সংখ্যা ক্রমে কেমন বেড়েই গেছে শতের ঘরে, হাজারে; এবং ষাটের দশকের প্রারম্ভ থেকে তখন দুরন্ত ধাবমান ইতিহাস ঊনসত্তরে গণঅভ্যুত্থানের নিশানায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সীমান্তে।
বিবেচনাতে আনব পটভূমিতে সেই পঞ্চাশের দশক থেকেই তো সমান্তরালে ভাষা আন্দোলন, প্রগতি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্মেলন, রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তকে নিয়ে অনুষ্ঠান এবং অবশ্যই কেমন দ্রুত সর্বাÍক জোরালো হয়ে উঠছিল প্রতিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন। ১৯৫৪তে সর্বদলীয় প্রাদেশিক নির্বাচনে যার অমন দেশব্যাপী প্রথম বিস্ফোরণ। অতঃপর ফিরে আসি মূলের কথাটায়। তাৎপর্যটি এইখানে যে আবারও বলে নিতে চাইছি সেই শুরুতে পয়লা বৈশাখ/বৈশাখী নিয়ে চেতনার উদ্বোধন আমাদেরকে চিনিয়ে দিয়েছিল স্বদেশ মাতৃভূমির ঠিকানা। আমাদের প্রজন্মের আমরাই তো স্যা সবে তখন পাকিস্তান, আর সেই পাকিস্তানিত্বের জজবায়, জিগিরে কেমন মোহাচ্ছন্ন চারপাশ! তাই থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে, যখন অবধি (নতুন শহরে) আমরা নতুন করে পয়লা বৈশাখের সাথে একাÍ হচ্ছি।
এখন প্রস্তাব যে, আমরা ইতিহাসে পাঠ নেব, বাংলা কবিতা-গান পাঠ করব। তবে জেনে যাব, দ্বিধা তো ছিল না আমাদের পূর্বপুরুষের; অস্বচ্ছতা ছিল না তাদের মানস ভাবনায়। উদার, লোকায়ত পরিবেশে তাঁদের লালন শত শত বর্ষব্যাপী ধর্মবিশ্বাসে-সংস্কারে, ধর্মাচরণে ভিন্নতা ছিল বটে, তবে কদাপি রুদ্ধ হয়নি তাদের চিত্ত। এবং সমস্ত কিছুর ওপরে প্রবলতর ছিল উদার মানবধর্ম। সেই সাথে আপনা থেকেই সম্পর্কিত ছিল মাতৃভাষা নিয়ে আপন গর্ব-অহঙ্কার, আর জননী মাতৃভূমি চেতনা। উদাহরণত সেই কবে সপ্তদশ শতাব্দীতে কবি আবদুল হাকিম এমত স্পষ্ট নির্দেশ করে জানাচ্ছেন, এ দেশ তো মাতৃভূমি, কেননা ‘মাতা-পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি’।
অতঃপর জেনে রাখতে চাইব যে, হাজার বছর ধরে এই স্বদেশ মাতৃভূমির সাথে একাÍ হয়েই আমাদের ষড়ঋতুর আবর্তন; আর শুরুতে তাই অমনতর আবাহনী ’এসো এসো এসো হে বৈশাখ। সাথে অতঃপর এই মতো যোগ করে নেব যে, কখনও কখনও বা কোনো কোনো দিন, ইতিহাসেরই অমোঘতায় বিশেষ করেই একেক ‘দিবস’ হয়ে আসে। যেমন কি-না দিবস আমাদের কাছে- ‘একুশে ফেব্র“য়ারি’, ‘সাতই মার্চ’, ‘ছাব্বিশে মার্চ’, ‘ষোলই ডিসেম্বর’; এবং এদিকে বছর গড়িয়ে আজ বাঙালি জনমানুষ আমাদের কাছে ওই মতোই আরেক ’ পয়লা বৈশাখ’। নতুন বাংলা সনের শুরু।
প্রসঙ্গত এখন এই দুটো বৈশিষ্ট্যের ওপরে বারংবার করেই গুরুত্ব আরোপ করবার বাসনা। এক. আমাদের বৈশাখের অনন্যতা। আবারও বলে নিই, এর সাথে শেকড়-সম্পর্ক আমাদের তৃণমূল প্রাকৃত সাধারণের। এবং আরেক আপন অভিজ্ঞতাতেই তো বলে, বাঙালিত্বের দুশমন শক্তিকে কেমন লড়ে লড়ে তবে আমাদেরকে অর্জন করে নিতে হয়েছে এই ‘আপন পয়লা বৈশাখ’ উদযাপনের অধিকার। আবার এদিকে সাম্প্রতিককালে ল্য করছি : সারাটা দেশজুড়ে বৈশাখী উদযাপনে ক্রমে ছাপিয়ে আসছে কেমন বানডাকা জোয়ার!
এখন তাহলে স্বভাবতই জিজ্ঞাসা সে বছর রমনা বটমূলে ’বৈশাখী’ অনুষ্ঠানে অমনতর বোমা হামলার হত্যাযজ্ঞ কেন? আবার এই বছর বেশ কয়েক হাজার পুলিশ-র‌্যাব-গোয়েন্দা, শান্তি-শৃ´খলা বাহিনীর কেমন প্রখর সর্বাÍক প্রহরা! বিস্মিত হয়ে যেতে হয় এইভাবেই কি তবে মানুষের মিলনমেলার উৎসব অনুষ্ঠান?
প্রশ্ন জাগে দুশমন শক্তির কারা ওরা? যেন জেনে রাখি অন্তরালে জোট বেঁধেছে- বেঁধেছে পিছুটান পাপশক্তি মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ, আর মদদ জুগিয়ে যাচ্ছে সুবিধা-তালাশি প্রতিক্রিয়াশীলতার রাজনীতি।
পুনরায় আপন ইতিহাসই তো জানান দেয় সব ছাপিয়ে বড় হয়ে আসে ‘শাশ্বত আমার বাংলা’র শেকড়-মূলের বাঙালিত্ব। আর সেইখানেতে কোটি কণ্ঠে শুনি উদাত্ত জয়ধ্বনি- ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’। এবং শুনি- প্রতীকী সত্যে ‘বৈশাখী’তে নতুন দিনের ডাক-
‘পুরাতন বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক’।
‘এখন বাতাস ছুটুক,
তুফান উঠুক
ফিরব না গো আর।’
কথা কয় পয়লা বৈশাখ।
ইতিতে অতঃপর প্রাসঙ্গিক পুনরায় জেনে রাখব- আলোর শিখার দিশা পেলাম, যখন থেকে আমাদের ভাষা আন্দোলন, আর একই সাথে পয়লা বৈশাখকে চিনে নিয়ে আমাদের বাঙালিত্বের উদ্বোধন। বুঝে নেব সেই তো ঋতুবন্দনা, ঋতুবন্দনার সাথে অন্তরঙ্গ সমার্থক দেশচেতনা, আর তাই থেকে আমার বাংলার জনমানুষের আÍপরিচিতি, আপন আইডেনটিটির উজ্জ্বল স্বার।
যখন বলি ‘বাঙালির বৈশাখ’, মর্ম সত্যটির সন্ধান পাই- এইখানে।  লেখক: গবেষক (০১৮১৭০০৯৩৪৩)

0 comments:

Post a Comment