বাংলাদেশে বর্ষবরণ
ড.ফোরকান আলী
ক’দিন ধরে আমার কিশোরবেলার কথা মনে পড়ছে। আকাশে ঘুড়ি উড়ছে- লাল, নীল নানা রঙের ঘুড়ি। সাধারণ ঘুড়ির মতো নয় একটু বড় সাইজের। দেখতেও একটু অন্যরকমের। কোনোটি দেখতে চিলের মতো, কোনোটি দেখতে ফানুসের মতো। লাটাই এবং সুতোও দেখতে একটু অন্যরকম। একটু ঝড়ো বাতাসে চিলে ঘুড়ি, ফানুস ঘুড়ি উড়ছে নীল আকাশে অনেক ওপরে। দু’জন কিশোর শক্ত হাতে লাটাই ধরে রেখেছে। চৈত্রের শেষ সপ্তাহে কোনো কোনো এলাকার বিকেলের দৃশ্যাবলি। অন্য দৃশ্য। কামারের দোকান থেকে ছুরি মতো ‘কাডাইল’ বানিয়ে কাঁচা আমের সন্ধানে আমের বাগানে ঘুরছে কিশোররা। সন্ধ্যা নামলে হাট শেষে বাড়ি ফিরছে অন্য কিশোর দল। তাদের হাতে বাঁশি, মুখে বাঁশি। কেউ বাঁশি বাজাতে জানে না। তবু নতুন কেনা বাঁশি ফ্যাঁ-ফোঁ বাজিয়ে চলেছে সুর-তাল ছাড়া।
আমরা বুঝতে পারতাম ‘ঢাক’ নামবে দু’একদিনের মধ্যে। ঢাকির দল চৈত্রসংক্রান্তিতে সং সেজে হিন্দু বাড়িতে গিয়ে অভিনয় দেখাবে। পাড়ার হরকান্ত হনুমান সেজে খুব লেজ নাচাতে পারত। আমরা হনুমানের মুখোশ পরা লেজ নাচানোর দৃশ্য দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপো করতাম। ক’দিন আগেই সওদাগর হাটের মেলায় ধুপের খালের পাড়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে বারুণীর মেলা। মায়ের কাছ থেকে দু’আনা সংগ্রহ করে একআনা দিয়ে একটা রসগোল্লা এবং এক আনা দিয়ে একটা মাটির ঘোড়া কিনে ফিরতাম। বইয়ের পৃষ্ঠায় আঁকা মহেঞ্জোদারোর ঘোড়ার সঙ্গে আমার মাটির ঘোড়ার মিল দেখে কিছুটা ‘অবাক’ হতাম। কীভাবে ‘মিল’ হলো, সেসব বোঝার বয়স অথবা জ্ঞান তখনও হয়নি। চৈত্র মাসের শেষ দিনে বসত শিবের হাটে ‘পরব’।
‘পরবে’ বড় বড় মিষ্টি, বড় বড় জিলাপি পাওয়া যেত। মায়ের কাছ থেকে পয়সা সংগ্রহ করতে পারলে অথবা দু’একজন হিন্দু বন্ধুর কল্যাণে রসগোল্লা, জিলাপির অংশবিশেষ পেটে যেতে পারব। ক’দিন থেকেই দেখতাম শিবের হাটের বিভিন্ন দোকান সেজে উঠছে নতুন সাজে। দোকানের সামনে ২টি কলা গাছ। বাঁশের কঞ্চি বাঁকিয়ে ধনুকের মতো দুই কলা গাছের মাথায় বাঁধা হতো। কলা গাছ থেকে দোকান পর্যন্ত আরও কঞ্চি লাগানো হতো। কঞ্চির গায়ে আঠা দিয়ে লাগানো হতো লাল-নীল সরু কাগজের টুকরো। ওপরে লেখা হতো ‘শুভ হালখাতা’। হালখাতার অর্থ প্রতীকী অর্থ না বুঝলেও শুনতে পেতাম হালখাতার সময় দোকানের বাকি শোধ করে দিতে হয়। বছরজুড়ে যারা দোকান থেকে বাকিতে তেল, নুন, সাবান ও অন্যান্য তৈজসপত্র কিনেছেন, দোকানদারের পাওনা শোধ করে দিতে হতো চৈত্রের মধ্যেই। বৈশাখ থেকে নতুন বছর নতুন বছরে নতুন খাতা হালখাতা (অর্থাৎ বর্তমান সনের হিসাবের খাতা) খোলা হবে। হালখাতায় দোকানির পাশে লালসালুতে ঢেকে বড় বড় বারকোশে রসগোল্লা রাখা হতো। যারা বাকি টাকা শোধ করতেন, তাদের দেওয়া হতো বড় বড় রসগোল্লা। আমার মতো কিশোরদের মিষ্টি খাওয়ার সুযোগ কম থাকত। বাকি লেনদেনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকত না বলে।
পরবের দু’একদিন আগে থেকে শোনা যেত, ভবরঞ্জন ওরফে ভবদের বাড়িতে গইড্ডা বা গড়িয়া হবে। মুসলমানের ছেলেদের গড়িয়া বা গইড্ডা দেখার সুযোগ ছিল না। পরের দিন মিন্টু সাহা গল্প করত গইড্ডায় বিষ্ণু সাহা ভুইল্লার গান পরিবেশন করেছিল। ‘ভুইল্লার কর্ম বুঝা দায়।/গাছের আগা বসত করে গাছের গোড়ায় খায়।/সেই ভুইল্লার তিনটি মেয়ে, একটি মেয়ে বড়/আকবর হাটে জিলাপি বেচে মিডা দিছে খড় (টক)’।
‘পরবে’ মুসলমানদের অংশগ্রহণ কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু ‘পরবে’র দু’একদিন আগেই মুসলমানরা ঘর লেপা-মোছায় ব্যস্ত হয়ে পড়ত এবং সে সঙ্গে চলত সবজি সংগ্রহ। কাঁচা কাঁঠাল, কাঁচা কলা, মেটে আলু, গাছ আলু, মিষ্টি আলু, কুমড়া, ঢেঁকিশাক, পুুঁইশাক- এ রকম আঠারো রকমের সবজি সংগ্রহ করে নিরামিষ তরকারি রান্নার কাজ শুরু হতো বৈশাখী সকাল থেকে। মুসলমানরা সাধারণত পাঁচফোড়ন ব্যবহার করে না। আঠারো রকম সবজি দিয়ে রান্না তরকারিতে অবশ্যই পাঁচফোড়ন ব্যবহার করা হতো। সন্দ¡ীপের লোকেরা এই মিক্সড ভেজিটেবলকে বলে ’আঁডোরা’। অধিক ফসল ফলাও, বিভিন্ন রকমের পুষ্টি সংগ্রহ কর অথবা কমপে একদিন আমিষ বর্জনের শিা দেওয়ার জন্য হয়তো আঁডোরার প্রচলন হয়েছিল। বিভিন্ন এলাকায় ৯ রকম অথবা এগারো রকমের সবজি দিয়ে তরকারি রান্নার কথা শুনেছি, কিন্তু ‘পান্তা-ইলিশে’র কথা কোথাও শুনিনি। দুপুরে অতিথি আসত বাড়িতে। নিয়মিত খাওয়া-দাওয়ার পর ‘আঁডোরা’ পরিবেশিত হতো। অতিথির ঝোঁক থাকত আঁডোরার দিকে। কোনো কোনো ধর্মপ্রাণ হিন্দুর বাড়িতে গাজীর গান, কৃষ্ণলীলা, রামলীলার আসর বসত রাতে। রসিক কবিয়াল এসব গানের ফাঁকে ফাঁকে নারীর বিরহকেন্দ্রিক ‘বারমাস্যা’ শোনাতেন। ’চৈত্র গেল, বৈশাখ গেল গাছে পাকে আম/পাশেতে নাই প্রাণবন্ধুয়া কারে খাওয়াইতাম।’
অন্যদিকে অনাবৃষ্টি চলতে থাকলে কিশোরীরা বের হতো ‘পানি মাগার গান’ নিয়ে। ‘মেঘারানী মেঘারানী/ঠ্যাং ধুই ধুই ফালা পানি/হাইল্লারা সাত ভাই/হাত ধুইতে পানি নাই/জাইল্লারা সাত ভাই/জাল ধুইতে পানি নাই।’ এক কিশোরীর মাথায় থাকত কুলা। কুলার ওপর বদনা, আর বদনায় থাকত পানি আর আমের পাতা। কিশোরীরা পানি মাগতে মাগতে হাজির হতো গৃহস্থের বাড়িতে। কোনো বাড়ির নতুন বউ কিশোরীদের হাতে দিতে কিছু চাল। অন্যদিনে কোনো রসিক বউ কিশোরীদের গায়ে ঢেলে দিত পানি। আমরা ততণ বাংলার গ্রাম সমাজে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের একটি খণ্ডচিত্র আঁকার চেষ্টা করলাম।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে পৌষমেলা, বসন্ত উৎসব পালনের ব্যবস্থা করেছিলেন। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের উদ্যোগ তিনি গ্রহণ না করলেও বৈশাখকেন্দ্রিক অনেক গান রচনা করেছিলেন। পহেলা বৈশাখ পালনের যে সংস্কৃতি নগরসমাজে দাঁড়িয়েছে, সেটি নিঃসন্দেহে রবীন্দ্র অনুপ্রাণিত। তাছাড়া ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’ গানে তিনি হালখাতার যে প্রতীকী ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেটিও আমরা সবাই মেনে নিয়েছি। নতুন বছরে আমরা নতুনভাবে জীবন শুরু করব। পুুরনো বছরের জীর্ণপাতা যাক ঝরে যাক। পুরনো বছরের ব্যর্থতার স্মৃতি আমরা মনে রাখব না ইত্যাদি ইত্যাদি। আজ থেকে বহু বছর আগে রমনার বটমূলে শান্তিনিকেতনের ছাত্রী সঙ্গীতশিল্পী সন্জীদা খাতুন যে বৈশাখী সংস্কৃতি চালু করেছিলেন সেটি আজ অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে পালিত হচ্ছে বিপুল বিস্তারে, সর্বজনীন বাঙালি সংস্কৃতিতে তা পরিণত হয়েছে মহামিলনমেলায়। প্রতি পহেলা বৈশাখে এ সংস্কৃতিতে যোগ হবে নতুন নতুন মাত্রা। ছায়ানটের পর নববর্ষের অনুষ্ঠানকে গুরুত্ব দিয়েছিল ঋষিজ শিল্পগোষ্ঠী লোকজ সম্ভার নিয়ে। বিশ শতকের নব্বই দশক থেকে চারুকলা ইনস্টিটিউট সংযোজন করেছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। কাগজের তৈরি নানা রঙের পশুপাখির ইমেজগুলো অবশ্যই আকর্ষণ বাড়িয়েছে বৈশাখী উৎসবের এ আয়োজন।
বিশেষ করে বলা দরকার, শুধু বাঙালি সমাজে নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা-মারমা-ত্রিপুরা আদিবাসী সমাজে কয়েকদিন ধরে পালিত হয় বৈসাবি উৎসব। ত্রিপুরাদের বৈসু থেকে বৈ, মারমাদের সাংগ্রাই থেকে সা এবং চাকমাদের বিজু থেকে বি নিয়ে তৈরি হয়েছে ’বৈসাবি’। বৈসাবি উৎসবে স্থান পায় গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি। বৈসাবি উৎসব থেকে আমরা গ্রহণ করতে পারি নদীতে ফুল ভাসিয়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা; গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন এবং চাকমা-মারমা-ত্রিপুরা জাতির বিভিন্ন নাচের মুদ্রা তাদের প্রতীকী ব্যঞ্জনাসহ উপস্থাপিত। শুনেছি যিশুখ্রিস্টের জন্মদিন উপলে যে সান্তাকজের আবির্ভাব ঘটে বাস্তাদের জন্য অভিনব উপহার নিয়ে এটি যুক্ত হয়েছিল নাইজেরিয়া অথবা তাঞ্জানিয়ার কোনো উৎসব থেকে ধার করে। বিগত দু’এক বছর থেকে দেখছি মুখে উল্কি আঁকছে কিশোর-কিশোরীরা। কোনো শিল্পী তাদের মুখে আমাদের প্রিয় পতাকা এঁকে দিচ্ছেন, অন্য কোনো শিল্পী এঁকে দিচ্ছেন অন্য কিছু। এক সময় এ প্রথা স্থায়ী রূপ পাবে দেশপ্রেমের চেতনা নিয়ে। আমাদের পহেলা বৈশাখ অথবা বর্ষবরণ উৎসব ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে সর্বজনীনতা, ধর্মনিরপেতার চেতনাকে ধারণ করে এ আশা করতেই পারি।
0 comments:
Post a Comment