Saturday, April 11, 2015

এ্যাডভেঞ্চার আর রোমাঞ্চের স্বপ্নিল ভূবন

এ্যাডভেঞ্চার আর রোমাঞ্চের স্বপ্নিল ভূবন
দুবলার চরের রাসমেলা

# রাসমেলা হতে পারে পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু

 আলী
অপরূপ সৌন্দর্যময় দেশ আমাদের বাংলাদেশ। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজের গালিচা পাতা রয়েছে এ দেশের পথে প্রান্তরে। এখানে আছে অবারিত সবুজের সমারহ ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট সুন্দরবন। নয়নাভিরাম নদী বিধৌত বিশ্বের বৃহত্তম লবনাম্বুজ বনভূমি এ সুন্দরবন। অনেক লোকগাঁথা ও দেব-দেবীর কাহিনী সমৃদ্ধ এ বন ভুমিতে প্রায় দু’শত বছর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ঐতিহ্যবাহী রাস মেলার পূণ্যøান। হিন্দু সনাতন ধর্মের পৌরানিক মতে রাস হচ্ছে রাধা ও কৃষ্ণের দিব্য চোখের মিলন। এ পূর্ণমিলনে পুর্ণ্যতা প্রাপ্তির ল্েয ৩১ অক্টোবর থেকে সুন্দরবনের দুবলার চরে শুরু হচ্ছে তিনদিন ব্যাপী রাস মেলা। এ মেলাকে ঘিরে প্রতিবছর এখানে সমবেত হয় লাধিক মানুষ। রাশ পূর্ণিমার রাতে øানের উদ্দেশে নদী পথে সমবেত হয় হাজার হাজার তীর্থ যাত্রী। দুবলার চরে তারা দেব-দেবীর নাম কীর্ত্তন ও মেলাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করবে। আগামী ২ নভেম্বর এ মেলার সমাপ্তি ঘটবে।

# দুবলার চরে পর্যটন সম্ভাবনা
বার্ড ওয়াচিং, এ্যাডভেঞ্চার ট্রেকিং, ক্যানেল ক্রজিংসহ সমুদ্রের কোল ঘেঁসা দীর্ঘ বালুময় সৈকতের ঐতিহাসিক দুবলার চরে রয়েছে রয়েছে জীবজন্তু দেখার নানা ধরনের আয়োজন। রাসমেলা দেবে নগর কোলাহল থেকে অবসর ও রোমাঞ্চকর পরিবেশের নির্মল আনন্দ। সুন্দরবন বর্তমানে বিশ্ব ঐতিহ্য। এখানকার অন্যতম আকর্ষন হচ্ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সুন্দরবনের একাংশ দুবলার চরের আরেক আকর্ষনীয় প্রানী হরিণ। এখানে মূলতঃ চিত্রা হরিণই সহজে দেখা যায়। ঝাঁকে ঝাঁকে দলবেঁধে চলাফেরা করে হরিণের দল। রয়েছে সুন্দরবনের আলোচিত প্রানী বানর। বানর গাছের ডাল পালা ইত্যাদি ফেলে হরিণের বাড়তি আহার যোগায়। আবার নানা ধরনের বিপদে আগাম বার্তা দিয়ে সতর্কও করে। এছাড়া বন্য শূকর, কুমির, অজগরসহ নানারকম প্রানীবৈচিত্র এখানকার পরিবেশকে অপরূপ সুন্দর ও কখনো কখনো ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। দুবলার চরের অন্যতম আকর্ষনীয় বিষয় হচ্ছে এর গাছপালার বৈচিত্র। সুন্দরী ছাড়াও গরান, গেওয়া, কেওড়া, বাইন, পশুর, গর্জন, ধোন্দল, কাঁকড়া, হেঁতাল, ওড়া ইত্যাদি অসংখ্য বৈচিত্রপূর্ন বৃরাজিতে পরিপূর্ন দুবলার চর। তাই জঙ্গলে হাঁটার রোমাঞ্চকর পরিবেশ রয়েছে এখানে। প্রতিবছর রাসমেলায় আগতরা প্রানভরে উপভোগ করে সমুদ্র ও সবুজের স্বাদ। আর এই রাসমেলাকে ঘিরেই দুবলার চরে নির্মিত হতে পারে পর্যটন কেন্দ্র। রাসমেলা হতে পারে পর্যটক আকর্ষনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

# দুবলার চরের অবস্থান
দেশের সর্বদেিন বঙ্গোপসাগরের তীরে এই সাগরকন্যা দুবলার চরের অবস্থান। প্রায় দশ কি.মি. বালুময় সৈকতসহ এর মোট আয়তন একাশি বর্গ কি.মি.। কে কখন কবে - এই পূন্যভূমির সন্ধান পেয়েছিল তা’ আজো অজানা। তবে বংশ পরাক্রমায় প্রতিবছর রাস পূর্ণিমায় পূর্ণ স্নান উদযাপন হয় এখানে। দুবলার চরের পশ্চিমে প্রায় ছয় কি.মি. দূরে মরজাত নদীর তীরে হিরণ পয়েন্ট। উত্তরে জনবসতিহীন ত্রিকোণ আইল্যান্ড। দেিন বঙ্গোপসাগর আর পূর্বে নীলমারিয়া, নারকেলবাড়িয়া। একমাত্র দণি ছাড়া চারদিকেই সুন্দরবন বেষ্টিত দুবলার চরে এবছর কার্তিক মাসের পূর্নিমায় উদযাপিত হবে রাসমেলা। আবারো হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে দুবলার চর। কিন্তু রাস মেলার সুযোগ বুঝে হরিণ শিকারীরা প্রায়শঃ বিপুল সংখ্যক হরিণ শিকার করে। পাশাপাশি চোরাকারবারীরা সুন্দরবনের অন্যান্য সম্পদ লুটের কর্মকান্ডে মেতে ওঠে। তাই রাসমেলা ও পূণ্য স্নানে যাওয়ার জন্য সুন্দরবন বিভাগের কাছ থেকে এবার অনুমতি নিতে হবে। মেলায় পূণ্যার্থীদের জন্য জনপ্রতি ৫০ টাকা রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এবছর হরিণ শিকার এবং বন সম্পদ পাচার ও বিনষ্টকারীদের কঠোর হস্তে দমন ও কঠিন  শাস্তির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে হরিণ শিকার প্রায় বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। 

# কিভাবে যাবেন
পূণ্যার্থী ও পর্যটকদের মেলায় যাতায়াতের জন্য এবার মোট আটটি রুট নির্দিষ্ট করা হয়েছে। রুটগুলো হলো- বুড়িগোয়ালিনী কোবাদক হতে বাটুলা নদী-বল নদী-পাটকোষ্টা খাল হয়ে হংসরাজ নদী পার হয়ে দুবলার চর। কদমতলা হতে ইছামতি দোবেকী হয়ে আড়পাঙ্গাশিয়া এরপর তীর্থস্থান। কৈখালী স্টেশন হয়ে মান্দার গাং খোপড়াখালি ভাড়ানি দোবেকী হয়ে আড়পাঙ্গাশিয়া তারপর কাগা দোবেকী হয়ে গন্তব্যস্থল। অপর চারটি রুট হলো কয়রা-কাশিয়াবাদ-খাশিটানা-বজবজা হয়ে আড়–য়া শিবসা এরপর শিবসা মরজাত নদী হয়ে দুবলার চর। ঢাংমারী চাঁদপাই স্টেশন-কচিখালী-শোলারচর হয়ে অনুষ্ঠান স্থল। বলেশ্বর-সুপতি স্টেশন কচিখালী শোলারচর হয়ে উৎসব স্থান এবং শরনখোলা স্টেশন-সুপতি স্টেশন-কচিখালী শোলারচর হয়ে রাসমেলা প্রাঙ্গন। মেলায় আগন্তুকদের অবশ্যই নির্দিষ্ট আটটি রুট দিয়েই যাতায়াত করতে হবে। এবং প্রত্যেককে একই রুট দিয়ে ফিরতে হবে।

# আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি
মেলায় আগতদের জন্য পুর্ণনিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা রয়েছে। মেলাকে সর্বাঙ্গিন সুন্দর ও সফল করার উদ্দেশ্যে অযথা হয়রানি বন্ধ করা, রুটগুলো সম্পর্কে অবহিতকরণ, বনের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে দ্রুতগামী জলযানের টহল কার্যক্রম পরিচালনা, পরিবেশ দুষণ, আগ্নেয়াস্ত্র পরিবহন নিষিদ্ধসহ এবার বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন, বাংলাদেশ রাইফেলস্, পুলিশ, র‌্যাব, ফরেস্টগার্ডের প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে।


# আগ্নেয়াস্ত্র ও হরিণধরা ফাঁদ নিষিদ্ধ
মেলায় হরিণ শিকার বন্ধ, চোরা শিকারীদের নিয়ন্ত্রন ও আইন শৃংখলা রায় নানা পদপে গ্রহণ করা হয়েছে। আগ্নেয়াস্ত্র,  হরিণ ধরা ফাঁদ, লাইলনের দড়ি, ভিডিও ক্যামেরা নেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের ও তীর্থ যাত্রীদের নির্ধারিত চেকিং পয়েন্ট ছাড়া কোথাও নৌযান ভিড়ানো যাবে না। দিনের ভাটিতে যাত্রা করতে হবে এবং হাঁস মুরগী ছাড়া অন্য কোন পশুর মাংস বহন করা ও খাওয়া যাবে না। মেলাকে সুন্দর করতে বনরক খুলনা সার্কেল আকবার হোসেনের সভাপতিত্বে মেলা উদযাপন কমিটির একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ বসু, দুবলার ফিসারম্যান গ্র“পের চেয়ারম্যান মেজর (অবঃ) জিয়াউদ্দিন, এডিএম, বাগেরহাট গোকুল কৃষ্ণ ঘোষ, সমীর কুমার সাহা এসব উপস্থিত ছিলেন।

# মেলাকে ঘিরে প্যাকেজ ট্যুর
দুবলার চরের মেলাকে ঘিরে প্রতি বছর খুলনা ও খুলনার বাইরের বেশ কয়েকটি ট্যুরিজম কোম্পানী বিলাশবহুল প্যাকেজ ট্যুর ব্যবস্থা করে থাকে। এবারও খুলনার এভারগ্রীন ট্যুরস্্, সুন্দরবন ট্যুরিজম, সুন্দরবন হলিডে তিনদিনব্যাপী প্যাকেজ ট্যুর’র ব্যবস্থা করেছে। এখানে নিজস্ব ক্যাবিন, উন্নতমানের খাবার, বিনোদনসহ নানা ধরনের সুবিধাদির ব্যবস্থা থাকে। খুলনা থেকে দুবলার  চরে গিয়ে অবস্থান ও আবার খুলনায় ফিরে আসার ৩১ অক্টোবর, ১ ও ২ নভেম্বরের প্যাকেজ ট্যুর’র জন্য জনপ্রতি খরচ ৫ হাজার টাকা। আর ঢাকা- দুবলার চর- ঢাকা প্যাকেজ ট্যুর’র জন্য জনপ্রতি খরচ ৬ হাজার ৩ শ’ টাকা। খুলনার এভারগ্রীন ট্যুরস্’র স্বত্ত্বাধিকারী জেড এম কচি জানান, প্রতিবছর গড়ে বিশটি জাহাজ ভ্রমনপিয়াসীদের নিয়ে দুবলার চরের মেলায় যায়।

# পর্যটনের জন্য করনীয়
দুবলার চরে পর্যটক আকর্ষনের জন্য প্রয়োজন এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পর্যটন পার্ক তৈরি, ট্যুরিষ্ট আকৃষ্ট করার মতো প্রচারণা এবং ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। দুবলার ফিসারম্যান গ্র“পের চেয়ারম্যান মেজর (অবঃ) জিয়াউদ্দিন কথা প্রসঙ্গে বলেন, দুবলার চরের মতো অপরূপ নৈসর্গিক এ জায়গাকে অবহেলা করার প্রশ্নই ওঠে না। আর দেশকে সমৃদ্ধের পথে এগিয়ে নিতে পর্যটনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের স্বার্থে দুবলারচরকে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে ঘোষনা দেয়া যেতে পারে।  

0 comments:

Post a Comment