বিপরীত চৌধুরী
অপরুদ্ধ
অনেকদিন পূর্বে কোন এক পত্রিকায় একটি গল্প পড়েছিলাম। গল্পটির নাম বিপরীত চৌধুরী। গল্পটির লেখকের নাম বা কোন পত্রিকায় গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিলো তা মনে নেই। তবে গল্পের মূল কাহিনী ও গল্পের নায়কের ট্রাজিক পরিণতি ভুলতে পারিনি।
গল্পটা অনেকটা এ ধরনের- কোন এক লোক যা বলতো টিক তার বিপরীত ঘনা ঘটতো। কাকতলীয় মনে হলেও বিষয়টা মোটেও কাকতলীয় ছিল না। এ কারণে লোকটিকে তার পরিচিতি বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, এমনকি স্ত্রী পর্যন্ত বিপরীত চৌধুরী বলে ডাকতো। সবাই ধরেই নিয়েছিল যে, সে যা বলবে টিকতার বিপরীত ঘটনা ঘটবে। সে যদি বলতো কোন খেলায় ‘ক’ দল জিতবে তাহলে ‘ক’ দল খেলায় হারতো, আবার যে যদি বলতো খেলায় ‘খ’ দল জিতবে তাহলে ‘খ’ দল খেলায় হারতো। তার কথার বিপরীত গনা যে ঘটবে না তা প্রমান করতে সে এক জায়গায় গিয়ে বলতো ‘ক’ দল জিতবে এবং অন্য জায়গায় গিয়ে যদি বলতো ‘খ’ দল জিতবে, তা হলে দেখা যেত খেলায় ড্র হয়েছে। এইভাবে লোকটি একদিন নিজেই অনুভব করল যে সত্যি সে বিপরীত চৌধুরী। বিপরীত চৌধুরীকে নিয়ে সবাই ভয়ে ভয়ে থাকতো বা তার কথার বিপরীত ফলাফলকে সুবিধাজনক ভাবে কাজে লাগাতো। বিপরীত চৌধুরীর জীবনে সবচেয়ে বড় ট্রাজিক ঘটনা ঘটলো তার নিজ সন্তানের অসুস্থতার সময়। সন্তানের অসুখে সে তার স্ত্রীকে সন্তানা দেওয়া ও স্ত্রীর মনে সাহস যোগানোর জন্য স্ত্রীকে বলেছিলো- চিন্তার কোন কারণ নেই, খোকা ভাল হয়ে যাবে। এই কথা শুনে তার স্ত্রী চিৎকার করে বললো, তুমি একথা বললে কেন? তুমি যা বলেছো তার বিপরীত ঘটনা ঘটবে। সত্যি সত্যি বিপরীত ঘটনাই ঘটলো। সন্তানকে সুস্থ করার সব ধরনের চেষ্টাকে ব্যর্থ করে বিপরীত চৌধুরীর সন্তান মৃত্যুবরণ করল। এই ঘটনায় বিপরীত চৌধুরী অনেকটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললো। সন্তানের মৃত্যুর জন্য বিপরীত চৌধুরীর স্ত্রী সবসময় বিপরীত চৌধুরীকে দায়ী করাতে সে তার স্ত্রীকে বললো, তাকে যদি পুনরায় বিপরীত চৌধুরী বলা হয় তাহলে সে তাকে খুন করবে। বিপরীত চৌধুরীর স্ত্রী জানতো সে কখনো তাকে খুন করতে পারবে না, কারণ সে যা বলে তার উল্টো ঘটনা ঘটে। কাজেই তার স্ত্রী তাকে সন্তান হত্যার জন্য দায়ী করা অব্যাহত রাখলো। একদিন বিপরীত চৌধুরী তার স্ত্রীর গলা টিপে, তাকে হত্যা করে ফেললো। স্ত্রীকে হত্যা করে বিপরীত চৌধুরী ভীষণ খুশি। তার কথার বিপরীত ঘটনা যেসব সময় ঘটে না, স্ত্রীকে হত্যা করে, বিপরীত চৌধুরী প্রমান করলো যে, সে বিপরীত চৌধুরী নয়। স্ত্রী হত্যার অভিযোগে আদালতে বিপরীত চৌধুরী হত্যার অভিযোগ স্বীকার করে বলেছিলেন, সে যে বিপরীত চৌধুরী নয় এটা প্রমাণ করার জন্যই সে স্ত্রীকে হত্যা করেছে। সে প্রমান করেছে সে যা বলে তার বিপরীত ঘটনাই ঘটে না, সে যা বলে তাও ঘটে।’
বিপরীত চৌধুরীর গল্প লেখা বর্তমান নিবন্ধের লক্ষ্য নয়। তবে বিপরীত চৌধুরীকে নিয়ে ভূমিকাটা বেশ বড় হয়ে গেলো। বিপরীত চৌধুরীর ঘটনা বড়ই ট্রাজিক। আর এই ট্রাজিক ঘটনা মনে পড়ে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের কথাবার্তা শুনে ও কাণ্ড-কারখানা দেখে। বেশিরভাগ রাজনীতিবিদদের কথাবার্তা শুনে কাণ্ড-কারখানা দেখে মনে হয় বিপরীত চৌধুরী গল্পের নায়ক অন্য কেউ নন আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরাই বিপরীত চৌধুরী গল্পের মূল নায়ক। কারণ এরা যা বলে তা বিশ্বাস করে না এবং যা বিশ্বাস করে তা বলে না। যা করে তার উপলক্ষ্য ও লক্ষ্য ভিন্ন।
যেমন ধরা যাক বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা। আওয়ামী লীগের নেত্রী ও দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তিনি যত কথা বলেছেন বা যত কর্ম করেছেন তা হিসেব করে বের করা সম্ভব নয়। ব্যাপক ভিত্তিতে গবেষনা করলে তার কথা ও কাজের একটি ফিরিস্ত হয়তে তৈরি করা সম্ভব। তবে তার সব কথার কিছু কিছু অংশ পত্রিকার পাতায় গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয়েছে তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তিনি যা বলেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই করেছেন ঠিক তার বিপরীত। সব কথা বা সব কাজ নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কিছু কথা যা তিনি বহুবার বলেছেন এবং এখনও সুযোগ পেলেই বলেন। সেই সব কতিপয় কথা বিপরীত চৌধুরীর গল্পের কর্মবাণী বুঝানোর জন্য উপস্থাপন করা যেতে পারে।
যেমন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুযোগ পেলেই বলেন যে, তিনি সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করেছেন। অতীতের সরকারগুলোর ন্যায় তিনি সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক ও দলীয় কাজে ব্যবহার করছেন না। এখন দেখা যাক এই কথাগুলি কতটুকু সত্যি বা মিথ্যা। তথ্য সংগ্রহ করলে দেখা যাবে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক লক্ষ্যে ব্যবহার না করার কথা সবচেয়ে বেশি উচ্চারণ করেছেন বর্তমান প্রধান মন্ত্রী মাননীয় শেখ হাসিনা। অথচ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংস্থাকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার দল আওয়ামী লীগ।
জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এরশাদের শাসনকাল বাদ দিয়ে এ বিষয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে। জেনারেল জিয়া সেনাবাহিনী থেকে আগত এবং খন্দকার মোশতাক জারিকৃত সামরিকশাসনের ধারাবাহিকতায় একসময় তিনি দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। জেনারেল এরশাদ নিজেই সামরিক শাসনজারি করে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন। কাজেই রাজনীতির সাথে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা আলোচনা করতে হলে যৌক্তিক কারণে এই দুই আমলকে বিবেচনার বাইরে রাখা উচিত।
এই দুই আমল বাদ দিয়ে থাকে শেখ মুজিবুর হরমানের ১৯৭২-৭৫ শানসকাল, বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯১-৯৬ শাসনকাল এবং শেখ হাসিনার ১৯৯৬-২০০১ শাসনকাল। এই তিন আমলে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত (সুষ্ঠুতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও) সরকার দেশ শাসন করেছে। কাজেই সেনবাহিনীকে রাজনৈতিক ও দলীয় কাজে ব্যবহারের প্রশ্ন আসলে, এই তিন আমলকেই বিবেচনায় আনাই হবে যুক্তিসংগত।
প্রথমেই ধরা যাক ১৯৭২-৭৪ এর শেখ মুজিবুর হরমানের শাসনকাল। নিম্নে শেখ মুজিব আমরে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহারের কতিপয় ঘটনা উল্লেখ করা হলো ঃ
* সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় সেনাবাহিনীতে সিনিয়র হওয়া সত্বেও জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাবিনহী প্রধান না বানিয়ে জেনারেল শফিউল্লাহকে সেনাবাহিনী প্রধান বানানো হয়েছিলো।
* রাজনৈতিক বিবেচনায় ও রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সেনাবাহিনীর অনেক মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিলো।
* রাজনৈতিক বিবেচনায় সেনাবাহিনীর বিকল্প হিসাবে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও ক্যাডারদের সমন্বয়ে রক্ষী বাহিনী গঠন করা হয়েছিলো।
* তৎকালীন প্রধান বিরোধী সংগঠন জাসদপন্থি ছাত্রলীগকে দমন করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পুলিশি কার্যক্রম চালানো হয়েছে সে ইতিহাস অনেকেই জানে। বর্তমান সরকারের মন্ত্রী আ স ম আব্দুর রবসহ জাসদ থেকে আওয়ামীলীগে যোগদানকারী নব্য আওয়ামীলীগের ও জাসদের যে নেতাবন্ধুরা বর্তমান সরকারের পক্ষে ডুগডুগি বাজাচ্ছেন তাদের অতীত বক্তব্য যাচাই করলেই বোঝা যাবে শেখ মুজিবুর রহমানের আমরে কিভাবে পুলিশকে বিরোধী দল দমনের ঠ্যাংগারে বাহিনী হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
* শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল ব্যবস্থা কায়েম করে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিডিআর, রক্ষীবাহিনী, আনসারসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সকল অফিসার ও সদস্যদের বাকশালে যোগদান বাধ্যতামূলক করেছিলেন। সেনবাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে।
এবার দেখা যাক শেখ হাসিনার সময়কালের কিছু ঘটনা ঃ
* বাংলাদেশে অবসর প্রাপ্ত সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয়। তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর (এল, পি, আর) নিয়েছিলেন। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় তিনি এল, পি, আর এ থাকাকালীন অবস্থায় ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর জনাব মুস্তাফিজুর রহমানকে পুনরায় সেনাবাহিনীতে ফেরত নিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান হিাসবে পুনঃনিয়োগ দেওয়া হয়। এল, পি, আর এ যাওয়া কোন অফিসারকে সেনাবাহিনীর ফিরিয়ে নিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান করার ঘটনার কোন নজির কোথাও নেই। পরবর্তী সময়ে এল,পি,আর এ থাকা অবস্থায় আওয়ামীলীগের পক্ষে প্রকাশ্য রাজনীতি করেছেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং যথারীতি হেরেছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসাবে শেখ হাসিনা কি রাজনৈতিক বিবেচনায় জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমানের এহনে কার্যকলাপকে প্রশ্রয় দেননি?
* পত্র-পত্রিকায় মাঝে মাঝেই খবর প্রকাশিত হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময় শেখ হাসিনা বিগত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অবস্থা সম্পর্কে তথ্র সংগ্রহ করার জন্যবিবিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে জরিপ কাজে লাগিয়েছেন ও তাদের নিকট থেকে রিপোর্ট নিয়েছেন এবং এর সাথে সাথে ছাত্রলীগের নেতাদের পরিচালিত জরিপের ফলাফলকে তিনি মিলিয়ে দেখেছেন। এ ধরনের খবর পত্রিকায় বার বার প্রকাশিত হলেও তৎকালীন সরকা রবা গোয়েন্দা সংস্থাগুলির তরফ থেকে কোন বক্তব্য না দেওয়াতে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের সত্যতাই প্রমাণিত হয়। সেনাবাহিনী ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাকে আওয়ামী লীগের নির্বাচন প্রস্তুতিতে ব্যবহার কি সেনাবাহিনীকে দলীয় কাজে ব্যবহার ছিল না?
* বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমাতয় আসার পর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী, সংসদসহ সমাজের উচ্চস্তরের অনেক মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। যেসব মানুষকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে তাদের ওই এলাকায প্রবেশে ও চলাচলে কোন বাধা-নিষেধ ছিল না। তা সত্বেও সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে ক্যান্টমেন্ট এলাকায় বিরোধী দলীয় নেতা সাংসদদের প্রবেশে বাধা প্রদান করা হয়েছে, তা বুঝতে বাকি থাকে না। বিশেষ করে সংসদে তৎকালীন বিরোধী দলীয় উপনেতা ও বর্তমান পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মেয়ের বিয়েতে সেনাকুঞ্জে অতিথি গমনে যে ঘটনা ঘটনো হয়েছিল তা হাসিনা সরকার কর্তৃক সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এমন কি আওয়ামী আমলে বিএনপি নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বিদেশী দূতদের সাক্ষাতকে বাধা প্রদান করা হয়েছে।
* পত্র পত্রিকায় বেশ কয়েকবার খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে শেখ হাসিনার সরকার সেনা গোয়েন্দা সংস্থাকে বিরোধী দলীয় নেতা কর্মী ও সাংসদদের ভাগিয়ে সরকারি দলে যোগদানে ব্যবহার করেছে। মিরপুরের বিএনপি নেতা ও বর্তমান সংসদ এস এ খালেককে সরকারি দলে যোগদানে সেনা গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে এস এ খালেক অভিযোগ এনেছিলেন। সেনাবাহিনীর কোন অফিসার, কিভাবেতাকে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে হাজির করিয়েছিলেন তার বর্ণনা পত্রিকায় এসেছিলো। সেনাবাহিনীর তরফ থেকে প্রতিবাদ পাঠানো হলে ওএস এ খালেকের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত খবর পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে শেখ হাসিনার সরকার সেনবাহিনীকে বিরোধী দলীয় নেতা সাংসদদের ভাগিয়ে সরকারি দলে যোগদান করানোর অভিযোগ একেবারে মিথ্যা ছিল না।
* শেখ হাসিনার সরকার যে সেনাবাহিনীকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছেতার অপর একটি প্রমাণ ভারতকে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘিœত হবে না এমন একটা ঘোষণা সামরিক বাহিনী প্রধানদের মুখ থেকে আদায় করানো। শেখ হাসিনার সরকার ভারতকে ট্রানজিট দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দেশের নিরাপত্তা ও আর্থিক ক্ষতির দিক বিবেচনা করে বিরোধী দলসহ দেশের ব্যাপক সংখ্যক মানুষ ভারতকে ট্রানজিট প্রদানের বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামে। আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার একদিকে টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষনা দেয় অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর প্রধানরা বিবৃতিতে উল্লেখ করতবোধ্য হন যে ভারতকে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘিœত হবে না। ট্রানজিট প্রদানের সিদ্ধান্ত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং দেশের নিরাপত্তা কৌশল রাজনৈতিক বিবেচনার অংশ। ভারতকে ট্রানজিট প্রদানের পক্ষে সামরিক বাহিনী প্রধানদের দিয়ে বিবৃতি প্রদান সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের প্রচেষ্টা বৈ অন্য কিছু নয়। ট্রানজিটের বিপক্ষে রাজনৈতিক আন্দোলনকে মোকাবিলা করার জন্যই যে সামরিক বাহিনী প্রদানদের দিয়ে বিবৃতি প্রদান করানো হয়েছিল তা বলাই বাহুল্য।
* শেখ হাসিনার সরকার পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক লাইনে দলীয়করণ করেছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।সরকার চাকুরির বিধিবিধান অমান্য করে যেসব পুিলশ অপিসার জনতার মঞ্চে উঠেছিল আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই সব পুিলশ অফিসারদের গুরুত্বপূর্ণ কমাণ্ড পজিসনের দায়িত্ব দেয়। এইসব পুলিশ অফিসার পুলিশ প্রশাসনের চেইন অব কর্মকাণ্ড ভেঙ্গে কিভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেতার অনেক খবর পত্রিকায় পাতায় এসেছে। তাছাড়া পুলিশ প্রশাসন বিশেষ করে কমাণ্ডিং পজিশনগুলি সেই সময়ে কিভাবে দলীয়করণ, এলাকাকরণ ও একটি বিশেষ ধর্মের মানুষদের মধ্যে বিন্যাস করা হয়েছিল তা আওয়ামী আমলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, এসপি, এএস পি, এসিদের নাম ঠিকানা নিরীক্ষা করলেই অনুমান করা যাবে।
* শেখ হাসিনা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতেন। তিনি মাঝে মাঝেই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতেন। কিন্তু বিচারপতি সাত্তারকে হটিয়ে জেনারেল রেশাদ যখনক্ষমতা দখল করেন তখন শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এরশাদের সামরিক শাসন জারিতে তিনি অখুশি নন। তাছাড়া এরশাদের সমরিক শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ যে ভূমিকা রেখেছিল তা আজ আর কোন অজানা কাহিনী নয়।
* ১৯৯৬ সালে তত্বাবধায়ক সরকার আমলে তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল নাসিমের ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টায় আওয়ামী লীগ ও ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে জেনারেল নাসিমের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। যেকোন বিচারে ওই ঘটনাকে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার বলা যায়।
এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের অন্যান্য প্রসঙ্গে বিবৃতি ও বাস্তব অবস্থা। শেখ হাসিনা মাঝেমাঝেই বলে থঅকতেন সন্ত্রাসীদের কোন দল নেই এবং সন্ত্রাসী যে দলেরই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেমে সংঘঠিত সন্ত্রাসী ঘটনা এবঙ এইসব ঘটনার সাথে কারা জড়িত ছিল এবং সন্ত্রাস দমনে তৎকালীন সরকারি পদক্ষেপ প্রমাণ করে শেখ হাসিনা ও তার সরকার যা বলেছে, করছে তার বিপরীত। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কথা বললেই আওয়ামী লীগ সরকার যে সন্ত্রাসীদের পক্ষেই অবস্থান নিযেছে তার ভুরি ভুরি প্রমান রয়েছে। কোন দেশের সরকার প্রধানকেই এভাবে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীদের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী হয়েও শেখ হাসিনা যখন বলেন, একটি লাশ পড়লে দশটি লাশ ফেলা হবে, অথবা ‘অস্ত্র হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য দলীয় ক্যাডারদের শাড়ি, চুড়ি পরে থাকার গঞ্জনা দেন’- তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না তিনি দলীয় কর্মিদের কি নির্দেশ দিয়েছিলেন। সন্ত্রাসীদের দমনে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, এক হাতে তালি বাজে না এবং দলের সিনিযর মন্ত্রীকে লক্ষ্মীপুরে পাঠান সন্ত্রাসীদের গডফাদার তাহেরের পক্ষে অবস্থান নিতে ও প্রশাসনকে সেই মোতাবেক নির্দেশ দিতে। দেশের সকল পত্রিকায় ফেনীর গডফাদার জয়নাল হাজারীল সন্ত্রাসের খবর প্রকাশের পর তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে শেখ হাসিনা যখন জয়নাল হাজারী, শামীম ওসমান, মায়া, মায়াপুত্র দীপুর পক্ষে কথা বলেন এবং পলাতক আসামী জয়নাল হাজারীর নির্বাচন দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন, তখন বুঝতে অসুবিধা হয না সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে শেখ হাসিনা সরকারের মনোভাব কি ছিল। এটা কি বিপরীত অবস্থান নয়?
শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ঘোষণা দিয়েছিল ক্ষমতায় গিয়ে রেডিও টেলিভিমনের স্বায়ত্বশাসন প্রদান ও বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হবে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শেখ হাসিনা অহরহই দাবি করতেন বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে এবং সরকার কোন ভাবেই বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে না। সরকারের এই দাবি যে প্রকৃত অবস্থার বিপরীত ছিল তার অনেক নজির রয়েছে। নিম্নে কিছু নমুনা উল্লেখ করা হলো ঃ
* শেখ হাসিনার সরকার রেডিও টেলিভিশনকে যে মাত্রায় দলীয়করণ ও সরকারের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে তা সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।
* আওয়ামী লীগ সরকার আমলে মন্ত্রীদের নেতৃত্বে বিচারকদের বিরুদ্ধে লাঠি মিছির করা হয়েছে। মন্ত্রীরা হুমকি দিয়েছে বিচারকদের লাঠি পেটা করার, জনতার আদালতে বিচারকদের বিচার করার।
* প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শেখ হাসিনা ওঅন্যান্য মন্ত্রীরা বিচারকদের বিরুদ্ধে ও বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বহুবার কটুবক্তব্য রেখেছে। এ নিয়ে আদালত অবমাননার মামলা হয়েছে। সুপ্রীমকোর্ট দুইবার প্রধানমন্ত্রীকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়ার পরেও বিচারক ও বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরকারের আক্রমণ বন্ধ করা হয়নি।
* শেখ হাসিনার আমলে সরকারি প্ররোচনায় সুপ্রীমকোর্ট চত্বরে বস্তি বসানো হয়েছিলো।
* বস্তিবাসীদের পক্ষ অবলম্বন করায় প্রখ্যাত আইনজীবী ডঃ কামাল হোসেেনর বাসার সামনে বস্তি বসানো হয়েছিলো।
* বহু স্থানে সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা আদালত আক্রমণ করেছিলো। বিপক্ষ দলীয় আইনজীবীদের আক্রমণ করেছে, আইনজীবীদের অপহরণ করেছে খুন করেছে। আওয়ামী লীগ সরকার এই সবের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে এইসব ঘটনাকে উৎসাহিত করেছে।
শেখ হাসিনা প্রায়শই বলেন তিনি সব হারিয়েছেন তার চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তিনি তার নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার কথা বলে যে আইন প্রণয়ন করেছেন, তার মর্মবাণী এই যে তিনি আজীবন প্রধানমন্ত্রীর মতো ঠাঁট-বাট নিয়ে থাকবেন। এদেশের সাধারণ মানুষের মতো নন, তিনি দেশের রাজকন্যা হিসাবে আজীবন অধিষ্ঠিত থাকতে চান।
এই ধরনের অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে যার দ্বারা প্রমাণ করা সম্ভব যে শেখ হাসিনা ও তার সরকার যা বলছে কিন্তু করেছে তার বিপরীত। সত্যিকার বিপরীত চৌধুরী বলে কেউ ছিল কিনা জানি না কিন্তু বিপরীত চৌধুরীর যে আছে তার প্রমাণ পেতে হলে বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগ সরকারের চরিত্র কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলেই বিপরীত চৌধুরীকে আবিষ্কার করা যাবে। (সংকলিত)
অপরুদ্ধ
অনেকদিন পূর্বে কোন এক পত্রিকায় একটি গল্প পড়েছিলাম। গল্পটির নাম বিপরীত চৌধুরী। গল্পটির লেখকের নাম বা কোন পত্রিকায় গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিলো তা মনে নেই। তবে গল্পের মূল কাহিনী ও গল্পের নায়কের ট্রাজিক পরিণতি ভুলতে পারিনি।
গল্পটা অনেকটা এ ধরনের- কোন এক লোক যা বলতো টিক তার বিপরীত ঘনা ঘটতো। কাকতলীয় মনে হলেও বিষয়টা মোটেও কাকতলীয় ছিল না। এ কারণে লোকটিকে তার পরিচিতি বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, এমনকি স্ত্রী পর্যন্ত বিপরীত চৌধুরী বলে ডাকতো। সবাই ধরেই নিয়েছিল যে, সে যা বলবে টিকতার বিপরীত ঘটনা ঘটবে। সে যদি বলতো কোন খেলায় ‘ক’ দল জিতবে তাহলে ‘ক’ দল খেলায় হারতো, আবার যে যদি বলতো খেলায় ‘খ’ দল জিতবে তাহলে ‘খ’ দল খেলায় হারতো। তার কথার বিপরীত গনা যে ঘটবে না তা প্রমান করতে সে এক জায়গায় গিয়ে বলতো ‘ক’ দল জিতবে এবং অন্য জায়গায় গিয়ে যদি বলতো ‘খ’ দল জিতবে, তা হলে দেখা যেত খেলায় ড্র হয়েছে। এইভাবে লোকটি একদিন নিজেই অনুভব করল যে সত্যি সে বিপরীত চৌধুরী। বিপরীত চৌধুরীকে নিয়ে সবাই ভয়ে ভয়ে থাকতো বা তার কথার বিপরীত ফলাফলকে সুবিধাজনক ভাবে কাজে লাগাতো। বিপরীত চৌধুরীর জীবনে সবচেয়ে বড় ট্রাজিক ঘটনা ঘটলো তার নিজ সন্তানের অসুস্থতার সময়। সন্তানের অসুখে সে তার স্ত্রীকে সন্তানা দেওয়া ও স্ত্রীর মনে সাহস যোগানোর জন্য স্ত্রীকে বলেছিলো- চিন্তার কোন কারণ নেই, খোকা ভাল হয়ে যাবে। এই কথা শুনে তার স্ত্রী চিৎকার করে বললো, তুমি একথা বললে কেন? তুমি যা বলেছো তার বিপরীত ঘটনা ঘটবে। সত্যি সত্যি বিপরীত ঘটনাই ঘটলো। সন্তানকে সুস্থ করার সব ধরনের চেষ্টাকে ব্যর্থ করে বিপরীত চৌধুরীর সন্তান মৃত্যুবরণ করল। এই ঘটনায় বিপরীত চৌধুরী অনেকটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললো। সন্তানের মৃত্যুর জন্য বিপরীত চৌধুরীর স্ত্রী সবসময় বিপরীত চৌধুরীকে দায়ী করাতে সে তার স্ত্রীকে বললো, তাকে যদি পুনরায় বিপরীত চৌধুরী বলা হয় তাহলে সে তাকে খুন করবে। বিপরীত চৌধুরীর স্ত্রী জানতো সে কখনো তাকে খুন করতে পারবে না, কারণ সে যা বলে তার উল্টো ঘটনা ঘটে। কাজেই তার স্ত্রী তাকে সন্তান হত্যার জন্য দায়ী করা অব্যাহত রাখলো। একদিন বিপরীত চৌধুরী তার স্ত্রীর গলা টিপে, তাকে হত্যা করে ফেললো। স্ত্রীকে হত্যা করে বিপরীত চৌধুরী ভীষণ খুশি। তার কথার বিপরীত ঘটনা যেসব সময় ঘটে না, স্ত্রীকে হত্যা করে, বিপরীত চৌধুরী প্রমান করলো যে, সে বিপরীত চৌধুরী নয়। স্ত্রী হত্যার অভিযোগে আদালতে বিপরীত চৌধুরী হত্যার অভিযোগ স্বীকার করে বলেছিলেন, সে যে বিপরীত চৌধুরী নয় এটা প্রমাণ করার জন্যই সে স্ত্রীকে হত্যা করেছে। সে প্রমান করেছে সে যা বলে তার বিপরীত ঘটনাই ঘটে না, সে যা বলে তাও ঘটে।’
বিপরীত চৌধুরীর গল্প লেখা বর্তমান নিবন্ধের লক্ষ্য নয়। তবে বিপরীত চৌধুরীকে নিয়ে ভূমিকাটা বেশ বড় হয়ে গেলো। বিপরীত চৌধুরীর ঘটনা বড়ই ট্রাজিক। আর এই ট্রাজিক ঘটনা মনে পড়ে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের কথাবার্তা শুনে ও কাণ্ড-কারখানা দেখে। বেশিরভাগ রাজনীতিবিদদের কথাবার্তা শুনে কাণ্ড-কারখানা দেখে মনে হয় বিপরীত চৌধুরী গল্পের নায়ক অন্য কেউ নন আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরাই বিপরীত চৌধুরী গল্পের মূল নায়ক। কারণ এরা যা বলে তা বিশ্বাস করে না এবং যা বিশ্বাস করে তা বলে না। যা করে তার উপলক্ষ্য ও লক্ষ্য ভিন্ন।
যেমন ধরা যাক বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা। আওয়ামী লীগের নেত্রী ও দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তিনি যত কথা বলেছেন বা যত কর্ম করেছেন তা হিসেব করে বের করা সম্ভব নয়। ব্যাপক ভিত্তিতে গবেষনা করলে তার কথা ও কাজের একটি ফিরিস্ত হয়তে তৈরি করা সম্ভব। তবে তার সব কথার কিছু কিছু অংশ পত্রিকার পাতায় গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয়েছে তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তিনি যা বলেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই করেছেন ঠিক তার বিপরীত। সব কথা বা সব কাজ নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কিছু কথা যা তিনি বহুবার বলেছেন এবং এখনও সুযোগ পেলেই বলেন। সেই সব কতিপয় কথা বিপরীত চৌধুরীর গল্পের কর্মবাণী বুঝানোর জন্য উপস্থাপন করা যেতে পারে।
যেমন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুযোগ পেলেই বলেন যে, তিনি সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করেছেন। অতীতের সরকারগুলোর ন্যায় তিনি সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক ও দলীয় কাজে ব্যবহার করছেন না। এখন দেখা যাক এই কথাগুলি কতটুকু সত্যি বা মিথ্যা। তথ্য সংগ্রহ করলে দেখা যাবে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক লক্ষ্যে ব্যবহার না করার কথা সবচেয়ে বেশি উচ্চারণ করেছেন বর্তমান প্রধান মন্ত্রী মাননীয় শেখ হাসিনা। অথচ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংস্থাকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার দল আওয়ামী লীগ।
জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এরশাদের শাসনকাল বাদ দিয়ে এ বিষয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে। জেনারেল জিয়া সেনাবাহিনী থেকে আগত এবং খন্দকার মোশতাক জারিকৃত সামরিকশাসনের ধারাবাহিকতায় একসময় তিনি দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। জেনারেল এরশাদ নিজেই সামরিক শাসনজারি করে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন। কাজেই রাজনীতির সাথে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা আলোচনা করতে হলে যৌক্তিক কারণে এই দুই আমলকে বিবেচনার বাইরে রাখা উচিত।
এই দুই আমল বাদ দিয়ে থাকে শেখ মুজিবুর হরমানের ১৯৭২-৭৫ শানসকাল, বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯১-৯৬ শাসনকাল এবং শেখ হাসিনার ১৯৯৬-২০০১ শাসনকাল। এই তিন আমলে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত (সুষ্ঠুতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও) সরকার দেশ শাসন করেছে। কাজেই সেনবাহিনীকে রাজনৈতিক ও দলীয় কাজে ব্যবহারের প্রশ্ন আসলে, এই তিন আমলকেই বিবেচনায় আনাই হবে যুক্তিসংগত।
প্রথমেই ধরা যাক ১৯৭২-৭৪ এর শেখ মুজিবুর হরমানের শাসনকাল। নিম্নে শেখ মুজিব আমরে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহারের কতিপয় ঘটনা উল্লেখ করা হলো ঃ
* সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় সেনাবাহিনীতে সিনিয়র হওয়া সত্বেও জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাবিনহী প্রধান না বানিয়ে জেনারেল শফিউল্লাহকে সেনাবাহিনী প্রধান বানানো হয়েছিলো।
* রাজনৈতিক বিবেচনায় ও রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সেনাবাহিনীর অনেক মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিলো।
* রাজনৈতিক বিবেচনায় সেনাবাহিনীর বিকল্প হিসাবে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও ক্যাডারদের সমন্বয়ে রক্ষী বাহিনী গঠন করা হয়েছিলো।
* তৎকালীন প্রধান বিরোধী সংগঠন জাসদপন্থি ছাত্রলীগকে দমন করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পুলিশি কার্যক্রম চালানো হয়েছে সে ইতিহাস অনেকেই জানে। বর্তমান সরকারের মন্ত্রী আ স ম আব্দুর রবসহ জাসদ থেকে আওয়ামীলীগে যোগদানকারী নব্য আওয়ামীলীগের ও জাসদের যে নেতাবন্ধুরা বর্তমান সরকারের পক্ষে ডুগডুগি বাজাচ্ছেন তাদের অতীত বক্তব্য যাচাই করলেই বোঝা যাবে শেখ মুজিবুর রহমানের আমরে কিভাবে পুলিশকে বিরোধী দল দমনের ঠ্যাংগারে বাহিনী হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
* শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল ব্যবস্থা কায়েম করে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিডিআর, রক্ষীবাহিনী, আনসারসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সকল অফিসার ও সদস্যদের বাকশালে যোগদান বাধ্যতামূলক করেছিলেন। সেনবাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে।
এবার দেখা যাক শেখ হাসিনার সময়কালের কিছু ঘটনা ঃ
* বাংলাদেশে অবসর প্রাপ্ত সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয়। তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর (এল, পি, আর) নিয়েছিলেন। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় তিনি এল, পি, আর এ থাকাকালীন অবস্থায় ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর জনাব মুস্তাফিজুর রহমানকে পুনরায় সেনাবাহিনীতে ফেরত নিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান হিাসবে পুনঃনিয়োগ দেওয়া হয়। এল, পি, আর এ যাওয়া কোন অফিসারকে সেনাবাহিনীর ফিরিয়ে নিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান করার ঘটনার কোন নজির কোথাও নেই। পরবর্তী সময়ে এল,পি,আর এ থাকা অবস্থায় আওয়ামীলীগের পক্ষে প্রকাশ্য রাজনীতি করেছেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং যথারীতি হেরেছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসাবে শেখ হাসিনা কি রাজনৈতিক বিবেচনায় জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমানের এহনে কার্যকলাপকে প্রশ্রয় দেননি?
* পত্র-পত্রিকায় মাঝে মাঝেই খবর প্রকাশিত হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময় শেখ হাসিনা বিগত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অবস্থা সম্পর্কে তথ্র সংগ্রহ করার জন্যবিবিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে জরিপ কাজে লাগিয়েছেন ও তাদের নিকট থেকে রিপোর্ট নিয়েছেন এবং এর সাথে সাথে ছাত্রলীগের নেতাদের পরিচালিত জরিপের ফলাফলকে তিনি মিলিয়ে দেখেছেন। এ ধরনের খবর পত্রিকায় বার বার প্রকাশিত হলেও তৎকালীন সরকা রবা গোয়েন্দা সংস্থাগুলির তরফ থেকে কোন বক্তব্য না দেওয়াতে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের সত্যতাই প্রমাণিত হয়। সেনাবাহিনী ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাকে আওয়ামী লীগের নির্বাচন প্রস্তুতিতে ব্যবহার কি সেনাবাহিনীকে দলীয় কাজে ব্যবহার ছিল না?
* বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমাতয় আসার পর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী, সংসদসহ সমাজের উচ্চস্তরের অনেক মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। যেসব মানুষকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে তাদের ওই এলাকায প্রবেশে ও চলাচলে কোন বাধা-নিষেধ ছিল না। তা সত্বেও সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে ক্যান্টমেন্ট এলাকায় বিরোধী দলীয় নেতা সাংসদদের প্রবেশে বাধা প্রদান করা হয়েছে, তা বুঝতে বাকি থাকে না। বিশেষ করে সংসদে তৎকালীন বিরোধী দলীয় উপনেতা ও বর্তমান পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মেয়ের বিয়েতে সেনাকুঞ্জে অতিথি গমনে যে ঘটনা ঘটনো হয়েছিল তা হাসিনা সরকার কর্তৃক সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এমন কি আওয়ামী আমলে বিএনপি নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বিদেশী দূতদের সাক্ষাতকে বাধা প্রদান করা হয়েছে।
* পত্র পত্রিকায় বেশ কয়েকবার খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে শেখ হাসিনার সরকার সেনা গোয়েন্দা সংস্থাকে বিরোধী দলীয় নেতা কর্মী ও সাংসদদের ভাগিয়ে সরকারি দলে যোগদানে ব্যবহার করেছে। মিরপুরের বিএনপি নেতা ও বর্তমান সংসদ এস এ খালেককে সরকারি দলে যোগদানে সেনা গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে এস এ খালেক অভিযোগ এনেছিলেন। সেনাবাহিনীর কোন অফিসার, কিভাবেতাকে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে হাজির করিয়েছিলেন তার বর্ণনা পত্রিকায় এসেছিলো। সেনাবাহিনীর তরফ থেকে প্রতিবাদ পাঠানো হলে ওএস এ খালেকের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত খবর পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে শেখ হাসিনার সরকার সেনবাহিনীকে বিরোধী দলীয় নেতা সাংসদদের ভাগিয়ে সরকারি দলে যোগদান করানোর অভিযোগ একেবারে মিথ্যা ছিল না।
* শেখ হাসিনার সরকার যে সেনাবাহিনীকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছেতার অপর একটি প্রমাণ ভারতকে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘিœত হবে না এমন একটা ঘোষণা সামরিক বাহিনী প্রধানদের মুখ থেকে আদায় করানো। শেখ হাসিনার সরকার ভারতকে ট্রানজিট দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দেশের নিরাপত্তা ও আর্থিক ক্ষতির দিক বিবেচনা করে বিরোধী দলসহ দেশের ব্যাপক সংখ্যক মানুষ ভারতকে ট্রানজিট প্রদানের বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামে। আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার একদিকে টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষনা দেয় অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর প্রধানরা বিবৃতিতে উল্লেখ করতবোধ্য হন যে ভারতকে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘিœত হবে না। ট্রানজিট প্রদানের সিদ্ধান্ত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং দেশের নিরাপত্তা কৌশল রাজনৈতিক বিবেচনার অংশ। ভারতকে ট্রানজিট প্রদানের পক্ষে সামরিক বাহিনী প্রধানদের দিয়ে বিবৃতি প্রদান সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের প্রচেষ্টা বৈ অন্য কিছু নয়। ট্রানজিটের বিপক্ষে রাজনৈতিক আন্দোলনকে মোকাবিলা করার জন্যই যে সামরিক বাহিনী প্রদানদের দিয়ে বিবৃতি প্রদান করানো হয়েছিল তা বলাই বাহুল্য।
* শেখ হাসিনার সরকার পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক লাইনে দলীয়করণ করেছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।সরকার চাকুরির বিধিবিধান অমান্য করে যেসব পুিলশ অপিসার জনতার মঞ্চে উঠেছিল আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই সব পুিলশ অফিসারদের গুরুত্বপূর্ণ কমাণ্ড পজিসনের দায়িত্ব দেয়। এইসব পুলিশ অফিসার পুলিশ প্রশাসনের চেইন অব কর্মকাণ্ড ভেঙ্গে কিভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেতার অনেক খবর পত্রিকায় পাতায় এসেছে। তাছাড়া পুলিশ প্রশাসন বিশেষ করে কমাণ্ডিং পজিশনগুলি সেই সময়ে কিভাবে দলীয়করণ, এলাকাকরণ ও একটি বিশেষ ধর্মের মানুষদের মধ্যে বিন্যাস করা হয়েছিল তা আওয়ামী আমলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, এসপি, এএস পি, এসিদের নাম ঠিকানা নিরীক্ষা করলেই অনুমান করা যাবে।
* শেখ হাসিনা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতেন। তিনি মাঝে মাঝেই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতেন। কিন্তু বিচারপতি সাত্তারকে হটিয়ে জেনারেল রেশাদ যখনক্ষমতা দখল করেন তখন শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এরশাদের সামরিক শাসন জারিতে তিনি অখুশি নন। তাছাড়া এরশাদের সমরিক শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ যে ভূমিকা রেখেছিল তা আজ আর কোন অজানা কাহিনী নয়।
* ১৯৯৬ সালে তত্বাবধায়ক সরকার আমলে তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল নাসিমের ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টায় আওয়ামী লীগ ও ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে জেনারেল নাসিমের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। যেকোন বিচারে ওই ঘটনাকে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার বলা যায়।
এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের অন্যান্য প্রসঙ্গে বিবৃতি ও বাস্তব অবস্থা। শেখ হাসিনা মাঝেমাঝেই বলে থঅকতেন সন্ত্রাসীদের কোন দল নেই এবং সন্ত্রাসী যে দলেরই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেমে সংঘঠিত সন্ত্রাসী ঘটনা এবঙ এইসব ঘটনার সাথে কারা জড়িত ছিল এবং সন্ত্রাস দমনে তৎকালীন সরকারি পদক্ষেপ প্রমাণ করে শেখ হাসিনা ও তার সরকার যা বলেছে, করছে তার বিপরীত। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কথা বললেই আওয়ামী লীগ সরকার যে সন্ত্রাসীদের পক্ষেই অবস্থান নিযেছে তার ভুরি ভুরি প্রমান রয়েছে। কোন দেশের সরকার প্রধানকেই এভাবে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীদের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী হয়েও শেখ হাসিনা যখন বলেন, একটি লাশ পড়লে দশটি লাশ ফেলা হবে, অথবা ‘অস্ত্র হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য দলীয় ক্যাডারদের শাড়ি, চুড়ি পরে থাকার গঞ্জনা দেন’- তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না তিনি দলীয় কর্মিদের কি নির্দেশ দিয়েছিলেন। সন্ত্রাসীদের দমনে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, এক হাতে তালি বাজে না এবং দলের সিনিযর মন্ত্রীকে লক্ষ্মীপুরে পাঠান সন্ত্রাসীদের গডফাদার তাহেরের পক্ষে অবস্থান নিতে ও প্রশাসনকে সেই মোতাবেক নির্দেশ দিতে। দেশের সকল পত্রিকায় ফেনীর গডফাদার জয়নাল হাজারীল সন্ত্রাসের খবর প্রকাশের পর তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে শেখ হাসিনা যখন জয়নাল হাজারী, শামীম ওসমান, মায়া, মায়াপুত্র দীপুর পক্ষে কথা বলেন এবং পলাতক আসামী জয়নাল হাজারীর নির্বাচন দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন, তখন বুঝতে অসুবিধা হয না সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে শেখ হাসিনা সরকারের মনোভাব কি ছিল। এটা কি বিপরীত অবস্থান নয়?
শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ঘোষণা দিয়েছিল ক্ষমতায় গিয়ে রেডিও টেলিভিমনের স্বায়ত্বশাসন প্রদান ও বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হবে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শেখ হাসিনা অহরহই দাবি করতেন বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে এবং সরকার কোন ভাবেই বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে না। সরকারের এই দাবি যে প্রকৃত অবস্থার বিপরীত ছিল তার অনেক নজির রয়েছে। নিম্নে কিছু নমুনা উল্লেখ করা হলো ঃ
* শেখ হাসিনার সরকার রেডিও টেলিভিশনকে যে মাত্রায় দলীয়করণ ও সরকারের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে তা সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।
* আওয়ামী লীগ সরকার আমলে মন্ত্রীদের নেতৃত্বে বিচারকদের বিরুদ্ধে লাঠি মিছির করা হয়েছে। মন্ত্রীরা হুমকি দিয়েছে বিচারকদের লাঠি পেটা করার, জনতার আদালতে বিচারকদের বিচার করার।
* প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শেখ হাসিনা ওঅন্যান্য মন্ত্রীরা বিচারকদের বিরুদ্ধে ও বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বহুবার কটুবক্তব্য রেখেছে। এ নিয়ে আদালত অবমাননার মামলা হয়েছে। সুপ্রীমকোর্ট দুইবার প্রধানমন্ত্রীকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়ার পরেও বিচারক ও বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরকারের আক্রমণ বন্ধ করা হয়নি।
* শেখ হাসিনার আমলে সরকারি প্ররোচনায় সুপ্রীমকোর্ট চত্বরে বস্তি বসানো হয়েছিলো।
* বস্তিবাসীদের পক্ষ অবলম্বন করায় প্রখ্যাত আইনজীবী ডঃ কামাল হোসেেনর বাসার সামনে বস্তি বসানো হয়েছিলো।
* বহু স্থানে সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা আদালত আক্রমণ করেছিলো। বিপক্ষ দলীয় আইনজীবীদের আক্রমণ করেছে, আইনজীবীদের অপহরণ করেছে খুন করেছে। আওয়ামী লীগ সরকার এই সবের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে এইসব ঘটনাকে উৎসাহিত করেছে।
শেখ হাসিনা প্রায়শই বলেন তিনি সব হারিয়েছেন তার চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তিনি তার নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার কথা বলে যে আইন প্রণয়ন করেছেন, তার মর্মবাণী এই যে তিনি আজীবন প্রধানমন্ত্রীর মতো ঠাঁট-বাট নিয়ে থাকবেন। এদেশের সাধারণ মানুষের মতো নন, তিনি দেশের রাজকন্যা হিসাবে আজীবন অধিষ্ঠিত থাকতে চান।
এই ধরনের অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে যার দ্বারা প্রমাণ করা সম্ভব যে শেখ হাসিনা ও তার সরকার যা বলছে কিন্তু করেছে তার বিপরীত। সত্যিকার বিপরীত চৌধুরী বলে কেউ ছিল কিনা জানি না কিন্তু বিপরীত চৌধুরীর যে আছে তার প্রমাণ পেতে হলে বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগ সরকারের চরিত্র কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলেই বিপরীত চৌধুরীকে আবিষ্কার করা যাবে। (সংকলিত)
0 comments:
Post a Comment