ড.ফোরকান আলী
‘আবার শুরু হয়েছে প্রতি ঘণ্টা অন্তর বিদ্যুতের লোডশেডিং। কী দিনের বেলা, কী সন্ধ্যারাতে। একই অবস্থা সারাক্ষণ। এমন কি গভীর রাতেও রক্ষা পাচ্ছে না রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের মানুষ। অসহনীয় হয়ে উঠছে বিদ্যুতের যন্ত্রণা। ভ্যাপসা গরমে নিদারুণ কষ্ট পাচ্ছে দেশবাসী।
‘গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। চাহিদার তুলনায় বর্তমানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস অর্ধেকও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে।
অন্যদিকে ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালানোর কারণে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তাই নতুন বিনিয়োগ করা নয়, বিদ্যমান উৎপাদন বিপর্যয় ঠেকানো নিয়েই মালিকরা এখন শঙ্কার মধ্যে আছেন। রপ্তানি আয়ের ৭৬ শতাংশ আসে পোশাক খাত থেকে। আর এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আছে কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের বস্ত্র খাত। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে এসব খাত এখন চরম সংকটের মধ্যে। তাই দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্যোক্তারা বলছেন, বিশ্বমন্দা কেটে যাওয়ায় রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলেও জ্বালানি সংকটে তা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। আর এ সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো।
বিদেশি ক্রেতারা এখন বেশি বেশি কাজ দিতে চায় বাংলাদেশকে। কিন্তু তারা সময়মতো কাজ দিতে পারবেন না বলে কাজ নিতে পারছেন না।
বেহাল দশা বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শিল্প স্থাপনের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করেও গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় বসে আছেন। উৎপাদনে না যেতে পারার কারণে দেশে কা´িখত লক্ষ্যমাত্রার কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
‘অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত বলেছেন, স্থানীয়ভাবে যাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, তারা ব্যর্থ হয়েছেন অদক্ষতার কারণে এবং তাদের ব্যর্থতার কারণেই দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। বিভিন্ন কোম্পানি চুক্তিবদ্ধ হয়েও নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না।’
পাঠক উপরের এই উদ্ধৃতিগুলো দুটি দৈনিকের। গত ৫-৬ দিন ধরে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের ওপর তাদের পরিবেশিত প্রধান (লিড নিউজ) খবর থেকে সংগৃহীত। অর্থমন্ত্রীর মন্তব্যটি ছিল তারও বেশ কিছু দিন আগের। আমার মনে হয়েছে, বিদ্যুৎ সংকটের বর্তমান তীব্রতার প্রভাব দেশবাসীর প্রাত্যহিক জীবনে, দেশের অর্থনীতিতে কি মাত্রায় গিয়ে পৌঁছেছে এবং এ সংকট কাটিয়ে উঠতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বর্তমান হালচাল বোঝার জন্য এই তিনটি উদ্ধৃতিই যথেষ্ট।
সরকার অবশ্য বিদ্যুতের বিপর্যয় রোধে চেষ্টা চালাচ্ছেন। এর জন্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ও বিদ্যুৎ আমদানির প্রশ্নে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর পক্ষে-বিপক্ষে রাজনৈতিক ও কারিগরি বিতর্কও রয়েছে। বলা হচ্ছে, ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মোকাবিলার জন্য সরকার নতুন উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের পরিবর্তে রেন্টাল পাওয়ার সংগ্রহের (আইপিপি) বা ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের দিকেই বেশি ধাবিত হয়েছে। এই রেন্টাল পাওয়ার কেন্দ্রগুলোর ওপর পিডিবির (পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন বোর্ড) দায় শতভাগ। কারণ পিডিবির নিজস্ব কেন্দ্রগুলো গ্যাসের অভাবে না চললেও চুক্তি মোতাবেক সরকার তাদের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে বাধ্য। তারা যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন করবে পিডিবি চুক্তি মোতাবেক উচ্চদরে কিনে নিতে বাধ্য। এর উত্তরে অর্থমন্ত্রী বললেন, দাম অনেক বেশি হলেও বিদ্যুৎ পেলেই স্বাগত জানাব। তারপরেও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছেন কী? পাচ্ছেন না। অর্থমন্ত্রী নিজেও তা স্বীকার করেছেন। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আর করারই-বা কি আছে এটাও আমরা স্বীকার করি।
বর্তমান অবস্থা সামাল দিতে সরকার বিদ্যুৎ নিয়ে কি ভাবছেন এবং ২০২০ সাল নাগাদ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে এবং সর্বোপরি দীর্ঘ মেয়াদে কি কি আঞ্চলিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে চায়, তা নিয়ে বেশি কিছু বলার নেই। ভবিষ্যৎই তা বলবে। আমাদের বক্তব্য ভিন্ন জায়গায়।
বিদ্যুৎ উৎপাদন একটি অতি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এর চাহিদা ক্রমবর্ধমান এবং বিনিয়োগ প্রচুর। সুইচ অন করলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় না। আবার নয়, দশ বা বারো মাসেরও ব্যাপার নয়। এর জন্য ব্যাপক অনুকূল বুনিয়াদ গড়ে তুলতে হয়। যাতে করে চাহিদা প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহও বাড়ানো সম্ভব হয়। সেটা যে শুধু অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়েই সম্ভব হবে এমন কোন কথা নেই। তা হতে পারে আমদানি বা হতে পারে আঞ্চলিক সহযোগিতাভিত্তিক কোন কাঠামো, যেখান থেকে বিদ্যুৎ আসবে। তার জন্য দরকার বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষমতা এবং দর কষাকষির জন্য দক্ষ রাজনৈতিক অবস্থানের।
এ রকমের একটি ভাবনা এবং তার প্রয়োগ আমাদের বিদ্যুৎ তথা জ্বালানি উৎপাদনের ইতিহাসে রয়েছে কী? বিদ্যুৎ সংকটের আজকের যে ভয়াবহতা তার জন্য কারা দায়ী এবং কাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে আজ দেশবাসী? না কোন দল বা ব্যক্তিকে দায়ী করছি না। এ পাপ আমাদের রাজনীতির। স্বাধীনতার পর থেকেই যে ভাবনাটা ভাবা দরকার ছিল, সে পথে আমরা যাইনি। আমরা উপলব্ধি করতে চাইনি, বিদ্যুৎ সভ্যতারই আরেক নাম। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যে দিয়ে যে রাজনীতিকে হত্যা করা হলো, যার ফল হিসেবে দেশ চলল উল্টো দিকে। আধুনিক সভ্যতার ভাবনা থেকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে সৃষ্টি করা হলো বিতর্ক এই সময়ের নেতৃত্বের প্রাজ্ঞ দূরদর্শিতার অভাবের ফলে বহুবছর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বুনিয়াদ গড়ে তোলার জন্য প্রত্যাশিত বিনিয়োগও হয়নি। কিছু কিছু সময়ের ব্যতিক্রম ছাড়া যা হয়েছে এবং হচ্ছে তা হলো ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা সামাল দিতে শুধু ‘এধারকা পানি ওধার, ওধারকা পানি এধার করা। যেমন খোদ রাজধানী শহরেই লোডশেডিং হচ্ছে ৪৭৫ মেগাওয়াট। পিডিবির হিসাব মতে সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে স্থাপনকালীন দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৬ হাজার ২৪৭ মেগাওয়াট ছিল, যা এখন ৫ হাজার ৬৮৫ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। সরকারি খাতের ১৯টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫৮টি ইউনিটের স্থাপনকালীন মোট উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৩ হাজার ৮১২ মেগাওয়াট। তা ৫৫০ মেগাওয়াট কমে ৩ হাজার ৩১৮ মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে। আর বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো নতুন হওয়ায় তাদের উৎপাদন ক্ষমতা তেমন কমেনি। সবচেয়ে পুরনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর প্রায় সবই পিডিবির আওতাধীন। পাঠক লক্ষ্য করুন, এর অধিকাংশই ২০ বছরের অধিক পুরনো। কিছু কেন্দ্রের বয়স ৩০ থেকে ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর সংরক্ষণকাজ সময়মতো করা হলে এসব পুরনো কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা আরও বাড়ানো যেত। সমস্যায় জর্জরিত দেশের বিদ্যুৎ খাতের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্র। সময়মতো সংস্কার না হওয়ায় যখন-তখন বসে যাচ্ছে ইউনিটগুলো। পিডিবি এর জন্য অর্থ সংকটকে দায়ী করেছে।
আমাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক অবহেলার এর চেয়ে আরও বড় প্রমাণের কোন দরকার আছে কী? বিদ্যুৎ উৎপাদনে অর্থ সংকট হয় কিন্তু উঁচু মহলের জৌলুসভরা জীবনের জন্য অর্থের সংকট হয় না। দারিদ্র্যের চেয়েও আমাদের আজ বড় শত্র“ বৈষম্য, তা তো এ সবের জন্যই হয়েছে। জাতীয় সম্পদ লুটপাটের প্রতি রাজনৈতিক ও দার্শনিক সমর্থনদান আমাদের রাজনীতির ধারাবাহিকতার প্রতিচ্ছবি। মোট কথা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রে চাহিদা, উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা, অভাব এবং দুর্নীতির একটি ঘোলাজল সৃষ্টি করা হয়েছে। যার প্রায়শ্চিত্ত এখন আমাদের করতে হচ্ছে। তবে এর সঙ্গে এখনো যে সেই ঘোলাজল সৃষ্টির অনুঘটক সক্রিয় নেই, তাও বলছি না। ইতিহাসই বলবে।
যার ফলে সেই আদ্দিকালের লক্করঝক্কর মার্কা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র দিয়ে আমাদের চলছে। তথ্য কী বলছে? বর্তমানে বন্ধ রয়েছে ১৩টি ছোট-বড় ইউনিট। এর মধ্যে একটি গ্যাস সংকটে, বাকি ১০টিই যান্ত্রিক ত্র“টির কারণে বন্ধ রয়েছে। এই ইউনিটগুলো চালু থাকলে জাতীয় গ্রিড আরও ৮৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বেশি পেত। শিকলবাহা ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গ্যাসের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না। আর যান্ত্রিক ত্র“টিসহ সংস্কার কাজের জন্য বন্ধ ইউনিটগুলো হচ্ছে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩ নম্বর ইউনিট, ঘোড়াশাল ২, ৫ ও ৬ নম্বর, টঙ্গী, খুলনা ১১০ মেগাওয়াট, বড় পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২ নম্বর ইউনিট, হরিপুর ৩, সিদ্ধিরগঞ্জ ১০৫ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট এবং আশুগঞ্জ স্টিম কেন্দ্রের ৪ নম্বর ইউনিট। সর্বশেষ গত ৪ তারিখ সকালে আশুগঞ্জ জিটি ১ ও স্টিম ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। এত পুরনো ক্ষয়িষ্ণু বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট দিয়ে আর কতকাল? এভাবেই জোড়াতালি দিয়ে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাটি চলেছে দশকের পর দশক ধরে। এখন একেবারেই ভেঙে পড়েছে। জোড়াতালি দেয়ারও আর জায়গা নেই। এই যে দশকের পর দশক ধরে জ্বালানি খাতের প্রতি অবহেলা এতে তো অতীত রাজনীতিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তা সামরিক শাসনই বলি, স্বৈরাচার বলি, আর নিখাদ সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির কথাই বলি। ফলাফল তো এসে দাঁড়ায় একই বিন্দুতে।
কার কার শাসনামলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বা কমেছে এই যে হিসাব রাজনীতির আক্রমণ পাল্টা আক্রমণে উঠে আসছে তা কিন্তু বিরাজমান উৎপাদন ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়েই করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন তো উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর, নতুন অবকাঠামো সংযোজনের এবং সে লক্ষ্যে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের। সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই জাতীয় রাজনীতির দায়িত্ব পালনের প্রশ্নটি বিচার্য হওয়া দরকার। যা হয়ে থাকে একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণকামী সুশাসনের দেশে। যার অর্থ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ সব উৎপাদিকা শক্তির বুনিয়াদ সম্প্রসারণের কাজটি চলবে নিরবচ্ছিন্নভাবে। সরকার বা রাজনীতির পরিবর্তনের পরেও। ফলে সরকারের পরিবর্তন হতে পারে, বিদ্যুৎসহ উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ প্রক্রিয়া থাকবে চলমান। আমাদের হয় উল্টো। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য নিষ্ঠুরভাবে সেই চলমানতাকে আমরা গলা টিপে হত্যা করি সরকার ও রাজনীতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে। এক জায়গায় দাঁড়িয়েই আমরা লেফট-রাইট করছি। বিরাজমান পুঁজির ওপর চাহিদার ক্রমাগত চাপে ভেঙে পড়ে সব কিছু। আজকের বিদ্যুৎ বিপর্যয় তারই প্রমাণ। আমাদের বিদ্যুৎ চাহিদা ৬ হাজার মেগাওয়াট বলা হলেও, বেসরকারি হিসেবে বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ৮ হাজার মেগাওয়াট।
এই পটভূমিতে বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা করছে। শুধু সংকট মোকাবিলা নয়, তার রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিশ্র“তি। তা হলো ২০২০ সালের মধ্যে দেশকে একটি গতিময় বিদ্যুৎ উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত করার। ইতোমধ্যেই ডিজেলচালিত ১০টি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে ভারতের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। এই সমঝোতার স্মারক অনুযায়ী চট্টগ্রাম ও খুলনায় দুটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। কয়লাচালিত এ দুটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা হবে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। দুটি প্রকল্পে প্রায় ১৩ হাজার ২০০ কোটি রুপি বিনিয়োগ হবে। এতে দুই দেশ সমান সমান বিনিয়োগ করবে। এ ছাড়াও রয়েছে উপমহাদেশীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তবে যে কথা শুরুতেই বলেছি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সংযোজন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এর অধিকাংশই প্রক্রিয়াই নির্বাচিত ৫ বছরমেয়াদি কোন সরকারের আমলে শেষ হতে পারে না। আমাদের রাজনীতির যে দৃষ্টান্ত অতীত থেকে চলে আসছে সেই পটভূমিতে সরকারের প্রাগ্রসর বিদ্যুৎ খাতের বিনিয়োগের সাফল্য ভবিষ্যৎই বলবে।
তবে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্য রেন্টাল পাওয়ার (আইপিপি) সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেয়াকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক চলছে এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশে কয়লা উত্তোলন প্রশ্নে যে বিতর্ক, তা সংশ্লিষ্টদের মতো আমাদের কাছেও স্পষ্ট নয়। এ নিয়ে খোলা বিতর্ক হওয়া দরকার। কথা হচ্ছিল এ নিয়ে পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান এ এন এম রিজওয়ানের সঙ্গে। তিনি বলেন, সীমাবদ্ধতার পরেও আমরা যেটুকু বিদ্যুতের মুখ আপাত দেখছি তা ওই রেন্টাল পাওয়ার সংগ্রহের কারণেই। আদ্দিকালের বিদ্যুৎ কেন্দ্র দিয়ে, এমন কি গ্যাস ফিল্ডগুলো পর্যন্ত আদ্দিকালের পুরনো তা দিয়ে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত জ্বালানির জোগান দিতে পারছে না। কারণ নতুন কোন গ্যাসকূপ বিগত আমলে খনন করা যায়নি।
বিদ্যুতের উৎপাদন খরচের প্রশ্নে রেন্টাল পাওয়ারের (আইপিপি) যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। পিডিবির গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় ১ দশমিক ৩০ টাকা থেকে ১ দশমিক ৫০ টাকা প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা। কিন্তু আইপিপি কেনে ৩ দশমিক ৫০ টাকা থেকে ৪ দশমিক ৫০ টাকা দরে। পিডিবির তেলচালিত কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় ৪.০০ থেকে ৫.০০ টাকা কিন্তু রেন্টাল পাওয়ার কেনে ১৩ দশমিক ৫০ থেকে ১৫ দশমিক ৫০ টাকা দরে। উৎপাদন ব্যয়ের এই পার্থক্যকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তা নিয়ে দুটো প্রশ্ন করা যায়।
এক. বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর যে হাল সেখানে উৎপাদনের আর্থিক ও সামাজিক ব্যয় হিসাব করা হয়েছে কি?
দুই. সুদূর অতীত থেকেই বলা যায়, বহু দশক ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির খাতে অর্থাৎ ক্যাপাসিটি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যেহেতু কা´িখত বিনিয়োগ হয়নি। সেখানে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা সামাল দিতে আইপিপি ও ক্যাপটিভ উৎপাদনের ওপর ভরসা করা ছাড়া গত্যন্তর আছে কী? মার্চ ২০০৮ এ এনার্জি বাংলার হিসাব মতে কলকারখানা, দোকানপাট এবং বাসাবাড়িতে ব্যক্তিগতভাবে স্থাপিত জেনারেটরের (ক্যাপটিভ) ক্ষমতা ছিল ১৮০০ মেগাওয়াট, যা বর্তমানে ২২০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। এই ব্যক্তিগত জেনারেটরগুলোই লোডশেডিংয়ের সময় ২০০০ মেগাওয়াট ঘাটতির অর্ধেক জোগান দেয়। সুতরাং শুধু টাকার অঙ্কে লাভ-লোকসানের হিসাবই যথেষ্ট নয়। সামাজিক ব্যয়টিও হিসাবে রাখা দরকার বলে মনে করি। তবে আর্থ-সামাজিক ব্যয়কে যদি রাজনীতির অভিধায় বিশ্লেষণ করা হয়, সেখানে তার অবস্থান আরো পরিষ্কার থাকা দরকার। বিদ্যুতের বিষয়টি যেখানে প্রগতি ও জাতিকে আলো-আঁধারে রাখার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত সেখানে বিষয়টি সুবিবেচনার সঙ্গে ভাবা দরকার। সেই আলোকেই, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে বিতর্ক তারও সমাধান দরকার। কয়লা উত্তোলন টানেল মাইনিং বা সুরঙ্গ খনি বা ওপেন পিট মাইনিং বা পুকুরখনি কোন পদ্ধতিতে হবে। এই বিতর্কের অবসান একমাত্র লাভ-ক্ষতির চুলচেরা বিবেচনার মাধ্যমেই সমাধান হতে হবে। সব পদ্ধতিরই সুযোগ রয়েছে। কয়লাখনিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জমি পুনরুদ্ধার করে তাদের ফিরে আসার সুযোগ দিতে হবে অথবা বিন্দুমাত্র ক্ষতি না করে অন্যত্র পুনর্বাসিত করতে হবে। আমরা মনে করি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো একটি ইস্যুর রাজনৈতিক বিতর্ক বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ও এগিয়ে যাওয়ার প্রশ্নকে ঘিরেই হওয়া দরকার। আর তা হতে হবে উন্মুক্ত, পরিষ্কার এবং ঋজু। কোন মতেই সেই বিতর্ক যেন পশ্চাৎপদ রাজনীতির বিকার দ্বারা আচ্ছন্ন না হয়ে পড়ে। আর সরকারকেও সুখী সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার স্কেচ স্পষ্টভাবে আঁকতে হবে। সবকিছুতেই করে দেব, করা হবে এ জাতীয় শব্দ ব্যবহারের ওজন ক্রমাগতই কমে আসছে। আর স্বপ্ন দেখানো নয়। এখন সময় করে দেখানোর। এখন ডেলিভারি দেয়ার সময়। কারণ ক্ষমতায় বসার দু-বছর প্রায় অতিক্রান্ত হতে যাচ্ছে। স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগে বিদ্যুতের কা´িখত পর্যায়ে চাহিদা মেটানোর উদ্যোগকে আমরা সমর্থন না করে পারছি না। সে ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী যে অদক্ষতার প্রশ্নটি তুলেছেন, আমরা তাতে উদ্বিগ্ন।
লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
0 comments:
Post a Comment