বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স : দিগন্তের অমর অশ্ব
ড. ফোরকান আলী
অনেকের মনের আশা-নিরাশার দোলাচলে, আমাদের হজ ফাইটের প্রথম ফাইট মাটি ছেড়ে আকাশে উড়লো। এর এক মাস বাদে ১০ নভেম্বর অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে শেষ হলো হজ ফাইট পরিচালনের প্রথম পর্যায়। বিমানের সর্বস্তরের কর্মচারীর চোখে তাই আনন্দাশ্র“। অসাধ্য সাধন করেছেন তারা। টানা ৩২ দিনের নিরলস পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা বয়ে এনেছে সাফল্যের সংবাদ। পরম করুণাময়ের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। রেকর্ড সংখ্যক দেশবাসীকে হজ পালনে জেদ্দা পাঠিয়ে ইতিহাস গড়লো বিমান!
বাংলাদেশ থেকে এবার ৯৫ হাজার বাংলাদেশী হজে যাবেন বলে ঘোষণা দেয়া হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে দায়িত্ব দেয়া হয় ৪৫ হাজার হজযাত্রী পরিবহনের জন্য। বাকি ৫০ হাজার হজযাত্রী পরিবহনের দায়িত্ব দেয়া হয় সৌদিয়াসহ ঢাকা থেকে চলাচলকারী ৯টি এয়ারলাইন্সকে। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে এই বিপুল পরিমাণ হজযাত্রী কিভাবে পরিবহন করবে তা নিয়ে শুরু থেকেই তৎপর ছিল বিমান। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন এই ভেবে যে, কি জানি কি হয়। বিমান ব্যবস্থাপনা অবশ্য শঙ্কিত ছিল না। তবে উদ্বোধনী ফাইট নিয়ে একটি সংকটই তৈরি হয়েছিল। অবশেষে অতি উচ্চ পর্যায়ের হস্তেেপ এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটে। বিমান ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত কৃতজ্ঞচিত্তে এ কথা স্মরণ করছে।
হজ কার্যক্রমের প্রথম পর্যায়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স মোট ৪৪ হাজার ৫৯২ হজযাত্রীকে জেদ্দা পৌঁছে দিয়েছে। বিমান এবং বাংলাদেশের জন্য এটি একটি রেকর্ড। এক মৌসুমে এতো বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশী আর কখনো হজ পালনে সৌদি আরব যাননি। বিমানের জন্য বেঁধে দেয়া হয়েছিল ৪৫ হাজার জন। অর্থাৎ বিমান পরিবহন করেছে নিদিষ্ট সংখ্যা থেকে মাত্র ৪০৮ জন কম। এটা অবশ্য ফাইট অথবা সিট সংকটের জন্য নয়। শেষের দিকে যাত্রী সংকট ছিল। এ কাজ নির্দিষ্ট সময়েই শেষ হয়েছে। একটানা ৩২ দিনে, গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪০০ হজযাত্রী জেদ্দা গেছেন। এ ছাড়া, আমাদের শিডিউল ফাইটেও হজযাত্রীরা নিয়মিতভাবে জেদ্দা পৌঁছেছেন। গোটা কার্যক্রমই ছিল অত্যন্ত সুবিন্যস্ত, সুশৃঙ্খল এবং সুসমন্বিত। এ কার্যক্রমে পরিচালিত হয়েছে মোট ১২৮টি ফাইট। প্রতিটি েেত্রই এর সুষ্ঠু তদারকির ব্যবস্থা ছিল, পরিকল্পনা থেকে বিপণনÑ বাদ যায়নি কোনো ছোটখাটো বিষয়ও।
বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের এই ৩২ দিন কিন্তু ঘটনাবিহীন ছিল না। যাত্রাপথ মসৃণ ছিল না। নজিরবিহীন এবং অনাকাক্সিত একটি ঘটনা আমাদের চলার পথকে সমস্যাসঙ্কুল করে তুলেছিল বৈকি। আল্লাহপাকের দরবারে লাখো শুকরিয়া। অযাচিত এবং অপ্রীতিকর এ সমস্যার ত্বরিত সমাধান হয়ে যায়।
বস্তুত এ সংকটেও বিমান কখনো ‘গ্রাউন্ডেড’ হয়নি। সমস্যা ক্রমশ যখন সংকটে রূপ নেয়, তখনো কিছু কিছু ফাইটের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনে, কিছু ফাইট বাতিল করে বিশেষ ব্যবস্থায় বিমানকে সচল রাখা হয়। এই ব্যবস্থায় সাময়িকভাবে কিছু যাত্রীর ভোগান্তি হলেও, ধৈর্য এবং সাহসের সঙ্গে সকল যাত্রী ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় সংকট কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হয় বিমান। গত এক মাস আমাদের জন্য ঘটনাবহুল ছিল। অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ আরো এক ঘটনা ঘটে যায় এই সময়ে আমাদের বিমানে। এই প্রথমবারের মতো আমরা দীর্ঘ ৩৯ বছর অপোর পর, আমাদের প্রোডাক্ট সরাসরি গ্রাহকের টেবিলে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছি। আমাদের রিজার্ভেশন সিস্টেমকে অনলাইনে নিয়ে গেছি ‘ইন্টারনেট বুকিং ইঞ্জিন (আইবিই)’ চালু করার মাধ্যমে। গত ১ নভেম্বর, ২০১০ থেকে এই ইন্টারনেট বুকিং সিস্টেম চালু করা হয়েছে বিমানে। একটি ওয়েব সাইটের সাহায্যে যাত্রীরা এখন তাদের পছন্দের ফাইটে টিকেট বুকিং দিয়ে সিট কনফার্ম করতে পারবেন। একই সঙ্গে ফাইটে তার জন্য পরিবেশনযোগ্য খাবারের অর্ডারও দিতে পারবেন। আমাদের সম্মানিত যাত্রীর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটাতে পেরে আমরাও যারপরনাই আনন্দিত। প্রাথমিকভাবে ‘সফট লঞ্চ’ আকারে এটি প্রবর্তিত হয়েছে। আগামী ৪ জানুয়ারি (বিমানের জন্মদিন) থেকে এটি পরিপূর্ণভাবে আত্মপ্রকাশ করবে। আর তখন থেকে টিকেটের মূল্য অনলাইনে পরিশোধ করা যাবে। তবে আপাতত মূল্য পরিশোধের জন্য কোনো বিমান কাউন্টারে যেতে হবে। উভয় েেত্রই যাত্রী শতকরা ৫% কমিশন পাবেন। ৪ জানুযারি থেকে অনলাইনে বুকিং দেয়া যাত্রীরা নিজস্ব ক্রেডিট কার্ডে মূল্য পরিশোধ করবেন। ইন্টারনেট প্রযুক্তি জীবনকে কতোই না সহজ করে দিচ্ছে প্রতিদিন। নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে ক্রমশ আমাদের জীবন ও কর্মপদ্ধতি। ইন্টারনেট বুকিং চালু করতে আমাদের ওয়েবসাইটকে নতুন সাজে সাজানো হয়েছে। আমাদের সকল যাত্রী, শুভানুধ্যায়ীদের আমন্ত্রণ জানাই এটি দেখার জন্য। (িি.িনরসধহ-ধরৎষরহবং.পড়স )
আমাদের বিমান বহরকে যুগোপযোগী ও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর আমরা। সিডিউল রেগুলারিটি নিশ্চিত করা এবং যাত্রী পরিবহনের মতা বাড়াতে দুটি বোয়িং ৭৭৭-২০০ লিজ নেয়ার জন্য ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের জ্বালানি সাশ্রয়ী এ দুটি জাহাজ আগামী মাসেই আমাদের বহরে যোগ দেবে। অপর একটি বোয়িং ৭৭৭ সংগ্রহের জন্য জোর চেষ্টা চলছে। তিনটি নতুন প্রজন্মের বোয়িং ৭৭৭ বহরে যুক্ত হলে আমাদের সিট ক্যাপাসিটি বাড়বে, যাত্রীর অভিযোগ হ্রাস পাবে, সর্বোপরি, দূরপাল্লার যাত্রায় তা বিমানের সমতাকে বাড়িয়ে তুলবে নিঃসন্দেহে।
বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিয়ে সা¤প্রতিক সময়ে নানা অপপ্রচারের অবতারণা হয়েছে। একটি আধুনিক, যুগোপযোগী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বদ্ধপরিকর। এ ল্েয সা¤প্রতিক সময়ে কেনা হয়েছে শত কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি, নিয়োগ করা হয়েছে আবশ্যকীয় জনবল, ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে যথাযথ প্রশিণ নিশ্চিত করার। একটি মহল দীর্ঘদিন যাবৎ লাভজনক এই ব্যবসাটি হাতিয়ে নেয়ার জন্য তৎপর। ঢাকা থেকে চলাচলকারী দেশী-বিদেশী সকল এয়ারলাইন্সকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রদান করার জন্য জাতীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমানের বিকল্প থাকতে পারে না। কারণ বাংলাদেশে একমাত্র বিমানেরই আছে প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞতা। আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের কথা নাই বা বললাম। এ প্রসঙ্গে বিমান কার্গো কমপ্লেক্সের বিষয়টিও প্রণিধানযোগ্য। কারণ একই অবস্থা বিরাজমান কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের েেত্রও। এ ব্যবসাটি পাওয়ার জন্য তৎপর একটি সুসংবদ্ধ গোষ্ঠী। আমরা জানি কার্গো কমপ্লেক্সে আমাদের কর্মদতা বাড়ানো জরুরি, চেষ্টাও চলছে। আমদানি-রপ্তানি উভয় শাখাতে অবকাঠামোর উন্নয়ন অত্যাবশ্যক। নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করার মাধ্যমে চুরি ও মাল লোপাট অবসান হওয়া সকলের কাম্য। কার্গো কমপ্লেক্স তথা বিমানবন্দরের এক শ্রেণীর অসাধু ব্যক্তির সহায়তায় এসব চুরি ও মাল খোয়া যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এমনকি ওষুধ শিল্পের জন্য আমদানিকৃত কাঁচামালও পাচার হয়ে যাচ্ছে। এটা নিশ্চয়ই নিছক চুরির কোনো ঘটনা নয়। কারণ এ ধরনের কাঁচামাল অবৈধ কোনো পন্থায় ক্রয় করার জন্য নিশ্চয়ই কোনো উৎসাহী মহল জড়িত। জনশ্র“তি আছে যে, ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল যারা চুরি করেন তারা ‘পাকা চোর অতিশয়’। আর এর দুটো কারণ এক. শুল্ক কর্তৃপকে এড়িয়ে চলা; দুই. হ্যান্ডলিং সংস্থার কাছ থেকে তিপূরণ দাবি করা।
ঊনচল্লিশ বছর আগে জাতির এক ক্রান্তিলগ্নে বিজয়ের আমেজে জন্ম নিয়েছিল বিমান। নিঃসীম নীলিমায় ডানা মেলে দিতে তার সময় লেগেছিল খানিকটা। কারণ একদম শুরুতে তার না ছিল কোনো বিমান, না ছিল অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ ও সুযোগ-সুবিধা, আকাশে উড়তে যার বিকল্প মেলে না। যা ছিল তার, তা কেবল ২৫০০ জনবল। অমিত প্রাণের উৎস হিসেবে যারা শিশু বিমানকে হাঁটি হাঁটি পা পা অবস্থা থেকে দিনে দিনে পৃথিবীর আকাশে উড়িয়ে দিয়েছে। পুব থেকে পশ্চিমÑ হংকং থেকে রোমÑ পৃথিবীর প্রধান প্রধান মহানগরসমূহ এখন বিমানের ডানার আওতায়। এখানেই থামবে না সে। দিগন্তের অমর অশ্ব বিমান, অসীমের নেশা তার ডানায় ডানায়।
লেখক: গবেষক
ড. ফোরকান আলী
অনেকের মনের আশা-নিরাশার দোলাচলে, আমাদের হজ ফাইটের প্রথম ফাইট মাটি ছেড়ে আকাশে উড়লো। এর এক মাস বাদে ১০ নভেম্বর অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে শেষ হলো হজ ফাইট পরিচালনের প্রথম পর্যায়। বিমানের সর্বস্তরের কর্মচারীর চোখে তাই আনন্দাশ্র“। অসাধ্য সাধন করেছেন তারা। টানা ৩২ দিনের নিরলস পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা বয়ে এনেছে সাফল্যের সংবাদ। পরম করুণাময়ের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। রেকর্ড সংখ্যক দেশবাসীকে হজ পালনে জেদ্দা পাঠিয়ে ইতিহাস গড়লো বিমান!
বাংলাদেশ থেকে এবার ৯৫ হাজার বাংলাদেশী হজে যাবেন বলে ঘোষণা দেয়া হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে দায়িত্ব দেয়া হয় ৪৫ হাজার হজযাত্রী পরিবহনের জন্য। বাকি ৫০ হাজার হজযাত্রী পরিবহনের দায়িত্ব দেয়া হয় সৌদিয়াসহ ঢাকা থেকে চলাচলকারী ৯টি এয়ারলাইন্সকে। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে এই বিপুল পরিমাণ হজযাত্রী কিভাবে পরিবহন করবে তা নিয়ে শুরু থেকেই তৎপর ছিল বিমান। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন এই ভেবে যে, কি জানি কি হয়। বিমান ব্যবস্থাপনা অবশ্য শঙ্কিত ছিল না। তবে উদ্বোধনী ফাইট নিয়ে একটি সংকটই তৈরি হয়েছিল। অবশেষে অতি উচ্চ পর্যায়ের হস্তেেপ এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটে। বিমান ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত কৃতজ্ঞচিত্তে এ কথা স্মরণ করছে।
হজ কার্যক্রমের প্রথম পর্যায়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স মোট ৪৪ হাজার ৫৯২ হজযাত্রীকে জেদ্দা পৌঁছে দিয়েছে। বিমান এবং বাংলাদেশের জন্য এটি একটি রেকর্ড। এক মৌসুমে এতো বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশী আর কখনো হজ পালনে সৌদি আরব যাননি। বিমানের জন্য বেঁধে দেয়া হয়েছিল ৪৫ হাজার জন। অর্থাৎ বিমান পরিবহন করেছে নিদিষ্ট সংখ্যা থেকে মাত্র ৪০৮ জন কম। এটা অবশ্য ফাইট অথবা সিট সংকটের জন্য নয়। শেষের দিকে যাত্রী সংকট ছিল। এ কাজ নির্দিষ্ট সময়েই শেষ হয়েছে। একটানা ৩২ দিনে, গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪০০ হজযাত্রী জেদ্দা গেছেন। এ ছাড়া, আমাদের শিডিউল ফাইটেও হজযাত্রীরা নিয়মিতভাবে জেদ্দা পৌঁছেছেন। গোটা কার্যক্রমই ছিল অত্যন্ত সুবিন্যস্ত, সুশৃঙ্খল এবং সুসমন্বিত। এ কার্যক্রমে পরিচালিত হয়েছে মোট ১২৮টি ফাইট। প্রতিটি েেত্রই এর সুষ্ঠু তদারকির ব্যবস্থা ছিল, পরিকল্পনা থেকে বিপণনÑ বাদ যায়নি কোনো ছোটখাটো বিষয়ও।
বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের এই ৩২ দিন কিন্তু ঘটনাবিহীন ছিল না। যাত্রাপথ মসৃণ ছিল না। নজিরবিহীন এবং অনাকাক্সিত একটি ঘটনা আমাদের চলার পথকে সমস্যাসঙ্কুল করে তুলেছিল বৈকি। আল্লাহপাকের দরবারে লাখো শুকরিয়া। অযাচিত এবং অপ্রীতিকর এ সমস্যার ত্বরিত সমাধান হয়ে যায়।
বস্তুত এ সংকটেও বিমান কখনো ‘গ্রাউন্ডেড’ হয়নি। সমস্যা ক্রমশ যখন সংকটে রূপ নেয়, তখনো কিছু কিছু ফাইটের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনে, কিছু ফাইট বাতিল করে বিশেষ ব্যবস্থায় বিমানকে সচল রাখা হয়। এই ব্যবস্থায় সাময়িকভাবে কিছু যাত্রীর ভোগান্তি হলেও, ধৈর্য এবং সাহসের সঙ্গে সকল যাত্রী ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় সংকট কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হয় বিমান। গত এক মাস আমাদের জন্য ঘটনাবহুল ছিল। অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ আরো এক ঘটনা ঘটে যায় এই সময়ে আমাদের বিমানে। এই প্রথমবারের মতো আমরা দীর্ঘ ৩৯ বছর অপোর পর, আমাদের প্রোডাক্ট সরাসরি গ্রাহকের টেবিলে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছি। আমাদের রিজার্ভেশন সিস্টেমকে অনলাইনে নিয়ে গেছি ‘ইন্টারনেট বুকিং ইঞ্জিন (আইবিই)’ চালু করার মাধ্যমে। গত ১ নভেম্বর, ২০১০ থেকে এই ইন্টারনেট বুকিং সিস্টেম চালু করা হয়েছে বিমানে। একটি ওয়েব সাইটের সাহায্যে যাত্রীরা এখন তাদের পছন্দের ফাইটে টিকেট বুকিং দিয়ে সিট কনফার্ম করতে পারবেন। একই সঙ্গে ফাইটে তার জন্য পরিবেশনযোগ্য খাবারের অর্ডারও দিতে পারবেন। আমাদের সম্মানিত যাত্রীর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটাতে পেরে আমরাও যারপরনাই আনন্দিত। প্রাথমিকভাবে ‘সফট লঞ্চ’ আকারে এটি প্রবর্তিত হয়েছে। আগামী ৪ জানুয়ারি (বিমানের জন্মদিন) থেকে এটি পরিপূর্ণভাবে আত্মপ্রকাশ করবে। আর তখন থেকে টিকেটের মূল্য অনলাইনে পরিশোধ করা যাবে। তবে আপাতত মূল্য পরিশোধের জন্য কোনো বিমান কাউন্টারে যেতে হবে। উভয় েেত্রই যাত্রী শতকরা ৫% কমিশন পাবেন। ৪ জানুযারি থেকে অনলাইনে বুকিং দেয়া যাত্রীরা নিজস্ব ক্রেডিট কার্ডে মূল্য পরিশোধ করবেন। ইন্টারনেট প্রযুক্তি জীবনকে কতোই না সহজ করে দিচ্ছে প্রতিদিন। নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে ক্রমশ আমাদের জীবন ও কর্মপদ্ধতি। ইন্টারনেট বুকিং চালু করতে আমাদের ওয়েবসাইটকে নতুন সাজে সাজানো হয়েছে। আমাদের সকল যাত্রী, শুভানুধ্যায়ীদের আমন্ত্রণ জানাই এটি দেখার জন্য। (িি.িনরসধহ-ধরৎষরহবং.পড়স )
আমাদের বিমান বহরকে যুগোপযোগী ও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর আমরা। সিডিউল রেগুলারিটি নিশ্চিত করা এবং যাত্রী পরিবহনের মতা বাড়াতে দুটি বোয়িং ৭৭৭-২০০ লিজ নেয়ার জন্য ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের জ্বালানি সাশ্রয়ী এ দুটি জাহাজ আগামী মাসেই আমাদের বহরে যোগ দেবে। অপর একটি বোয়িং ৭৭৭ সংগ্রহের জন্য জোর চেষ্টা চলছে। তিনটি নতুন প্রজন্মের বোয়িং ৭৭৭ বহরে যুক্ত হলে আমাদের সিট ক্যাপাসিটি বাড়বে, যাত্রীর অভিযোগ হ্রাস পাবে, সর্বোপরি, দূরপাল্লার যাত্রায় তা বিমানের সমতাকে বাড়িয়ে তুলবে নিঃসন্দেহে।
বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিয়ে সা¤প্রতিক সময়ে নানা অপপ্রচারের অবতারণা হয়েছে। একটি আধুনিক, যুগোপযোগী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বদ্ধপরিকর। এ ল্েয সা¤প্রতিক সময়ে কেনা হয়েছে শত কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি, নিয়োগ করা হয়েছে আবশ্যকীয় জনবল, ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে যথাযথ প্রশিণ নিশ্চিত করার। একটি মহল দীর্ঘদিন যাবৎ লাভজনক এই ব্যবসাটি হাতিয়ে নেয়ার জন্য তৎপর। ঢাকা থেকে চলাচলকারী দেশী-বিদেশী সকল এয়ারলাইন্সকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রদান করার জন্য জাতীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমানের বিকল্প থাকতে পারে না। কারণ বাংলাদেশে একমাত্র বিমানেরই আছে প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞতা। আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের কথা নাই বা বললাম। এ প্রসঙ্গে বিমান কার্গো কমপ্লেক্সের বিষয়টিও প্রণিধানযোগ্য। কারণ একই অবস্থা বিরাজমান কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের েেত্রও। এ ব্যবসাটি পাওয়ার জন্য তৎপর একটি সুসংবদ্ধ গোষ্ঠী। আমরা জানি কার্গো কমপ্লেক্সে আমাদের কর্মদতা বাড়ানো জরুরি, চেষ্টাও চলছে। আমদানি-রপ্তানি উভয় শাখাতে অবকাঠামোর উন্নয়ন অত্যাবশ্যক। নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করার মাধ্যমে চুরি ও মাল লোপাট অবসান হওয়া সকলের কাম্য। কার্গো কমপ্লেক্স তথা বিমানবন্দরের এক শ্রেণীর অসাধু ব্যক্তির সহায়তায় এসব চুরি ও মাল খোয়া যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এমনকি ওষুধ শিল্পের জন্য আমদানিকৃত কাঁচামালও পাচার হয়ে যাচ্ছে। এটা নিশ্চয়ই নিছক চুরির কোনো ঘটনা নয়। কারণ এ ধরনের কাঁচামাল অবৈধ কোনো পন্থায় ক্রয় করার জন্য নিশ্চয়ই কোনো উৎসাহী মহল জড়িত। জনশ্র“তি আছে যে, ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল যারা চুরি করেন তারা ‘পাকা চোর অতিশয়’। আর এর দুটো কারণ এক. শুল্ক কর্তৃপকে এড়িয়ে চলা; দুই. হ্যান্ডলিং সংস্থার কাছ থেকে তিপূরণ দাবি করা।
ঊনচল্লিশ বছর আগে জাতির এক ক্রান্তিলগ্নে বিজয়ের আমেজে জন্ম নিয়েছিল বিমান। নিঃসীম নীলিমায় ডানা মেলে দিতে তার সময় লেগেছিল খানিকটা। কারণ একদম শুরুতে তার না ছিল কোনো বিমান, না ছিল অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ ও সুযোগ-সুবিধা, আকাশে উড়তে যার বিকল্প মেলে না। যা ছিল তার, তা কেবল ২৫০০ জনবল। অমিত প্রাণের উৎস হিসেবে যারা শিশু বিমানকে হাঁটি হাঁটি পা পা অবস্থা থেকে দিনে দিনে পৃথিবীর আকাশে উড়িয়ে দিয়েছে। পুব থেকে পশ্চিমÑ হংকং থেকে রোমÑ পৃথিবীর প্রধান প্রধান মহানগরসমূহ এখন বিমানের ডানার আওতায়। এখানেই থামবে না সে। দিগন্তের অমর অশ্ব বিমান, অসীমের নেশা তার ডানায় ডানায়।
লেখক: গবেষক
0 comments:
Post a Comment