বোরো চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষক
ড.ফোরকান আলী
দেশে প্রধান খাদ্য ফসল- আউশ, আমন ও বোরো ধান আবাদের জমির পরিমাণ বাড়ছে না। সেচ ব্যয় ও সাশ্রয়ী বালাই ব্যবস্থাপনার কারণে কৃষকরা বোরো’র পরিবর্তে গম আবাদে সা¤প্রতিককালে কিছুটা আগ্রহী হয়ে উঠছে। ডিজেল নির্ভর সেচ ব্যয় ও কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধির সাথে ব্যয়বহুল বালাই ব্যবস্থাপনায় সারের অতিরিক্ত মূল্য বোরো আবাদের জমির পরিমাণ বৃদ্ধিতে প্রধান অন্তরায় হয়ে উঠেছে। এর সাথে ধানের দর পতনে কৃষকদের আগ্রহ ধরে রাখা যাচ্ছে না। অপরদিকে নিজ দেশীয় উচ্চ ফলনশীল বীজের পরিবর্তে রোগ বালাইয়ের প্রবণতা সম্পন্ন ভিন দেশী ‘নেরিকা’ নামের আউশ উৎপাদনে কৃষকদের প্রণোদনা প্রদানের ফলে সেদিকেও ঝুঁকছে না কৃষকগণ। এমনকি আমন আবাদ ও উৎপাদন এখনো পরিপূর্ণভাবে প্রকৃতি নির্ভর থাকায় তার জমির পরিমাণও প্রায় একই অবস্থানে স্থির রয়েছে গত কয়েক বছর ধরে। তবে দুবছর আগের তুলনায় বিগত মওসুমে দেশে আমন আবাদ যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে।
বাংলাদেশ গোটা বিশ্বে ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে ইতোমধ্য ৪র্থ স্থানে উঠে আসলেও এখনো হেক্টর প্রতি গড় ফলন ৪.০১ টন। প্রতিবেশী ভারত ও মায়নমারসহ বেশ কিছু উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের চেয়ে কিছুটা বেশী। তবে চীন, জাপান, কোরিয়া ও ভিয়েতনামে এর ফলন ৫ থেকে ৬ টনের মত। কিন্তু অধিক উৎপাদনশীল অনেক উন্নত জাতের এবং পরিবেশ সহনশীল ধান ও সেচাবাদের আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পরেও আমাদের দেশের ৭০ লাখ হেক্টর চাষযোগ্য জমির মধ্যে এখনো সেচাবাদের আওতাধীন জমির পরিমাণ মাত্র ৫০ লাখ হেক্টরেরও নিচে।
বরিশাল কৃষি অঞ্চলসহ দেশের কয়েকটি এলাকাতে চলতি মওসুমে ল্যমাত্রার পেছনে রয়েছে বোরো আবাদ। চলতি মওসুমে দণিাঞ্চলের ১১ জেলায় ৩ লাখ ২৯ হাজার ৩৪ হেক্টরে বোরো আবাদের ল্যমাত্রার বিপরীতে সর্বশেষ ও চূড়ান্ত হিসেবানুযায়ী আবাদ হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ২৮০ হেক্টরে। যা ল্যমাত্রার ৯৮.৭৭%। বিগত ২০১২-১৩ মওসুমে দণিাঞ্চলে ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৫০ হেক্টরের ল্যমাত্রার বিপরীতে বোরো আবাদের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ২৯ হাজার ৬৪ হেক্টর। উৎপাদন ছিল প্রায় ১৩লাখ ৭৪হাজার টন চাল। এর আগের বছর, ২০১১-১২ মওসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলের ১১টি জেলায় ৩লাখ ৫৫ হাজার ৪৩ হেক্টরে বোরো আবাদের ল্যমাত্রার বিপরীতে প্রকৃত আবাদ ছিল ৩ লাখ ৬৮ হাজার ২৬ হেক্টর। যা ছিল ল্যমাত্রার ১০৩.৬১% বেশী। কিন্তু সেখান থেকে চলতি মওসুমে দণিাঞ্চলে বোরো আবাদ প্রায় ৪৩ হাজার হেক্টর হ্রাস পেয়ে ৩ লাখ ২৫ হাজার ২৮০ হেক্টরে নেমেছে। আমাদের দেশে বোরো ধান সামগ্রিকভাবে ইতোমধ্যেই প্রধান খাদ্য ফসল হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। কৃষি স¤প্রসারণ অধিদফতরের মতে ১৯৫০-৫১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চালের মোট উৎপাদন ছিল ৬২ লাখ টন। বীজ ও সব ধরনের অপচয় বাদে চালের নীট প্রপ্তি ছিল ৫৬ লাখ টনের কাছাকাছি। সে সময়ের ৪ কোটি ২১ লাখ জনসংখ্যার দৈনিক মাথাপিছু ৪৫৪ গ্রাম হিসেবে খাদ্য শষ্যের প্রয়োজনীয়তা ছিল ৬৭ লাখ ৩০ হাজার টন। ১৯৬৮ সাল থেকে দেশে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট-‘ইরি’ উদ্ভাবিত উফশী জাতের ধানের আবাদ শুরুর পরে ১৯৭৫ সালে চালের উৎপাদন দাড়ায় ১.০৭কোটি টনে। ২০১১-১২ অর্থ বছরে এর উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৩৫ লাখ ৪১ হাজার টনে। যার মধ্যে ঐ সময়ে বোরো ধান থেকে চালের প্রাপ্তি ছিল ১ কোটি ৮৭ লাখ টনের মত।
১৯৬৮ সালে ‘আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট-ইরি’ থেকে উচ্চ ফলনশীল-উফশী জাতের ধান ‘আই আর-৮’ বীজ সংগ্রহ করে আমাদের দেশে প্রথমবারের মত বোরো ধান আবাদের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৭০ সালে ‘বাংলাদেশ ধান গবেষনা ইনস্টিটিউট-ব্রি’ প্রতিষ্ঠিত হবার পরে এপর্যন্ত প্রায় ৬০টি বিভিন্ন ধরনের ইনব্রীড ও হাইব্রীড জাতের ধান বীজ উদ্ভাবন করেছে। যার মধ্যে ২৯টির মত ইনব্রীড ও হাইব্রীড জাতের বোরো ধানের বীজ রয়েছে। এমনকি ২০০৮-০৯ সালে দেশে আবাদকৃত উচ্চ ফলনশীল-উফশী ধানের ৭৫ ভাগই আমাদের ‘ব্রি’ উদ্ভাবিত বিভিন্ন ধরনের জাতের আবাদ হয়েছে। এসময়ে দেশের উৎপাদিত মোট ধানের ৮৭ ভাগই ছিল ব্রি উদ্ভাবিত উফশী জাতের ধান থেকে ।
এদিকে ডিজেলের ওপর ভর্তুকি প্রত্যাহার সহ ইউরিয়ার মূল্য বৃদ্ধির সাথে ধানের দর সংগতিপূর্ণ না হওয়ায় কৃষকদের আর্থিক সংকট কাটছে না। ফলে দণিাঞ্চল সহ দেশের অনেক এলাকার কৃষকই এখন বোরো আবাদে উৎসাহ হারাতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবীদগণ। গত কয়েক বছর ধরেই মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা প্রতিমণ বোরো ধান ৬শ টাকায়ও বিক্রী করতে পারছেন না। অথচ এর উৎপাদন ব্যায় সাড়ে ৬শ’ টাকারও ওপরে। উপরন্তু গত মওসুমে ডিজেলের দাম লিটার প্রতি আরো ৬টাকা এবং বিদ্যুতের দাম গত দুবছরে প্রতি ইউনিটে প্রায় ২৫ ভাগ বেড়েছে। উপরন্তু বিদ্যুতের চেয়ে ডিজেলের সাহায্যে সেচ ব্যায় বেশী হলেও কোন ভতর্’কি নেই। অথচ ২০০৩ সাল থেকে সেচকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতে ২০% রেয়াত দিচ্ছে সরকার। কৃষি মন্ত্রনালয়ের মতে আমাদের দেশে এখনো বোরা উৎপাদনে সেচ ব্যায় ২৮%। যা ভিয়েতনামে ৬%, থাইল্যান্ডে ৮% ও ভারতের মরু প্রবণ পাঞ্জাবে ১৩%।
এদিকে ২০১১-১২ মওসুমে দেশে প্রায় ৩.৬০ লাখ হেক্টরে আবাদের মাধ্যমে প্রায় ৯.৫০ লাখ টন গম উৎপাদন হয়। যা ২০১২-১৩ মওসুমে ৪.৪৩ লাখ হেক্টরে উন্নীত হয়। উৎপাদন ছিল প্রায় ১০.৬০ লাখ টন। আর চলতি মওশুমে দেশে প্রায় সোয়া ৪ লাখ হেক্টরে গম আবাদের লমাত্রার বিপরিতে প্রায় ৫ লাখ হেক্টরে তার আবাদ সম্পন্ন করেন কৃষকগন। উৎপাদনও ১২ লাখ টন অতিক্রম করার ব্যাপারে আশাবাদী মাঠ পর্যায়ের কৃষিবীদগন।
অপরদিকে দেশের সর্বত্র আউশ আবাদ সম্ভব নয়। দণিাঞ্চল সহ কিছু কিছু জেলায় সর্ব মোট প্রায় ১০ লাখ ৫১ হাজার হেক্টর জমিতে আউশের আবাদ হলেও উৎপাদনও ২৪ লাখ টনের নিচে। কৃষিবীদগনের মতে, দেশের অন্তত অর্ধেক এলাকার কৃষি জমি আউশ আবাদ অনুকুল নয়। ফলে বোরো’র পরিবর্তে আউশ আবাদে উৎসাহিত করে কতটা সুফল পাওয়া যাবে তা এখনো পরিস্কার নয়। কিন্তু কৃষি মন্ত্রনালয় গত কয়েক বছর ধরে আফ্রিকান ‘নেরিকা’ নামের এক ধরনের আউশ ধানের বীজ ও কিছু সার প্রনোদনা হিসেবে কৃষকদের মধ্যে বিতরন করে এর আবাদকে উৎসাহিত করতে চেষ্টা করেও তেমন কোন সফলতা আসছেনা। শুধুমাত্র অপোকৃত নিচু এলাকা হিসেবে বিবেচিত দনিাঞ্চলেই আউশ আবাদ স¤প্রসারন সম্ভব বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবীদগন। ২০১১-১২ সালে দেশে ১১ লাখ ৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে অউশের আবাদ হলেও ২০১২-১৩ সালে তা ১০.৫৩ লাখ হেক্টরে হ্রাস পায। আর সবশেষ চলতি মওশুমে তা আরো প্রায় ২হাজার হেক্টর হৃাস পেয়ে ১০.৫১ লাখ হেক্টরে হ্রাস পেয়েছে।
অপরদিকে গত তিন বছরে আমনের উৎপাদনও খুব একটা অগ্রগিত লাভ করছে না। ২০১১-১২ মওসুমে দেশে আমনের আবাদ হয়েছিল ৫৫.৮০ লাখ হেক্টরে। ২০১২-১৩ মওশুমে এর আবাদ পায় ৩০ হাজার হেক্টর বৃদ্ধি পেয়ে ৫৬.১০ লাখ হেক্টরে উন্নতি হয়। কিন্তু গত মওশুমে দেশে আমন আবাদে ব্যাপক ধ্বস নামে। আগের মওশুমের তুলনায় প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর আবাদ হ্রাস পেয়ে গত মওশুমে দেশের অন্যতম প্রধান খাদ্য ফসল আমনের আবাদ ৫৫.৩০ লাখ হেক্টরে নেমেছে।
কষিবীদদের মতে, কোন অবস্থাতেই আউশ আবাদে উৎসাহ দেয়ার বিপরীতে বোরো আবাদকে প্রত্য ও পরোভাবে নিরুৎসাহিত করা ঠিক হবেনা। কারন কৃষকরা গত ৪০বছরে বোরো আবাদের যে সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে এবং এর সাথে অভ্যস্থ ও প্রশিতি হয়েছে, সেখান থেকে তাদের অন্যদিকে সরিয়ে নেয়া কৃষি অর্থনীতির জন্য মোটেই সুখকর হবে না। আমন ও আউশ আবাদ বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার নামে কোন অবস্থাতেই বোরো আবাদকে অবহেলার পরিনাম দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বরে মনে করছেন কৃষি-অর্থনীতিবীদগণ।
অপরদিকে ব্রি ইতোমধ্যে রোপা ও বোনা আউশ-এর ২৩টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করলেও কৃষি মন্ত্রনালয় কি কারনে আফ্রিকান প্রজাতির নেরিকা নামের বীজ কৃষকদের মাঝে সরবারহ করছে, তার সঠিক কারনও কেউ বলছেন না। তবে বোরো’র পরিবর্তে আউশ চাষ উপযোগী অঞ্চলেও ঐ জাতের বীজ আবাদ স¤প্রসারন সহ স্থলাভিষিক্ত করতে ন্যূনতম ১০-১৫ বছর সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন দায়িত্বশীল মহল। আমরা আশাকরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে সংশিশ্লষ্ট কতৃপ পদপে নেবে। লেখক: গবেষক
Saturday, April 11, 2015
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
0 comments:
Post a Comment