বাংলাদেশকে নিয়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর শীতল যুদ্ধ!
ড.ফোরকান আলী
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারতের মতো বৃহৎ শক্তিগুলোর শীতল যুদ্ধেেত্র পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ। নিজ স্বার্থ রার্থে দেশগুলো মরিয়া। কারো সাথে বৈরিতা নয়, সবার সাথে বন্ধুত্ব নীতি বজায় রাখতে গিয়ে মাঝখানে নাজুক অবস্থানে বাংলাদেশ। ভারতের সাথে এ মুহূর্তে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ভালো সম্পর্ক বলে দাবি করছে সরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও নিরাপত্তা সংলাপের বেড়াজালে সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে। সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমন, নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা এবং জাতিসংঘ শান্তিরা কার্যক্রমসহ বঙ্গোপসাগর এর নিরাপত্তা রায় বাড়ছে মার্কিন অংশগ্রহণ। অন্যদিকে পররাষ্ট্রনীতিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাবেক ৪ দলীয় সরকারের নীতি ছিল ’রোড টু ইস্ট’ বা পূর্বমুখী কূটনীতি। বর্তমান সরকারও ভিন্ন নামে একে বলছে রিজিওনাল কানেকটিভিটি। ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের সুযোগ হাতছানি দিচ্ছে। বাড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের সুযোগও। বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া নীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, মিয়ানমারের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সে গুরুত্ব আরো বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার মতো সমুদ্র উপকূলের ছোট দেশগুলোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক হয়ে ওঠেছে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।এসব দেশের নৌবাহিনীর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে। ভবিষ্যতে তা আরো বাড়বে বলে আভাস দিচ্ছে মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব। তারা ঢাকাকে যেমন দেখছেন না দিল্লীর চোখে, তেমনি নাইপিডোকে দেখছে না বেইজিংয়ের চোখে। ফলে ছোট ছোট এসব দেশের গুরুত্ব যেমন বাড়ছে, তেমনি ঝুঁকিও বাড়ছে। আঞ্চলিক শক্তি বিশেষ করে ভারত চায় না এ অঞ্চলের ছোট দেশগুলো সামরিক শক্তি বাড়–ক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ সর্ম্পককেও ভারত দেখছে সন্দেহের চোখে। মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ওয়াশিংটন চাইছে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের সর্ম্পক ঘনিষ্ঠ হোক। এখানে রয়েছে দিল্লীর আপত্তি, মিয়ানমার ও আসিয়ানের দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সর্ম্পকের েেত্র ভারতের রয়েছে অনাগ্রহ। কারণ এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির েেত্র ভারত নির্ভরতা আর থাকবে না। বঙ্গোপসাগরের রণকৌশলিক গুরুত্ব এবং সর্বোপরি রাশিয়া ও চীনের সাথে ভারতের ব্রিকস গঠন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আর ‘ভারতের চোখ’ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখার স্থানে রাখেনি।
অপরপে ২০১২ সালেই এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ঘোষণা অনুযায়ী ২০২০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের মোট যুদ্ধজাহাজের ৬০ শতাংশই এ অঞ্চলে মোতায়েন করা হবে। এক দিকে মার্কিন রণতরী বাড়ানোর ঘোষণা, অপর দিকে ভারতকে ঘিরে রেখে চীনের নৌ-উপস্থিতি বাড়ানোয় উদ্বিগ্ন ভারত। বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের আগ্রহ এবং বাংলাদেশের নৌবাহিনীর সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বাড়ানোকেও ভারত ভালোভাবে নিতে পারছে না।বাংলাদেশ যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ চীন আক্রমণের জন্য। তেমনি চীনের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ আত্মরার জন্য। আর, ভারতের কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ শুধু একটি নয়, তিনটি কারণে। প্রথমতঃ চীনের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে আত্মরা, দ্বিতীয়তঃ চীনকে পালটা আক্রমণ করা; এবং তৃতীয়তঃ পূর্বাঞ্চালীয় রাজ্যগুলোকে ভারতীয় ফেডারেশনের মধ্যে ধরে রাখা। ভারত তাই বঙ্গোপসাগরে ও বাংলাদেশে মার্কিন বা অন্য যেকোনো শক্তির উপস্থিতি সহ্য করবে না। সম্প্রতি চীন ও বাংলাদেশ ২০৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি স্বার করেছে, যেখানে বাংলাদেশ দুটি ‘মিং’ সাবমেরিন পাবে। ভারত এ চুক্তির কঠোর সমালোচনা করেছে এবং বেইজিংয়ের কাছে এ চুক্তির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। আসন্ন এ হুমকির কথা চিন্তা করে ভারতীয় নৌবাহিনী কিছু পদপে নিয়েছে। প্রথম পদপে হিসেবে ‘সাগর’ দ্বীপে তারা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ঘেঁষে মিসাইল ব্যাটারি স্থাপন করবে। উপরন্তু, তারা গভীর সমুদ্রবন্দরের সংস্কার কার্যক্রম অনেক জোরেশোরেই করছে যেন যুদ্ধজাহাজগুলো সেখানে নোঙর করতে পারে। পরবর্তীতে তারা সাগর দ্বীপে ভূমি থেকে জাহাজে, ভূমি থেকে আকাশে নিপেণযোগ্য মিসাইল ব্যবস্থা স্থাপন করবে। ভারতের প্রতিরা মন্ত্রণালয় বঙ্গোপসাগরে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ করেছে।এ-পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান দুই পরাশক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী। চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের ব্যাপারে ভারত সন্দিগ্ধ। তাই সে কখনও চীনকে হুমকি মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এবং কখনও যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি মনে করে চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এ-দোলচালের মধ্যে ভারত যে রণকৌশলিক অবস্থানটা স্থির রাখতে চায়, তাহলো বঙ্গোপসাগরে নিজেকে ছাড়া অন্য কোনো বৃহৎশক্তিকে প্রবেশ করতে না দেয়া। এ অবস্থার মধ্যে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে চীনের উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিনিধিরা আগামী মাসে ঢাকা আসছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বেইজিং সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে চীনা কর্তৃপ। বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লী জুন গত বুধবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে এ বিষয়গুলো তুলে ধরেন। চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক এই মুহূর্তে খুবই চমৎকার। দু’দেশের রাজনৈতিক ও মানুষে মানুষে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে আগামী মাসের শুরুতে ঢাকা আসছেন চীনের ন্যাশনাল কংগ্রেসের ভাইস চেয়ারপারসন এবং চীনের ন্যাশনাল মিলিটারি কমিশনের ভাইস চেয়ারপারসন। এছাড়া চলতি বছরের শেষের দিকে চীনের পানি সম্পদ বিষয়ক ভাইস মিনিস্টার ঢাকা সফর করবেন। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ আগামী মাসের শেষের দিকে বেইজিং সফর করবেন। তিনি বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিতব্য ‘এশিয়া কনফিডেন্স বিল্ডিং সামিট’-এ অংশ নেবেন। লী জুন বলেন, বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারের (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোর বিভিন্ন েেত্র দু॥দেশের সহযোগিতাকে আরো উন্নত করবে। এ অর্থনৈতিক করিডোরে কুনমিংয়ের সাথে চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ একটি মৌলিক বিষয়। সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তির পর গত এক বছরে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নত হয়েছে। মিয়ানমার এখন বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোরকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। উল্লেখ্য, বিসিআইএমে বর্তমান প্রস্তাবিত রুটে কলকাতা থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত রুটটি পশ্চিমবঙ্গ থেকে যশোর-ঢাকা-সিলেট হয়ে আবারো আসামের সিলচরে মিশেছে। এর পর তা মিয়ানমারের মান্দালা হয়ে কুনমিং পৌঁছেছে। এর ফলে অর্থনৈতিক করিডোরের আওতায় বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট পেয়ে যায় ভারত। কিন্ত বাংলাদেশ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে এ রুটটি ঢাকা থেকে টেকনাফ হয়ে মিয়ানমারের চাকতোর (কোয়াক কো) মধ্য দিয়ে কুনমিং পৌঁছতে চাইছে। বাংলাদেশ কোয়াক কোর সাথে যুক্ত হতে পারলে সহজেই কুনমিংয়ের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে, কেননা চীন আগে থেকেই এ যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে বিশাল বিনিয়োগ করেছে। ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনাও এ আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির ব্যাপারে খুবই আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে।চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, বিসিআইএমভুক্ত দেশগুলোর কোনোটি কয়লায় সমৃদ্ধ। আবার কোনোটি জলবিদ্যুতের সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকট কম-বেশি সব দেশেই আছে। তাই বিসিআইএমে বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা গুরুত্ব পাওয়া উচিত। রাষ্ট্রদূত বলেন, চীন আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৫০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। বাংলাদেশও এ থেকে লাভবান হতে পারে। গত এক বছরে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ দ্বিগুণ হয়ে ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। পানিসম্পদ খাতে বাংলাদেশের সাথে সহযোগিতা জোরদার করার ল্যকে সামনে রেখে চীনের একজন ভাইস-মিনিস্টার আগামী জুন অথবা জুলাইয়ে আসছেন। এ সময় ব্রহ্মপুত্র নদীর তথ্য-উপাত্ত বাংলাদেশের সাথে বিনিময় করা হবে। চীন-যুক্তরাষ্ট্রে সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন েেত্র সহযোগিতার পাশাপাশি প্রতিযোগিতাও রয়েছে। চীন সা¤্রাজ্যবাদ বা আগ্রাসী নীতি অনুসরণ করে না। তবে চীনের রাষ্ট্রীয় অখ-তা বা এক চীন নীতির প্রতি অন্যদের শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। চীনের সাথে ভারতের সম্পর্ক বিষয়ক অপর একটি প্রশ্নের জবাবে জুন বলেন, ভারতের সাথে সীমান্ত নিয়ে কিছু বিরোধ রয়েছে যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। দুই দেশের দ্বিপীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দ্রুতগতিতে বাড়ছে। বিসিআইএম এশিয়ার দুই উদীয়মান শক্তির মধ্যে সহযোগিতার একটি ভালো উদাহরণ। বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা সামরিক সংলাপের আদলে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ফোরামে চীন আগ্রহী কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বহু বছর ধরেই বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সামরিক েেত্র আলোচনা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সফর বিনিময় চলছে। বাংলাদেশ আগ্রহী হলে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া যেতে পারে।এদিকে ঢাকায় বাংলাদেশ-মার্কিন ৩য় নিরাপত্তা সংলাপে মার্কিন ব্যুরো অব পলিটিক্যাল-মিলিটারী অ্যাফেয়ার্সের প্রিন্সিপাল ডেপুটি অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারী টম কেলী বলেছেন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা ও বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা রায় বাংলাদেশকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নৌবাহিনীকে আধুনিকায়ন করতে বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করতে ইচ্ছুুক বলেও জানান তিনি। উল্লেখ্য, ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ‘সমুদ্র জয়’ (মার্কিন কোস্ট গার্ড এর কাটার জার্ভিস নামে পরিচিত) নামক একটি জাহাজ এবং কোস্টগার্ডকেও কয়েকটি টহল যান সরবরাহ করেছে। তবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস এ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস)-এর সভাপতি প্রতিরা এবং নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মুনীরুজ্জামান এর মতে বঙ্গোপসাগরের কারণে ভারত মহাসাগরের জলসীমায় হওয়ায় বাংলাদেশ নিরাপত্তার কৌশলগত দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। আর বঙ্গোপাসাগরের কারণে ভারত মহাসাগরে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অধিকার রয়েছে। এ অবস্থানের কারণে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বিশেষ করে আন্তর্জাতিক েেত্র বাংলাদেশের যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তা নির্ভর করবে আমরা এর সুযোগ কতোটা নিতে পারবো তার উপরে। দু’ভাবে বাংলাদেশ এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে-এক্সেস কন্ট্রোল অথবা এক্সেস ডিনায়াল অর্থাৎ আমরা কাউকে এ সুযোগ দিতে পারি অথবা বঞ্চিতও করতে পারি। ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপারে তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে চীনের যতোই ভালো বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকুক না কেন, একটি বৈরিতার সম্পর্কতো রয়েই গেছে। চীনের এ ব্যাপারে তেমন উদ্বেগ না থাকলেও ভারতের দিক থেকে একটি বড় ধরনের উদ্বেগ এবং চিন্তা রয়েছে। বিশেষ করে তাদের যে বিরোধপূর্ণ সীমান্ত এলাকা রয়েছে অরুনাচল প্রদেশের সঙ্গে, সে বিষয়ে ভারত জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে। জেনারেল মুনীরুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের যে কৌশলগত দিক আছে, তার প্রধান বিষয় হচ্ছে, ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগর। বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগর ও বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে, সে প্রোপট বিবেচনায় পুরো বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, গভীর সমুদ্র নিয়ে একটি বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এেেত্র বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে জেনারেল মুনীরুজ্জামান বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রি-ব্যালান্সিং টুয়ার্স এশিয়া বা পিভ্যট্ টুয়ার্স এশিয়া অর্থাৎ এশিয়ার ভারসাম্যের পুনর্বিন্যাস-নীতির পরিপ্রেেিত এবং অন্যান্য দিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে, দণি এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব খুবই উন্নততর এবং উঁচু পর্যায়ে পৌছে গেছে। আর এটি হয়েছে এ কারণে যে, এটা একটি বিশাল অঞ্চল এবং এই অঞ্চলে দুইশ কোটি মানুষের বসবাস। এছাড়া দণি এশিয়ার অন্য যে বড় দেশ ভারত, বিশ্বের একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এর বাইরেও বিশ্বের সীমিত সংখ্যক পরমাণু শক্তিধর যে দেশগুলো রয়েছে, তারা দুটিই রয়েছে দণি এশিয়ায়। চীনের প থেকেও দণি এশিয়াকে নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থান দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর প্রথম নিদর্শন দেখতে পাই, যখন চীন সার্কের অবজারভার বা পর্যবেক হিসেবে যোগ দিয়েছে। আমার মতে চীনের সঙ্গে আমাদের যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাতে হালকা কিছু চিড় ধরলেও, বড় ধরনের কোনো ধস নামেনি। মেজর জেনারেল(অব.) মুনীরুজ্জামান বলেন, আগে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা আমাদের হিসাবে যেটা ওদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সেখানে বাংলাদেশ ডেস্ক বলে আলাদা কিছু ছিল না; ইন্ডিয়ান ডেস্কেরই অন্তর্গত ছিল বাংলাদেশ। নীতির নতুন পর্যায় বা গুরুত্বের কারণে এবার ২০১১ সাল থেকে আলাদা করে বাংলাদেশ ডেস্ক খোলা হয়। মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিতে নতুন এক বয়ান হাজির হয় “পার্টনারশিপ ডায়লগ”। এই অঞ্চলের সব দেশের সাথে আমেরিকা “পার্টনারশিপ ডায়লগ” নামে চুক্তির জন্য তৎপর হয়ে উঠতে দেখছি আমরা। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই “পার্টনারশিপ ডায়লগ” বিষয়ক চুক্তিতে স্বারকারী। ধরনের দিক থেকে “পার্টনারশিপ ডায়লগ” এর ফোকাস অর্থনৈতিক নয়, বরং স্ট্রাটেজিক, অর্থাৎ সামরিক ও রাজনৈতিক।উল্লেখ্য, গত ৫ জানুয়ারি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের জন্য আলাদা ডেস্ক চালু হয়েছে। যা আগে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে একই ডেস্কে (বিএসএম) ছিল। এখন দেশ দুটিকে ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নির্ধারিত ডেস্কের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এর নাম দেয়া হয়েছে এসএমঅ্যান্ডআইওআর বিভাগ। ভারতের এই পদেেপর মধ্যে তাদের পররাষ্ট্র নীতিতে বাংলাদেশের বিষয়ে আরো বেশি মনোযোগ দেয়ারই ইংগিত দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। লেখক: গবেষক
0 comments:
Post a Comment