অচেনা প্রতিবিম্ব
অচেনা প্রতিবিম্ব
অপরুদ্ধ
আয়নার কি অবিকল প্রতিবিম্ব পড়ে। অবিকল ঠিক ঠিক চেহারা দেখা যায়। মনে হয় না। যদি দেখা যেত তাহলে আয়নার লোকটাকে চিনতে পারছেনা কেন অতু? সে খুবই অবাক। অতি সম্প্রতি বাবার কিনে দেয়া স্যুটটা গায়ে চড়ানোর পর নিজেকে আর চিনতে পারছেনা অতু। অবাক কাণ্ড! নিজেকে কেমন যেন ভারিক্কি টাইপের মানুষ বলে মনে হচ্ছে।
টাইয়ের নটটা ঠিক করতে গিয়ে থেমে গেল অতু।
এই, দেখতো নটটা ঠিক মত করতে পারছিনা।
তুমিতো কোন কাজই ঠিকমত করতে জাননা। অসম্ভব মায়াবী কন্ঠে বলল রীপা। ভালবাসার দুই সমুদ্র ওর দুই চোখে।
‘কিছু কিছু কাজ আমি কখনোই শিখতে চাইনা।’
‘তা হবে না বুড়ো খোকা। নিজের কাজ নিজেকেই করতে হবে।’
‘না করলে কি করবে। মারবে! মার....না।’ আদুরে গলায় বলল অতু। আয়নায় অতু ভেংচি কাটছে স্যুটেড-বুটেড অতুকে। কেজানে সত্যি সত্যি রীপা এমন করে অতুর টাইয়ের নট বেঁধে দিত কিনা। আচ্ছা অতুর কল্পনা আর বাস্তবতার মাঝে এত অমিল হল কেন! আয়নার অতুকে প্রশ্ন করল বাইরের অতু। দুষ্টুমী ভরা চোখে অসম্ভব মমতায় রীপা যদি ওর টাইয়ের নট ঠিক করে দিত তাহলে এমন কি তি হত পৃথিবীর!
‘অতুব, বাবা রেডী হয়েছিস?’ মার কথায় সচকিত হল অতু।
‘এইতো মা। আচ্ছা মা, দেখতো এখনো আমাকে তোমার পাগল ছেলে
‘কে বলল তুই আমার পাগল ছেলে। তুই আমার রাজা ছেলে’ পরম মমতায় অতুকে জড়িয়ে ধরলেন মা।
‘মা, তোমার চোখে পানি।’
দ্রুত আঁচলে চোখ মুছলেন মা। কই নাতো। চোখে কিছু পড়েছে বোধহয়।’
অতুকে দেখে খুশীতে টগবগিয়ে উঠল বাবা। ইয়েস মাই সান। ইউ আর লুকিঙ লাইক আনক্রাউন্ড প্রিন্স।’
বাবার কথা শুনে হেসে ফেলল অতু। কেন বাবা, মুকুটটা কি হারিয়ে গেছে না কেউ এসে লুট করে নিয়ে গেছে।’
‘আমার ছেলের মাথার মুকুট নিয়ে যায় কার সাধ্য! চল এখন আমরা নাস্তার টেবিলে যাই।
‘চল বাবা।’
‘হ্যাপী অফিস গোয়িং ডে, ভাইয়া।’ গ্লডিওলাস ফুলে সাজানো ফুলেল তোড়া বাড়িয়ে ধরে বলল রীতা।ওমা, ফুয়াদও দেখি হাজির। চান্সটা ভালোই নিয়েছে। কাচুমাচু ভংগেিত ড্রয়িংরুমের কোনায় দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা মাপচোঙের মত করে রেখেছে। সম্ভবত জড়তায়।
‘ভাইয়া, আপনাকে দারুন স্মার্ট লাগছে।’
‘থ্যাংক ইউ। ভালো আছ! হাত বাড়িয়ে দিল অতু। ভয়ংকর অস্বস্তি নিয়ে রোবটের মত কাজটা সারল ফুয়াদ। ও এখানে আসতেই চায়নি। একটা ফ্যামিলি অ্যারেনজমেন্ট। রীতার ধমক খেয়ে আসতে হল।
অবশ্য ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে না এসেতো উপায় নেই। চান্স পেলেই কেটে পড়তে হবে এটা মনে মনে ঠিক করে রেখেছে ফুয়াদ।
অতু প্রতিদিন তোর মা তোকে হাতে তুলে খাইয়ে দেয়। আজ একটা বিশেষ দিন। আজ আমি খাইয়ে দিব।’ এমন মুডে বাবাকে কখনো দেখেনি অতু। খুব মজা লাগছে ওর।
‘মা অনুমতি দিলে আমার আপত্তি নেই বাবা।’
‘তোর মার আপত্তি কে শুনছে।’
অতু নিশ্চিত অন্য সময় হলে মার রাগ ওঠে যেত। এক লাফে দুই সিঁড়ি টপকে উনি ওপরে চলে যেতেন। আশ্চর্য! আজ সেরকম কিছুই করছেন না। বরং মিটি মিটি হাসছেন।
‘তার আগে বাবা কেক কাটতে হবে।’
‘অবশ্যই অবশ্যই। ব্যবস্থা করা হোক।’ বাবার কন্ঠে সম্রাটের মত উত্তাপ। হঠাৎ অতুর মনে হল জীবনটা অনেক সুন্দর।
‘বাবার আমার কিন্তু লজ্জ্বা লাগছে। অবাক হয়ে গেল অতু। মনে করতে পারলনা এত সহজ করে বাবার সাথে এর আগে সে কোনদিন কথা বলেছিল কিনা।
‘আজ কেক কাটা হবে কিন্তু মোমবাতি জ্বলতে থাকবে। আমার অতুর ভালো আমি নিভতে দিবনা।’ ঘোষণার মত করে বললেন বাবা।
‘অতু কেক কাটছে। হ্যাপী অফিস গোয়িং ডে.... হ্যাপী হ্যাপী ভেরি হ্যাপী অফিস গোয়িং ডে। আনন্দে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বাচ্চা ছেলেদের মত সুর করে গাইছেন বাবা। নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না অতু। এত আনন্দ! এত আনন্দ! আর সেই আনন্দের উপসর্গ আতাউল্লাহ অতু।
..............
বিশেষ ভংগীমায় গাড়ীর দরজা খুলে দাঁড়ালো বাচ্চু। মনে হল যেন কোন রাজা, বা রাজপুত্রকে অভিভাদন জানাচ্ছে। ওর চোখে মুখে তৃপ্তির ছাপ। সবাই এত ভালোবাসে অতুকে! এই ভালবাসার ঋণ শোধ করার চেষ্টা বৃথা। শুধু অনুভব করে যেতে হবে। মনে মনে ভাবল অতু।
‘অতু, বিজনেস ইস্যুতে আমি তোমাকে কোন ব্রিফ করতে চাইনা। সবকিছু তোমাকে বুজে শুনে নিতে হবে। নিজের মত করে হ্যান্ডেল করতে হবে। আমি চাই ওয়ার্ম আপ থেকে ফাইনাল দৌড় সব তোমার মত করে হবে।
‘বাবা, আমাকে তুমি করে বলছ। অস্বস্তি লাগছে।’
‘হা হা। আমার লাগছেনা। আজ-তুমি দিবস। তাছাড়া আমার কোম্পানীর সেকেন্ড ইন কামন্ডকে তুই করে বলঅ ভালো দেখায়না। হা হা....।’
এত খুশী বাবা এর আগে কখনো হয়েছেন কিনা ভেবে পেলনা অতু।
‘কিন্তু....।’
‘কোন কিন্তু নেই। তুমি আমার ছেলে বিকেল পাঁচটার পর।’
‘ঠিক আছে বাবা।’ ভেতরে ভেতরে খুব মজা পাচ্ছে অতু বাবার কাণ্ড কারখানায়। না জানি অফিসে গিয়ে কী ঘটনা ঘটান!
‘হ্যাপী অফিস জয়েনিং ডে স্যার।’ বাবার পি এস লিসা অনেগুলো গোরাপ একসঙ্গে বাঁধা একটা তোড়া বাড়িয়ে ধরল অতুর সামনে।
গোলাপ কখনোই অতুর প্রিয় ফুল ছিল না। কিন্তু আজ ভাল লাগছে। মনে হচ্ছে গোলাপ পৃথিবীর শ্রেষ্ট ফুল এবং লীসার দেয়া গোলাপগুলো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কালেকশন। সুনীলের ১০৮ টা নীল গোরাপের সৌন্দর্য এই লাল গোলাপের কাছে কিছুই না। বাবা দেখছি অফিসের সব এমপ্লয়ীকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। দুই পাশে সারি করে। মন্ত্রী টাইপের সম্বর্ধনা। বাবার অফিসের এমপ্লয়ীরা তো বেশ সপ্রতিভ, স্মার্ট্ এর আগে কখনো ভালো করে দেখা হয়নি। সর্বনাশ! বাবা আবার ব্যাণ্ড পার্টির ব্যসস্থা করেন নিতো। ভাবতেই এক সমুদ্র অস্বস্তি এসে ভর করল অতুকে। অবশ্য এই অস্বস্তিকে অসুক নেই।
বাবা যেখানে বসেন তার পাশের কামরায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অতুকে। নেমপ্লেটের নীচে লেখা ম্যানেজিং ডিরেকটর। আবারো লজ্জ্বা পেল অতু। ভেতরে ঢুকতেই দুই পাশ থেকে বেজে উটল মাউথ অরগান। এবার অবাক হবার পালা অতুর। মাউথ অরগান এর পছন্দের বাদ্যযন্ত্র এটাতো বাবার জানার কথা না।
তাহলে....কে বলল?
মাউথ অরগানে চমৎকার সুর তোলা হচ্ছে। অসম্ভব সুন্দর করে সাজানো কামরাটায় ঢেউ খেলে বেড়াচ্ছে সুরের মূর্ছণা। মুগ্ধ বিস্ময়ে অতু বলল
‘বাবা........।’
শ্রাগের মত ভংগী করে বাবা বললেন ‘আমি জানি, অতু।’
কত বড় হবে কামরাটা! দশ বাই বারো, নাকি চৌদ্দ-আঠার। তার চেয়েও বেশী, নাকি কম। ান্য সময় হলে কাউকে গজ ফিতা নিয়ে আসতে বলত অতু অথবা নিজেই নিয়ে এসে মাপামাপি শুরু করে দিত। এখন বোধহয় কাজটা করা ঠিক হবেনা। অতু কি বদলে গেছে নাকি বদলে যাচ্ছে! মিনিট দশেক হল বাবা বেরিয়ে গেছেন অতুর রুম থেকে। এর পর আর কেউ আসেনি এখন পর্যন্ত। হতে পারে বাবারই পরিকল্পনা। অতুকে একটা থাকতে দিচ্ছেন কিছুণ। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে নিজেকে ধাতস্থ করতে।
কতদিন হবে, তিন মাস নাকি ছমাস? না তার চেয়েও বেশী। ঠিক মনে করতে পারছেনা অতু। কি করে বদেল যাচ্ছে সব কিছু। আজকে সকালে দাঁত ব্রাশ করতে গিয়ে টিউব ভরা পেষ্ট পেয়েছে। দাঁত দিয়ে কলবল করে রক্ত বেরোয়নি ব্রাশের ঘষা লেগে। বেসিনে তেলাপোকও পড়ে ছিল না। না কি ছিল! দেখায় কোন ভুল হয়েছে। ডাক্তাররা কি মাথার মগজ বের করে অন্যের মগজ ঢুকিয়ে দিয়েছে নাকি চোখ বদলে দিয়েছে।
কী সব ভাবছে অতু। ঝট করে ওঠে দাঁড়ালো সে। চলে গের চেয়ারের ঠিক পেছনটায়। ঘুরিয়ে দিল ওটাকে। দেখতে বেশ সুন্দরতো চেয়ারটা। বাবা কি স্পেশাল অর্ডার দিয়ে তৈরি করিয়েছে এটা। অনলি ওয়ান পিস। হতে পারে। বাবা তার লজিক্যাল ছেলেল জন্য স্পেশাল অর্ডার দিয়ে বানাতেই পারেন এটা।
দেয়ালে ভীষন একটা পেইনটিং। সুন্দর কিন্তু দুবোর্ধ্য। আকর্ষনীয় কিন্তু ছভুঁতে গেলেই হারিয়ে যাবে। শিল্পী কি বোঝাতে চাইছেন। নীচের দিকে ছোট্ট একটা ক্যাপশন। রোড টু অ্যাচিভমেন্ট-কমিটমেন্ট। কমিটমেন্ট। বাট টু হোম, টু হোয়াট। ঝাঁ ঝাঁ প্রশ্নটা বাড়ি খাচ্ছে অতুর মগজে।
পেইন্টিংটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে এক ধরনের ঘোর লেগে যেত অতুর।
‘তোমাকে ধন্যবাদ।’
‘কেন?’
‘এমনিই।’
‘এখনো রহস্য করবে। সহ্য হয়না।’
‘তোমাকে আজকের ভুমিকায় সত্যি ভাল লাগছে।’
‘মন রাখার মত কথা বলছ।’
‘আমি কি সেরকম?’
‘সেরকম ছিলেনা। ‘কিন্তু হয়ে গেছ।’
‘তোমার সব ধারণা ঠিক হবে?’
‘হয়তো। হয়তো বা না।’
‘অন্তত্ টো ঠিকন া।’
‘কোনটা।’
‘এই যে বললে আমি তোমার মন রাখার মত কথা বললাম।’
‘বলনি?’
‘ধর বললামইবা। তাতে কী? তোমাকে তো সত্যি ভাল রাগছে। নির্ভরতা এই গুণটি তোমার সাথে যোগ হল।’
‘তোমার কাজতো আমার দোষ ধরা গুণ আবিষ্কার করা নয়।’
‘কে বলল?’
‘তুমি বলেছিলে। এলোমেলো আমাকে তোমার পছন্দ। গোছানো আমি তোমার কাছে অসহ্য।’
‘বলেছিলাম নাকি! ভুল বলেছি। বিশ্বাস কর।’
‘কোনটা বিশ্বাস করব। তোমাকে না তোমার কথাকে।’
‘দুটো কি আলাদা?’
‘নিশ্চিত করে জানি না।’
‘এত ভেবোনাতো।’
‘কি করব! ভাবতে ভাল লাগছে।’
‘এই ভাল লাগাটা ভুলতে হবে তোমার। অতু, তোমার কাছে অনেক প্রত্যাশা।’
‘কার?’
‘তোমার মার বাবার। তোমাকে ঘিরে থাকা সবার।’
‘আর তোমার!’
‘আমি তো তোমাকে ঘিরে নেই।’
‘ঠিক বলেছো। তুমি আজ অস্তিত্বে, আমার আমিতে।’
‘তাই বুঝি?’
‘আবারো রহস্য করে কথা বলছ।’
‘তোমার দেবার মত ানে কিছু আছে। তোমার জীনবটা পার্কে বাদাম বিক্রেতার মত নয়।’
‘সে তো অনেক ভাল। সবার সুখে সহায়ক।’
‘হালকা কথা বলছ। এখন তোমাকে এটা মানায না।’
‘কি মানায় আমাকে! তোমাকে ভুলে থাকা?’
‘মানুষতো ভুলের মধ্রেই থাকে। সত্যকে খুঁজতে গিয়ে ভুল করে। খুঁজে পেয়ে সত্যটাকে বুঝতে ভুর করে।’
‘তুমি অত বড় দার্শনিক কবে হলে?’
‘হা হা হা। সেতো তোমার জন্যে।’
‘বাহ্। আমার তাহরে একটা কিছু অর্জন আছে।’
‘অর্জনতো শুধু তোমারই। বাকী সবতো বিসর্জন।’
ক্রিং ক্রিং শব্দ। চমকে ওঠে ঘাড় ঘুরিয়ে অতু দেখল সাদা টেলিফোনটা বাজছে। ইন্টারকম সাধারণত লাল হয় বড় সাহেবদের। অতুর বাবার েেত্র ব্যতিক্রম। সাদা ফোন বাবার ফোন।
হ্যালো। দ্বিতীয়বার চমকালো অতু। ওর নিজের কন্ঠস্বর ওর কাছেই অচেনা মনে হল।
0 comments:
Post a Comment