Wednesday, April 15, 2015

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গতিশীলতা প্রয়োজন

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গতিশীলতা প্রয়োজন
ড.ফোরকান আলী
ছোট্ট একটি আয়তনের দেশ বাংলাদেশ। প্রায় ১৬ কোটির অধিক জনসংখ্যা নিয়ে এদেশটি আজ বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। জনসংখ্যার উর্ধ্বগতি দেশটিকে নানা সমস্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে। সেই সাথে দরিদ্র, আশ্রয়হীন ও দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে ীপ্রগতিতে। লাগামহীন সমস্যায় জর্জরিত এখন নগর ও গ্রাম্যজীবন। সমাজের বুকে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টির মতো নানা ঘটনা অহরহ ঘটছে, সমাজ জীবনের ভিতকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। নিত্যনতুন সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া বড়ই দুষ্কর। গবেষকদের মূল্যায়নে দেখা যায়, গত দুই যুগে দেশে মোট জনসংখ্যা ৪০ শতাংশ হারে বাড়লেও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৫২ শতাংশ হারে। ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গৃহহীন ও কর্মহীন মানুষের সংখ্যা। তথ্যমতে, বর্তমানে সারাদেশে ঘরহীন মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৪ হাজার। বেকার সমস্যা, খাদ্য সমস্যা সব দেশের সব প্রধান সমস্যার মূলে রয়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যা। কাজেই এ সমস্যাটির গুরুত্ব ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৪৩। আমেরিকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পপুলেশন কাউন্সিলের তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতিবছর বাংলাদেশে যোগ হচ্ছে ২৫ ল। এ হারে বাড়তে থাকলে আগামী ২০৩৭ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে কমপে ২১ কোটিতে পৌঁছবে। ২০৫১ সালে ২৮ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। ১৫ কোটি জনসংখ্যার চাপে নানা সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছে দেশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১Ðএ নামিয়ে আনলে ২০২০ সালে দেশের জনসংখ্যা দাঁড়াবে ১৮ কোটিতে। বাংলাদেশ ২০০৪ সালের জনসংখ্যা নীতিতে ২০১০ সালের মধ্যে টোটাল ফার্টিলিটি রেট বা টিএফআর (একজন নারীর প্রজনন বয়সে মোট সন্তান জন্মদান হার) ২.২Ðএ কমিয়ে আনার ল্যমাত্রা স্থির করে। ২ দশমিকে Ð প্রতিস্থাপন যোগ্য জন-উর্বরতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে তখন নীট প্রজনন হার হবে এক। বর্তমানে দেশের টিএফআর হচ্ছে ২ দশমিক ৭। এ ল্যমাত্রা অর্জিত হলে ২০৬০ সালে দেশের জনসংখ্যা স্থির হবে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত-আগামী দুই বছরে কাঙিত ল্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির উর্ধ্বগতি রোধ করতে হলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করাসহ বাল্যবিবাহ বন্ধে কঠোর পদপে নেয়া জরুরি। কিন্তু, দুঃখের বিষয় বিগত ৪ঠা জুন শীর্ষস্থানীয় একটি জাতীয় পত্রিকা “জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে” এমন একটি খবর প্রকাশিত হয়। সেই সঙ্গে গত ২৮শে জুন অপর একটি দৈনিকে আরেকটি খবর শিরোনাম হয়, “যৌতুকবিহীনের নামে গণ-বাল্যবিবাহ”। সত্যিকার অর্থেই খবর দু’টি জনসংখ্যা বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। দেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ১৯৬৫ সালে। আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যায়ে কার্যক্রমটি বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে সাধারণ মানুষের কাছে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিটিকে বেশ গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। কিন্তু বর্তমানে জনবলের, অভাব, ঔদাসীন্যতা, দুর্নীতির কারণে এই কার্যক্রমের গতিধারা (হতাশাব্যঞ্জক) নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সরকারের জাতীয় জনসংখ্যা-গবেষণা ও প্রশিণ ইনিস্টিটিউট (নিপোর্ট) পরিচালিত বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক এন্ড হেলথ সার্ভের রিপোর্টে বলা হয়, দেশের ৫৬ ভাগ নারী-পুরুষ জন্মনিরোধ ব্যবহার করে। তাছাড়া জন্মনিরোধক ব্যবহারে আগ্রহী ১৯ শতাংশ মানুষের কাছে তা পৌঁছায় না। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সূত্র জানায় ২০১৫ সালের মধ্যে কাঙিত টিএফআর অর্জিত হবে না বলে তারা জোর দিচ্ছেন “বিলম্বে বিয়ে বিলম্বে প্রথম সন্তান” এই শ্লোগানটিকে। শিতি বা শহুরে সমাজে আর্থিকভাবে সম দম্পতিরা একটি বা দু’টি সন্তান নিচ্ছে বিলম্বে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে এখনো বিয়ের গড় বয়স ১৫। দেশের ৬০ ভাগ নারী ১৮-১৯ বছরের মধ্যে মা হচ্ছেন। এটা একটা অশনি সংকেত। সন্তান ধারণের এ বয়স বাড়াতে না পারলে প্রজনন হার কমবে না। তাছাড়া এই যে আর্থিকভাবে সম দম্পতিদের একটি বা দু’টি সন্তান আর দরিদ্র সমাজে, বস্তিবাসীদের এখনো ৫/৬ টি সন্তান, ভবিষ্যতে এর ভারসাম্যহীনতার ফলাফলও আমাদেরকেই ভোগ করতে হবে। অশিতি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সু-শিতি জনগোষ্ঠীর সংখ্যাকে অতিক্রম করলে সমাজের বুকে অপকর্মের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাবে। সু-শিতি জনগোষ্ঠীকে কিছুতেই তারা শান্তিতে থাকতে দিবে না। আইন প্রয়োগ করে তা দমন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তর করা না গেলে, প্রতিটি কর্মম মানুষের হাতকে কর্মের হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করা না গেলে, সু-শিার মাধ্যমে বিবেকবোধকে জাগ্রত করতে না পারলে, কর্মেেত্র দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে বিশ্বের দরবারে দরিদ্র ও দুর্নীতিগ্রস্থ দেশ হিসেবে ধিক্কার পেতে থাকব আমরা। দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে না পারলে তা সর্বেেত্রই বোঝা হিসেবেই বিরাজ করবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে গতিসঞ্চার, বাল্যবিবাহ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা জরুরি প্রয়োজন। সেই সাথে প্রয়োজন জেনে নেয়া ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ চীন কি কৌশলে তাদের জনসংখ্যার ঊর্ধ্বগতিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। লেখক: গবেষক

0 comments:

Post a Comment