পয়লা বৈশাখে মাকে
ড.ফোরকান আলী
মা,তোমার চরণে কপাল রেখে শুরু করছি। হয়তো অনেক উদ্বিগ্ন হয়ে আছ আমার ভাল-মন্দ ভাবনায়। তোমার কুশল আমি কখনও জানতে চাইনে। কেন চাইনে জান মা? আমি জানি সব কিছু বুকের তলে চাপা দিয়ে মাটি কামড়ে পড়ে থাকার মতা তোমার অসাধারণ। তোমার সম্পদ-সম্মান সব কিছুর ওপর অভিঘাত এসেছে বারবার। তার পরও বিচলিত হওনি। হলেও এই অবাধ্য সন্তানকে বুঝতে দাওনি কখনও। অন্তত ৪০ বছর ধরে একই মাটি জোর করে আঁকড়ে ধরে পড়ে আছ। আমরা তো দেখেছি কতবার হাতের তলা থেকে পুরনো মাটি খসে গেছে আবার নতুন করে ধরেছ আরেক স্তর। নিজেকে সরতে দাওনি। আচ্ছা বল তো মা, সব হারিয়েও মাটি কামড়ে পড়ে থাকার অপূর্ব এই কৌশল তোমাকে কে শিখিয়েছিল? তার নাম বুঝি বাঙালি সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতি এখন তোমাদের মতো নিরুপায়দের সর্বংসহা হতে বলে আর সামর্থ্যবানদের পছন্দের জীবন বেছে নেয়ার জন্য প্রণোদনা দেয়। চূড়ান্তভাবে তা উন্মাদনার পর্যায়ে গেলেও চতুর ধ্বনি ব্যবসায়ীরা তাকে ‘স্বকীয়তা’ বলে প্রলেপ দিয়ে থাকেন। যাই হোক, তুমি হয়তো জান মা আজ পয়লা বৈশাখ। আমার বেশ মনে পড়ে ছোট বেলায় বাপ-চাচাদের বলতে শুনতাম ‘রাত পোহালে পয়লা বৈশাখ। লাঙল গরু ঠিক রাখতে হবে’। এমন রেওয়াজ হামেশায় চোখে পড়ত যে পয়লা বৈশাখ সকালে কৃষক øান করে পাক-পবিত্র হয়ে মুঠ বুনতে মাঠে যেতেন। সেদিন আবার বাড়িতে একটু ভাল-মন্দ খাবারের আয়োজনও হতো। তাহলে এ কথা বলাই যেতে পারে যে নববর্ষের উদ্বোধন হলো নতুন সৃষ্টির উদ্বোধন। নতুনের এই স্রষ্টা কারা? যাদের হাতে কর্ষিত মাটিতে ঘটে স্বপ্নের অঙ্কুরোদগম। সহজ কথায় যারা মাটি ছুঁয়ে জীবন কাটায়। যারা সৃষ্টি করে তোমার সন্তানের মতো হাজারো সন্তানের বেঁচে থাকার উপায়। এর পরও এদের নিয়ে কোনদিন পয়লা বৈশাখ হতে দেখেছ মা? আমার জানতে খুব ইচ্ছে করছে তোমার ছোট বেলার কথা। তোমার বাবার গ্রামে কি একদল সাফ ছুতোর ভদ্রলোক পয়লা বৈশাখের দিন বাঙালি সাজার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত হতো। আমার ছোট বেলায় আমাদের গ্রামে এমন দেখিনি। তবে বছরের শুরুতে স্বচ্ছতা আর শুভ্রতা দিয়ে দিন শুরুর প্রচেষ্টা মানুষের মধ্যে ছিল। আর এখন চারদিকে তাকিয়ে দেখ মা অস্বচ্ছ কালো কুচকুচে মনের মানুষগুলো সফেদ পাঞ্জাবির আড়ালে কত সুন্দর করে ঢেকে রাখছে তাদের কুৎসিত মনোবৃত্তি। তোমার আমার মতো বাঙালির জন্য এদের কতই না নাকি কান্না। এরা কেউ সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত না। নতুনের মিছিলের সহযাত্রী না। একেকটি বন্ধক রাখা আমানবিক আÍা।
শোন মা! এইখানে আমার মনে পড়ে গেল আমাদের অনেক আপন পড়শি জোহর চাচার কথা। এখন তার মুখে সাদা হয়ে যাওয়া এক গোছা দাড়ি। ঠিক সাদা বলা যাবে না। অযতœ আর অবহেলায় দাড়িগুলোর রঙ প্রায় তামাটে হয়ে গেছে। চোয়াল দুটো বসা, চোখ গেছে গর্তে ঢুকে। তরতাজা যৌবনে এই মানুষটি লাঙল-গরু নিয়ে রোজ সকালে মাঠে যেতেন। কত বৈশাখে কত েেত যে তিনি বীজ ছড়িয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। সেই সময়ে জোহর চাচার ছোট্ট মেয়ে সালমার চেহারা খুব মনে পড়ে। ধুলোমাখা গায়ে ল্যাংটা হয়ে ঘুরে বেড়াত। অপুষ্টিতে শরীরে চেয়ে পেটটি হয়ে উঠেছিল বড়। মিষ্টি কুমড়োর মতো মোটা। পাঁজরের হাড়গুলো গোনা যেত। সালমা এখন স্বামীর ঘর করে। ছেলেপুলেও হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির দাবি মেটাতে না পারায় মাঝে মধ্যেই বাপের বাড়িতে এসে দিন কাটাতে হয়। এরপরও জোহর চাচা সমানে সৃষ্টি করে চলেছেন মানুষের জন্য। আরও একজন মানুষের কথা মনে করিয়ে দেই, তিনি আমাদের আমিন দাদা। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষটি গ্যাস্ট্রিকের ব্যথায় একহাতে পেট চেপে ধরে আরেক হাতে নিড়ানি নিয়ে হয়তো আজ সকালেও যাবেন পরের েেত জন বেচতে। তোমার মনে পড়ে মা এক বৈশাখে বাশারের দোকানের হালখাতার কথা। যে দেনাদাররা টাকা মেটাতে যাননি মাইক লাগিয়ে তাদের নাম ডাকা হচ্ছিল। রাতের মধ্যে পাওনা পরিশোধ না করতে পারলে বাড়ির হাঁস-মুরগি, ছাগল পর্যন্ত ধরে আনার কথা জানানো হয়েছিল। ওই নামের তালিকায় আমিন দাদার নামও ছিল। জোহর চাচা, আমিন দাদা এদের বৈশাখ কতই না মধুর (!) তাই না মা! অথচ এদেরই তো হওয়ার কথা ছিল বাঙালির পহেলা বৈশাখের উদ্বোধক।
মাগো! তোমার দেয়া শিা অনুযায়ী অন্তত এতটুকু বলতে শিখেছি যে, নতুনের অবগাহনেই সংস্কৃতির উন্মেষ। বদ্ধ ডোবাখানায় এর বিকাশ নয়। অথচ আজ চারদিকে তাকিয়ে দেখ সভ্যতার উন্মেষ যাদের হাতে তাদের বিকাশকে যারা জোর করে রুদ্ধ করছে বাঙালি সংস্কৃতির লাটাই এখন তারাই ছাড়ছে আর গোটাচ্ছে। মস্তিষ্ক প্রসূত নতুন সব বিতর্কের বেড়াজালে আটকে দিচ্ছে বঞ্চিত স্রষ্টাদের ঐক্য।
রবীন্দ্রনাথের একটি গান আজ অনেক বেশি করে কানে বাজবে। ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো... তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে’। বৈশাখ তো আসবেই। মুমূর্ষুরে উড়িয়ে দেয়াও জরুরি। রবি ঠাকুর কোন মুমূর্ষুরে উড়াতে বললেন, আর উড়ে যাচ্ছে কোন মুমূর্ষু তা একবার ভেবে দেখ। হালখাতা খুলে বসে থাকা মহাজন বাশারের কাছে বৈশাখ আসে এক আমেজে আর দেনাদার নিঃস্ব আমিনের ঘরে পৌঁছে দেয় অন্য বারতা। ‘বৎসরের আবর্জনা’ দূর হবে কথা ছিল কিন্তু সেই আবর্জনার হাতেই পিষ্ট হয়ে কঙ্কালসার জোহর, আমিনরা এখন মুমূর্ষের মতো উড়ে যাচ্ছে। পথের পাশে বসে সৃষ্টির উদ্বোধক এই মানুষগুলোকে এখন গাইতে হচ্ছে কবিগুরুর অন্য আরেকটি গান- ‘ওগো পথিক হাওয়া... ও দখিন হাওয়া পথের ধারে আমার বাসা...।’ সৃষ্টির জন্য সারাজীবন ব্যয় করেও একটু আশ্রয়, কোন রকম বেঁচে থাকা এসবের জন্য মানুষগুলোর কি আকুতি। দুবেলা নুন-ভাত যেন স্বপ্নের মতো। পান্তা ইলিশের আয়োজনে বর্ষবরণের ভড়ং এদের টানে না। বরং বৈশাখ এলে এই ভাবনাই মাথায় আসে, যেন সময় মতো বর্ষা হয়। ভুইতে যেন উপযুক্ত সময় জো হয়। তা হলেই বেঁচে থাকা সহজ হবে। বুদ্ধিবৃত্তিতে জীবিকা নির্বাহ করেন যারা তারা তো বলে থাকেন, বাঙালির অস্তিত্বের শেকড় প্রোথিত রয়েছে পয়লা বৈশাখে। কিন্তু এ শেকড় গজালো কোথা থেকে, কে পুঁতেছিল বীজ! এখন তারাই বা কেমন আছে তার খবর রাখতে বড় অনীহা। বক্তব্যটা বাহবা নেয়া আর হাততালি পাওয়ার মতো হলেই হলো।
এলেবেলে কতকথা মনে আসে মা। সব কিছু যে বলা যায় না বলতে মানা অনেক কিছু । সত্য সহ মিথ্যা কহ এই দোটানায় জীবন গেল। তবু কিছু কথা বলি তোমায়। তুমিতো মা। আমার কথার জন্য অন্তত তুমি আমাকে রাজশক্তি বিরোধী বলে তো আর দ- দিতে পারবে না। ছোট বেলায় গ্রামে যেমন আমাদের পড়শী ছিলেন অনেক চাষা চাচা এখন কিন্তু আমার তেমন পড়শী কম। এখন প্রতিদিন দেখি বড় মাপের কিছু আঙ্কেল। আমার জোহর চাচার মেয়েরা জানতো না পয়লা বৈশাখ কি? কিন্তু এখনকার আঙ্কেলদের ছেলেমেয়েরা বেশ ভাল করেই জানে পয়লা বৈশাখের কথা। বরং দিনটির জন্য তারা উদগ্রীব হয়ে থাকে। রং-বেরঙয়ের কারুকাজ করা নতুন কাপড় পরা, পিঠা-পায়েসের আয়োজন আর গরম ভাতে পানি ঢেলে পান্তা ইলিশের ভোজন। বছরান্তে একদিনের জন্য বাঙালি সাজার সে কি প্রাণান্ত চেষ্টা। ‘ধান গাছে তক্তা হয়’ কি না এ প্রশ্নের সমাধান না জেনেই ইংরেজি স্কুলে পড়া এই আঙ্কেল পুত্ররাই হয়তো হয়ে উঠবে আগামী প্রজন্মের ‘গর্বিত বাঙালি’। একটি দিনের জন্য পোশাকি বাঙালি সেজে গণসংস্কৃতির ওপর কত নান্দনিক বক্তব্য। শুনতে শুনতে বুকের ভেতরটা মাঝে মধ্যে মোচড় দিয়েও ওঠে। কিন্তু ফাঁকিটা ধরা পড়তে সময় লাগে না বেশি। তার পরও এই ফাঁকিতে আমাদের ফেলছেন যারা তারাই হচ্ছেন ‘গর্বিত বাঙালি’।
মাগো তুমিতো গ্রামে থাক। সৃষ্টির ভিত্তিভূমিতে মাথা নুয়ে বাস কর। সহজ মানুষ নিয়ে জাদুকরী আয়োজনের সব কিছুর খবর রাখ না। তোমার সন্তানরা বাঙালি সংস্কৃতির নামে কোন সংস্কৃতির চর্চায় ব্যস্ত তা হয়তো অন্ধ্র øেহে বুঝতে চাওনা। আমার শেকড় হলো বাঙালিত্ব আর আমার সেই প্রাণের উৎসবের খরচের যোগান দিচ্ছে বেনিয়া পুঁজির মালিকরা। উৎসব আমার প্রাণের-ঐতিহ্যের আর পৃষ্টপোষক আমাদেরই জানি দুশমন কর্পোরেট পুঁজি। সত্যিই মা এই নন্দনতত্ত¡ তুমি বোঝ না তাই আমাকেও শিখাতে পারনি। দেখি আর মুগ্ধ হই বাঙালি কবিদের হৃদয় নিঙড়ানো সৃষ্টি অশ্বত্থতলায় বসে বটমূলের উৎসব নাম দিয়ে কত আয়োজন করেইনা নিলামে তোলা হচ্ছে। আর ‘নিজস্ব সংস্কৃতির’ জয়গানের নামে বগল বাঁজিয়ে লাভবান হচ্ছেন ‘অনুকরণীয়’ সব বাঙালি বাবুরা।
একটি কথা বড় বেশি মনে হচ্ছে মা। আমাদের জীবন নিসৃত গণসংস্কৃতি আজ সংস্কৃতি বেনিয়াদের খোয়াড়ে পড়ে ছটফট করে মরছে। বদ্ধ খাঁচায় আটকে রেখে বন্ধ্যা সংস্কৃতির নামে নাচ-গানের আয়োজনে নগর জীবনে ণিকের তরে প্রশান্তির বাতাস দমকা হাওয়ার মতো বয়ে যাচ্ছে এটাও সত্যি। কিন্তু চূড়ান্তভাবে যে কালচার জেঁকে বসছে আমাদের ঘাড়ে তার সঙ্গে কালটিভেশনের কোন যোগসূত্র থাকছে বলে মনে হয় না।
আয়োজনের সর্বাঙ্গে যেন মুনাফার ড্রাগন হা করে নাচছে। প্রাণের আয়োজন দেখছিনে কোথাও। আজকের পয়লা বৈশাখেও কোটি মানুষ জীবন অনে¦ষণ শেষে কান্ত দেহে রাস্তায় ঘুমাবে। কোটি মানুষ উৎসব আয়োজনের উচ্ছিষ্ট কুড়িয়ে ুধা নিবারণ করবে। আর কিছু মানুষ বেনিয়া পুঁজির উচ্ছিষ্টে পকেট ভরে নিশ্চিন্ত রাত্রি যাপন করবে। কর্পোরেট হাউজের কোটি টাকার সাংস্কৃতিক বিনিয়োগ জোহর আলী, আমিন উদ্দিনের দিকে চেয়ে ক্রুর হাসি হাসবে। ইলিশের বাজারে বইবে আগুনের হলকা।
নিত্য অনটনের আগুন জ্বলছে নিরবধি যে প্রাণে সে প্রাণে কবিগুরুর ’আগুনের পরশমণি’ কে ছোঁয়াবে! তা ছোঁয়াতে দরকার জাতীয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির উদ্বোধন। সেই আর্শীবাদ চেয়ে তোমার পদযুগলে রাখি করকমল। দূরন্ত বৈশাখের শুভেচ্ছা নিও মা। ভাল থেকো জননী আমার। লেখক: গবেষক
ড.ফোরকান আলী
মা,তোমার চরণে কপাল রেখে শুরু করছি। হয়তো অনেক উদ্বিগ্ন হয়ে আছ আমার ভাল-মন্দ ভাবনায়। তোমার কুশল আমি কখনও জানতে চাইনে। কেন চাইনে জান মা? আমি জানি সব কিছু বুকের তলে চাপা দিয়ে মাটি কামড়ে পড়ে থাকার মতা তোমার অসাধারণ। তোমার সম্পদ-সম্মান সব কিছুর ওপর অভিঘাত এসেছে বারবার। তার পরও বিচলিত হওনি। হলেও এই অবাধ্য সন্তানকে বুঝতে দাওনি কখনও। অন্তত ৪০ বছর ধরে একই মাটি জোর করে আঁকড়ে ধরে পড়ে আছ। আমরা তো দেখেছি কতবার হাতের তলা থেকে পুরনো মাটি খসে গেছে আবার নতুন করে ধরেছ আরেক স্তর। নিজেকে সরতে দাওনি। আচ্ছা বল তো মা, সব হারিয়েও মাটি কামড়ে পড়ে থাকার অপূর্ব এই কৌশল তোমাকে কে শিখিয়েছিল? তার নাম বুঝি বাঙালি সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতি এখন তোমাদের মতো নিরুপায়দের সর্বংসহা হতে বলে আর সামর্থ্যবানদের পছন্দের জীবন বেছে নেয়ার জন্য প্রণোদনা দেয়। চূড়ান্তভাবে তা উন্মাদনার পর্যায়ে গেলেও চতুর ধ্বনি ব্যবসায়ীরা তাকে ‘স্বকীয়তা’ বলে প্রলেপ দিয়ে থাকেন। যাই হোক, তুমি হয়তো জান মা আজ পয়লা বৈশাখ। আমার বেশ মনে পড়ে ছোট বেলায় বাপ-চাচাদের বলতে শুনতাম ‘রাত পোহালে পয়লা বৈশাখ। লাঙল গরু ঠিক রাখতে হবে’। এমন রেওয়াজ হামেশায় চোখে পড়ত যে পয়লা বৈশাখ সকালে কৃষক øান করে পাক-পবিত্র হয়ে মুঠ বুনতে মাঠে যেতেন। সেদিন আবার বাড়িতে একটু ভাল-মন্দ খাবারের আয়োজনও হতো। তাহলে এ কথা বলাই যেতে পারে যে নববর্ষের উদ্বোধন হলো নতুন সৃষ্টির উদ্বোধন। নতুনের এই স্রষ্টা কারা? যাদের হাতে কর্ষিত মাটিতে ঘটে স্বপ্নের অঙ্কুরোদগম। সহজ কথায় যারা মাটি ছুঁয়ে জীবন কাটায়। যারা সৃষ্টি করে তোমার সন্তানের মতো হাজারো সন্তানের বেঁচে থাকার উপায়। এর পরও এদের নিয়ে কোনদিন পয়লা বৈশাখ হতে দেখেছ মা? আমার জানতে খুব ইচ্ছে করছে তোমার ছোট বেলার কথা। তোমার বাবার গ্রামে কি একদল সাফ ছুতোর ভদ্রলোক পয়লা বৈশাখের দিন বাঙালি সাজার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত হতো। আমার ছোট বেলায় আমাদের গ্রামে এমন দেখিনি। তবে বছরের শুরুতে স্বচ্ছতা আর শুভ্রতা দিয়ে দিন শুরুর প্রচেষ্টা মানুষের মধ্যে ছিল। আর এখন চারদিকে তাকিয়ে দেখ মা অস্বচ্ছ কালো কুচকুচে মনের মানুষগুলো সফেদ পাঞ্জাবির আড়ালে কত সুন্দর করে ঢেকে রাখছে তাদের কুৎসিত মনোবৃত্তি। তোমার আমার মতো বাঙালির জন্য এদের কতই না নাকি কান্না। এরা কেউ সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত না। নতুনের মিছিলের সহযাত্রী না। একেকটি বন্ধক রাখা আমানবিক আÍা।
শোন মা! এইখানে আমার মনে পড়ে গেল আমাদের অনেক আপন পড়শি জোহর চাচার কথা। এখন তার মুখে সাদা হয়ে যাওয়া এক গোছা দাড়ি। ঠিক সাদা বলা যাবে না। অযতœ আর অবহেলায় দাড়িগুলোর রঙ প্রায় তামাটে হয়ে গেছে। চোয়াল দুটো বসা, চোখ গেছে গর্তে ঢুকে। তরতাজা যৌবনে এই মানুষটি লাঙল-গরু নিয়ে রোজ সকালে মাঠে যেতেন। কত বৈশাখে কত েেত যে তিনি বীজ ছড়িয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। সেই সময়ে জোহর চাচার ছোট্ট মেয়ে সালমার চেহারা খুব মনে পড়ে। ধুলোমাখা গায়ে ল্যাংটা হয়ে ঘুরে বেড়াত। অপুষ্টিতে শরীরে চেয়ে পেটটি হয়ে উঠেছিল বড়। মিষ্টি কুমড়োর মতো মোটা। পাঁজরের হাড়গুলো গোনা যেত। সালমা এখন স্বামীর ঘর করে। ছেলেপুলেও হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির দাবি মেটাতে না পারায় মাঝে মধ্যেই বাপের বাড়িতে এসে দিন কাটাতে হয়। এরপরও জোহর চাচা সমানে সৃষ্টি করে চলেছেন মানুষের জন্য। আরও একজন মানুষের কথা মনে করিয়ে দেই, তিনি আমাদের আমিন দাদা। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষটি গ্যাস্ট্রিকের ব্যথায় একহাতে পেট চেপে ধরে আরেক হাতে নিড়ানি নিয়ে হয়তো আজ সকালেও যাবেন পরের েেত জন বেচতে। তোমার মনে পড়ে মা এক বৈশাখে বাশারের দোকানের হালখাতার কথা। যে দেনাদাররা টাকা মেটাতে যাননি মাইক লাগিয়ে তাদের নাম ডাকা হচ্ছিল। রাতের মধ্যে পাওনা পরিশোধ না করতে পারলে বাড়ির হাঁস-মুরগি, ছাগল পর্যন্ত ধরে আনার কথা জানানো হয়েছিল। ওই নামের তালিকায় আমিন দাদার নামও ছিল। জোহর চাচা, আমিন দাদা এদের বৈশাখ কতই না মধুর (!) তাই না মা! অথচ এদেরই তো হওয়ার কথা ছিল বাঙালির পহেলা বৈশাখের উদ্বোধক।
মাগো! তোমার দেয়া শিা অনুযায়ী অন্তত এতটুকু বলতে শিখেছি যে, নতুনের অবগাহনেই সংস্কৃতির উন্মেষ। বদ্ধ ডোবাখানায় এর বিকাশ নয়। অথচ আজ চারদিকে তাকিয়ে দেখ সভ্যতার উন্মেষ যাদের হাতে তাদের বিকাশকে যারা জোর করে রুদ্ধ করছে বাঙালি সংস্কৃতির লাটাই এখন তারাই ছাড়ছে আর গোটাচ্ছে। মস্তিষ্ক প্রসূত নতুন সব বিতর্কের বেড়াজালে আটকে দিচ্ছে বঞ্চিত স্রষ্টাদের ঐক্য।
রবীন্দ্রনাথের একটি গান আজ অনেক বেশি করে কানে বাজবে। ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো... তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে’। বৈশাখ তো আসবেই। মুমূর্ষুরে উড়িয়ে দেয়াও জরুরি। রবি ঠাকুর কোন মুমূর্ষুরে উড়াতে বললেন, আর উড়ে যাচ্ছে কোন মুমূর্ষু তা একবার ভেবে দেখ। হালখাতা খুলে বসে থাকা মহাজন বাশারের কাছে বৈশাখ আসে এক আমেজে আর দেনাদার নিঃস্ব আমিনের ঘরে পৌঁছে দেয় অন্য বারতা। ‘বৎসরের আবর্জনা’ দূর হবে কথা ছিল কিন্তু সেই আবর্জনার হাতেই পিষ্ট হয়ে কঙ্কালসার জোহর, আমিনরা এখন মুমূর্ষের মতো উড়ে যাচ্ছে। পথের পাশে বসে সৃষ্টির উদ্বোধক এই মানুষগুলোকে এখন গাইতে হচ্ছে কবিগুরুর অন্য আরেকটি গান- ‘ওগো পথিক হাওয়া... ও দখিন হাওয়া পথের ধারে আমার বাসা...।’ সৃষ্টির জন্য সারাজীবন ব্যয় করেও একটু আশ্রয়, কোন রকম বেঁচে থাকা এসবের জন্য মানুষগুলোর কি আকুতি। দুবেলা নুন-ভাত যেন স্বপ্নের মতো। পান্তা ইলিশের আয়োজনে বর্ষবরণের ভড়ং এদের টানে না। বরং বৈশাখ এলে এই ভাবনাই মাথায় আসে, যেন সময় মতো বর্ষা হয়। ভুইতে যেন উপযুক্ত সময় জো হয়। তা হলেই বেঁচে থাকা সহজ হবে। বুদ্ধিবৃত্তিতে জীবিকা নির্বাহ করেন যারা তারা তো বলে থাকেন, বাঙালির অস্তিত্বের শেকড় প্রোথিত রয়েছে পয়লা বৈশাখে। কিন্তু এ শেকড় গজালো কোথা থেকে, কে পুঁতেছিল বীজ! এখন তারাই বা কেমন আছে তার খবর রাখতে বড় অনীহা। বক্তব্যটা বাহবা নেয়া আর হাততালি পাওয়ার মতো হলেই হলো।
এলেবেলে কতকথা মনে আসে মা। সব কিছু যে বলা যায় না বলতে মানা অনেক কিছু । সত্য সহ মিথ্যা কহ এই দোটানায় জীবন গেল। তবু কিছু কথা বলি তোমায়। তুমিতো মা। আমার কথার জন্য অন্তত তুমি আমাকে রাজশক্তি বিরোধী বলে তো আর দ- দিতে পারবে না। ছোট বেলায় গ্রামে যেমন আমাদের পড়শী ছিলেন অনেক চাষা চাচা এখন কিন্তু আমার তেমন পড়শী কম। এখন প্রতিদিন দেখি বড় মাপের কিছু আঙ্কেল। আমার জোহর চাচার মেয়েরা জানতো না পয়লা বৈশাখ কি? কিন্তু এখনকার আঙ্কেলদের ছেলেমেয়েরা বেশ ভাল করেই জানে পয়লা বৈশাখের কথা। বরং দিনটির জন্য তারা উদগ্রীব হয়ে থাকে। রং-বেরঙয়ের কারুকাজ করা নতুন কাপড় পরা, পিঠা-পায়েসের আয়োজন আর গরম ভাতে পানি ঢেলে পান্তা ইলিশের ভোজন। বছরান্তে একদিনের জন্য বাঙালি সাজার সে কি প্রাণান্ত চেষ্টা। ‘ধান গাছে তক্তা হয়’ কি না এ প্রশ্নের সমাধান না জেনেই ইংরেজি স্কুলে পড়া এই আঙ্কেল পুত্ররাই হয়তো হয়ে উঠবে আগামী প্রজন্মের ‘গর্বিত বাঙালি’। একটি দিনের জন্য পোশাকি বাঙালি সেজে গণসংস্কৃতির ওপর কত নান্দনিক বক্তব্য। শুনতে শুনতে বুকের ভেতরটা মাঝে মধ্যে মোচড় দিয়েও ওঠে। কিন্তু ফাঁকিটা ধরা পড়তে সময় লাগে না বেশি। তার পরও এই ফাঁকিতে আমাদের ফেলছেন যারা তারাই হচ্ছেন ‘গর্বিত বাঙালি’।
মাগো তুমিতো গ্রামে থাক। সৃষ্টির ভিত্তিভূমিতে মাথা নুয়ে বাস কর। সহজ মানুষ নিয়ে জাদুকরী আয়োজনের সব কিছুর খবর রাখ না। তোমার সন্তানরা বাঙালি সংস্কৃতির নামে কোন সংস্কৃতির চর্চায় ব্যস্ত তা হয়তো অন্ধ্র øেহে বুঝতে চাওনা। আমার শেকড় হলো বাঙালিত্ব আর আমার সেই প্রাণের উৎসবের খরচের যোগান দিচ্ছে বেনিয়া পুঁজির মালিকরা। উৎসব আমার প্রাণের-ঐতিহ্যের আর পৃষ্টপোষক আমাদেরই জানি দুশমন কর্পোরেট পুঁজি। সত্যিই মা এই নন্দনতত্ত¡ তুমি বোঝ না তাই আমাকেও শিখাতে পারনি। দেখি আর মুগ্ধ হই বাঙালি কবিদের হৃদয় নিঙড়ানো সৃষ্টি অশ্বত্থতলায় বসে বটমূলের উৎসব নাম দিয়ে কত আয়োজন করেইনা নিলামে তোলা হচ্ছে। আর ‘নিজস্ব সংস্কৃতির’ জয়গানের নামে বগল বাঁজিয়ে লাভবান হচ্ছেন ‘অনুকরণীয়’ সব বাঙালি বাবুরা।
একটি কথা বড় বেশি মনে হচ্ছে মা। আমাদের জীবন নিসৃত গণসংস্কৃতি আজ সংস্কৃতি বেনিয়াদের খোয়াড়ে পড়ে ছটফট করে মরছে। বদ্ধ খাঁচায় আটকে রেখে বন্ধ্যা সংস্কৃতির নামে নাচ-গানের আয়োজনে নগর জীবনে ণিকের তরে প্রশান্তির বাতাস দমকা হাওয়ার মতো বয়ে যাচ্ছে এটাও সত্যি। কিন্তু চূড়ান্তভাবে যে কালচার জেঁকে বসছে আমাদের ঘাড়ে তার সঙ্গে কালটিভেশনের কোন যোগসূত্র থাকছে বলে মনে হয় না।
আয়োজনের সর্বাঙ্গে যেন মুনাফার ড্রাগন হা করে নাচছে। প্রাণের আয়োজন দেখছিনে কোথাও। আজকের পয়লা বৈশাখেও কোটি মানুষ জীবন অনে¦ষণ শেষে কান্ত দেহে রাস্তায় ঘুমাবে। কোটি মানুষ উৎসব আয়োজনের উচ্ছিষ্ট কুড়িয়ে ুধা নিবারণ করবে। আর কিছু মানুষ বেনিয়া পুঁজির উচ্ছিষ্টে পকেট ভরে নিশ্চিন্ত রাত্রি যাপন করবে। কর্পোরেট হাউজের কোটি টাকার সাংস্কৃতিক বিনিয়োগ জোহর আলী, আমিন উদ্দিনের দিকে চেয়ে ক্রুর হাসি হাসবে। ইলিশের বাজারে বইবে আগুনের হলকা।
নিত্য অনটনের আগুন জ্বলছে নিরবধি যে প্রাণে সে প্রাণে কবিগুরুর ’আগুনের পরশমণি’ কে ছোঁয়াবে! তা ছোঁয়াতে দরকার জাতীয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির উদ্বোধন। সেই আর্শীবাদ চেয়ে তোমার পদযুগলে রাখি করকমল। দূরন্ত বৈশাখের শুভেচ্ছা নিও মা। ভাল থেকো জননী আমার। লেখক: গবেষক
0 comments:
Post a Comment