কারিগরি শিক্ষায় আসছে না মেধাবীরা
ড.ফোরকান আলী
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে যেখানে মধ্যম স্তরের কারিগরি শিক্ষায় মেধাবী শিতি জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির হার ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ সেখানে বাংলাদেশে এ হার মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ। মূলত, এই চিত্রই বলে দেয় আমাদের দেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই শিক্ষা স্তরের অনাকাক্সিত অবস্থা। কারিগরি শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের অভিমত, ‘নানামুখী সীমাবদ্ধতা, অবহেলা, অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন কারণে মেধাবীরা এ শিায় আগ্রহী নয়। ভালো কোনো শিা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভের সুযোগ না পেয়ে শিার্থীরা অনেকটা বাধ্য হয়েই কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে। কেবল তাই নয়, এসএসসি ভোকেশনাল শিা লাভের পর কারিগরি শিা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে আগ্রহী হয় না তারা। ভোকেশনাল শিক্ষা লাভের পর অধিকাংশ শিার্থী পুনরায় সাধারণ শিক্ষায় ফিরে আসে। আবার বছরের পর বছর যাবৎ এই শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা সঙ্কুল অবস্থার উত্তরণের দাবি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে হয়ে আসছে উপেতি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারিগরি শিক্ষায় প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিার্থীদের উচ্চশিা গ্রহণে বাস্তবভিত্তিক কোনো সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট বিভাগে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। এছাড়া কারিগরি শিক্ষা প্রসারের েেত্র সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন তারা। এই স্তরের শিক্ষক-শিার্থীরা বলছেন, কারিগরি শিার প্রসার, প্রচার ও পাঠ্যক্রমে উন্নত বিশ্বের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী ধারণা দেয়া নেই। রয়েছে মানসম্মত বইয়ের অভাব। তাছাড়া, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেশিরভাগই পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারিভাবে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে পরিচালিত শিা প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে ল্যাবরেটরি, শিক ও ক্যাম্পাস ছাড়াই। তবে চরম অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। নির্দিষ্ট সময় উত্তীর্ণ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেট লাভ করে কিন্তু বাস্তবে ব্যবহারিক কিছু শিখতে পারে না। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম না মেনে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দেশে মধ্যম স্তরের কারিগরি শিক্ষার মধ্যে রয়েছে ৮ ধরনের ডিপ্লোামা শিক্ষা। এর মধ্যে রয়েছে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিপ্লোমা ইন কৃষি, ডিপ্লোমা ইন মেরিন, ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল, ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি, ডিপ্লোমা ইন এনিম্যাল হেলথ এন্ড প্রোডাক্টশন টেকনোলজি, ডিপ্লোমা ইন ভোকেশনাল এডুকেশন, ডিপ্লোমা ইন হেলথ টেকনোলজি। বর্তমানে কারিগরি শিা বোর্ডের আওতায় ৪৮টি সরকারি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৩টি কৃষি প্রশিক ইনস্টিটিউট, ৬টি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট, ১টি মেরিন্ ইঞ্জিনিয়ারিং, ২টি সার্ভে ইনস্টিটিউট এবং ৪০টি টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট রয়েছে। জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর অধীনে রয়েছে ৩৫টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার। কারিগরি শিা অধিদপ্তরের অধীনে ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ রয়েছে। এছাড়া কারিগরি শিা অধিদপ্তরের অধীনে দেশে বেসরকারিভাবে ৯৭ টি কৃষি ডিপ্লোমা এবং ১২৮টি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ৩২ হাজার, ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইলে আড়াই হাজার, ডিপ্লোমা ইন কৃষিতে ১১ হাজার, ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রিতে ১৫০, ডিপ্লোমা ইন এনিম্যাল হেলথ এন্ড প্রোডাকশন টেকনোলজিতে ২০০ এবং ডিপ্লোমা ইন হেলথ টেকনোলজিতে প্রায় ২ হাজার শিার্থী লেখাপড়া করছে। শিার্থী ও শিকদের অভিযোগ, কারিগরি ডিপ্লোমা গ্রহণের পর শিার্থীরা উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। উচ্চশিা গ্রহণের েেত্র কারিগরি ডিপ্লোমা শিায় উত্তীর্ণদের জন্য কোনো আসন বরাদ্দ নেই। শিার্থীদের জন্য শুধু ঢাকা ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজিতে (ডুয়েট) সুযোগ রয়েছে। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর কয়েক হাজার কারিগরিতে বিএসসি ডিগ্রিধারী বের হচ্ছে। ফলে বাজার চাহিদায় ডিপ্লোামাধারীদের অগ্রাধিকার কমে যাচ্ছে। কারিগরি শিল্পকারখানায় বিএসসি ডিগ্রিধারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে ডিপ্লোমাধারী শিার্থীদের বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করতে হয়। কিন্তু ডিপ্লোামাধারী শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত চার-পাচ বছর সময় লাগছে বলেও অভিযোগ করছেন তারা। এদিকে আগে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জনের জন্য তিন বছর সময় লাগতো। শিক্ষার্থীরা ডিগ্রির সমমান পেতে চার বছরের ডিগ্রির দাবি জানায়। কিন্তু বর্তমানে তা ডিগ্রির সমমান না হওয়ায় সময় বাড়ানোর কারণে বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিার্থী সোহেল আহম্ম্দে জানান, ডিপ্লোমা ডিগ্রির জন্য সময় চার বছর করার কারণে শিার্র্থীদের তি হচ্ছে। সে আরো জানায়, বর্তমানে কারিগরি শিল্পকারখানায় বিভিন্ন পদে কারিগরিতে বিএসসি রয়েছে এমন প্রার্থীদের চাকরির সুযোগ দেয়া হচ্ছে। ডিপ্লোমার কোনো অবস্থান নেই। এসব কারণে এ শিায় মেধাবীরা আসছে না বলে তিনি জানান।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অনেক কর্মকতাই বলেন, সরকারি-বেসরকারি দুই ধরনের ডিাোমা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাই পরীক্ষায় ব্যাপকহারে অকৃতকার্য হয়। এতো বেশি ফেল করার মধ্য দিয়েই ধারণা নেয়া যায় কারিগরি শিক্ষায় মেধাবীরা আসছে না। খবরে প্রকাশ ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্রী নাসরিন জানান, কোথাও ভর্তির সুযোগ না পেয়ে অনেক শিার্থী এ ধরনের শিায় বাধ্য হয়ে ভর্তি হয়। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পর কারিগরি শিক্ষার বর্তমান অবস্থা দেখে তারা আরো হতাশ হয়। তিনি আরো জানান, কৃষিতে ডিপ্লোমাধারীদের বিএসসিতে (কৃষি) ভর্তি হতে হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতোই তাকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। ভর্তি পরীায় সাধারণ শিক্ষার সিলেবাস থেকে প্রশ্ন করা হয়ে থাকে। যা কারিগরি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভর্তি হতে বড় বাধা। মূলত, এ ধরনের সমস্যা থেকে কিভাবে দেশের কারিগরি শিক্ষার মান বাড়ানো যায় তা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছে বলে অভিযোগ শিঠক্ষার্থীদের। সম্প্রতি বেশ কিছু দৈনিকের কাছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তাই স্বীকার করেছেন, ব্যবহারিক ক্লাসের সুযোগের স্বল্পতা, শিক্ষক স্বল্পতা, শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব, নিম্নমানের কারিগরি বই, জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। এছাড়া ঝরে পড়ার হার ৩০ শতাংশের বেশি। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভমত, শিা বোর্ডের উদাসীনতার কারণে এ শিক্ষার প্রতি মেধাবীরা আগ্রহী হচ্ছে না। যারা কারিগরিতে ভর্তি হয়েছে তারাও বোর্ডের নানা অনিয়ম এবং উদাসীনতার কবলে পড়ে। তাদের মতে শিক্ষার মান উন্নয়নে অন্যান্য পদক্ষেপের পরেও কারিগরি শিা বোর্ড এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করা বড় বেশি জরুরি। পুরো বিষয় সম্পর্কে সম্প্রতি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান গণমাধ্যমকে বলেন, কারিগরি শিায় মেধাবীরা কম আসছে। এই শিায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে নানা পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো শিার্থী ডিপ্লোমা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করলে সমাজ তাকে ভালোভাবে গ্রহণ করে না। কারিগরি শিক্ষায় মেধাবীদের আগ্রহ সৃষ্টি করতে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার বলে তিনি মনে করেন। আমরা আশাকরি শিক্ষার মান উন্নয়নে অন্যান্য পদেেপর পরেও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করা বড় বেশি জরুরি। তাহলে আমাদের সব হাতই কর্মের হাতিয়ারে পরিণত হবে।
লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
Monday, September 22, 2014
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
0 comments:
Post a Comment