মৃত্যুপথযাত্রী রাজধানী
ড. ফোরকান আলী
ঢাকা শহর নিয়ে এ কলমে আমি আরো কয়েকবার লেখেছি। তবে আমার এ লেখা নিয়ে তর্ক থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু গত শুক্রবার (১৯.০৯.১৪) আমি ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে বেরিয়ে মনে হচ্ছিল না আমি বাংলা দেশের রাজধানীতে। আমার মনে হয়েছে আমি দেশের কোনো উপক’ল এলাকায় রিক্্রা বা ভ্যান নয় কোনো নৌকার জন্য অপো করছি। কথাটি অবিশ্বাষ্য হতে পারে অনেকের। তবে আমার দৃশ্যমান চারি দিকে শুধু জল আর জল। কাক ভেজা জড়োসড়ো হয়ে সিএনজির অধিক মাশুল গুণে গন্তব্যে পৌঁছালাম। দূর্ভাগ্য আমার সাথে থাকা দুই ভিনশেী বন্ধুদের বোঝাতে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। অল্প বৃষ্টিতে শুধু রাজধানী নয় আমাদের সারাদেশের চিত্র একইভাবে ফোঁটে উঠে। অল্প সময়ে তাদের সাথে থেকে মনে হয়েছে, অনেক বিষয়ে নিজেদের গণতান্ত্রিক মতামত ও উন্নত দেশের অর্জিত অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিকল্প নেই। কথায় বলে ’আপনি বাঁচলে বাপের নাম’। দেশ আর রাজধানীই যদি না বাঁচে কোথায় থাকবে আওয়ামী লীগ, কোথায় যাবে বিএনপি। হঠাৎ বর্ষণের সন্ধ্যাটিতে শাহবাগের শাহবাগীদের চেহারা দেখে আতঙ্কিত হওয়ার বিকল থাকে না। খানিক বৃষ্টিতেই এক হাঁটু জল, প্যাচপ্যাচে কাদা আর অবর্ণনীয় দুর্ভোগÑ এ ধারা যদি আরও ঘণ্টা দুয়েক প্রলম্বিত হতো পরদিন সেখানে মতো অবস্থা থাকত না। ঢাকার সর্বত্র এক অবস্থা, দুঃসহ যানজটে চলাফেরা প্রায় দুঃসাধ্য। সেলিব্রেটি, রাজনীতির পুরোধাদের সঙ্গে কথা বলেও সদুত্তর পাইনি। কেউ জানে না এর সমাধান কোথায়। জানে না বলাটা বোধহয় ভুল জানলেও এ বিষয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই তাদের। পুরো দেশটির আওয়ামীকরণ আর নামকরণে ব্যস্ত মতাসীনদের এ নিয়ে ভাবার সময় নেই। বিরোধী দল নামে পরিচিত গৃহপালিত প্রতিপ ব্যস্ত ইস্যুর সন্ধানে।
ঢাকা তথা রাজধানী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও তারা মত পাল্টাবেন বলে মনে হয় না। এই যে নামকরণ বা নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি তার দিকে খানিকটা নজর দিয়ে মূল প্রসঙ্গে ফিরে যাব। জাতীয়তাবাদী দল এখন বিরোধী দল নয়। একদিন মতাসীনরাও ফিরে যেতে পারে সে অবস্থানে। উভয় দল নিজ নিজ নেতা-নেত্রী, প্রতিষ্ঠাতাদের নাম নিয়ে এত ব্যস্ত যে দলের পরিচয় বা অবস্থানগত নাম নিয়ে চিন্তারও অবকাশ নেই। একমাত্র সংসদ ব্যতীত আর কোথাও ’বিরোধী’ শব্দটি কি সত্যি প্রয়োজ্য? বাংলা অভিধানে বিরোধ বা বিরোধী শব্দের অর্থ কী? দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একাধিক দলের অস্তিত্বই গণতন্ত্র। বিএনপি, কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় পার্টি যে যার অবস্থান থেকে দেশের জন্য ভাবে, দেশের ও জনগণের জন্য রাজনীতি করে। সমর্থন-অসমর্থন পরের কথা। এক কথায় ’বিরোধী দল’ নামে চিহ্নিত করার ব্যাপারটির পুনর্বিবেচনা এখন জরুরি। অন্যপ বা রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্ন মতাবলম্বী দলগুলো ’বিরোধী’ হবে কোন দুঃখে? তারা বিরোধিতা করলেও করছেন সরকারি দল বা তাদের কর্মপন্থায়। দেশ ও জনগণ তাদের সরকার বিরোধী দল হিসেবে জানলেও গড়পড়তা ’বিরোধী’ বলে চিহ্নিত করাটা আর যাই হোক যৌক্তিক ঠেকে না।
’বিরোধী’ নামে পরিচিত বলেই হয়তো তারা কল্যাণ, উন্নয়ন, এমনকি অস্তিত্ব রার মতো বিষয়েও বিরোধিতা করছে। বিরোধিতাই যেন রাজনীতি অথবা রাজনীতির একমাত্র সূত্র।
যে কথা বলছিলাম, ঢাকা শহর যে মরতে বসেছে সে নিয়ে কারও কোন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। সমস্যার কথা লিখে লাভ নেই। সবারই জানা আছে তা, সমাধান নিয়ে কথা বললে প্রথমেই রাজধানী নির্ভরতা হ্রাস করার প্রসঙ্গ উঠবে। যে কৃষক, যে রিকশাচালক, যে শ্রমিক অন্য শহর ছেড়ে ঢাকা আসে, মানবেতর জীবনযাপনে উপার্জন করে সংসার চালায়, নিজ শহরে সে সুযোগ থাকলে সে ঢাকায় পা বাড়াত না। সংস্কৃতির ব্যাপারও তাই। চট্টগ্রামে অবকাঠামো, সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে বিশাল টিভি স্টেশন খুলে রাখা হয়েছে বটে, ঘণ্টা দেড়েকের হাস্যকর অনুষ্ঠানমালা ছাড়া আর কোন উপযোগিতা নেই। অর্থনৈতিকভাবে কৃষক-শ্রমিক ছাত্র-জনতা যেমন ঢাকামুখী, সংস্কৃতি বা বিনোদনেও রাজধানী নির্ভরশীলতার বিকল্প গড়ে ওঠেনি। নিন্দুকেরা বলেন, রাজধানীবাসী বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতির নেতা-নেত্রীর আসন ছাড়তে নারাজ। সদা হারানোর সংশয় আর ভয়ে তখন ছাড়তে গররাজি বলেই সব কিছু ঢাকা কেন্দ্রিক। এ বিষয়ে নিঃসংশয় হওয়ার জন্য কয়েকজন মানুষের নাম উল্লেখ করাই যথেষ্ট। সনৎ সাহা, হাসান আজিজুল হক, যতীন সরকার থেকে বিনোদ বিহারী চৌধুরী, সর্বত্র অযতœ আর উপো, পরিণত বয়সে মৃত্যুপথযাত্রী না হওয়া পর্যন্ত স্বীকৃতি নেই। নেই কোন জাতীয় মর্যাদা, ইদানীং চ্যানেলে চ্যানেলে গান বাজনার যে লড়াই সেখানেও একই অবস্থা। নির্মাণ শ্রমিক, পোশাক শ্রমিক, ট্যালেন্ট হান্টিং সব ঢাকামুখী। বইমেলার কথাই ধরুন, জাতীয় বইমেলার প্রচার এ নিয়ে চ্যানেল ও প্রিন্ট মিডিয়ার চোখ ধাঁধানো মাসব্যাপী অনুষ্ঠানের তুলনায় লেখক-প্রকাশক তো সে মুখী হবেনই। অথচ দেশের প্রায় প্রতি জেলাতেই বইমেলা হয়। চট্টগ্রাম দ্বিতীয় নগরী, বহু েেত্র বহু আয়োজনে বর্ণাঢ্য, দেশজয়ী, প্রতি বছর বিপুল জনসমাগমে ছড়া, কবিতা উৎসব করেন আয়োজকরা। ছড়া উৎসব এখন আর অন্য কোথাও হয় বলেও শুনিনি। গত দু’বছর উদ্বোধক ও প্রধান অতিথি হিসেবে কাছ থেকে এ অনুষ্ঠানের জ্যোতি ও আঁচ দেখছি। ঢাকাবাসী ধন্য ধন্য করছেন প্রচার দিচ্ছেন বটে, তবে মূল জায়গাটা ছেড়ে দিতে রাজি বলে মনে হয় না। বেচারা মফস্বলীদের ঢাকামুখী হওয়া ছাড়া তখন আর কি গতি থাকতে পারে?
জীবন ও জীবনযাপনের জন্য ঢাকা কেন্দ্রিক বাস্তবতা দূর করতে হলে বিভাগীয় শহরগুলোকে মর্যাদা দিতে হবে। সরকারি দফতরগুলোর সব ক’টা ঢাকা কেন্দ্রিক হওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়? জীবনের উপাদান, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, চিত্ত বিনোদন উপযোগী সমাজ কাঠামো গড়ে এসব দফতর অন্য শহরে পাঠাতে হবে। সরকারি, বেসরকারি, এনজিও বা অন্যান্য সংস্থার কার্যালয়, কার্যক্রম জেলা ও অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে দিলে জনসংখ্যার চাপ কমে আসতে বাধ্য। এর সঙ্গে যেহেতু শ্রমজীবীদের কর্মসংস্থান জড়িয়ে, রিকশা, ট্যাক্সি, দোকান বা ব্যবসায় নিয়োজিত শ্রমিকরাও যেন ছড়িয়ে পড়বেন।
ঢাকা শহরে যানজট কমাতে ওভারব্রিজ, উড়ালপুল, সুরঙ্গপথ, আকাশপথের মতো বিকল্প ব্যবস্থার চিন্তা হচ্ছে। সাধুবাদ বটে কিন্তু কিছুতেই কিছু হবে না, হওয়ার নয়। কমাতে হবে জনসংখ্যার চাপ। কমাতে হবে ঢাকামুখী জনস্রোত।
রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের এসব বিষয়ে ভাবনা-চিন্তার সময় আছে বলে মনে হয় না। তারা ব্যস্ত আছেন নাম পরিবর্তন নিয়ে। বিএনপি ভাবছে বিমানবন্দর গেছে তো অন্য কোথাও এর শোধ তুলতে হবে। আওয়ামী লীগ মনে করছে, পুরো দেশটাই নিজেদের নামে করে নেব। অথচ যে দেশ, যে মাটি, যে রাজধানী নিয়ে এত ঝগড়া-ফ্যাসাদ, নাম নিয়ে এত বিভ্রাটথ সে এখন মৃত্যুশয্যায়। ধুঁকছে, এ মুমূর্ষু রোগী ঢাকাকে অক্সিজেন দিতে না পারলে বাঁচানো অসম্ভব। হে জাতীয় বুদ্ধিজীবীরা এখনও সময় আছে। এ দিকে ফিরে দেখুন, নইলে স্বর্ণালঙ্কার বা সোনার তাজ কিছুই থাকবে না।
ড. ফোরকান আলী
ঢাকা শহর নিয়ে এ কলমে আমি আরো কয়েকবার লেখেছি। তবে আমার এ লেখা নিয়ে তর্ক থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু গত শুক্রবার (১৯.০৯.১৪) আমি ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে বেরিয়ে মনে হচ্ছিল না আমি বাংলা দেশের রাজধানীতে। আমার মনে হয়েছে আমি দেশের কোনো উপক’ল এলাকায় রিক্্রা বা ভ্যান নয় কোনো নৌকার জন্য অপো করছি। কথাটি অবিশ্বাষ্য হতে পারে অনেকের। তবে আমার দৃশ্যমান চারি দিকে শুধু জল আর জল। কাক ভেজা জড়োসড়ো হয়ে সিএনজির অধিক মাশুল গুণে গন্তব্যে পৌঁছালাম। দূর্ভাগ্য আমার সাথে থাকা দুই ভিনশেী বন্ধুদের বোঝাতে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। অল্প বৃষ্টিতে শুধু রাজধানী নয় আমাদের সারাদেশের চিত্র একইভাবে ফোঁটে উঠে। অল্প সময়ে তাদের সাথে থেকে মনে হয়েছে, অনেক বিষয়ে নিজেদের গণতান্ত্রিক মতামত ও উন্নত দেশের অর্জিত অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিকল্প নেই। কথায় বলে ’আপনি বাঁচলে বাপের নাম’। দেশ আর রাজধানীই যদি না বাঁচে কোথায় থাকবে আওয়ামী লীগ, কোথায় যাবে বিএনপি। হঠাৎ বর্ষণের সন্ধ্যাটিতে শাহবাগের শাহবাগীদের চেহারা দেখে আতঙ্কিত হওয়ার বিকল থাকে না। খানিক বৃষ্টিতেই এক হাঁটু জল, প্যাচপ্যাচে কাদা আর অবর্ণনীয় দুর্ভোগÑ এ ধারা যদি আরও ঘণ্টা দুয়েক প্রলম্বিত হতো পরদিন সেখানে মতো অবস্থা থাকত না। ঢাকার সর্বত্র এক অবস্থা, দুঃসহ যানজটে চলাফেরা প্রায় দুঃসাধ্য। সেলিব্রেটি, রাজনীতির পুরোধাদের সঙ্গে কথা বলেও সদুত্তর পাইনি। কেউ জানে না এর সমাধান কোথায়। জানে না বলাটা বোধহয় ভুল জানলেও এ বিষয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই তাদের। পুরো দেশটির আওয়ামীকরণ আর নামকরণে ব্যস্ত মতাসীনদের এ নিয়ে ভাবার সময় নেই। বিরোধী দল নামে পরিচিত গৃহপালিত প্রতিপ ব্যস্ত ইস্যুর সন্ধানে।
ঢাকা তথা রাজধানী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও তারা মত পাল্টাবেন বলে মনে হয় না। এই যে নামকরণ বা নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি তার দিকে খানিকটা নজর দিয়ে মূল প্রসঙ্গে ফিরে যাব। জাতীয়তাবাদী দল এখন বিরোধী দল নয়। একদিন মতাসীনরাও ফিরে যেতে পারে সে অবস্থানে। উভয় দল নিজ নিজ নেতা-নেত্রী, প্রতিষ্ঠাতাদের নাম নিয়ে এত ব্যস্ত যে দলের পরিচয় বা অবস্থানগত নাম নিয়ে চিন্তারও অবকাশ নেই। একমাত্র সংসদ ব্যতীত আর কোথাও ’বিরোধী’ শব্দটি কি সত্যি প্রয়োজ্য? বাংলা অভিধানে বিরোধ বা বিরোধী শব্দের অর্থ কী? দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একাধিক দলের অস্তিত্বই গণতন্ত্র। বিএনপি, কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় পার্টি যে যার অবস্থান থেকে দেশের জন্য ভাবে, দেশের ও জনগণের জন্য রাজনীতি করে। সমর্থন-অসমর্থন পরের কথা। এক কথায় ’বিরোধী দল’ নামে চিহ্নিত করার ব্যাপারটির পুনর্বিবেচনা এখন জরুরি। অন্যপ বা রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্ন মতাবলম্বী দলগুলো ’বিরোধী’ হবে কোন দুঃখে? তারা বিরোধিতা করলেও করছেন সরকারি দল বা তাদের কর্মপন্থায়। দেশ ও জনগণ তাদের সরকার বিরোধী দল হিসেবে জানলেও গড়পড়তা ’বিরোধী’ বলে চিহ্নিত করাটা আর যাই হোক যৌক্তিক ঠেকে না।
’বিরোধী’ নামে পরিচিত বলেই হয়তো তারা কল্যাণ, উন্নয়ন, এমনকি অস্তিত্ব রার মতো বিষয়েও বিরোধিতা করছে। বিরোধিতাই যেন রাজনীতি অথবা রাজনীতির একমাত্র সূত্র।
যে কথা বলছিলাম, ঢাকা শহর যে মরতে বসেছে সে নিয়ে কারও কোন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। সমস্যার কথা লিখে লাভ নেই। সবারই জানা আছে তা, সমাধান নিয়ে কথা বললে প্রথমেই রাজধানী নির্ভরতা হ্রাস করার প্রসঙ্গ উঠবে। যে কৃষক, যে রিকশাচালক, যে শ্রমিক অন্য শহর ছেড়ে ঢাকা আসে, মানবেতর জীবনযাপনে উপার্জন করে সংসার চালায়, নিজ শহরে সে সুযোগ থাকলে সে ঢাকায় পা বাড়াত না। সংস্কৃতির ব্যাপারও তাই। চট্টগ্রামে অবকাঠামো, সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে বিশাল টিভি স্টেশন খুলে রাখা হয়েছে বটে, ঘণ্টা দেড়েকের হাস্যকর অনুষ্ঠানমালা ছাড়া আর কোন উপযোগিতা নেই। অর্থনৈতিকভাবে কৃষক-শ্রমিক ছাত্র-জনতা যেমন ঢাকামুখী, সংস্কৃতি বা বিনোদনেও রাজধানী নির্ভরশীলতার বিকল্প গড়ে ওঠেনি। নিন্দুকেরা বলেন, রাজধানীবাসী বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতির নেতা-নেত্রীর আসন ছাড়তে নারাজ। সদা হারানোর সংশয় আর ভয়ে তখন ছাড়তে গররাজি বলেই সব কিছু ঢাকা কেন্দ্রিক। এ বিষয়ে নিঃসংশয় হওয়ার জন্য কয়েকজন মানুষের নাম উল্লেখ করাই যথেষ্ট। সনৎ সাহা, হাসান আজিজুল হক, যতীন সরকার থেকে বিনোদ বিহারী চৌধুরী, সর্বত্র অযতœ আর উপো, পরিণত বয়সে মৃত্যুপথযাত্রী না হওয়া পর্যন্ত স্বীকৃতি নেই। নেই কোন জাতীয় মর্যাদা, ইদানীং চ্যানেলে চ্যানেলে গান বাজনার যে লড়াই সেখানেও একই অবস্থা। নির্মাণ শ্রমিক, পোশাক শ্রমিক, ট্যালেন্ট হান্টিং সব ঢাকামুখী। বইমেলার কথাই ধরুন, জাতীয় বইমেলার প্রচার এ নিয়ে চ্যানেল ও প্রিন্ট মিডিয়ার চোখ ধাঁধানো মাসব্যাপী অনুষ্ঠানের তুলনায় লেখক-প্রকাশক তো সে মুখী হবেনই। অথচ দেশের প্রায় প্রতি জেলাতেই বইমেলা হয়। চট্টগ্রাম দ্বিতীয় নগরী, বহু েেত্র বহু আয়োজনে বর্ণাঢ্য, দেশজয়ী, প্রতি বছর বিপুল জনসমাগমে ছড়া, কবিতা উৎসব করেন আয়োজকরা। ছড়া উৎসব এখন আর অন্য কোথাও হয় বলেও শুনিনি। গত দু’বছর উদ্বোধক ও প্রধান অতিথি হিসেবে কাছ থেকে এ অনুষ্ঠানের জ্যোতি ও আঁচ দেখছি। ঢাকাবাসী ধন্য ধন্য করছেন প্রচার দিচ্ছেন বটে, তবে মূল জায়গাটা ছেড়ে দিতে রাজি বলে মনে হয় না। বেচারা মফস্বলীদের ঢাকামুখী হওয়া ছাড়া তখন আর কি গতি থাকতে পারে?
জীবন ও জীবনযাপনের জন্য ঢাকা কেন্দ্রিক বাস্তবতা দূর করতে হলে বিভাগীয় শহরগুলোকে মর্যাদা দিতে হবে। সরকারি দফতরগুলোর সব ক’টা ঢাকা কেন্দ্রিক হওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়? জীবনের উপাদান, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, চিত্ত বিনোদন উপযোগী সমাজ কাঠামো গড়ে এসব দফতর অন্য শহরে পাঠাতে হবে। সরকারি, বেসরকারি, এনজিও বা অন্যান্য সংস্থার কার্যালয়, কার্যক্রম জেলা ও অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে দিলে জনসংখ্যার চাপ কমে আসতে বাধ্য। এর সঙ্গে যেহেতু শ্রমজীবীদের কর্মসংস্থান জড়িয়ে, রিকশা, ট্যাক্সি, দোকান বা ব্যবসায় নিয়োজিত শ্রমিকরাও যেন ছড়িয়ে পড়বেন।
ঢাকা শহরে যানজট কমাতে ওভারব্রিজ, উড়ালপুল, সুরঙ্গপথ, আকাশপথের মতো বিকল্প ব্যবস্থার চিন্তা হচ্ছে। সাধুবাদ বটে কিন্তু কিছুতেই কিছু হবে না, হওয়ার নয়। কমাতে হবে জনসংখ্যার চাপ। কমাতে হবে ঢাকামুখী জনস্রোত।
রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের এসব বিষয়ে ভাবনা-চিন্তার সময় আছে বলে মনে হয় না। তারা ব্যস্ত আছেন নাম পরিবর্তন নিয়ে। বিএনপি ভাবছে বিমানবন্দর গেছে তো অন্য কোথাও এর শোধ তুলতে হবে। আওয়ামী লীগ মনে করছে, পুরো দেশটাই নিজেদের নামে করে নেব। অথচ যে দেশ, যে মাটি, যে রাজধানী নিয়ে এত ঝগড়া-ফ্যাসাদ, নাম নিয়ে এত বিভ্রাটথ সে এখন মৃত্যুশয্যায়। ধুঁকছে, এ মুমূর্ষু রোগী ঢাকাকে অক্সিজেন দিতে না পারলে বাঁচানো অসম্ভব। হে জাতীয় বুদ্ধিজীবীরা এখনও সময় আছে। এ দিকে ফিরে দেখুন, নইলে স্বর্ণালঙ্কার বা সোনার তাজ কিছুই থাকবে না।
0 comments:
Post a Comment