Saturday, December 7, 2013

বিপন্ন উপকূলীয় পশুসম্পদ

বিপন্ন উপকূলীয় পশুসম্পদ
ড.ফোরকান আলী
উন্নত দেশগুলোতে মানুষের খাবারের মোট আমিষ গ্রহণের ৭০ ভাগই আসে পশুর উৎস থেকে। পাশাপাশি বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর পরিমাণ ১২ ভাগেরও কম। এই পরিসংখ্যান থেকে এটি পরিস্কার যে, আমাদেরকে সুস্থ, স্বাস্থ্যবান, মেধাবী এবং দ জাতিতে পরিণত হতে হলে প্রাণিজ উৎস থেকে আমিষ গ্রহণের মাত্রা উন্নত দেশগুলোর কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে, কারণ মানুষের দেহ এবং দেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ মস্তিকের বৃদ্ধি ও উন্নয়নে প্রাণিজ বিশেষ করে দুধ থেকে আমিষ গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। এজন্য প্রয়োজন দেশের বিরাজমান পশুসম্পদের উন্নয়ন সাধন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।আমাদের দেশে যে পশুসম্পদ রয়েছে তার মধ্যে গরু, মহিষ, ছাগল এবং ভেড়া উল্লেখযোগ্য। অর্থনৈতিক সমীার তথ্যানুসারে, বর্তমানে বাংলাদেশে মহিষের সংখ্যা ১.২৬ মিলিয়ন। এই মোট সংখ্যার শতকরা ৮০ ভাগ মহিষই বসবাস করছে দেশের প্রায় ১৯ জেলার উপকূলবর্তী চরাঞ্চলে। কিন্তু নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ-জলোচ্ছ্বাস/বন্যা, লবণাক্ততা ও বিশুদ্ধ খাবার পানি, পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ পশুখাদ্য, সঠিক চিকিৎসা এবং দিকনির্দেশনার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে এসব জেলার উপকূলীয় চর অঞ্চলের মূল্যবান পশুসম্পদ-মহিষ।অফুন্ত- সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ এবং বিশেষজ্ঞদের সংশ্লিষ্টতা না থাকার কারণে দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এসব মহিষ। ফলশ্র“তিতে উক্ত অঞ্চলের মহিষ পালনের সাথে সংযুক্ত মানুষ হয়ে পড়ছে দরিদ্র, বাড়ছে বেকারত্ব। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে মহিষের সংখ্যা প্রায় ১৭২.২০ মিলিয়ন যা বিশ্বের প্রায় ৫০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সমগ্র বিশ্বের শতকরা ৯৬ ভাগ মহিষই রয়েছে শুধু এশিয়া মহাদেশে। বাংলাদেশ মহিষ উৎপাদনের দিক থেকে ৮ম অবস্থানে রয়েছে, অথচ পার্শ্ববতী দেশ ভারত রয়েছে ১ম অবস্থানে।  আমাদের দেশে মহিষের কোন সুনির্দিষ্ট জাত নেই। তবে এদেরকে দু’টি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। যথা- রিভারটাইপ (নদীর মহিষ) এবং সোয়াম্পটাইপ (জলাভূমির মহিষ)। স্বভাবগত কারণেই মহিষ নদী-নালা, খাল-বিল, ডোবা-পুকুরের পানিতে ডুবে থাকতে পছন্দ করে। দেশের মোট ১৯টি জেলা নিয়ে উপকূলীয় অঞ্চল গঠিত। যেখানে প্রায় তিন কোটি মানুষের বসবাস। আর এই উপকূলীয় অঞ্চলে জমির পরিমাণ প্রায় ৪,৭০০ বর্গ কিলোমিটার। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলেই চড়ে বেড়ায় দেশের মূল্যবান পশুসম্পদ মহিষ। অবস্থানগত কারণে এসব অঞ্চলের জনগণ শিাসহ বিভিন্ন নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অধিকাংশ অঞ্চলেই নেই কোন বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, এমনকি নেই কোন পশু চিকিৎসালয়ও। অনেকটা নদীপথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় ওইসব চরাঞ্চলে। যেখানে কোন নাগরিক সুবিধাই নেই, সেখানে মহিষের সঠিক খাদ্য সরবরাহ, পরিচর্যা ও চিকিৎসার কথাও চিন্তা করে না উক্ত অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠি। বিস্তীর্ণ ওইসব চরাঞ্চলে বিভিন্ন পালে বিভিক্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় মহিষগুলো। অত্যন্ত নিম্নমানের ঘাস খেয়েই বেঁচে থাকে এরা। রাতের বেলা এদের বেড়াহীন ঘরে আটকে রাখা হয়। অথচ প্রতিটি দুগ্ধবতী মহিষ গড়ে দিনে ৩-৪ লিটার দুধ দিয়ে থাকে যা আমাদের দেশের গৃহপালিত দুগ্ধবতী গাভীর গড় দুধ উৎপাদন থেকেও ১-২ লিটার বেশি। এ ছাড়া গরু থেকে এসব মহিষের রোগবালাইও তুলনামূলক অনেক কম। তথাপিও বাচ্চা মহিষ সহজেই রোগাক্রান্ত হতে পারে এবং সে েেত্র মৃত্যুহার বেশি হয়ে থাকে। অপরদিকে মহিষের দুধে গরুর দুধের তুলনায় কোলেস্টেরল ও পানি কম এবং স্নেহ পদার্থ, আমিষ, ভিটামিন-এ বেশি থাকায় দুগ্ধজাত দ্রব্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে মহিষের দুধের চাহিদাও বেশি। এছাড়া মহিষের মাংসে তুলনামূলকভাবে গরুর মাংস থেকে চর্বি ও কোলেস্টেরল কম থাকে এবং আমিষ ও অন্যান্য খনিজ পদার্থ কম থাকায় পুষ্টিমানও অনেক বেশি থাকে। নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর অঞ্চলের কয়েকজন মহিষপালকের সাথে কথা বলে জানা যায়, উপকূলীয় এসব চরাঞ্চলে জোয়ার-ভাটার প্রভাব প্রকট। বছরের প্রায় তিন মাস এ চরের প্রায় সমস্ত অংশ কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। তখন অনেক মহিষ মারা যায় আর বাকিগুলো যথাসম্ভব উঁচু স্থানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন এ বিশাল দেহের প্রাণীকে চাহিদানুযায়ী খাদ্য সরবরাহ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে ফলে অধিকাংশ মহিষ পুষ্টিহীনতায় ভোগে, এমনকি মারাও যায়। তারা আরো জানান, চরের সমস্ত মহিষ মালিকানাধীন। মালিকরা শুধু মহিষ কিনে চরের গরিব লোকদের পালতে দেয় এবং পরবর্তীতে ওই মহিষের দুধ এবং বিক্রিলব্ধ সমস্ত টাকা তারা নিয়ে যায়। পারিশ্রমিক হিসেবে তাদের অতি সামান্য কিছু টাকা দিয়ে থাকে। এছাড়া পুলিশি নিরাপত্তা না থাকায় এ চরাঞ্চলে ডাকাত দলের প্রভাব প্রকট। ডাকাতদের দাবিকৃত অর্থ না দিলে মহিষসহ অন্যান্য অর্থসম্পদ তারা লুট করে নিয়ে যায়। এমনকি স্বার্থের কারণে তারা মানুষ হত্যা করতে পর্যন্ত দ্বিধাবোধ করে না। প্রতিটি ঘর থেকে অন্তত একটি ছেলে সন্তানকে তাদের দলে পাঠাতে হয়। এমনি এক খারাপ অবস্থায় চরাঞ্চলের মানুষ শহরমুখী হওয়া শুরু করেছে। ফলে এ সব চরাঞ্চলে গবাদিপশু পালনের যে সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে তা দিন দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের পশুপ্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট মহিষ গবেষক এর তথ্যমতে, দুধ উৎপাদনকারী প্রাণীর মধ্যে মহিষের অবস্থান দ্বিতীয়। বাংলাদেশে শতকরা ৮০ ভাগ দুধের মহিষ উপকূল তথা নোয়াখালী, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, পটুয়াখালী এবং বরগুনা জেলার সমূদ্র বা নদী তীরবর্তী এলাকায় বাস করে। আমাদের দেশে মহিষের সুনির্দিষ্ট কোন জাত না থাকায় এসব অঞ্চলের মহিষের উৎপাদন এবং রোগপ্রতিরোধ মতাও অত্যš- কম। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলের মহিষের পুষ্টিকর খাদ্য, বাসস্থান ও সুচিকিৎসার মারাত্মক অভাব রয়েছে। অতিরিক্ত লবণাক্ততা এবং বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে অধিকাংশ মহিষ ডায়রিয়া জনিত অসুখে ভোগে এবং এর ফলে আমাদের দেশের শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ মহিষ মারা যায়। নদীপথে এসব অঞ্চলের মহিষের দুধের বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাও অত্যন্ত খারাপ। ফলে ওইসব উপকূলীয় এলাকার অধিকাংশ মহিষ এবং মহিষজাত পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, ১৯৮০ সাল থেকে আমাদের দেশে মহিষের উপর গবেষণা শুরু হলেও অর্থাভাব এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ না থাকার কারণে সেসব গবেষণা কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি। তাছাড়া বাগেরহাট জেলায় একটি মহিষ প্রজনন খামার থাকলেও বিশেষজ্ঞ ও লোকবল সংকটের কারণে সেটির অগ্রগতিও থমকে গেছে। তবে অতি সম্প্রতি সরকারি প্রতিষ্ঠান ডিপার্টমেন্ট অব লাইভস্টক সার্ভিস (ডিএলএস) এবং মিল্ক ভিটা মহিষের জাত উন্নয়ন ও সংরণের ব্যাপারে কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। পশুসম্পদ পরিদপ্তরের তথ্য মতে, বাংলাদেশে বছরে ১২.৮২ মিলিয়ন মেট্টিক টন চাহিদার বিপরীতে দুধ উৎপাদন মাত্র ২.২৮ মিলিয়ন মেট্টিক টন। অর্থাৎ প্রতি বছর দেশে প্রায় ১০.৫৪ মিলিয়ন মেট্টিক টন দুধের ঘাটতি রয়েছে। যেখানে মহিষ হতে উৎপাদিত দুধের পরিমাণ ৯৬ হাজার মেট্টিক টন। বিগত অর্থবছরে দেশের পশুসম্পদের জিডিপি’তে অবদান শতকরা ২.৯ ভাগ যা মোট কৃষি উন্নয়নের েেত্র শতকরা ১৭.৫ ভাগ। অথচ গড়ে পশুসম্পদের সার্বিক উন্নয়নে বরাদ্দ থাকে বার্ষিক জাতীয় বাজেটের মাত্র শতকরা দশমিক তিন ভাগ। দেশের মোট পশু উৎপাদনের মধ্যে মহিষ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং দেশের মোট মহিষের শতকরা ৮০ ভাগই উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করে বিধায় এই মূহূর্তে দরকার সরকারের জরুরিভিত্তিতে দেশীয় এ পশুসম্পদ মহিষ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে জোর গুরুত্বারোপ করা এবং পশুসম্পদের উন্নতিকল্পে বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের সংশ্লিষ্টকরণের মাধ্যমে যুগোপযোগী ও আধুনিক পদপে গ্রহণের পাশাপাশি সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে দেশের এই মুল্যবান পশুসম্পদকে বিলুপ্তির হাত থেকে রা করা।
†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267




0 comments:

Post a Comment