হাওর অধ্যুষিত জেলাগুলোকে রা করতে হবে
ড.ফোরকান আলী
বাংলাদেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং নেত্রকোনা হাওর অঞ্চল হিসেবে সারাদেশে পরিচিত। অবশ্য এই তালিকায় আরও কয়েকটি জেলার নাম আসতে পারে। তবে উপরের পাঁচটি জেলাই মূলত হাওর জেলা। কিন্তু এই সব হাওর জেলার মানুষের জীবনযাত্রা এবং নিম্ন আয়ের লোকজনের অবস্থা কেমন, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে তারা কেমন পরিবেশে টিকে আছে এই বিষয়গুলো নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন তেমন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে জলবায়ুর প্রভাবে এসব হাওর জেলার প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভূমিও য়ে যাচ্ছে। গৃহহীন হচ্ছে শত শত পরিবার। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারি উদ্যোগ তেমন চোখে পড়ে না। আমি আমার নিবন্ধে পাঁচ জেলার মধ্যে পরিবেশ বিপর্যয়ে নেত্রকোনা জেলার চিত্রটাই তুলে ধরছি।
এই সুবিশাল ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্বপাশে গারো পাহাড়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাওর, খাল-বিল, নদী-নালা, কৃষি আর ছোট ছোট বন-জঙ্গলের গড়ে ওঠা ২৭৮৫.৬৮ বর্গ কিলোমিটারের জনপদ নেত্রকোনা জেলা। এর মধ্যে রয়েছে অসংখ্য নদনদী, ৫৬টি ছোটবড় হাওর, গারো পাহাড়। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের লীলাভূমিতে বিচিত্র নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের জনগোষ্ঠী নিয়ে গড়ে উঠেছে ভাটি এলাকার এ জনপদ। এ জেলার মানুষের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি। উপজেলাগুলোর সঙ্গে জেলা সদরের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই নাজুক। জেলার অধিকাংশ উপজেলার লোকজন কৃষি নির্ভর এবং সেখানে একটি মাত্র ফসল হয় তা হলো বোরো, তাও আবার এই ফসল প্রকৃতির খেয়াল-খুশির ওপর নির্ভরশীল। ফসল কাটার পর কৃষকদের আর কোন কাজ থাকে না। তারা হয়ে যায় বেকার।
বাংলাদেশে ১৯৭৭ সালে পরিবেশ দূষণ বিধিমালায় পরিবেশের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, আমাদের চারপাশে বায়ু, পানি, ভূমি, খাদ্য ও বাসস্থান যা কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের জীবনযাপনে সহায়তা করে বা প্রভাবিত করে তাকে পরিবেশ বলা হয়। আমরা জীবনধারণের প্রয়োজনে বা নিজেদের খেয়াল খুশিমতে প্রকৃতিকে প্রায়ই এমনভাবে ব্যবহার করে থাকি, যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে চলেছে। পানি, বাতাস, মাটি ও জীবনকুলসহ পরিবেশের কোন উপাদানের যখন কোন রকম পরিবর্তন ঘটে, যা প্রত্য বা পরোভাবে তাৎণিক বা পরবর্তীতে জীবজগতের ওপর নেতিবাচক ও তিকর প্রভাব ফেলে বা ফেলতে পারে, তখন এ অবস্থাকে পরিবেশের বিপর্যয় বলা হয়। নেত্রকোনা জেলার পরিবেশ সমস্যার েেত্র নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়া যেতে পারে- জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, পানীয় জলের সংকট, আর্সেনিক দূষণ, বৃরাজি ধ্বংস, কৃষিজমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, দেশীয় মাছের পোনা নিধন অপরিকল্পিতভাবে সøুইস গেট বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণ এবং কাঁচা পায়খানার ব্যবহার এবং যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ।
প্রথমেই নদীর কথা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। মেঘালয়ের গারো পাহাড় হতে নিম্নে সমতল ভূমিতে এসে এই অঞ্চলের প্রতিটি নদী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত। নদীগুলো বর্ষায় তীব্র রস্রোতা থাকে। প্রবাহিত পলি ও বালু পড়ে তলদেশে ভরাট হওয়ায় নদীগুলো নাব্যতা সংকটে ভুগছে। পাহাড়ে বৃষ্টি হলে বর্ষার মৌসুমে নদীর দুই কূল প্লাবিত হয়ে বন্যার সৃষ্টি হলে অধিবাসীদের দুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়। নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী নদী ’মগড়া’।
পূর্বধলার নেতাই নদী থেকে জন্ম নিয়ে এ নদী পূর্বধলা, নেত্রকোনা সদর, আটপাড়া ও মদন উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জেলা শহরের বুক চিরে এ নদী প্রবাহিত হওয়ায় নেত্রকোনাকে বলা হয় ’মগড়া তীরের জনপদ’। উৎসমুখ ভরাট এবং পূর্বধলার ত্রিমোহনীতে নদী শাসন করে একটি সøুইস গেট নির্মাণের কারণে বহু কিংবদন্তির মগড়া আজ মরা, স্রোতহারা। এর বুকে এখন কোথাও কোথাও ফসলের মাঠ।
নেত্রকোনার পাহাড়ি জনপদ দুর্গাপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সোমেশ্বরী নদী। মেঘালয়ের পাদদেশ থেকে নেমে আসা এ নদীটির চরিত্রও বিচিত্র। শুষ্ক মৌসুমে নদীটি ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়।
অন্যদিকে বর্ষায় হয়ে ওঠে ভয়াল ও বিধ্বংসী। সামান্য বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলেই নদীটি উপচে পড়ে। সৃষ্টি করে অকাল বন্যার। বন্যা ও ভাঙনের শিকার হয় দুই কূলের বিশাল জনবসতি। এদিকে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে সোমেশ্বরী বয়ে আনে বিপুল পরিমাণ সিলিকা বালি। নদী উপকূলে বালির স্তর পড়ে। ফলে মরুভূমির মতো বিরান প্রান্তরে পরিণত হয় কৃষি জমি। ইতোমধ্যে দুর্গাপুরের হাজার হাজার একর আবাদি জমি অনাবাদি হয়ে গেছে। ভাঙনে বিলীন হয়েছে বহু বাড়িঘর। এসব কারণে চীনের ’হোয়াংহো’র মতোই সোমেশ্বরীকে বলা হয় ‘পাহাড়ি জনপদের দুঃখ’।
একই অবস্থা মোহনগঞ্জের ঘোরাউৎরা এবং সাপমারা নদীর। এ ছাড়াও অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে ঠাকারাকোনার ধনাইখালি, সলি, সলি বুবিজান, বারহাট্টা-কলমাকান্দার মাঝামাঝি গোলামখালি এবং মদনের বালই নদী।
এদিকে নদনদী ভরাট, বিলীন ও গতিপথ পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এলাকার কৃষি, যোগাযোগ, মৎস্য, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর। ২০ বছর আগেও যে কৃষকরা নদীর পানি দিয়ে জমির সেচ দিতে, বাধ্য হয়ে এখন তারা শ্যালো ইঞ্জিন ব্যবহার করেন। এতে করে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বলাবাহুল্য, এত বেশি নদনদী এবং জলাশয়ের কারণেই নেত্রকোনাকে বলা মৎস্যভাণ্ডার। এখন খোদ নেত্রকোনাতেই মাছের আকাল। বিলুপ্ত হয়ে গেছে সোমেশ্বরীর মহাশোল, কংসের বাঘা আইড়সহ নানা প্রজাতির মাছ, জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ। অন্যদিকে জেলার নৌযোগাযোগ ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে গেছে। কাজ হারিয়েছেন অসংখ্য মাঝি-মাল্লা। বদ্ধ জলাশয়ের নামে নদীগুলো ইজারা দেওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছেন মৎস্যজীবীরা। তবে নদনদীর অস্তিত্ব সংকটে পোয়াবারো অবস্থায় আছেন দখলদাররা।
জ্বালানি ও অন্যান্য গৃহস্থালি প্রয়োজনে এ অঞ্চলের বৃরাজি দিনে দিনে যেভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে, সে তুলনায় বন গড়ে তুলবার ব্যাপারে কোন মহলেরই তেমন কার্যকর উদ্যোগে চোখে পড়ে না। খাসজমিতে জন্ম নেয়া বৃ নিধনে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কিছু রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সর্বদা যোগাযোগ রা করে চলে। রাজনৈতিক পরিচয় ও শক্তি নিয়ে এর গাছ কাটে বলে স্থানীয় কর্তৃপরে চোখের সামনে এসব ঘটলেও এদের দমন করা তাদের পে সম্ভব হয় না। এভাবেই আজ এ অঞ্চলের অনেক গাছপালা ধ্বংস হয়ে গেছে।
তিগ্রস্ত হচ্ছে হাওর এলাকার কৃষিজমি ও প্রাণবৈচিত্র্য। হাওরনির্ভর জীবিকা হারিয়ে পরিবেশগত উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে হাওরবাসী। হাওরের দৃশ্যমান বড় সম্পদের নাম মিষ্টি পানি। বর্ষায় বাংলাদেশের যে পরিমাণ পানি থাকে তার বড় অংশটিই বিরাজ করে হাওরে। এটি একটি বিশালাকারের প্রাকৃতিক জলাশয়। এই পানিকে কেবলমাত্র মাছের জন্য নয় শুকনো মৌসুমে কাজে লাগানোর কথা ভাবা দরকার। গারো পাহাড়ের পাদদেশে বা কোন কোন হাওরে বা বিলগুলো খনন করে পানি সংরণ করে এই এলাকার কৃষির আমূল পরিবর্তন সম্ভব।
শিকার করা মানুষের প্রাচীন পেশাগুলোর অন্যতম। যেখানেই জনবসতি গড়ে উঠেছে, সেখানেই শিকারিদের দেখা গেছে। হাওরাঞ্চলেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। পাখি শিকার করে বীরত্ব প্রকাশের সামন্তবাদী রেওয়াজ হাওরাঞ্চলগুলোতে এখনো রয়ে গেছে। পত্র-পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, হাওরাঞ্চলে যাদের লাইসেন্স করা বন্দুক রয়েছে তাদের প্রত্যেকেই কমবেশি পাখি শিকার করে থাকেন। এদের মধ্যে আছেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাও। এমনকি যারা পাখি নিধন করার বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করেন শীত মৌসুমে তারাও এ জঘন্য কাজে লিপ্ত হন।
হাওরের লোকজন প্রতিবছর জল আতঙ্কে ভোগে। বর্ষায় গোটা হাওর এলাকা জলে ফুলে ফেঁপে ওঠে। তখন হাওর আর হাওর থাকে না। পরিণত হয় কূলহীন সমুদ্রে। আর গ্রামগুলো হয়ে ওঠে একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। কচুরিপানার মতো ভাসতে থাকে দ্বীপ সদৃশ্য গ্রামগুলো। এ সময় হাওরের প্রকৃতিও হয়ে ওঠে ভয়াবহ, উন্মাতাল। কোন বাধাই মানতে চায় না সে। সামান্য বাতাসেই হাওরের পানিতে প্রচণ্ড ঢেউ ওঠে। বিশাল বড় বড় এসব ঢেউ আঘাত করে গ্রামগুলোর ওপর। এতে ভাঙে গ্রাম, বসতবাড়ি। আঞ্চলিক ভাষায় এ ধরনের দুর্যোগকে বলা হয় ‘আফাল’। গত এক শতাব্দীতে আফালের তাণ্ডবে হাওর জনপদের বহু গ্রাম বিলীন হয়ে গেছে, মুছে গেছে মানচিত্র থেকে। বর্ষা বন্যা ও ঢেউয়ের ভাঙনে অতীতের বিভিন্ন সময়ে খালিয়াজুরির অন্তত ২২টি গ্রামে হাওরগর্বে বিলীন হয়ে গেছে, মুছে গেছে মানচিত্র থেকে। এই সব গ্রামের মানুষ হয়ে গেছে ভিটে মাটি শূন্য।
তবে আফালের তাণ্ডব থেকে ঘরবাড়ি রার প্রস্তুতিও সেখানে কম নয়। প্রতিবছর বাড়ির চারপাশে বাঁশ-কাঠ দিয়ে এক ধরনের বাঁধ নির্মাণ করতে হয়। একেকটি বাঁধে খরচ পড়ে তিন-চার হাজার টাকা। যাদের এ সামর্থ্য থাকে না তারাই বেশি তিগ্রস্ত হয়। তাই হাওরবাসীর আনন্দবেদনার সঙ্গে অনেকখানিই জড়িয়ে আছে সর্বনাশা এ আফালের নাম। অন্যদিকে বন্যাও এ অঞ্চলের প্রায় নিত্যসঙ্গী। হাওরে দুই ধরনের বন্যা হয়। একটি অকাল (আগাম) বন্যা অন্যটি বর্ষাকালীন বন্যা। বর্ষাকালীন বন্যা যতটা না ভয়াবহ তার চেয়ে বেশি ভয়াবহ অকাল বন্যা। সাধারণত চৈত্র-বৈশাখ মাসে এ বন্যা হয়। এতে হাওরের মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। আর একবার ফসল তলিয়ে গেলে কৃষকরা সহায়সম্বল হারিয়ে রীতিমত নিঃস্ব হয়ে যান। এ ছাড়াও খরা, শিলাবৃষ্টি, চিটায় ফসল হানিসহ নানা দুর্যোগের সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম করে বাঁচতে হয় প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
মৎস্যভাণ্ডার নামে খ্যাত নেত্রকোনা অঞ্চল এখন শুধুই মাছের অকাল। এলাকা মৎস্যশূন্য হয়ে পড়ছে। স্থানীয় বাজারগুলোতে স্থানীয় জাতের মাছের পরিবর্তে আগ্রাসী বা বিদেশি মাছে ভর্তি। সারা বছর জেলার জলমহালে ছোট বড় নানা বৈচিত্র্যময় মাছে ভরপুর থাকত। প্রভাবশালী অমৎস্যজীবী ব্যবসায়ীদের দাপটে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা তাদের পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অতিলোভী অমৎস্যজীবী লোকদের হাতে জলমহাল থাকায় অবাধে মৎস্য সম্পদ শিকার করে মাছ বৈচিত্র্য ধ্বংস করে দিচ্ছে। কিন্তু একজন মৎস্যজীবী কখনো মাছকে বিলুপ্ত হতে দেয় না, কেননা এটার মাধ্যমেই তার জীবনজীবিকা নিশ্চিত হয়, সে তার পেশাকে টিকিয়ে রাখতে চায়। তাই সে কখনো মা মাছ বা ডিম ওয়ালা মাছ ধরে না, মাছের বংশ বিস্তারে বাধা সৃষ্টি করে না। বরঞ্চ তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় মাছের বংশবিস্তারে সহযোগিতা করে। অন্যদিকে রাসায়নিক কৃষি প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে জমিতে অবাধে সার, বিষ, কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাছের প্রজনন নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে, স্থানীয় জাতের মাছ সংরণের েেত্র রাসায়নিক কৃষির পরিবর্তে জৈব কৃষির দিকে আমাদের সবার মনোযোগ দিতে হবে।
নেত্রকোনা জেলা সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলা পাহাড়বেষ্টিত সবুজ প্রকৃতি এখন বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভে অপরিকল্পিতভাবে গারো পাহাড় এবং পাহাড় সংলগ্ন চাষের জমি খনন করে নির্বিচারে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। কাটা হচ্ছে পাহাড়। ধ্বংস হচ্ছে পাহাড়ি সমভূমি। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ভেসে আসা নুড়ি পাথর জমা হয়ে সমতলের চাষের ভূমি নষ্ট করছে। এ কারণে চাষের জমি অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে। বালির নিচে চাপা পড়ছে চাষের জমি। গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য আজ হুমকির সম্মুখীন। আদিবাসীদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ছে। আমাদের স্কুলপাঠ্য বইগুলোতে পরিবেশ বিষয়ে এমন ধারণা দেয়া উচিত, যাতে একটি পঞ্চম শ্রেণী উত্তীর্ণ ছেলে বা মেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরিবেশ বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠে। পাঠ্যবহির্ভূত কার্যক্রম থেকেই ছেলেমেয়েরা এ বিষয়ে যা কিছু জানতে পারে। অর্থাৎ পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতা আমাদের আলাদা করে শিখে নিতে হয়। সেটা আসতে পারে শিকসহ অন্যান্য বর্ষীয়ান ব্যক্তিদের কাছ থেকে শুনে, রেডিও-টিভির অনুষ্ঠান শুনে ও দেখে, স্কুলপাঠ্যের বাইরের পরিবেশ সহায়ক পুস্তক, পুস্তিকা, লিফলেট, পোস্টার পড়ে, পরিবেশ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা ও মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে কিংবা এ জাতীয় অন্য কোন উপায়ে।
জেলা ভিত্তিক পরিবেশ রায় এখানে কয়েকটি সুপারিশ করা হলো। কারেন্ট জাল, খনা জাল নিষিদ্ধ করতে হবে। এপ্রিল-জুন মাসে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করতে হবে, উন্মুক্ত জলাশয়ে এবং জলাশয়ে, মাছের প্রজনন কেন্দ্রে বিষ- কীটনাশক ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে, ভরাট নদী ও খাল সরকারিভাবে খনন করার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষিতে রাসায়নিক সার ব্যবহারের তিকারক দিক সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করতে হবে, কৃষি জমি ব্যবহারে শক্ত নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে যথাযথ পদপে গ্রহণ, কৃষি জমিতে ইট ভাটা, মার্কেট, মৎস্য খামার, মোবাইল টাওয়ার করা যাবে না, গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্য বেতার, টেলিভিশন, মাইকে প্রচার, পোস্টার, লিফলেট, পুস্তিকা বিতরণসহ ব্যাপক সভা-সমাবেশ আয়োজন করতে হবে, স্কুল, কলেজে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম আয়োজনসহ পাঠ্যপুস্তকে পরিবেশের গুরুত্ব নির্দেশ করে আরও অধিক হারে প্রবন্ধ সংকলন করতে হবে, নদী খনন বা ড্রেজিং করে ও সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করে নদীর পানি ধারণ মতা বৃদ্ধি করতে হবে, পরিকল্পিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করতে হবে, পাখি ও দেশি মাছ সংরণে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, হাওরের প্রতিবেশ ও পরিবেশ রার জন্য হিজল, করস, নলখাগড়ার বনায়ন করা প্রয়োজন। সব হাওরের কান্দা এলাকায় বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে এগুলো রণাবেণের দায়িত্ব দেয়া দরকার হাওরবাসীকে এবং সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
ড.ফোরকান আলী
বাংলাদেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং নেত্রকোনা হাওর অঞ্চল হিসেবে সারাদেশে পরিচিত। অবশ্য এই তালিকায় আরও কয়েকটি জেলার নাম আসতে পারে। তবে উপরের পাঁচটি জেলাই মূলত হাওর জেলা। কিন্তু এই সব হাওর জেলার মানুষের জীবনযাত্রা এবং নিম্ন আয়ের লোকজনের অবস্থা কেমন, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে তারা কেমন পরিবেশে টিকে আছে এই বিষয়গুলো নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন তেমন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে জলবায়ুর প্রভাবে এসব হাওর জেলার প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভূমিও য়ে যাচ্ছে। গৃহহীন হচ্ছে শত শত পরিবার। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারি উদ্যোগ তেমন চোখে পড়ে না। আমি আমার নিবন্ধে পাঁচ জেলার মধ্যে পরিবেশ বিপর্যয়ে নেত্রকোনা জেলার চিত্রটাই তুলে ধরছি।
এই সুবিশাল ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্বপাশে গারো পাহাড়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাওর, খাল-বিল, নদী-নালা, কৃষি আর ছোট ছোট বন-জঙ্গলের গড়ে ওঠা ২৭৮৫.৬৮ বর্গ কিলোমিটারের জনপদ নেত্রকোনা জেলা। এর মধ্যে রয়েছে অসংখ্য নদনদী, ৫৬টি ছোটবড় হাওর, গারো পাহাড়। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের লীলাভূমিতে বিচিত্র নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের জনগোষ্ঠী নিয়ে গড়ে উঠেছে ভাটি এলাকার এ জনপদ। এ জেলার মানুষের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি। উপজেলাগুলোর সঙ্গে জেলা সদরের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই নাজুক। জেলার অধিকাংশ উপজেলার লোকজন কৃষি নির্ভর এবং সেখানে একটি মাত্র ফসল হয় তা হলো বোরো, তাও আবার এই ফসল প্রকৃতির খেয়াল-খুশির ওপর নির্ভরশীল। ফসল কাটার পর কৃষকদের আর কোন কাজ থাকে না। তারা হয়ে যায় বেকার।
বাংলাদেশে ১৯৭৭ সালে পরিবেশ দূষণ বিধিমালায় পরিবেশের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, আমাদের চারপাশে বায়ু, পানি, ভূমি, খাদ্য ও বাসস্থান যা কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের জীবনযাপনে সহায়তা করে বা প্রভাবিত করে তাকে পরিবেশ বলা হয়। আমরা জীবনধারণের প্রয়োজনে বা নিজেদের খেয়াল খুশিমতে প্রকৃতিকে প্রায়ই এমনভাবে ব্যবহার করে থাকি, যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে চলেছে। পানি, বাতাস, মাটি ও জীবনকুলসহ পরিবেশের কোন উপাদানের যখন কোন রকম পরিবর্তন ঘটে, যা প্রত্য বা পরোভাবে তাৎণিক বা পরবর্তীতে জীবজগতের ওপর নেতিবাচক ও তিকর প্রভাব ফেলে বা ফেলতে পারে, তখন এ অবস্থাকে পরিবেশের বিপর্যয় বলা হয়। নেত্রকোনা জেলার পরিবেশ সমস্যার েেত্র নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়া যেতে পারে- জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, পানীয় জলের সংকট, আর্সেনিক দূষণ, বৃরাজি ধ্বংস, কৃষিজমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, দেশীয় মাছের পোনা নিধন অপরিকল্পিতভাবে সøুইস গেট বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণ এবং কাঁচা পায়খানার ব্যবহার এবং যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ।
প্রথমেই নদীর কথা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। মেঘালয়ের গারো পাহাড় হতে নিম্নে সমতল ভূমিতে এসে এই অঞ্চলের প্রতিটি নদী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত। নদীগুলো বর্ষায় তীব্র রস্রোতা থাকে। প্রবাহিত পলি ও বালু পড়ে তলদেশে ভরাট হওয়ায় নদীগুলো নাব্যতা সংকটে ভুগছে। পাহাড়ে বৃষ্টি হলে বর্ষার মৌসুমে নদীর দুই কূল প্লাবিত হয়ে বন্যার সৃষ্টি হলে অধিবাসীদের দুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়। নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী নদী ’মগড়া’।
পূর্বধলার নেতাই নদী থেকে জন্ম নিয়ে এ নদী পূর্বধলা, নেত্রকোনা সদর, আটপাড়া ও মদন উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জেলা শহরের বুক চিরে এ নদী প্রবাহিত হওয়ায় নেত্রকোনাকে বলা হয় ’মগড়া তীরের জনপদ’। উৎসমুখ ভরাট এবং পূর্বধলার ত্রিমোহনীতে নদী শাসন করে একটি সøুইস গেট নির্মাণের কারণে বহু কিংবদন্তির মগড়া আজ মরা, স্রোতহারা। এর বুকে এখন কোথাও কোথাও ফসলের মাঠ।
নেত্রকোনার পাহাড়ি জনপদ দুর্গাপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সোমেশ্বরী নদী। মেঘালয়ের পাদদেশ থেকে নেমে আসা এ নদীটির চরিত্রও বিচিত্র। শুষ্ক মৌসুমে নদীটি ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়।
অন্যদিকে বর্ষায় হয়ে ওঠে ভয়াল ও বিধ্বংসী। সামান্য বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলেই নদীটি উপচে পড়ে। সৃষ্টি করে অকাল বন্যার। বন্যা ও ভাঙনের শিকার হয় দুই কূলের বিশাল জনবসতি। এদিকে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে সোমেশ্বরী বয়ে আনে বিপুল পরিমাণ সিলিকা বালি। নদী উপকূলে বালির স্তর পড়ে। ফলে মরুভূমির মতো বিরান প্রান্তরে পরিণত হয় কৃষি জমি। ইতোমধ্যে দুর্গাপুরের হাজার হাজার একর আবাদি জমি অনাবাদি হয়ে গেছে। ভাঙনে বিলীন হয়েছে বহু বাড়িঘর। এসব কারণে চীনের ’হোয়াংহো’র মতোই সোমেশ্বরীকে বলা হয় ‘পাহাড়ি জনপদের দুঃখ’।
একই অবস্থা মোহনগঞ্জের ঘোরাউৎরা এবং সাপমারা নদীর। এ ছাড়াও অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে ঠাকারাকোনার ধনাইখালি, সলি, সলি বুবিজান, বারহাট্টা-কলমাকান্দার মাঝামাঝি গোলামখালি এবং মদনের বালই নদী।
এদিকে নদনদী ভরাট, বিলীন ও গতিপথ পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এলাকার কৃষি, যোগাযোগ, মৎস্য, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর। ২০ বছর আগেও যে কৃষকরা নদীর পানি দিয়ে জমির সেচ দিতে, বাধ্য হয়ে এখন তারা শ্যালো ইঞ্জিন ব্যবহার করেন। এতে করে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বলাবাহুল্য, এত বেশি নদনদী এবং জলাশয়ের কারণেই নেত্রকোনাকে বলা মৎস্যভাণ্ডার। এখন খোদ নেত্রকোনাতেই মাছের আকাল। বিলুপ্ত হয়ে গেছে সোমেশ্বরীর মহাশোল, কংসের বাঘা আইড়সহ নানা প্রজাতির মাছ, জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ। অন্যদিকে জেলার নৌযোগাযোগ ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে গেছে। কাজ হারিয়েছেন অসংখ্য মাঝি-মাল্লা। বদ্ধ জলাশয়ের নামে নদীগুলো ইজারা দেওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছেন মৎস্যজীবীরা। তবে নদনদীর অস্তিত্ব সংকটে পোয়াবারো অবস্থায় আছেন দখলদাররা।
জ্বালানি ও অন্যান্য গৃহস্থালি প্রয়োজনে এ অঞ্চলের বৃরাজি দিনে দিনে যেভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে, সে তুলনায় বন গড়ে তুলবার ব্যাপারে কোন মহলেরই তেমন কার্যকর উদ্যোগে চোখে পড়ে না। খাসজমিতে জন্ম নেয়া বৃ নিধনে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কিছু রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সর্বদা যোগাযোগ রা করে চলে। রাজনৈতিক পরিচয় ও শক্তি নিয়ে এর গাছ কাটে বলে স্থানীয় কর্তৃপরে চোখের সামনে এসব ঘটলেও এদের দমন করা তাদের পে সম্ভব হয় না। এভাবেই আজ এ অঞ্চলের অনেক গাছপালা ধ্বংস হয়ে গেছে।
তিগ্রস্ত হচ্ছে হাওর এলাকার কৃষিজমি ও প্রাণবৈচিত্র্য। হাওরনির্ভর জীবিকা হারিয়ে পরিবেশগত উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে হাওরবাসী। হাওরের দৃশ্যমান বড় সম্পদের নাম মিষ্টি পানি। বর্ষায় বাংলাদেশের যে পরিমাণ পানি থাকে তার বড় অংশটিই বিরাজ করে হাওরে। এটি একটি বিশালাকারের প্রাকৃতিক জলাশয়। এই পানিকে কেবলমাত্র মাছের জন্য নয় শুকনো মৌসুমে কাজে লাগানোর কথা ভাবা দরকার। গারো পাহাড়ের পাদদেশে বা কোন কোন হাওরে বা বিলগুলো খনন করে পানি সংরণ করে এই এলাকার কৃষির আমূল পরিবর্তন সম্ভব।
শিকার করা মানুষের প্রাচীন পেশাগুলোর অন্যতম। যেখানেই জনবসতি গড়ে উঠেছে, সেখানেই শিকারিদের দেখা গেছে। হাওরাঞ্চলেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। পাখি শিকার করে বীরত্ব প্রকাশের সামন্তবাদী রেওয়াজ হাওরাঞ্চলগুলোতে এখনো রয়ে গেছে। পত্র-পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, হাওরাঞ্চলে যাদের লাইসেন্স করা বন্দুক রয়েছে তাদের প্রত্যেকেই কমবেশি পাখি শিকার করে থাকেন। এদের মধ্যে আছেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাও। এমনকি যারা পাখি নিধন করার বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করেন শীত মৌসুমে তারাও এ জঘন্য কাজে লিপ্ত হন।
হাওরের লোকজন প্রতিবছর জল আতঙ্কে ভোগে। বর্ষায় গোটা হাওর এলাকা জলে ফুলে ফেঁপে ওঠে। তখন হাওর আর হাওর থাকে না। পরিণত হয় কূলহীন সমুদ্রে। আর গ্রামগুলো হয়ে ওঠে একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। কচুরিপানার মতো ভাসতে থাকে দ্বীপ সদৃশ্য গ্রামগুলো। এ সময় হাওরের প্রকৃতিও হয়ে ওঠে ভয়াবহ, উন্মাতাল। কোন বাধাই মানতে চায় না সে। সামান্য বাতাসেই হাওরের পানিতে প্রচণ্ড ঢেউ ওঠে। বিশাল বড় বড় এসব ঢেউ আঘাত করে গ্রামগুলোর ওপর। এতে ভাঙে গ্রাম, বসতবাড়ি। আঞ্চলিক ভাষায় এ ধরনের দুর্যোগকে বলা হয় ‘আফাল’। গত এক শতাব্দীতে আফালের তাণ্ডবে হাওর জনপদের বহু গ্রাম বিলীন হয়ে গেছে, মুছে গেছে মানচিত্র থেকে। বর্ষা বন্যা ও ঢেউয়ের ভাঙনে অতীতের বিভিন্ন সময়ে খালিয়াজুরির অন্তত ২২টি গ্রামে হাওরগর্বে বিলীন হয়ে গেছে, মুছে গেছে মানচিত্র থেকে। এই সব গ্রামের মানুষ হয়ে গেছে ভিটে মাটি শূন্য।
তবে আফালের তাণ্ডব থেকে ঘরবাড়ি রার প্রস্তুতিও সেখানে কম নয়। প্রতিবছর বাড়ির চারপাশে বাঁশ-কাঠ দিয়ে এক ধরনের বাঁধ নির্মাণ করতে হয়। একেকটি বাঁধে খরচ পড়ে তিন-চার হাজার টাকা। যাদের এ সামর্থ্য থাকে না তারাই বেশি তিগ্রস্ত হয়। তাই হাওরবাসীর আনন্দবেদনার সঙ্গে অনেকখানিই জড়িয়ে আছে সর্বনাশা এ আফালের নাম। অন্যদিকে বন্যাও এ অঞ্চলের প্রায় নিত্যসঙ্গী। হাওরে দুই ধরনের বন্যা হয়। একটি অকাল (আগাম) বন্যা অন্যটি বর্ষাকালীন বন্যা। বর্ষাকালীন বন্যা যতটা না ভয়াবহ তার চেয়ে বেশি ভয়াবহ অকাল বন্যা। সাধারণত চৈত্র-বৈশাখ মাসে এ বন্যা হয়। এতে হাওরের মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। আর একবার ফসল তলিয়ে গেলে কৃষকরা সহায়সম্বল হারিয়ে রীতিমত নিঃস্ব হয়ে যান। এ ছাড়াও খরা, শিলাবৃষ্টি, চিটায় ফসল হানিসহ নানা দুর্যোগের সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম করে বাঁচতে হয় প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
মৎস্যভাণ্ডার নামে খ্যাত নেত্রকোনা অঞ্চল এখন শুধুই মাছের অকাল। এলাকা মৎস্যশূন্য হয়ে পড়ছে। স্থানীয় বাজারগুলোতে স্থানীয় জাতের মাছের পরিবর্তে আগ্রাসী বা বিদেশি মাছে ভর্তি। সারা বছর জেলার জলমহালে ছোট বড় নানা বৈচিত্র্যময় মাছে ভরপুর থাকত। প্রভাবশালী অমৎস্যজীবী ব্যবসায়ীদের দাপটে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা তাদের পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অতিলোভী অমৎস্যজীবী লোকদের হাতে জলমহাল থাকায় অবাধে মৎস্য সম্পদ শিকার করে মাছ বৈচিত্র্য ধ্বংস করে দিচ্ছে। কিন্তু একজন মৎস্যজীবী কখনো মাছকে বিলুপ্ত হতে দেয় না, কেননা এটার মাধ্যমেই তার জীবনজীবিকা নিশ্চিত হয়, সে তার পেশাকে টিকিয়ে রাখতে চায়। তাই সে কখনো মা মাছ বা ডিম ওয়ালা মাছ ধরে না, মাছের বংশ বিস্তারে বাধা সৃষ্টি করে না। বরঞ্চ তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় মাছের বংশবিস্তারে সহযোগিতা করে। অন্যদিকে রাসায়নিক কৃষি প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে জমিতে অবাধে সার, বিষ, কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাছের প্রজনন নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে, স্থানীয় জাতের মাছ সংরণের েেত্র রাসায়নিক কৃষির পরিবর্তে জৈব কৃষির দিকে আমাদের সবার মনোযোগ দিতে হবে।
নেত্রকোনা জেলা সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলা পাহাড়বেষ্টিত সবুজ প্রকৃতি এখন বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভে অপরিকল্পিতভাবে গারো পাহাড় এবং পাহাড় সংলগ্ন চাষের জমি খনন করে নির্বিচারে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। কাটা হচ্ছে পাহাড়। ধ্বংস হচ্ছে পাহাড়ি সমভূমি। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ভেসে আসা নুড়ি পাথর জমা হয়ে সমতলের চাষের ভূমি নষ্ট করছে। এ কারণে চাষের জমি অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে। বালির নিচে চাপা পড়ছে চাষের জমি। গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য আজ হুমকির সম্মুখীন। আদিবাসীদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ছে। আমাদের স্কুলপাঠ্য বইগুলোতে পরিবেশ বিষয়ে এমন ধারণা দেয়া উচিত, যাতে একটি পঞ্চম শ্রেণী উত্তীর্ণ ছেলে বা মেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরিবেশ বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠে। পাঠ্যবহির্ভূত কার্যক্রম থেকেই ছেলেমেয়েরা এ বিষয়ে যা কিছু জানতে পারে। অর্থাৎ পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতা আমাদের আলাদা করে শিখে নিতে হয়। সেটা আসতে পারে শিকসহ অন্যান্য বর্ষীয়ান ব্যক্তিদের কাছ থেকে শুনে, রেডিও-টিভির অনুষ্ঠান শুনে ও দেখে, স্কুলপাঠ্যের বাইরের পরিবেশ সহায়ক পুস্তক, পুস্তিকা, লিফলেট, পোস্টার পড়ে, পরিবেশ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা ও মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে কিংবা এ জাতীয় অন্য কোন উপায়ে।
জেলা ভিত্তিক পরিবেশ রায় এখানে কয়েকটি সুপারিশ করা হলো। কারেন্ট জাল, খনা জাল নিষিদ্ধ করতে হবে। এপ্রিল-জুন মাসে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করতে হবে, উন্মুক্ত জলাশয়ে এবং জলাশয়ে, মাছের প্রজনন কেন্দ্রে বিষ- কীটনাশক ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে, ভরাট নদী ও খাল সরকারিভাবে খনন করার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষিতে রাসায়নিক সার ব্যবহারের তিকারক দিক সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করতে হবে, কৃষি জমি ব্যবহারে শক্ত নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে যথাযথ পদপে গ্রহণ, কৃষি জমিতে ইট ভাটা, মার্কেট, মৎস্য খামার, মোবাইল টাওয়ার করা যাবে না, গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্য বেতার, টেলিভিশন, মাইকে প্রচার, পোস্টার, লিফলেট, পুস্তিকা বিতরণসহ ব্যাপক সভা-সমাবেশ আয়োজন করতে হবে, স্কুল, কলেজে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম আয়োজনসহ পাঠ্যপুস্তকে পরিবেশের গুরুত্ব নির্দেশ করে আরও অধিক হারে প্রবন্ধ সংকলন করতে হবে, নদী খনন বা ড্রেজিং করে ও সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করে নদীর পানি ধারণ মতা বৃদ্ধি করতে হবে, পরিকল্পিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করতে হবে, পাখি ও দেশি মাছ সংরণে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, হাওরের প্রতিবেশ ও পরিবেশ রার জন্য হিজল, করস, নলখাগড়ার বনায়ন করা প্রয়োজন। সব হাওরের কান্দা এলাকায় বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে এগুলো রণাবেণের দায়িত্ব দেয়া দরকার হাওরবাসীকে এবং সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267
Email- dr.fourkanali@gmail.com
0 comments:
Post a Comment