বিজয়ের অস্তিত্ব অটুট রাখুন
ড.ফোরকান আলী
‘জয়’ শব্দটির আগে ‘বি’ উপসর্গ যুক্ত করলে যে শব্দটি গঠিত হয় সেটির তাৎপর্য গুণগতভাবেই পৃথক। অনেক অনেক ‘জয়’-এর পরিমাণগত পরিবর্তন ঘটতে ঘটতেই ‘বিজয়’ এর মধ্যে ঘটে গুণগত পরিবর্তন। ‘জয়’ যদি হয় বিবর্তনেরই আরেক নাম, তবে ‘বিজয়’ মানে বিপ্লব।পাকিস্তান নামক অদ্ভুত ও উদ্ভট রাষ্ট্রটি আমরাই প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। প্রতিষ্ঠার প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই আমাদের উপলব্ধি ঘটলো যে আমরা মারাত্মক ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছি। এই উপলব্ধির সঞ্চার হওয়া মাত্রই আমরা প্রতারণাভেদের সংগ্রামে নেমে পড়লাম। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আমাদের সেই সংগ্রামের সূচনা। ভাষার সংগ্রাম থেকেই সংস্কৃতির সংগ্রাম, আবহমান বাংলার ঐতিহ্যগত অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সেই সংগ্রামকে ক্রম-অগ্রগতিই আপন সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের চেতনাকে বিস্তৃততর ও গভীরতর করে তুললো। আমরা আমাদের ভাষার বর্ণমালার মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলাম। চর্যাপদ-শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-মঙ্গলকাব্য থেকে শুরু করে মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ পর্যন্ত সকলের মহান উত্তরাধিকারকে বিলুপ্তি ও বিকৃতির হাত থেকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের পালন করতে হয়েছিল। সে-সব দায়িত্ব পালন করতে করতেই আমরা এই বোধে উন্নীত হলাম যে পাকিস্তান নামক তথাকথিত রাষ্ট্রটির খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কোনো কিছুই রক্ষা করা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম দিয়ে শুরু করে আমরা উপনীত হলাম রাজনৈতিক সংগ্রামে। সেই রাজনৈতিক সংগ্রামটিরই পরিণতি ঘটলো সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে। নিরস্ত্র অথবা সশস্ত্রÑ সংগ্রামের সব পর্যায়েই ছোটবড় অনেক জয়ের গৌরব যেমন আমরা লাভ করেছি, তেমনই পরাজয়ের গ্লানিও আমাদের কম ভোগ করতে হয়নি। সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে শত্রু হনন করে ‘গাজী’ যেমন হয়েছি আমরা অনেকে, তেমনই অনেককে আমাদের মরণ-বিষের পোয়ালায় চুমুক দিয়ে শাহাদাতও বরণ করতে হয়েছে। গাজী ও শহীদদের মিলিত অবদানেই অনেক ক্ষুদ্র-বৃহৎ জয়-পরাজয়ের পাথার পেরিয়ে, আমরা উপনীত হলাম মহান বিজয়ের উপল উপকূলে। জয়কে আমরা বিজয়ে পরিণত করলাম তো রক্তসমুদ্র পাড়ি দিয়েই; তাই আমাদের বহু-কাক্সিক্ষত বিজয়ের দিন ষোলই ডিসেম্বর শুধু বছরের তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের একটি দিন হয়ে রইলো না, পরিণত হলো রক্তের অক্ষরে লেখা ‘দিবস’-এ। ষোলই ডিসেম্বরকে আমরা সঙ্গত কারণেই, ‘দিন’ বলি না, বলি ‘দিবস’Ñ ‘মহান বিজয় দিবস’। এ রকম বলাটি আমাদের একান্ত গৌরবদ্যোতকতারই পরিচায়ক।
কিন্তু আমাদের কাছে গৌরবদ্যোতক হলে কী হবে? যাদের কাছ থেকে বিজয় আমরা ছিনিয়ে এনেছি তাদের পরাজয়ের গ্লানি যে কত গভীর, সে কথাটিও ভুলে গেলে চলবে না। পরাজয়ের গ্লানি যে প্রত্যক্ষত পাকিস্তানের, তা তো আমরা সবাই জানি। সেই সঙ্গেই ভুলে থাকতে পারি না আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদদদাতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কথাও। আমাদের বিজয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের গ্লানিই বোধ হয় সবচেয়ে বেশি মর্মবিদারক। সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন প্রশাসন আমাদের মুক্তির সংগ্রামকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য তার পেয়ারের পাকিস্তানকে সর্ববিধ বৈষয়িক ও আত্মিক সহায়তা তো জুগিয়ে গেছে প্রথম থেকেই। একেবারে শেষপর্যায়ে চূড়ান্ত মরিয়া হয়ে উঠে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে আমাদের মুক্তির অভীপ্সাকে বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দেয়ার প্রয়াসও গ্রহণ করেছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই শেষরক্ষা হয়নি ওদের। বিজয়ী হয়েছি আমরাই। আমাদের এই বিজয় পাকিস্তান ও আমেরিকাকে তো যন্ত্রণাবিদ্ধ করেছেই, সবচেয়ে বেশি মর্মযাতনায় ভুগিয়েছে পাকিস্তান ও আমেরিকার বাংলাদেশি অনুচরদের। মনুষ্যনামধারী এই মনুষ্যেতর প্রাণীগুলোর বুকে আমাদের বিজয় যেন প্রতিনিয়ত তীক্ষè অঙ্কুশের আঘাত হানছে। সেই আঘাতের বেদনা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ওরা সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। বিজয়ের আনন্দে আমরা হয়েছি পুরোপুরি আত্মহারা। সে-রকম আত্মহারা হয়ে আমরা মনে করে বসেছি যে চিরকালের জন্য আমাদের শত্রুরা পরাজয় বরণ করেছে, অথবা আমাদের সব শত্রুই নিঃশেষিত হয়ে গেছে। অথচ ঘটছে যে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা, সে-রকম সন্দেহও আমাদের মনে উঁকি দেয়নি। যুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেই আমরা মনে করে বসেছি যে আমাদের সব কাজ শেষ হয়ে গেছে; এখন আমাদের নাকে তেল মেখে ঘুমোবার সময় এবং ছাব্বিশ মার্চের স্বাধীনতা দিবসে কিংবা ষোলই ডিসেম্বরের বিজয় দিবসে ধরমর করে জেগে উঠে নাচে-গানে-ফুর্তিতে গা ঢেলে দেয়ার অফুরন্ত সুযোগের আমরা অধিকারী। ‘চির জাগরণের মধ্য দিয়েই যে প্রতিনিয়ত স্বাধীনতার মূল্য পরিশোধ করে যেতে হয়’ (ঊঃবৎহধষ ঠরমরষধহপব রং ঃযব চৎরপব ড়ভ খরনবৎঃু)Ñ স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় লাভ করার সঙ্গেসঙ্গেই সেই মহাবাক্য অমরা বেমালুম ভুলে গেছি। সেই মহাভুলেরই মূল্য শোধ করে যাচ্ছি প্রতিদিনে প্রতিক্ষণে। বাকি অংশ ১৪ পৃষ্ঠায় একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বরে সশস্ত্র সংগ্রামে বিজয়ের পর বায়াত্তর সনেই আমরা একটি মহৎ কর্ম সম্পন্ন করেছিলাম। আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়কে ধরে রাখার জন্য জনগণের ‘মালিকানার দলিল’ প্রণয়ন ও গ্রহণ করেছিলাম। এই দলিলটিরই পোশাকি নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’। এই সংবিধানে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষিত হয়েছিল যে ‘জনগণই এই রাষ্ট্রের মালিক’। জনগণের মালিকানাকে চারটি শক্ত স্তম্ভের উপর স্থাপন করেছিলাম। জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রÑ এই চারটি স্তম্ভের মধ্যে প্রথমটির মধ্যে কিছুটা ত্রুটি অবশ্যি থেকে গিয়েছিল। দেশের সকল জাতিসত্তার অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করে সেই ত্রুটি খুব সহজেই সংশোধনযোগ্য। বাংলাদেশের এই সংবিধান পাকিস্তানবাদকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেই প্রণীত হয়েছিল। আর এ কারণেই এ সংবিধান পাকিস্তান- প্রেমিক তথা পাকিস্তানপন্থীদের গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছিল। সে জ্বালা জুড়ানোর জন্যই পঁচাত্তরের পর তারা সেই সংবিধানটিকে নির্মমভাবে কাঁটাছেঁড়া করে এতে পাকিস্তানবাদের অন্তঃসার ঢুকিয়ে দিয়েছে। তেমনটি করেই বাংলাদেশের বিজয়কে তারা নস্যাৎ করে ফেলতে পেরেছে, ষোলই ডিসেম্বরের বিজয়কে পরাজয়ের পঙ্কে ডুবিয়ে দিয়েছে। আর এই অপকর্মে তারা যেমন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা পেয়েছে পাকিস্তানের, তেমনই পেয়েছে পাকিস্তান-মিত্র বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের।
এরপরও কি আমরা ষোলই ডিসেম্বরের বিজয় দিবসে ভাবনাহীন বিনোদনের কোলে আত্মসমর্পণ করতে পারি? জনগণের মালিকানার মূল দলিল তথা চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত সংবিধানটির পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্পন্ন করার পূর্ব পর্যন্ত কি আমরা ভাবতে পারি যে আমাদের বিজয় এখনো বহাল আছে? তথাকথিত বিশ্বায়নের বেনামিতে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের নষ্টামি ও ধূর্তামিকে তীব্র ঘৃণায় জর্জরিত না করে কি বিজয় দিবসের কোনো অনুষ্ঠানই সুসম্পন্ন হতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর সন্ধানের মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান তথা বিজয়কে পরাজয়ের পঙ্ক থেকে উদ্ধার করতে পারি। প্রতিষ্ঠা করতে পারি বিজয়ের অন্তঃস্থিত বিপ্লবকেও। অটুট রাখতে পারি বিজয়ের অস্তিত্বকেও।
লেখক: ড.ফোরকান আলী
ড.ফোরকান আলী
‘জয়’ শব্দটির আগে ‘বি’ উপসর্গ যুক্ত করলে যে শব্দটি গঠিত হয় সেটির তাৎপর্য গুণগতভাবেই পৃথক। অনেক অনেক ‘জয়’-এর পরিমাণগত পরিবর্তন ঘটতে ঘটতেই ‘বিজয়’ এর মধ্যে ঘটে গুণগত পরিবর্তন। ‘জয়’ যদি হয় বিবর্তনেরই আরেক নাম, তবে ‘বিজয়’ মানে বিপ্লব।পাকিস্তান নামক অদ্ভুত ও উদ্ভট রাষ্ট্রটি আমরাই প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। প্রতিষ্ঠার প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই আমাদের উপলব্ধি ঘটলো যে আমরা মারাত্মক ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছি। এই উপলব্ধির সঞ্চার হওয়া মাত্রই আমরা প্রতারণাভেদের সংগ্রামে নেমে পড়লাম। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আমাদের সেই সংগ্রামের সূচনা। ভাষার সংগ্রাম থেকেই সংস্কৃতির সংগ্রাম, আবহমান বাংলার ঐতিহ্যগত অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সেই সংগ্রামকে ক্রম-অগ্রগতিই আপন সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের চেতনাকে বিস্তৃততর ও গভীরতর করে তুললো। আমরা আমাদের ভাষার বর্ণমালার মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলাম। চর্যাপদ-শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-মঙ্গলকাব্য থেকে শুরু করে মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ পর্যন্ত সকলের মহান উত্তরাধিকারকে বিলুপ্তি ও বিকৃতির হাত থেকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের পালন করতে হয়েছিল। সে-সব দায়িত্ব পালন করতে করতেই আমরা এই বোধে উন্নীত হলাম যে পাকিস্তান নামক তথাকথিত রাষ্ট্রটির খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কোনো কিছুই রক্ষা করা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম দিয়ে শুরু করে আমরা উপনীত হলাম রাজনৈতিক সংগ্রামে। সেই রাজনৈতিক সংগ্রামটিরই পরিণতি ঘটলো সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে। নিরস্ত্র অথবা সশস্ত্রÑ সংগ্রামের সব পর্যায়েই ছোটবড় অনেক জয়ের গৌরব যেমন আমরা লাভ করেছি, তেমনই পরাজয়ের গ্লানিও আমাদের কম ভোগ করতে হয়নি। সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে শত্রু হনন করে ‘গাজী’ যেমন হয়েছি আমরা অনেকে, তেমনই অনেককে আমাদের মরণ-বিষের পোয়ালায় চুমুক দিয়ে শাহাদাতও বরণ করতে হয়েছে। গাজী ও শহীদদের মিলিত অবদানেই অনেক ক্ষুদ্র-বৃহৎ জয়-পরাজয়ের পাথার পেরিয়ে, আমরা উপনীত হলাম মহান বিজয়ের উপল উপকূলে। জয়কে আমরা বিজয়ে পরিণত করলাম তো রক্তসমুদ্র পাড়ি দিয়েই; তাই আমাদের বহু-কাক্সিক্ষত বিজয়ের দিন ষোলই ডিসেম্বর শুধু বছরের তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের একটি দিন হয়ে রইলো না, পরিণত হলো রক্তের অক্ষরে লেখা ‘দিবস’-এ। ষোলই ডিসেম্বরকে আমরা সঙ্গত কারণেই, ‘দিন’ বলি না, বলি ‘দিবস’Ñ ‘মহান বিজয় দিবস’। এ রকম বলাটি আমাদের একান্ত গৌরবদ্যোতকতারই পরিচায়ক।
কিন্তু আমাদের কাছে গৌরবদ্যোতক হলে কী হবে? যাদের কাছ থেকে বিজয় আমরা ছিনিয়ে এনেছি তাদের পরাজয়ের গ্লানি যে কত গভীর, সে কথাটিও ভুলে গেলে চলবে না। পরাজয়ের গ্লানি যে প্রত্যক্ষত পাকিস্তানের, তা তো আমরা সবাই জানি। সেই সঙ্গেই ভুলে থাকতে পারি না আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদদদাতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কথাও। আমাদের বিজয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের গ্লানিই বোধ হয় সবচেয়ে বেশি মর্মবিদারক। সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন প্রশাসন আমাদের মুক্তির সংগ্রামকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য তার পেয়ারের পাকিস্তানকে সর্ববিধ বৈষয়িক ও আত্মিক সহায়তা তো জুগিয়ে গেছে প্রথম থেকেই। একেবারে শেষপর্যায়ে চূড়ান্ত মরিয়া হয়ে উঠে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে আমাদের মুক্তির অভীপ্সাকে বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দেয়ার প্রয়াসও গ্রহণ করেছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই শেষরক্ষা হয়নি ওদের। বিজয়ী হয়েছি আমরাই। আমাদের এই বিজয় পাকিস্তান ও আমেরিকাকে তো যন্ত্রণাবিদ্ধ করেছেই, সবচেয়ে বেশি মর্মযাতনায় ভুগিয়েছে পাকিস্তান ও আমেরিকার বাংলাদেশি অনুচরদের। মনুষ্যনামধারী এই মনুষ্যেতর প্রাণীগুলোর বুকে আমাদের বিজয় যেন প্রতিনিয়ত তীক্ষè অঙ্কুশের আঘাত হানছে। সেই আঘাতের বেদনা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ওরা সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। বিজয়ের আনন্দে আমরা হয়েছি পুরোপুরি আত্মহারা। সে-রকম আত্মহারা হয়ে আমরা মনে করে বসেছি যে চিরকালের জন্য আমাদের শত্রুরা পরাজয় বরণ করেছে, অথবা আমাদের সব শত্রুই নিঃশেষিত হয়ে গেছে। অথচ ঘটছে যে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা, সে-রকম সন্দেহও আমাদের মনে উঁকি দেয়নি। যুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেই আমরা মনে করে বসেছি যে আমাদের সব কাজ শেষ হয়ে গেছে; এখন আমাদের নাকে তেল মেখে ঘুমোবার সময় এবং ছাব্বিশ মার্চের স্বাধীনতা দিবসে কিংবা ষোলই ডিসেম্বরের বিজয় দিবসে ধরমর করে জেগে উঠে নাচে-গানে-ফুর্তিতে গা ঢেলে দেয়ার অফুরন্ত সুযোগের আমরা অধিকারী। ‘চির জাগরণের মধ্য দিয়েই যে প্রতিনিয়ত স্বাধীনতার মূল্য পরিশোধ করে যেতে হয়’ (ঊঃবৎহধষ ঠরমরষধহপব রং ঃযব চৎরপব ড়ভ খরনবৎঃু)Ñ স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় লাভ করার সঙ্গেসঙ্গেই সেই মহাবাক্য অমরা বেমালুম ভুলে গেছি। সেই মহাভুলেরই মূল্য শোধ করে যাচ্ছি প্রতিদিনে প্রতিক্ষণে। বাকি অংশ ১৪ পৃষ্ঠায় একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বরে সশস্ত্র সংগ্রামে বিজয়ের পর বায়াত্তর সনেই আমরা একটি মহৎ কর্ম সম্পন্ন করেছিলাম। আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়কে ধরে রাখার জন্য জনগণের ‘মালিকানার দলিল’ প্রণয়ন ও গ্রহণ করেছিলাম। এই দলিলটিরই পোশাকি নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’। এই সংবিধানে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষিত হয়েছিল যে ‘জনগণই এই রাষ্ট্রের মালিক’। জনগণের মালিকানাকে চারটি শক্ত স্তম্ভের উপর স্থাপন করেছিলাম। জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রÑ এই চারটি স্তম্ভের মধ্যে প্রথমটির মধ্যে কিছুটা ত্রুটি অবশ্যি থেকে গিয়েছিল। দেশের সকল জাতিসত্তার অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করে সেই ত্রুটি খুব সহজেই সংশোধনযোগ্য। বাংলাদেশের এই সংবিধান পাকিস্তানবাদকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেই প্রণীত হয়েছিল। আর এ কারণেই এ সংবিধান পাকিস্তান- প্রেমিক তথা পাকিস্তানপন্থীদের গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছিল। সে জ্বালা জুড়ানোর জন্যই পঁচাত্তরের পর তারা সেই সংবিধানটিকে নির্মমভাবে কাঁটাছেঁড়া করে এতে পাকিস্তানবাদের অন্তঃসার ঢুকিয়ে দিয়েছে। তেমনটি করেই বাংলাদেশের বিজয়কে তারা নস্যাৎ করে ফেলতে পেরেছে, ষোলই ডিসেম্বরের বিজয়কে পরাজয়ের পঙ্কে ডুবিয়ে দিয়েছে। আর এই অপকর্মে তারা যেমন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা পেয়েছে পাকিস্তানের, তেমনই পেয়েছে পাকিস্তান-মিত্র বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের।
এরপরও কি আমরা ষোলই ডিসেম্বরের বিজয় দিবসে ভাবনাহীন বিনোদনের কোলে আত্মসমর্পণ করতে পারি? জনগণের মালিকানার মূল দলিল তথা চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত সংবিধানটির পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্পন্ন করার পূর্ব পর্যন্ত কি আমরা ভাবতে পারি যে আমাদের বিজয় এখনো বহাল আছে? তথাকথিত বিশ্বায়নের বেনামিতে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের নষ্টামি ও ধূর্তামিকে তীব্র ঘৃণায় জর্জরিত না করে কি বিজয় দিবসের কোনো অনুষ্ঠানই সুসম্পন্ন হতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর সন্ধানের মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান তথা বিজয়কে পরাজয়ের পঙ্ক থেকে উদ্ধার করতে পারি। প্রতিষ্ঠা করতে পারি বিজয়ের অন্তঃস্থিত বিপ্লবকেও। অটুট রাখতে পারি বিজয়ের অস্তিত্বকেও।
লেখক: ড.ফোরকান আলী
M‡elK I mv‡eK
Aa¨ÿ
01711579267
dr.fourkanali@gmail.com
0 comments:
Post a Comment