Friday, November 29, 2013

কৃষক যেন ভালো থাকে

কৃষক যেন ভালো থাকে
  ড.ফোরকান আলী
এ দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। শতকরায় প্রকাশ করে দেশের উন্নয়নে তাদের এ অবদানকে শতভাগ বলা যেতে পারে; কারণ আমাদের মৌলিক চাহিদার সর্বপ্রথমে রয়েছে খাদ্য। পিঠে সহায়ে দেশের উন্নয়ন করতে গেলে পেটে খাদ্য থাকতে হবে। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে কৃষক বড় (খাদ্য উৎপাদন) অবদান রেখে চলেছে, সমাজে তার অবস্থান কোথায় তা কি আমরা জানি? কথিত সভ্যসমাজে ‘চাষা’ বলে পরিচিত কৃষক আজ অবহেলিত। চাষের জমি হারিয়ে, সময়মতো কৃষি উপকরণ না পেয়ে, উৎপাদিত পণ্যের নায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে কৃষক আজ দিশেহারা। আমি কৃষিবিদ বা অর্থনীতিবিদ নই। তবে পাঠ্যসূচিতে কৃষিবনায়ন থাকায় কৃষক, কৃষি ও কৃষিপণ্যের সঙ্গে ধারণা থাকায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস পাচ্ছি।
কৃষিপণ্যের যুগোপযোগী উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে দেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে বীজ, সার, সেচ, পাওয়ার পাম্প, কীটনাশক, কৃষিঋণ ইত্যাদি যা কিছু প্রয়োজন, কৃষক যাতে সবকিছু সহজেই পায় তার সুব্যবস্থা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে কৃষককে নিয়মিত ভর্তুকি দিতে হবে। কৃষক যাতে সহজে এগুলো পায় তার জন্য প্রতিটি উপজেলায় সরকারি তত্ত্বাবধানে কৃষি উপকরণ কেন্দ্র থাকতে হবে। এসব কেন্দ্রে কৃষক তার পণ্যের বিনিময়ে প্রয়োজনানুযায়ী যেন নগদ টাকা অথবা নায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে একজন করে মানবিক গুণসম্পন্ন সৎ কৃষি কর্মকর্তাসহ একটি কৃষি অফিস থাকবে, যেখান থেকে কৃষক তার কৃষিবিষয়ক সমস্যার সহজ সমাধান পাবে। ভেজাল বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি কিনে কৃষক যাতে না ঠকে তার বন্দোবস্ত করতে হবে। কৃষি কর্মকর্তাসহ কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সরকারি চাকরিজীবীকে প্রতিনিয়ত মাঠ পর্যবেণে পাঠাতে হবে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে মাঠে বসে কৃষককে যাতে ভাবতে না হয়, সে উদ্দেশে কৃষকদের সন্তানদের জন্য অন্তত দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শর্তসাপেে ‘কৃষি কোটা’ নামে মাসিক সরকারি বৃত্তি চালু করা যেতে পারে।
বীজ আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো উচিত। অথচ কৃষককে বীজ উৎপাদন ও সংরণের পরিবর্তে আমদানিকৃত বীজ ক্রয় করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে! প্রায়ই দেখা যায় আমদানিকৃত বিভিন্ন প্রকার বীজের ফসল থেকে নতুন করে আর বীজ উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। ফলে কৃষক বীজ উৎপাদন করতে না পেরে উচ্চমূল্যে বীজ কিনতে বাধ্য হচ্ছে, সেই সঙ্গে বীজ উৎপাদন ও সংরণের পদ্ধতি ভুলে যাচ্ছে। ফলে আমরা খাদ্যের জন্য ধীরে ধীরে বীজ আমদানির ওপরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। ভবিষ্যতে আমরা যদি কারও দ্বারা খাদ্য রাজনীতির শিকার হই, তবে বীজ রফতানি হবে তাদের প্রথম ও প্রধান হাতিয়ার। অতএব বীজ উৎপাদনে আমরা যতদিন পর্যন্ত আÍনির্ভরশীল হতে না পারব, ততদিন আমাদের কৃষকের স্বকীয়তা বজায় রাখতে হবে। কৃষক যাতে নিজেই বীজ সংরণ করতে পারে, সে ব্যাপারে তাকে দিকনির্দেশনা দিতে হবে।
কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং কৃষকের মাথায় হাত পড়ার আর একটি বড় কারণ হল কৃষি জমি হ্রাস পাওয়া। বিভিন্ন কারণে দেশে কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে। শিল্প-কলকারখানা ও ইটভাটাসহ কৃষিজমির বিকল্প কিছু ব্যবহারের মধ্যে ইদানীং ফুল ও তামাক চাষ আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে। দেশের হাজার হাজার একর কৃষিজমিতে ফুল ও তামাক চাষ হচ্ছে। কিন্তু ফুল-তামাক রফতানি করে চাল-ডাল আমদানির পরিণতি কখনোই শুভ হবে না। আমরা ফুল-তামাক রফতানি না করলে আমদানিকারকদের কিছুই আসবে যাবে না, কিন্তু চাল-ডাল আমদানি না করলে আমাদের এক বেলাও চলবে না। অতএব ফুল-তামাক চাষে যতই লাভ হোক, কারও প্রচারণায় প্ররোচিত না হয়ে খাদ্য ঘাটতি মেটাতে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন।
উপরের সবকিছুর সহজ সমাধান হলেও কৃষকের কিন্তু একটা হতাশা থেকেই যাবে। আর তা হল কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য। কৃষিপণ্যের দাম বাড়লে কৃষক লাভবান হনÑ কথাটার কোন যৌক্তিক ভিত্তি আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ আমাদের কৃষক নিজেও সীমিত আয়ের মানুষ। একই কৃষক সব কৃষিপণ্য নিজে উৎপাদন করে না। তাকে ধান বেচে ডাল কিনতে হয়; ডাল বেচে সবজি কিনতে হয়; সবজি বেচে পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন ইত্যাদি কিনতে হয়। এেেত্র ধান-চালসহ কৃষিপণ্যের দাম বাড়লে তারা নিজেরা লাভে দু’একটা পণ্য বিক্রি করতে পারলেও একাধিক পণ্য কিনে বরং তিগ্রস্ত হবে। আসলে বাজারে কৃষিপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলে কৃষকের চেয়ে বেশি লাভবান হয় মধ্যস্বত্বভোগীরা। দাম বেশি হোক বা কম হোক, মধ্যস্বত্বভোগীরাই সবসময় সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করে থাকে। অতি মুনাফালোভী একশ্রেণীর ব্যবসায়ী কৃষিপণ্য ক্রয় করে গুদামজাত করে রাখে। বিভিন্ন শ্রেণীর ব্যবসায়ীর সঙ্গে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে সিন্ডিকেট তৈরি করে পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। তারপর যখন পণ্যের চাহিদা তীব্রতর হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই তারা তাদের মজুদ পণ্য বেশি দামে বিক্রি করে মোটা অংকের মুনাফা করে। এেেত্র সরকারকে দলমত নির্বিশেষে সব মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কৃষক যাতে তাদের উৎপাদিত পণ্য নায্যমূল্যে সরাসরি সরকারের হাতে তুলে দিতে পারে, সেজন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারের প থেকে নায্যমূল্যে কৃষিপণ্য ক্রয়কেন্দ্র চালু করতে হবে। এসব সুবিধা পাওয়ার জন্য প্রতিটি কৃষকের অবশ্যই একটি কৃষি পরিচয়পত্র থাকতে হবে, যাতে অন্য কেউ এ সুযোগ গ্রহণ করতে না পারে। কৃষকের ওপরই নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ। কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। তাই কৃষক যাতে ভালো থাকে, সে ব্যবস্থাই করা দরকার। আর এজন্য যা যা করণীয়, সরকারকে তা-ই করতে হবে।


†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267

0 comments:

Post a Comment