ফোরকান আলী
ইছামতি নামে দেশের আট নদী বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। বিরূপ প্রকৃতি, অদূরদর্শী নদী ব্যবস্থাপনা ও ভূমিদস্যুদের তান্ডবে ইছামতি নামের সব নদীই এখন মরণদশায়। মৃতপ্রায় ইছামতির দু'পাড়ের প্রভাবশালীরা নদী দখলের প্রতিযোগিতায় যেভাবে নেমেছে তাতে এক সময় এসব নদীর চিহ্ন পর্যন্ত থাকবে না।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি বাঙালি নদীর একটি শাখা ইছামতি নাম ধারণ করে ধুনটের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ব্রহ্মগাছা বাজার অতি-ক্রম করে পূর্ব দিয়ে পাঙ্গাসী বন্দরের পূর্বপাশ ঘেঁষে দেিণ অগ্রসর হয়ে ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে নলকা সেতুর অর্ধকিলোমিটার উত্তরে ফুলজোড় নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। উভয় নদীর মিলিত ধারা আরো দেিণ গিয়ে হুরাসাগরে পতিত হয়েছে। এ নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৭ কিলোমিটার, প্রস্থ প্রায় ২১০ মিটার। দেশের তৃতীয় ইছামতি হিসাবে পরিচিত এই নদীতে এক সময় বড় বড় বজরা নৌকা চলতো। যন্ত্রচালিত বড় বড় নৌযানও চলতো সে সময় এই নদী পথে। ধুনটের নিমগাছি ইউনিয়নের ধামাচামা গ্রামে ইছামতির উপর বাঁধ নির্মাণের পর থেকে নদীটি নাব্যতা হারিয়ে মরণদশায় পতিত হয়। এছাড়া ২০০৫ সালে এই নদীর উপর রায়গঞ্জের ব্রহ্মগাছা এলাকায় সেতু নির্মাণ করা হয়। সেতুটি নির্মাণে 'ফাড লেভেল'র বিষয়টি কোন গুরুত্ব পায়নি। এ কারণে বর্ষা মৌসুমে সেতুটির দুই পাড় তলিয়ে যায়।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এক সময়ের বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহে সুগম এই নদীতে এখন আর কোন নৌযান চলাচল করতে পারে না। অপরদিকে শুকনা মৌসুমে নদীতে পানি না থাকায় দেখা দেয় মাছের আকাল। নদী-তীরবর্তী শত শত মৎস্যজীবী পরিবার এ সময়ে উপার্জনহীন মানবেতর জীবন-যাপন করে। নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চর জেগে ওঠায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা নেমেছে এ সকল চর দখলের প্রতিযোগিতায়। ব্রহ্মগাছা বাজার এলাকার বাসিন্দারা বলেন, অপরিকল্পিত সেতুটির ফাড লেভেল ঠিক ও নদীটি খনন করে সরকার নাব্যতা ফিরিয়ে আনবে এ আশায় ছিলাম আমরা। এলাকাবাসীর প থেকে ঊর্ধ্র্বতন কর্তৃপকে বারবার বিষয়টি লিখিত আবেদনের মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু এখনও কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই অবস্থা থেকে উত্তরণে নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও জরুরি ভিত্তিতে নদীগুলো খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য। এছাড়া ভারতের সাথে শুষ্ক মৌসুমে বিভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাহলে নদীগুলোতে প্রাণ ফিরে আসবে।
এদিকে দেশের ইছামতি নামের অন্য সাত নদীর অবস্থাও একই রকম। প্রথম ইছামতি দেশের উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুরের ছাতিয়ানগর বিল থেকে উৎপত্তি হয়ে খানসামা, চিরির বন্দর, পার্বতীপুর ও ফুলবাড়ী দিয়ে বয়ে গেছে। ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৫৯ মিটার প্রস্থ এই ইছামতির অনেক জায়গায় এখন নদীর চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় ইছামতি গাইবান্ধা-বগুড়ায় অবস্থিত। ৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ইছামতি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থেকে বগুড়ার গাবতলী পর্যন্ত বিস্তৃত। করতোয়া থেকে উৎপত্তি হয়ে মিশেছে বাঙ্গালি নদীর সাথে। ভরাট হয়ে নদীটির বহু জায়গায় জনবসতি গড়ে উঠেছে।
চতুর্থ ইছামতি পাবনায়। পাবনা শহরের বাজিতপুর ঘাটের কাছে পদ্মার শাখা নদী হিসাবে উৎপন্ন এ নদী প্রায় ৬৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। পাবনা শহরের বুক বেয়ে আঁকাবাঁকা হয়ে সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে হুরাসাগরে পতিত হয়েছে। এ ইছামতি একবারেই শুকিয়ে গেছে। রেগুলেটর দিয়ে উৎসমুখ বন্ধ করে দেয়ায় বর্ষাকালেও পানি আসে না। নদীতে এখন শুধু ধু ধু বালুচর।
পঞ্চম ইছামতি কুষ্টিয়ায়। এ ইছামতি নদীর কোন তথ্য পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রণীত বাংলাদেশের নদ-নদীর তালিকায় পাওয়া যায়নি। বাংলা পিডিয়ায় ইছামতি নদীর বিবরণে উলেস্নখ করা হয়েছে, ভেড়ামারা উপজেলার উত্তর- পশ্চিমে রায়তার কাছে গঙ্গা নদী থেকে বের হয়ে প্রথমে পশ্চিমে এবং পরে দেিণ বেঁকে কুষ্টিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীটির নাম ইছামতি। এর অস্তিত্ব অনেকাংশেই বিলীন হয়ে গেছে।
ষষ্ঠ ইছামতি সাতীরায়। নদীটি সাতীরা সদর, দেবহাটা, কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর সীমান্তপথ ধরে কালিন্দি রায়মঙ্গল নদীতে পতিত হয়েছে। ৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ ও প্রায় সাড়ে ৭শ' মিটার প্রস্থের এই সীমান্ত নদীটি বারোমাসী হলেও পলিস্তর জমে অনেক স্থানে চর জেগে উঠেছে।
সপ্তম ইছামতি বৃহত্তর ঢাকায়। এক সময় ঢাকার দণি-পশ্চিমাঞ্চলে ইছামতি নদী প্রসিদ্ধ ছিল। মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে যমুনা থেকে উৎপন্ন হয়ে ঘিওর, শিবালয়, হরিরামপুর, নবাবগঞ্জ, দোহার , সিরাজদিখান, শ্রীনগর ও লৌহজং অতিক্রম করে নদীটি পদ্মায় পতিত হয়েছে। এই ইছামতির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৯০ কিলোমিটার, প্রস্থ প্রায় ১৪৫ মিটার ও গভীরতা ৮ মিটার। বারোমাসী এ নদী বহু আগেই মৌসুমী নদীতে রূপান্তরিত হয়েছে। বৃটিশ আমলের মানচিত্র ও হাল আমলের মানচিত্রে নদীটির কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। মাইলের পর মাইল চর পড়ে ও অবৈধ দখলে নদীটির মাঝপথে প্রায় ৪০/৪৫ কিলোমিটার এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
অষ্টম ইছামতি রাঙ্গামাটিতে। ঠাণ্ডাছড়ির পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে উৎপত্তি হয়ে ৩৪ কিলোমিটার গতিপথ অতিক্রম করে রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলী নদীতে পতিত হয়েছে। এ প্রজন্মের অনেকের কাছে পাহাড়ি এই ইছামতি নদীটি এখন বন্ধ্যা নদী।
এ প্রসঙ্গে পানিসম্পদ কাউন্সিলের সদস্য ও পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) প্রাক্তন মহাপরিচালক ড. এম এ কাশেম বলেন, সারাদেশে বিলুপ্ত হওয়া ও হওয়ার পথে যে নদী-নালা, খাল-বিল আছে, তা পুনরুজ্জীবিত করার কোন বিকল্প নেই। এজন্য প্রথমে একটা সার্বিক পরিকল্পনা করতে হবে। আর এই পরিকল্পনা করতে হবে বাংলাদেশকে। কিন্তু আমাদের বেশিরভাগ পরিকল্পনা হয় দাতাদের দ্বারা। এই সকল পরিকল্পনায় ওদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়। তাই বাস্তব অবস্থা প্রতিফলিত হয় না।
তিনি বলেন, ছোট-বড় নদীগুলো প্রয়োজনমতো খনন, শাসন ও ভারতের সাথে শুষ্ক মৌসুমে বিভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে দেশের নদনদী বাঁচবে।
†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267
Email- dr.fourkanali@gmail.com
0 comments:
Post a Comment