ফোরকান আলী
এককালের প্রমত্তা স্রোতস্বিনী করতোয়া নদী এখন শীর্ণকায় মরা খালে পরিণত হয়েছে। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় দুই তীরে জেগে উঠেছে চর আর চর। তার বুকে চলছে চাষাবাদ। শুধু বর্ষা মৌসুম ছাড়া এই নদীতে সারা বছরই থাকে হাঁটু জল। কখনো বা তারও কম। নদীর এই দৈন্যদশা দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা হতাশ হয়ে পড়েছেন। এরই ফাঁকে কেউ কেউ প্রতিযোগিতা করে দখল করছে নদীর বালুচর। শুকিয়ে যাওয়া করোতোয়া নদীর দিকে তাকালে এখন দেখা যাবে, চরে উদয়াস্থ শ্রম দিয়ে জমি তৈরি করে ফসল ফলাতে ব্যস্ত চরের নারী-পুরুষেরা। এ অবস্থা শুধু পঞ্চগড় শহরের বুকে অবস্থিত করতোয়া নদীরই নয়; জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া চাওয়াই, তালমা, পাঙ্গা, কুড়ুম পাম্প, ভেরসা, ডাহুক, তীরনই, রণচণ্ডি, বেরং, জোড়াপানি, ঘোরামাড়া, নাগর, সিঙ্গিয়া, ঘাগরা, বুড়িতিস্তাসহ উজান থেকে নেমে আসা ছোট বড় নদ-নদীগুলোরও। স্থানীয় কৃষক সাহাবুর জানান, এক সময় নদীগুলোতে পর্যাপ্ত পানি ছিল। সে পানি ব্যবহার করে আমরা চাষাবাদ করেছি। এখন নদীর পানি শুকিয়ে চর জেগে উঠেছে। এই কারণে অন্য পানির উৎসগুলোতেও পানির স্তর কমে গেছে। এতে কৃষির উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে কয়েক গুণ। নাব্য হ্রাস পাওয়ায় কমে গেছে নদীর জল। দেখা যায় না জেলেদের উৎসবের সঙ্গে মাছ ধরা। তাই দুর্দিন চলছে মৎস্য শিকারিদের। জেলা সদরের বাগানবাড়ি গ্রামের মোহাম্মদ আলী টেপু (৪২) জানান, এখন খাল-বিল-পুকুর শুকিয়ে গেছে। অনেকে আবার ভরাট করে বসতবাড়ি করেছে। একমাত্র ভরসা ছিল নদী। নদীর পানিও শুকিয়ে এখন চর জেগেছে। সেখানে চলছে চাষাবাদ। আমাদের মাছ ধরার জায়গাও অনেক কমে গেছে। তাই, এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশার কথা ভাবছি। স্থানীয় লোকজন জানান, উজান থেকে নেমে আসা পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত সব নদীরই উৎসমুখ হচ্ছে ভারত। ভারত নদীগুলোর উৎস এবং প্রবেশমুখে বাঁধ, স্লুইস গেট, জলাধার, ফিডার ক্যানেল ও রেগুলেটর নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন এবং জেলার ২২১ কিলোমিটার সীমান্তব্যাপী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ভারত জেলার তেঁতুলিয়া সীমান্তের বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টের পশ্চিম-উত্তর কোণে মহানন্দা নদীর ওপর বিশাল বাঁধ নির্মাণ করেছে। ফুলবাড়ি ব্যারেজ নামে খ্যাত এ ব্যারেজ নির্মাণের পর থেকে জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। ১৯৮৬ সালে ভারতীয় কর্তৃপ তিস্তা-মহানন্দা নামের বাঁধটি নির্মাণ করে। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে ফিডার ক্যানেলের সাহায্যে এই নদী থেকে পানি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যের বিভিন্ন স্থানের মরু কবলিত এলাকায় তারা সেচ কাজ করে চাষাবাদ করছে। তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে দাঁড়ালেই পশ্চিম-উত্তর কোণে দেখা যাবে, মহানন্দা নদীর ওপর ভারতীয় অংশের বিশাল বাঁধ। পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোসহ উজান থেকে নেমে আসা ছোট বড় নদ-নদীগুলোর উৎসমুখে ভারত বাঁধ বা স্লুইস গেট তৈরি করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। এছাড়াও বাঁধ দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে জেলার সবকটি নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করায় নদীগুলোর নাব্যও আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এ কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানিও অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে। অথচ ভূগর্ভস্থ পানি পঞ্চগড় জেলার সেচের একমাত্র অবলম্বন। ভূগর্ভস্থ পানি নিচে নেমে যাওয়ার কারণে ইরি-বোরো চাষে স্থানীয় চাষীরা সেচ দেয়ার পরও সেচের পানি পাওয়া যায় না বলে স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, শুষ্ক মৌসুমে বাঁধের পানি আটকে রেখে ভারতীয় কর্তৃপ জেলার নদ-নদীগুলোকে মরা নদীতে পরিণত করেছে। তারা আবার বর্ষা মৌসুমে আকস্মিকভাবে বাঁধের মুখ খুলে দিচ্ছে। ফলে, প্লাবিত হয়ে পড়ছে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। এভাবে প্রতি বছর ভারতীয় কর্তৃপ কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি করে ফসলের তি করছে। এতে করে আকস্মিক বন্যায় রোপা-আমনসহ অন্যান্য তে পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের কয়েক হাজার ঘরবাড়ি, হাঁস-মুরগি, ধান-চাল, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রী এই পানিতে ভেসে যাচ্ছে। এতে করে নিম্নআয়ের লোকজন উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নদীগুলোতে ড্রেজিং, বাঁধ বা স্লুইস গেট নির্মাণ করে এসব নদীতে জলাধার নির্মাণ করা যায়। এর ফলে, সারা বছর ধরে আটকানো পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করা সম্ভব। এছাড়া জলাধারে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছ চাষ করেও এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। পঞ্চগড়সহ বৃহত্তর দিনাজপুরের এসব নদ-নদী ড্রেজিং করে বাঁধ এবং স্লুইস গেট নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় পদপে গ্রহণ করে কৃষিেেত্র সেচ সুবিধা ব্যবহার করা সম্ভব। এতে করে ধান, গমসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ বৃদ্ধি পাবে এবং এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ লাভবান হবে। এ ব্যাপারে জেলা পরিবেশ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও পাথারাজ মহাবিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রভাষক মোঃ আলতাফ হোসেন জানান, নদ-নদীগুলোর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাবে। এতে এলাকায় মরুকরণসহ কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। জীববৈচিত্র্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়বে। তিনি দ্বিপাকি আলোচনার মাধ্যমে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা যাবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।
†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267
Email- dr.fourkanali@gmail.com
0 comments:
Post a Comment