Wednesday, November 27, 2013

বাংলাদেশ-ভারত পানি সমস্যায় ‘ফারাক্কা’ দায়ী?

বাংলাদেশ-ভারত পানি সমস্যায় ‘ফারাক্কা’ দায়ী?
ফোরকান আলী
 আমাদের দেশের প্রবহমান নদীগুলোর প্রায় সবগুলোর উৎস ভারত। মোহনা তথা ‘মিলনস্থল’ বাংলাদেশে। যেমন গঙ্গার উৎস ‘গঙ্গোত্রী হিমবাহ’ এবং ব্রহ্মপুত্রের উৎস ‘মানস সরোবরে’। নদীর ধর্মানুযায়ী নদী তার প্রবাহিত গতিপথে সব ধরনের বাধা ও অসমতা এড়িয়ে সামনে এগিয়ে যায় এবং পর্যায়ক্রমে গতিবেগ হ্রাস পাওয়ায় আঁকাবাঁকা সর্পিল পথে প্রবাহিত হয়। সৃষ্ট সর্পিল বাঁকের কারণে য়ক্রিয়া তথা ভাঙনের সৃষ্টি হয়। প্রথাগতভাবে নদীগুলোর জীবনকাল ‘যৌবন’, ‘পরিণত’ এবং ‘বার্ধক্য’ এই তিন পর্যায়ে বিভক্ত। উৎসে বাধাঁর কারনে নদীগুলো ‘যৌবন’দীপ্ত তথা খরস্রোতা থাকলেও, বাংলাদেশে নদীগুলো মূলত তারুণ্য-যৌবন হারিয়ে ‘পরিণত’ বয়সে মন্থর ও বিসর্পিল বা বিনুনি আকৃতি নিয়ে এদেশে প্রবেশ করে। আবার অনেক নদী কেবল ‘বার্ধক্যে’ এদেশে প্রবেশ করে বিধায় নাব্যতা হারায়। পলি ও মিহি বালুতে গঠিত নদীতীর, সাম্প্রতিক মজুদকৃত তীরের নরম পদার্থসমূহ ভাঙনের পে খুবই সংবেদনশীল। তাছাড়া এ অঞ্চল গঠনগত প্রকৃতি তথা নদীগুলো দণিমুখী, সর্পিল, চরোৎপাদী বা বিনুনি, সরলাকার, সূক্ষ্ম বালুকণাময় তলদেশ, নরম পলল গঠিত ভূমি, পরিমিত ঢাল, ভাঙনপ্রবণ তীর ও পরিবর্তনশীল নদীখাতজাত বৈশিষ্ট্যের কারণে উজান থেকে নদী ভাঙনজাত প্রায় ২.৪ বিলিয়ন টন মাটি-পলি বা উপজাত পদার্থ ‘ভাটি’তে নিয়ে এসে নতুন চরের সৃষ্টি করে। যে কারণে নদীগুলো চর সৃষ্ট কারণে ভরাট হয় এবং বর্ষায় পানি প্রবাহ উপচে অকাল বন্যার সৃষ্টি করে। এগুলো মূলত হয় নদীর সঞ্চয়কাজের ফলে বদ্বীপ, প্লাবনভূমি, চর ও পলিজাত উপভূমি সৃষ্টি হয়ে। এই নদীগুলো কেবল ভারত থেকে ২.৪ বিলিয়ন টন নরম মাটি-পলিই নিয়ে আসে না, বর্ষা মৌসুমে প্রবল জলস্রোতে অনেক ‘নুিড়পাথর’ বহন করে, যা বাংলাদেশে সিলেটসহ বেশ কটি জেলার নদী ভরা ট হয়ে যাচ্ছে। তবে ভারতের ।ুজান খেকে আসা ‘নুিড়পাথর’ সংগৃহীত হয় এবং এদেশের নির্মাণ শিল্পে তা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সে অর্থে ভারতের নদী প্রবাহ আমাদের উপকারও করে। প্রাকৃতিক কারণে ১৭৮৭ সালে ‘তিস্তা’র মধ্যে বিনুনি প্রকৃতি, প্রচরণ ও বিপুল বালুস্রোত প্রবাহের কারণে ‘আত্রা’ই নদীমুখে জমা হয়ে, তিস্তার প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ‘ঘাঘট’ নদীর দিকে নবরূপে প্রবাহিত হয়। অবার ধরা বর্ষাকালে প্রায় ‘যৌবনপ্রাপ্ত’ নদীশ্রেণীভুক্ত হলেও, শুকনো মৌসুমে এটি মৃতপ্রায় বিনুনি প্রকৃতিতে পরিণত হয়। ১৭৮৭ সালে আসামের প্রবল বন্যায় ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ তথা ধারা পরিবর্তিত হয়ে ‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র’ মৃতপ্রায় নদে রূপান্তর হয়। এভাবে দেখা যাচ্ছে প্রাকৃতিক নিয়মেই অঞ্চলের নদীগুলো তাদের পথপরিক্রমা খুজে নেয়। এ অঞ্চলের আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, গ্রীষ্মকালে প্রবল বৃষ্টিপাত ও শুকনো মৌসুমে বিরল বৃষ্টি। গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতু একই সময়ে হওয়ায় হিমালয়ের বরফগলা পানি ও প্রবল বৃষ্টিপাত মিলে ভাটি অঞ্চলে প্রবল বেগে নেমে এসে বন্যার সৃষ্টি করে। বিপরীত দিকে শুষ্ক মৌসুমে শীতকাল থাকাতে হিমালয় অঞ্চলে বরফ জমাট বাঁধে এবং বৃষ্টি বিরল হওয়ায় জলপ্রবাহ হ্রাস পায়। ফলশ্র“তিতে উজানের নদী সম্পৃক্ত মানুষগুলো তাদের জল চাহিদা পূরণের জন্য ভাটিতে অবাধ জলপ্রবাহে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করে। এরূপই একটি বাধা হচ্ছে ‘ফারাক্কা বাঁধ’, যা বাংলাদেশ সীমান্তের ১৮ কিমি. উজানে ভারত নির্মাণ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে ও সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফারাক্কা বাঁধের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও কিংবা বাঁধ নির্মাণের অনেক আগেই গত ১’শ বছরে রাজশাহীর ১০টি নদীর মধ্যে ৯টিই এখন মৃত নদী। যশোরের ৮টি নদী, কুড়িগ্রামের ১২টি নদী মৃত্যুর দিকে এগুচ্ছে। কিশোরগঞ্জ জেলার ৬টি নদী সংস্কারের অভাবে ভরাট হয়ে আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। গাইবান্ধার তিনটি প্রধান নদীতে শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ হচ্ছে। পঞ্চগড়ে প্রবাহিত ২০টি নদীর মধ্যে ১০টি নদী, রংপুর জেলার ১০টি নদী ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত হয়েছে। দিনাজপুর জেলার মৃত নদীর তালিকায় রয়েছে তিনটি নদী। কুমিল্লার তিনটি নদীর অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। বৃহত্তর বরিশাল জেলা থেকে হারিয়ে গেছে ৬টি নদী। টাঙ্গাইল থেকে তিনটি, ফরিদপুর থেকে তিনটি, নড়াইল থেকে ৪টি নদী, কুড়িগ্রাম থেকে ১০টি, গাইবান্ধা থেকে তিনটি, মানিকগঞ্জ থেকে ২টি, খুলনার তিনটি, ঝিনাইদহের ২টি, বগুড়ার ৫টি, পাবনার ২টি, নেত্রকোনার ১২টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২টি এবং সুনামগঞ্জের ১০টি নদী বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে প্রাকৃতিক কারণে। এছাড়া মাদারীপুর, চুয়াডাঙ্গা, জয়পুরহাট, শরীয়তপুর থেকেও একাধিক নদী বিলুপ্ত হয়েছে একই কারণে। এমনকি বৃহত্তর ঢাকা জেলার ওপর দিয়ে এক সময় ৩১টি নদ-নদী প্রবাহিত হতো। এর মধ্যে ১২টি নদী মজে গেছে কিংবা বিলুপ্ত হয়ে গেছে বর্ণিত কারণে। গত ১’শ বছরে আমাদের প্রায় ২৪,১৪০ কিমি. নদীপথের আঁকাবাঁকা সর্পিল চমৎকার নামধারী ৭’শ জালিকার মতো নদীপ্রবাহের অনেক নদী এখন মৃত কিংবা মৃতপ্রায়। অস্তিত্বলোপ বা বিলুপ্তপ্রায় এ নদীগুলো হচ্ছেÑ ডাহুক, তলমা, নাগর, কোকিল, টাংগস, ঘাঘট, ঢেপা, আত্রাই, বুড়িতিস্তা, যমুনেশ্বরী, ত্রিমোহনী, ধরলা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, জিজিরাম, করতোয়া, ছোট যমুনা, শিব, মহানন্দা, পাগলা, বারানাই, ভোগাই, নিতাই, কংস, সোমেশ্বরী, ধনু, পিয়াইন, বানার, কুমার, মধুমতি, নবগঙ্গা, ফটকি, চিত্রা, ভৈরব, কপোতা, গোমতী, স্বাতি, খারভাজা, আখির, খারখরিয়া, গদাধর, সনকোশ, নোয়াডিহিং, কাপিলি, টাঙ্গন, কোরাম, বড়াল, জলঢাকা, কল্যাণী, হুরাসাগর, তালান, ল্যা, ভুৃবনেশ্বরী, ইলশামারী, আইমন, সুতিয়া, বোথাই, নিতারী, পানকুরা, ধানু, মানস, কালনি, হরি, রক্তি, তিতাস, খেরু, কাকড়ি, জাঙ্গালিয়া, বুড়িগাঙ, বিজলী, ইছামতি, জলাঙ্গি, চন্দনা, পানগুবি, কবা, পাংগানি, গড়াই, পাংল, আত্রাই, গলাঙ্গী, শীলা, কাগীবাগ, চন্দনা, পটুয়া, ধানসিঁড়ি, নলবিটি, কালিদা, বুড়া গৌরাঙ্গ, হংসরাগ, ডাংমারি, লতাবেড়ি, সাতনলা ইত্যাদি। এভাবে আমরা গত ১’শ বছরে হারিয়ে ফেলেছি প্রায় ১’শ এর বেশি নদী। হারিয়ে যাওয়া এই নদীগুলোর জন্য কিন্তু ফারাক্কাই অধিকাংশ দায়ী। এর অধিকাংশ নদীর সঙ্গে ফারাক্কার যোগসূত্র ছিল। এ অঞ্চলের নদীর গঠনগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে নাব্যতা হারায়, ভাঙন ও চর সৃষ্টি হয় এবং বর্ষায় প্রবল জলপ্রবাহের কারণে বন্যা এবং শুকনো মৌসুমে প্রাকৃতিকভাবে কম জলপ্রবাহের কারণে সব নদীতে (কেবল গঙ্গায় নয়) নাব্যতা সংকটের সৃষ্টি হয়। শুকনো মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহারের কারণে গঙ্গা তথা পদ্মায় কম জল আসে এবং এর পরিপ্রেেিত নাব্যতা, লবণাক্ততা, নৌপরিবহন, কৃষি ও মৎস্য প্রজননে সমস্যা দেখা দেয়; কিন্তু বাংলাদেশের পদ্মাসহ অন্যান্য উল্লিখিত নদীগুলোর নাব্যতা সংকটের জন্য এটিই কিন্তু একমাত্র । এছাড়া ও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা ভূপ্রাকৃতিক কারণ। ড্রেজিং, জলাধার নির্মাণ, ভাঙন প্রতিরোধ, গতিপথ সহজীকরণ ইত্যাদির মহাপরিকল্পনা গ্রহণ দেশের নদীনির্ভর মানুষকে বাঁচানোর জন্য বাস্তবভিত্তিক পদপে গ্রহণ করা একান্তই জরুরি।
†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267




0 comments:

Post a Comment