Thursday, November 28, 2013

ইচ্ছামতী থেকে ইছামতী

ইচ্ছামতী থেকে ইছামতী
ফোরকান আলী
‘‘বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে” এবারের বৈশাখ মাসে সেই ইচ্ছামতী নদীকে দেখতে গিয়েছিলেম। গিয়ে দেখি তার ভিন্নরূপ। নদী ইচ্ছামতী শুকিয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। শুকনো নদীর বুকের ভেতর জেগে উঠেছে নতুন নতুন বসতি। ছনের, খড়ের, কাশের এমনকি করোগেটেড টিনের তৈরি অনেক বাড়ি-ঘর। আশেপাশের সদ্য প্রস্ফুটিত সবুজকলা পাতাগুলো পতপত করে উড়ছে। যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। দিগন্ত জুড়ে অগ্নিবান ফুঁড়ে চলেছে সূর্যমামা, সামান্য কখনো জোরে বৈশাখের সেই তপ্ত দুপুরে ধুলো বালিগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে কোথায় যে যাচ্ছে সে খবর শুধু বাতাসই জানে। দু’একটি কাক এবং একঝাঁক পায়রাকে দেখলাম। কাক সদানন্দে ডাকছে না। দেখলাম পায়রাগুলো উড়ে গিয়ে বসলো, ভর দুপুরের রোদমাথায় নিয়ে বাবলা গাছের ডালে, কয়েকটি বসলো গিয়ে টিনের চালে, কিন্তু টিনের চাল গরম থাকাতেই বোধকরি বেশিণ না বসে উড়ে গেলো নীল আকাশের দিকে। যেন চারিদিকে ধু ধু মরুভূমি। যে ইচ্ছামতী নদীকে দেখে রবীন্দ্রনাথ একদা কবিতা লিখেছিলেন: ‘‘যখন যেমন মনে করি, তাই হতে পাই যদি, আমি তবে এক্খনি হই ইচ্ছামতী নদী” সেই ইচ্ছামতী নদীকে নিয়ে পাবনা শহরবাসীর একদা খুব অহঙ্কার ছিলো। সেই অহঙ্কার আর গৌরবের অগ্রভাগে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ-ইচ্ছামতী কবিতাটি ১৩২৮ সালের ২৯শে আশ্বিনে। খুব সম্ভবত প্রবাসী নাকি সন্দেশে প্রকাশিত হয়েছিলো। সে তথ্য আমার জানা না থাকলেও, কবিতাটি আমার কৈশোরে খুবই প্রিয় ছিল। আমার বিশ্বাস জমিদার রবীন্দ্রনাথ যখন তার জমিদারী দেখতে কলকাতা থেকে বোটে ভেসে গড়াই, পদ্মা, যমুনা পাড়ি দিয়ে যেতেন। তখন শাহজাদপুর, পতিসর, তখন হয়তোবা কবি আমাদের পাবনা শহরের দণি দিক দিয়ে বর্ষাকালে প্রবাহিত ইচ্ছামতী। নদীটির নাম তিনি শুনেছিলেন। নদীটি পদ্মারই একটি শাখা নদী হিসেবে এলেও, ইচ্ছামতী নদীটি পরবর্তীতে পাবনাবাসীর উচ্চারণে অপভ্রংশে হয়ে গিয়েছিলো ইছামতী নদী। নদীটি শহরের দণি দিক দিয়ে প্রবেশ করে উত্তরের শিঙ্গার মহাশ্মশানের ঘাট হয়ে চলে গিয়েছে আরো উত্তরে। শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোকে যেন চোখের উপর হঠাৎ হঠাৎ ভাসতে দেখি, বিখ্যাত গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, আর প্রখ্যাত গায়ক বরীন মজুমদারদের রাধা নগরের পৈত্রিক রথ খোলায়, প্রতিবছর ৩০শে চৈত্রের শেষ দিনে বসতো চৈত্রের মেলা। নাগরদোলায় উঠতে গিয়ে সেবার পড়ে গিয়ে আমার ডানপায়ে প্রচন্ড ব্যথা পেয়েছিলাম। সেই চৈত্রের মেলাতেই পাবনা শহরের শালগাড়িয়া থেকে আসতো একদল লোক। মুখে মুখোশ, সমস্ত শরীরে সাদা চুন ভুসো মাখিয়ে তারা শিবের কীর্তন করতেন। হাতে থাকতো ঢাল-তলোয়ার। মাথায়, পাট দিয়ে তৈরি অথচ কালো কুচ কুচে চুল, কেউ বা হতেন শিব, কেউবা, অর্জুন, রাম, লণ, সীতা হতেন, আমাদের সহপাঠী গোপাল ঘোষের বড়দা মৃণাল ঘোষ, মৃণালদাকে দেখতে নাকি সীতার মতোই লাগতো। হরেক রকমের নৌকো। নামও হরেক রকমের। ডিঙ্গি, কোষা, পালতোলা এবং সবচেয়ে বড় যেটি, সেটির নাম গহনার নৌকো। আমার ছেলেবেলায় ধারণা ছিলো, নৌকোগুলো, সোনার গহনা দিয়ে বানানো, তাই, একদিন আমার পিতার কাছ্ থেকে জানতে চেয়েছিলেম। নৌকোগুলোর নাম গহনার নৌকো কেন? তিনি জানিয়েছিলেন, মাটির কলস, হাড়ি, পাতিল, ধান-পাট ঐ নৌকোগুলো অনেক বেশি বহন করতে পারে এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় বর্ষা মৌসুমে যাতায়াত করে। যেমন, আমাদের পাবনা থেকে কয়েক শ’ মণ পাট বোঝাই করে নিয়ে যাবে নারায়ণগঞ্জে, পাটতো আমাদের সোনালি আঁশ। ঐ সোনালি আঁশতো আসলেই দেখতে সোনার মতো- গহনার নৌকো নামকরণের পেছনে বোধ করি পিতা আরো কিছু যুক্তি দিতে চাইছিলেন। আমাদের ছোট কাকা আমার আর পিতার কথপোকথনের মাঝে জানালেন, রবি ঠাকুর ঐ নৌকোতেই সোনারঙ্গের রাশি রাশি, ভরা ভরা, ধান পদ্মার দুই পাড়ের কৃষকদের ওঠাতে দেখেছিলেন, ধানের রং তো সোনার মতোই, সেই সোনা যে নৌকোয় বহন করে, তাকেই বোধকরি বলা হয় গহনার নৌকো। তবে পাবনার আঞ্চলিক ভাষায়-গহনার বদলে, অপভংশে হয়ে গিয়েছিলো গয়নার নৈকে। নেই সেই গহনার নৌকো। নেই সেই ইছামতী নদী, ইছামতীর বুকে নেই হাঁটুজল। গরুর গাড়ি, মোটর সাইকেল, প্রাইভেট কার সব কিছুই নির্বিঘেœ পাড় হয়ে যাচ্ছে, ইছামতির বুকের ওপর দিয়ে। শালিকের ঝাঁক, পাখির কিচির মিচির কিছু নেই। আছে জনপদ, আছে তপ্ত রোদ। সেই তপ্ত রোদে যারা বৈশাখী মেলায় এসেছে তারা সকলেই এই প্রজন্মের। ওরা কোনোদিনই জানবেনা, এখানে একটি নদী ছিলো। যে নদীতে বৈশাখেও থাকতো হাঁটুজল। রবিঠাকুর যে ইচ্ছামতী নদীকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন এ প্রজন্মের অনেকেই তা জানে না। ইতিপূর্বে অনেকবার শুনেছিলেম ইছামতী নদীটিকে খনন করা হবে, খনন করা হলে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পেতো। হয়তোবা দেখতে পেতাম, সেই শৈশব-কৈশোরের নৌকা বাইচ। হয়তো দেখতে পেতাম সুজানগরের সিরাজ মন্ডলের নৌকা বাইচে প্রথম হয়ে জেলা প্রশাসকের হাত থেকে বিশাল একটি কাঁসার কলস নিচ্ছেন। দ্রুতলয়ে ফটো তুলছেন কাকা, নেই সেই নৌকা বাইচ, নেই সেই কাকা। এখনো আছে প্রিয় বৈশাখী মেলা, চৈত্রের মেলা, আছে রাধানগরের মজুমদারদের রথের মথর্ড। আছে পদ্মা-যমুনা, তবে সেখানেও যে খুব বেশি জল/ পানি আছে তাও নয়। দয়া করে যদি ফারাক্কা বাঁধ একটু বেশি করে জল ছেড়ে দেয়, তাহলে বোধকরি আমাদের নদীগুলোতে হাঁটুজল আমরা দেখতে পাবো।
†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267




0 comments:

Post a Comment