Wednesday, November 27, 2013

মারাত্মক দূষণের কবলে ছয় নদী

মারাত্মক দূষণের কবলে ছয় নদী
 ফোরকান আলী
দেশের ছয়টি নদীকে মারাত্মক দূষিত নদী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, পরিবেশ অধিদপ্তর, পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে এই বিষয়টি জানা গেছে। নদীর অবস্থা এতটাই খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই দূষণের মূল কারণ শিল্প বর্জ্য কোন রকম শোধন না করেই নদীতে ফেলা। এর সঙ্গে আরও আছে মানুষের ফেলা নানা বর্জ্য। দেশের সবচেয়ে দূষণ কবলিত নদী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে বুড়িগঙ্গা। দূষণ মাত্রায় মারাত্মক পর্যায়ে রয়েছে শীতল্যা, বালু নদী, খুলনার রূপসা ও ভৈরব এবং চট্টগ্রামের কর্নফুলী নদী। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বুড়িগঙ্গার অবস্থা ভয়াবহতম পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজধানী ঢাকার যত ধরনের বর্জ্য আছে সবই গিয়ে পড়ছে বুড়িগঙ্গা নদীতে। একটি সময় ছিল যখন এই বুড়িগঙ্গার পানি শোধন করে ঢাকাবাসীকে সরবরাহ করা হতো। আজ আর এই অবস্থা নেই। এই নদীর পানির দূষণের কারণে একদিকে ব্যবহারের একবারে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে অন্যদিকে এই নদীর সাথে যে সকল শাখা নদী রয়েছে, সেগুলোকেও দূষিত করে দিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ নরসিংদী এবং ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার আগুগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন শিল্প বর্জ্যরে কারণে দেশের দ্বিতীয় দূষিত নদী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে শীতল্যা। এই নদীতে প্রতিদিন ইউরিয়া সার কারখানার বর্জ্য (এমোনিয়া) এবং বিভিন্ন শিল্প কল-কারখানার কেমিক্যা এসে পড়ছে। আর এই কারণে এর অবস্থা এতটাই খারাপ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে এখানে মাছের বংশ বিস্তারও ঘটছে। মাছের আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে গেছে।
রাজধানীর অপর আরেক নদী বালু। এটিও স্বীকৃতি পেয়েছে দূষিত নদী হিসাবে। টঙ্গী শিল্প এলাকায় গড়ে ওঠা টেক্সটাইল, লিড ব্যাটারী, পেপার পাল্প, লোহা, রং, রাবার ইত্যাদি শিল্প কলকারখানা থেকে এই নদীতে গিয়ে পড়ছে বর্জ্য। ফলে এর দূষণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
চতুর্থ এবং পঞ্চম দূষিত নদী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে ভৈরব ও রূপসা নদী। এই নদীতে পাট কল, তেল কল, নিউজপ্রিন্ট, শিপ ইয়ার্ড, তামাক, ম্যাচ ফ্যাক্টরি, হার্ডবোর্ড কারখানা থেকে বর্জ্য পড়ছে। প্রধানত বিভিন্ন ধরনের এসিড, এমোনিয়াম সালফাইড, ইত্যাদি এই নদীতে বেশী মাত্রায় পড়ার কারণে নদীর পানি বিষিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর পানি দূষনের মূল কারণ গুলোর মধ্যে রয়েছে, ট্যানারি, টেক্সটাইল মিল, তেল শোধনাগার, স্টিল মিল, কেমিক্যাল কমপ্লেক্স, ইউরিয়া সার কারখানা, সিমেন্ট ফ্যাক্টরির বর্জ্য পড়ার সাথে এই নদীতে জাহাজের পোড়া তেল ফেলার কারণে পানির দূষণ মাত্রা বেড়ে গেছে। জানা যায়, দেশের বড় ও মাঝারি ধরনের প্রায় আট হাজার শিল্প-কারখানা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, আশুগঞ্জ, ঘোড়াশাল প্রভৃতি কয়েকটি স্থানের মূলতঃ নদীর তীরে অবস্থিত। এসব এলাকার শিল্প কারখানাগুলো তাদের মারাত্মক তিকর বর্জ্য পার্শ্ববর্তী নদীগুলোতে নিঃসরণ করে যাচ্ছে। ফলে বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলী, রূপসা, তুরাগ, বালু, শীতল্যা এমনকি বাংলাদেশের বৃহত্তম নদীগুলোর একটি মেঘনা ও দূষণের নির্মম শিকার। শুকনো মৌসুমে এসব নদীর মারাত্মক দূষণের ভয়াবহ চিত্র খালি চোখেও দেখা যায়।
এসব নদীর পানিতে মারাত্মক দূষণ সৃষ্টিকারী শিল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- চামড়া শিল্প, ওষুধ শিল্প, রাসায়নিক সার কারখানা, টেক্সটাইল ডাইং এ্যাণ্ড প্রিন্টিং, রঙ, কাগজ, অন্যান্য রাসায়নিক শিল্প প্রভৃতি। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক তথ্য অনুযায়ী, এসব শিল্প-কারখানা মোট ৬২ ধরনের মারাত্মক তিকর রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিতে ছড়াচ্ছে। এসব বর্জ্যরে মধ্যে রয়েছে- সায়ানাইড, ক্রোমিয়াম, পারদ, কোরিন, নানা ধরনের এসিড, দস্তা, নিকেল, ফসফোজিপসাম, সীসা, ক্যাডমিয়াম, লোহা, এ্যালকালি ইত্যাদি। এছাড়াও বাংলাদেশের কৃষিখাতে প্রতিবছর প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন আমদানিকৃত রাসায়নিক কীট-নাশক ব্যবহার করা হয়। এগুলোও কৃষিজমি থেকে শেষ পর্যন্ত খাল-বিল, নদী-নদীর পানিতে মিশে পানি দূষণ ঘটায়। ক্রমান্বয়ে এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক ভূগর্ভের পানিতেও ছড়িয়ে পড়ছে। দেশের রাজধানী ঢাকার একাংশজুড়ে (হাজারিবাগ) গড়ে ওঠা প্রায় ২৫০ চামড়া শিল্পে ক্রোমিয়ামসহ বেশ কিছু মারাত্মক তিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে বছরে প্রায় ৩০০০ মেট্রিক টন। এই শিল্পে তরল রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গা নদীতে নিঃসৃত হচ্ছে। বুড়িগঙ্গায় এছাড়াও নির্গত হচ্ছে ঢাকা মহানগরীতে গড়ে ওঠা আরও অনেক শিল্প-কারখানার বর্জ্য, নগরবাসীর পয়ঃবর্জ্য, কয়েক হাজার নৌযানের তেল-ময়লা প্রভৃতি। ফলে বুড়িগঙ্গার দূষণ এখন অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে অনেকগুণ বেশী। প্রকৃতপক্ষে বুড়িগঙ্গা নদীর অস্তিত্বই এখন মারাত্মক হুমকির মুখে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান চিটাগাং কেমিক্যাল কমপ্লেক্স। এই শিল্প থেকে প্রতি বছর সাড়ে তিন মেট্রিক টন পারদ তরল বর্জ্য আকারে কর্ণফুলী নদীতে মিশছে। গত প্রায় ৪০ বছর ধরে এই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি ১০০ মেট্রিক টনেরও বেশি পারদ পানিতে ছেড়েছে বর্জ্য আকারে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে আরও অনেক তিকর রাসায়নিক বর্জ্য আকারে নিঃসৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল ডাইং এ্যাণ্ড প্রিন্টিং শিল্পগুলোও বছরে প্রায় তিন হাজার মেট্রিক টন রাসায়নিক ব্যবহার করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রয়েছে কোরিন, এ্যালকালিসহ ভারী রাসায়নিক (হেভি মেটাল)। এগুলোও নদীর পানিতে মিশছে। শীতল্যা, তুরাগ, বালু, মেঘনা প্রভৃতি নদী এই শিল্প বর্জ্যরে দূষণের শিকার। রঙ, ইলেকট্রোপ্লেটিং প্রভৃতি শিল্প থেকেও ভারী রাসায়নিকসহ অনেক তিকর বর্জ্য নিঃসৃত হয়ে অবিরাম পানি দূষণের কারণ হচ্ছে। উল্লিখিত শিল্পসমূহ মারাত্মক পরিবেশ দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত। অথচ এগুলোতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রপাতি স্থাপন করার কার্যকর কোনও উদ্যোগ নেই। বাংলাদেশে পরিবেশ সংরণ আইন (১৯৯৫) আছে। এ আইনের প্রয়োগের জন্য রয়েছে বিধিমালা। কিন্তু শিল্প-দূষণ নিয়ন্ত্রণে এখনও পর্যন্ত এর কোনও প্রয়োগ বা কার্যকারিতা নেই। এছাড়া বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের ইন্টারন্যাশনা প্ল্যান্ট প্রটেকশন কনভেনশন থেকে ’৯২ সালে জীববৈচিত্র্য সংরণ সংক্রান্ত কনভেনশন এবং সর্বশেষ ধরিত্রী সম্মেলন পর্যন্ত অনেক আন্তর্জাতিক চুক্তি বিধিতে স্বার করেছে। কিন্তু দেশের পরিবেশ সংরণে এগুলোর বাস্তবায়ন কার্যত নেই বললেই চলে। তবে সরকার সম্প্রতি শিল্প দূষণ নিয়ন্ত্রণে কিছু চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছেন। প্রয়োজনীয় পদপে গ্রহণের কথাও ভাবছে সরকার। বাংলাদেশে ছোট-বড় নদী রয়েছে ২৩০টি। এর মধ্যে ৫৭টি নদী আস্তর্জাতিক। এই নদীগুলোর মধ্যে ৫৪টির উৎসস্থল ভারত এবং বাকি ৩টি মিয়ানমার। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে পঞ্চগড়, নিলফামারি, রংপুর, বগুড়া এবং সিরাজগঞ্জের উপর দিয়ে প্রবাহিত ছিল যে করতোয়া নদী, সেটি এখন মৃতপ্রায়। এটি বড় বড় নদী থেকে এখন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। পাবনা, মানিকগঞ্জ, ঢাকা এবং মুন্সিগঞ্জ জেলার উপর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদীতে গিয়ে পড়েছিল ইছামতি নদী, সেটিও এখন মৃত প্রায়। নাটোর এবং পাবনা জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত বরাল নদীর শাখাগুলো এখন মরে গেছে। শুকিয়ে মরে গেছে রাজশাহী এবং নাটোরের উপর দিয়ে বহমান মুসাখান নামের নদীটি। একই অবস্থা হয়েছে নাটোর পাবনার নদী চিকনাই। ভৈরব নদী যা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, খুলনা এবং বাগেরহাটের উপর দিয়ে চলে গেছে সেটিও ক্রমশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে যশোর খুলনার ভদ্রা নদী। মরে গেছে কুষ্টিয়ার হিসনা নদী। প্রায় মৃত অবস্থায় রয়েছে কালিগঙ্গা নদী। এই নদী ছিল কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল এবং পিরোজপুরের উপর দিয়ে প্রবাহমান। মেহেরপুর, মাগুরা, ফরিদপুর, ঝিনাইদহ এবং মাদারিপুরের উপর দিয়ে প্রবাহিত কুমার নদীও মৃতপ্রায়। হারিয়ে গেছে চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও যশোরের চিত্রা নদীর উৎসমুখ। মরে গেছে খুলনার হামকুড়া, যশোরের হরিহর, কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা, হবিগঞ্জের বিবিয়ানা এবং শাখা বরাক, শরিয়তপুরের পালাং, রাজবাড়ি এবং ফরিদপুরের ভূবেনেশ্বরী, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বুড়িনদী এবং সন্দ্বিপ চ্যানেলের বামনি নদী। বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে এইসব নদীগুলো হারিয়ে যাচ্ছে অথবা ক্রমশ হারিয়ে যাবার কারণে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্রমশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।


†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267




0 comments:

Post a Comment