Saturday, November 16, 2013

গড়াই শুকিয়ে গেছে ।। বুক জুড়ে ধুধু বালুচর


গড়াই শুকিয়ে গেছে ।। বুক জুড়ে ধুধু বালুচর
ফোরকান  আলী

দেশের দক্ষিণ পশ্চিমের জেলাগুলোর মিঠা পানির একমাত্র উৎস গড়াই শুকিয়ে যাচ্ছে। গড়াইয়ের বুক জুড়ে এখন ধুধু বালুচর । প্রমত্ত গড়াই এখন দেখতে একটি মরা খাল। গড়াইকে জীবিত রাখতে ফের পুনরুদ্ধার প্রকল্প গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে ।

পদ্মার প্রধান শাখা গড়াই, এককালের এ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ নদী। গড়াইয়ের পানির একমাত্র উৎস পদ্মা। ভারত কর্তৃক ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় পানি প্রবাহ ব্যাপক হ্রাস পায়। এর প্রভাব পড়ে গড়াইয়ের ওপর। উৎসমুখ ও নদীটির দীর্ঘ প্রবাহ পথে পলি জমে ভরাট হতে থাকে। এক সময় গড়াইয়ের উৎস মুখ পলি জমে ভরাট হয়ে গেলে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। প্রয়োজন পড়ে গড়াই খননের।
১৯৯৬- ৯৭ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিশেষজ্ঞগণ গড়াই খনন প্রকল্প তৈরি করেন। সরকার ৪৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষ নিজস্ব অর্থায়নে গড়াই খনন প্রকল্প অনুমোদন করে। ওই বছর ৪ কোটি ৬০ লাখ ১৪ হাজার টাকা মূল্যের ৩ হাজার ৫’শ ৪৫ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। জন শ্রমের মাধ্যমে নদী খনন শুরু করা হয় ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ৫ লাখ ৮৭ হাজার ঘনমিটার পলি অপসারণ করা হয়। প্রকল্পটি ছিল ৩ বছর মেয়াদি। কিন্তু গড়াইয়ের মত একটি বড় নদীর জনশ্রমিকের মাধ্যমে খনন ও পলি অপসারণ ছিল অসম্ভব ব্যাপার। প্রয়োজন হয় ড্রেজিং-এর। ড্রেজার সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না । ফলে পরবর্তী বছর খনন কাজ বন্ধ রাখা হয়।

ক্যাপ- ৪ এর আওতায় গড়াই পুনরুদ্ধারের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি ৩টি সুপারিশ করা হয়। এরপর দীর্ঘ মেয়াদি একটি খনন কমসূচীর জন্য বিশ্বব্যাংক, ডাচ ও জাপানী আর্থিক সাহায্য নিশ্চিত হওয়ার পর দুশো ২৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় সম্বলিত দু বছর মেয়াদি একটি সংশোধিত প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদন করা হঘ। এ প্রকল্পে ডাচ ও জাপান সরকারের অনুদান ছিল ৮২ কোটি ৩৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা, বেলজিয়াম সরকারের ঋণ সহায়তা ছিল ৩৮ কোটি ৩৪ লাখ ৩৪ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ছিল একশ’ ৩ কোটি ৩ লাখ ৬৩ হাজার টাকা।

প্রথম বছর ১৯৯৮ সালের ২০ অক্টোবর গড়াইয়ের উৎস মুখ থেকে ড্রেজিং শুরু হয় এবং চলে ১৬ মার্চ, ১৯৯৯ পর্যন্ত। আর উৎস মুখ থেকে ১৯ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার ভাটি পর্যন্ত ড্রেজিং করে ৭ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ঘনমিটার পলি অপসারণ করা হয়। ২য় বছর ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৯ ড্রেজিং শুরু হয় এবং চলে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০০০ পর্যন্ত । একই অংশে ১৬ কিলোমিটার ড্রেজিং করে ৪ দশমিক ০৫ মিলিয়ন ঘনমিটার পলি অপসারণ করা হয়। পরপর দু বছর ড্রেজিং-এর ফলে পদ্মার মোট প্রবাহের শতকরা ৯ দশমিক ১০ ভাগ পানি গড়াই দিয়ে প্রবাহিত করানো সম্ভব হয় ।

৩য় বছর রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং-এর জন্য নেদারল্যান্ড সরকারের ১০ দশমিক ৬২ মিলিয়ন গিল্ডার ও বাংলাদেশ সরকারের ২৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা অনুদানের মাধ্যমে দুশ’ ৬৭ কোটি ৩০ লাখ টাকার সংশোধিত প্রকল্প পরিপত্র ২০০১ সালের ৩০ জানুয়ারি একনেকের সভায় অনুমোদন করা হয় । ৩য় বছর গড়াই থেকে ড্রেজিং-এর মাধ্যমে ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন ঘনমিটার পলি অপসারণ করা হয় । এর ফলে ওই বছর শুষ্ক মৌসুমে প্রতি সেকেন্ডে ৫০ ঘনমিটার পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। নদীতে নব্যতা ফিরে আসে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা হ্রাস পায় এবং পরিবেশের উন্নতি হয়। নদী খননের ধারা অব্যাহত রাখতে ৪র্থ বছর ৩’শ ২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষ ৩য় সংশোধিত প্রকল্প দাখিল করা হয়। ২০০১ সালে গড়াই খনন প্রকল্প থেমে যায়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করে জনবল, ড্রেজার এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি গুটিয়ে নেওয়া হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক সূত্রে জানা যায়, আগের প্রকল্প বাস্তবায়নকালে বেশ ত্র“টি ছিল । খননের পর অপসারিত পলি নদীর দু পাড়ে ফেলা হয়। যা পরবর্তীতে বর্ষা কালে ফের নদীতে এসে পড়ে ভরাট হয়ে যায়। নদীতে আবার পূর্বের অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে আরো জানা যায়, গড়াই পুন:খননের জন্য ৯’শ ৯ কোটি ৬১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয়সাপেক্ষ একটি নতুন প্রকল্প পরিপত্র তৈরি করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন অগ্রগতি নেই। গড়াই শুকিয়ে গেলে গড়াইয়ের পানিনির্ভর এলাকায় কৃষি, মৎস্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন, গৃহস্থালির পানি সরবরাহ এবং পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়ে। সে সাথে ভৃগর্ভস্থ মিঠা পানি সরবরাহে তীব্র স্বল্পতার সৃষ্টি হয়। কয়েক বছর আগে তৈরি গড়াই পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সারসংক্ষেপে বর্ণিত তথ্যে বলা হয় পুন:খনন না করলে আগামী ২০-২৫ বছরের মধ্যে গড়াই একটি মৃত খালে পরিণত হবে। গড়াই সুন্দর বন এলাকার শতকরা ৫৭ ভাগ মিঠা পানি সরবরাহ করে থাকে। মিঠা পানি স্বল্পতার কারণে সুন্দর বনের বৃক্ষ রাজির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে সারসংক্ষেপে উল্লেখ আছে ।

গড়াইর তীরে ভ্রমণ পিপাসু মানুষের ঢল:কুষ্টিয়া শহরে প্রাণখুলে ঘুরে বেড়ানো কিংবা অবসর বিনোদনের জায়গা খুব একটা নেই। এখানকার মানুষ বৈকালিক ভ্রমণ কিংবা একটু অবসর বিনোদনের জন্য শহরের এদিক-ওদিক ঘুরে সময় কাটিয়ে দেন। তবে ইদানিং ভ্রমণ পিপাসু স্থানীয় মানুষ শহরের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া গড়াই নদীর তীরবর্তী শহর রক্ষা বাঁধে বিনোদন ও অবসর সময় কাটানোর জন্য ভিড় করছেন। নদীর তীরে অবস্থিত ঐ বাঁধ তিনটিতে প্রতিদিন বিকালে শত শত নারী-পুরুষের আগমন ঘটে। সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার কিংবা সরকারি কোন ছুটির দিনে ছুটে আসা মানুষের পদচারণায় নদী তীরের বাঁধ এক রকম মিলন মেলায় পরিণত হয়। প্রমত্তা পদ্মার প্রধান শাখা গড়াই নদীর ভাঙ্গন থেকে কুষ্টিয়া শহরকে রক্ষার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে তিনটি বড় বাঁধ নির্মাণ করা হয়। সিসি ব্লক, ইট ও কংক্রিট ঢালাইয়ে তৈরি দৃষ্টিনন্দন বাঁধ তিনটি থেকে নদীর সৌন্দর্য ও নদী তীরের ছায়াঘেরা অপরূপ পরিবেশ অবলোকন করা যায়। আর সেজন্যই এখানে ছুটে আসেন শহরের মানুষ। নিরিবিলি ও মনোরম পরিবেশে নদী তীরের এই বাঁধে একটু ঘুরে বেড়ানো ও অবসর সময় কাটানোর আনন্দই যেন অন্যরকম। প্রতিদিন বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীসহ শহরের শত শত মানুষের ঢল নামে। ভ্রমণ পিপাসু মানুষরা এখানে এসে দল বেঁধে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চড়ে আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠে, কেউবা নদীর বালু চরে হেঁটে বেড়ায় আবার অনেকেই বাঁধের এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে প্রকৃতির সাথে একাত“ হয়ে আপন মনে নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ক্ষিার্থী জানান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সব মানুষকেই আকর্ষণ করে। তাই শহরের কোলাহলময় ও একঘেঁয়েমি এড়িয়ে একটু আলাদা পরিবেশে সময় কাটানোর জন্য গড়াই নদীর পাড়ে মানুষ ছুটে আসেন। নদী তীরে ভ্রমণের পাশাপাশি শহরের অনেকেই আবার পিকনিক করতে আসেন। এককালের প্রমত্তা গড়াই নদ্ ীবর্তমানে পানিশূন্য হয়ে মরাখালে পরিণত হলেও নদী ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই এখানে শত শত মানুষের আগমন ঘটে। †jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267



0 comments:

Post a Comment