Saturday, April 21, 2018

স্মরণ: বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান


স্মরণ: বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান

আলী ফোরকান
জন্ম : ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর
শহীদ বরণ: ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট
১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল এদেশের অগণিত মানুষ। বঙ্গবন্ধুর ডাকে যে যার অবস্থান থেকে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে এদেশকে স্বাধীন করেছে। সেই সময়ে দেশের প্রয়োজনে কিছু মানুষ দেশের স্বাধীনতার জন্য জেনে-শুনে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তাদের অন্যতম বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান। বাংলাদেশ নামের এই স্বাধীন ভূ-খণ্ডটি একদিনে কিংবা হঠাৎ করেই গজিয়ে ওঠেনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঠিক নেতৃত্ব এবং নির্দেশনায় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের দীর্ঘ ২৪ বছরের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ৭ কোটি মানুষ ১৯৭১-এ একযোগে যোদ্ধা হয়ে উঠতে পেরেছিল। মতিউর রহমান সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে দেশমাতৃকাকে বাঁচাতে ছুটে এসে শহীদ হন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতা আর বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে সাত বীরকে সর্বোচ্চ সম্মান বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করা হয়, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান তাদের মধ্যে অন্যতম। মতিউর রহমান ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার ১০৯, আগা সাদেক রোডের পৈতৃক বাড়ি ‘মোবারক লজ’-এ জন্মগ্রহণ করেন। ৯ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে মতিউর ষষ্ঠ। তার বাবা মৌলভী আবদুস সামাদ, মা সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পাস করার পর সারগোদায় পাকিস্তান বিমানবাহিনী পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৬১ সালে বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালের জুন মাসে রিসালপুর পিএএফ কলেজ থেকে কমিশন লাভ করেন এবং জেনারেল ডিউটি পাইলট হিসেবে নিযুক্ত হন। এরপর করাচির মৌরীপুরে জেট কনভার্সন কোর্স সমাপ্ত করে পেশোয়ারে গিয়ে জেটপাইলট হন। ১৯৬৭ সালে তিনি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ইরানের রানী ফারাহ দিবার সম্মানে পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত বিমান মহড়ায় তিনি ছিলেন একমাত্র বাঙালি পাইলট। ১৯৭১ সালে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে মতিউর সপরিবারে দুই মাসের ছুটিতে ঢাকা আসেন। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হয়েও অসীম ঝুঁকি ও সাহসিকতার সঙ্গে ভৈরবে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প খোলেন। যুদ্ধ করতে আসা বাঙালি যুবকদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্থান থেকে এনে জড়ো করেন এবং অস্ত্র দিয়ে গড়ে তুললেন একটি প্রতিরোধ বাহিনী। ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বিমানবাহিনী ‘সেভর জেড’ বিমান থেকে তাদের ঘাঁটির ওপর বোমাবর্ষণ করে। মতিউর রহমানের বিচক্ষণতায় ঘাঁটি পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পান তিনি ও তার বাহিনী। এরপর ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল ভৈরব থেকে তিনি ঢাকা আসেন ও ৯ মে সপরিবারে করাচি ফিরে যান। ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট শুক্রবার করাচির মৌরীপুর বিমান ঘাঁটিতে তারই এক ছাত্র রশীদ মিনহাজের কাছ থেকে একটি জঙ্গিবিমান ছিনতাই করেন। কিন্তু রশীদ এ ঘটনা কন্ট্রোল টাওয়ারে জানিয়ে দিলে, অপর চারটি জঙ্গিবিমান মতিউরের বিমানকে ধাওয়া করে। রাডারের চোখ ফাঁকি দিতে বিমান উড্ডয়নের উচ্চতা কম থাকায় বিমানটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে থাট্টা এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। মতিউরের সঙ্গে প্যারাস্যুট না থাকায় তিনি প্রাণ হারান। তার মৃতদেহ উদ্ধার করে করাচির মাসরুর বেসের চতুর্থ শ্রেণীর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। ২০০৬ সালের ২৩ জুন মতিউর রহমানের দেহাবশেষ পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে পূর্ণ মর্যাদায় ২৫ জুন শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্তানে পুনরায় দাফন করা হয়। গভীর শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করছি।

0 comments:

Post a Comment