মাধ্যমিক শিÿাব্যবস্থা উন্নয়নে কিছু কথা
আলী ফোরকান
বাংলাদেশের শতকরা নব্বইভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয় গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত। অতি প্রাচীনকাল থেকেই এদেশে গ্রাম এবং শহরের ব্যবধান প্রকট। এই ব্যবধান শিÿা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ প্রায় সব ÿেত্রেই প্রতীয়মান। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে অর্থাৎ বিশ্বায়নের সুবাদে সব কিছুই আজ মানুষের হাতের মুঠোয় এসে পড়েছে। দশ-পনের বছর আগেও আমরা চিন্তা করেছি, উন্নত বিশ্বে মানব কল্যাণে যা কিছু ঘটছে তার সুফল পেতে আমাদের শত শত বছর অপেÿা করতে হবে। আজ তা ভ্রান্ত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। মানুষের কল্পনার পাখা আজ যেন কোন যাদুর ছোঁয়ায় বা¯Íবে রূপ নিয়েছে। পৃথিবীর এত পরিবর্তনের পরেও বাংলাদেশে সেই গ্রামবাংলা এবং শহরের মাঝে আজও প্রকৃত সেতুবন্ধন রচনা করা সম্ভব হয় নি। এখনও গ্রাম জনপদের কোন বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে ভাল ফল করা কোন শিÿার্থীকে শহরে এসে খাপখাওয়াতে লেগে যায় জীবনের অনেকটা সময়। তারপরও নাগরিক জীবনের সাথে নিজেকে সুর মেলাতে চেষ্টা করতে হয় সারাটা জীবন। এর মূল খুঁজতে গেলে অন্য অনেক কিছুর সাথে আমাদের সামনে এসে হাজির হয় ত্রæটিপূর্ণ শিÿাব্যবস্থা। এই ত্রæটিপূর্ণ কথাটার সাথে অনেক কিছুই জড়িয়ে আছে। যার অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সদিচ্ছায়। এই প্রবন্ধে আমি গ্রামবাংলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিÿাসহ সামগ্রিক মান উন্নয়নে আমার দীর্ঘদিনের শিÿাÿেত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু বিষয় সম্পর্কে বিশেøষণ করার চেষ্টা করবো। প্রথমেই আসা যাক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে যারা আছেন তাদের কথায়: একটি বিদ্যালয়ের সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভর করে একটি গতিশীল, দÿ এবং সৃজনশীল ব্যবস্থাপনা পরিষদের উপর। সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে দ্রæত পাল্টে যাচ্ছে ব্যবস্থাপনার ধারণা। প্রতিনিয়তই সংযোজন ঘটছে নতুন নতুন ব্যবস্থাপনা কৌশল ও পদ্ধতির। একবিংশ শতাব্দীতে এটি একটি বড় ধরনের চ্যালেন্স হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে সবার কাছে। তাই ব্যবস্থাপনা প্রশিÿণ আজ একটি চরম বা¯Íবতায় রূপ নিয়েছে। বিদ্যালয়ের সামগ্রিক মান উন্নয়নের জন্য বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের প্রশিÿণের আয়োজন করতে হবে। এই প্রশিÿণ সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায় থেকে আয়োজন করা যেতে পারে। প্রশিÿণ প্রদানের পর একটা নির্দিষ্ট সময় মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। মূল্যায়নের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে পুরস্কার বা তিরস্কারের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় যে সকল বিদ্যালয়ে ইতিমধ্যে মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই বিদ্যালয়কে পরিদর্শনের জন্য অপেÿাকৃত দুর্বল বিদ্যালয়কে পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।
প্রধানশিÿক ও সহকারী প্রধানশিÿক: প্রধানশিÿক ও সহকারী প্রধানশিÿক একটি বিদ্যালয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। প্রশাসনিক দÿতা, মুক্ত চিন্তাচেতনা, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান এবং সৃজনশীলতায় তাদেরকে হতে হয় অগ্রণী। দÿ নাবিক যেমন শত বাধাবিঘœকে জয় করে অতি সুনিপুণভাবে পৌঁছতে পারে তার গন্তব্যে। তেমনি দÿ প্রধানশিÿক ও সহকারী প্রধানশিÿক একটি বিদ্যালয়কে সাফল্যের চরম শিখরে নিয়ে যেতে পারে। এই জন্য প্রধানশিÿক ও সহকারী প্রধানশিÿকের জন্য আয়োজন করা দরকার ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দÿতা অর্জনের প্রশিÿণ। যদিও বাংলাদেশ সরকারের শিÿা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ব্র্যাক এই ধরনের প্রশিÿণের আয়োজন করছে কিন্তু এটি আরও ব্যাপকভাবে শুরু করা প্রয়োজন। উন্নয়নের মানদন্ড হিসেবে শিÿকদের নিয়মিত পড়াশুনা করার বিকল্প নেই। এ ছাড়াও ভাল স্কুল পরিদর্শন করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শিÿকমন্ডলী:বিশ্বায়ন ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে কারিকুলাম পরিবর্তন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশের শিÿকগণ নতুন পদ্ধতির প্রবর্তন হলেই মানসিক সাহস হারিয়ে ফেলেন। মনে করেন শিÿার্থীদের পÿে নতুন পদ্ধতি রপ্ত করে ভাল ফল করা সম্ভব নয়। তাই পরিবর্তিত কারিকুলামের আঙ্গিকে শিÿকের দÿতা অর্জন তথা শিÿক প্রশিÿণ এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের বিদ্যালয়ের শ্রেণীকÿে ব্যাপকভাবে শিÿণ-শিখন পদ্ধতির উন্নয়ন প্রয়োজন। এ ÿেত্রেও শিÿক প্রশিÿণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা শিÿকদের সÿমতা, উদ্যম, গতিশীলতা, পেশাদারিত্ব ও সৃজনশীলতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে। আর এই শিÿকদের প্রশিÿিত করার জন্য প্রয়োজন সৃজনশীল, উদ্যমী, নতুনত্বে বিশ্বাসী দÿ প্রশিÿক, যারা শ্রেণীকÿে মানসম্মত শিÿা নিশ্চিতকরণের লÿ্যে শিÿকদের প্রস্তুত করবেন।
শিÿকদের বিষয়ভিত্তিক প্রশিÿণের পাশাপাশি শিÿাদান পদ্ধতি, ক্লাস ব্যবস্থাপনা, শিÿার্থী মনোবিজ্ঞান-এর উপরও ব্যাপক প্রশিÿণ দেয়া প্রয়োজন। শিÿককে নিমেষেই শিÿার্থীর মানসিক অবস্থা বিশেøষণের দÿতা থাকতে হবে। অনেক শিÿক আছেন যারা মনে করেন আমি যা জানি এটাই যথেষ্ট। কিন্তু শিÿাব্যবস্থার প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে, এই ইতিবাচক দৃষ্টি ভঙ্গি শিÿককে হƒদয়ে লালন করতে হবে। তবেই তিনি একজন প্রকৃত শিÿক হিসেবে পরিগণিত হবেন এবং জাতিও উপকৃত হবে তাঁর শিÿাদানে।
আমরা সবাই কমবেশি জানি যে, আমাদের সমাজে মুক্তবুদ্ধিদীপ্ত তথা যুক্তিবাদী মানুষের বড় অভাব। আমরা যা বুঝি সেটার যে বৈপরীত্য থাকতে পারে, তার যে ভিন্ন মাত্রা থাকতে পারে একথাও আজ আমরা ভুলতে বসেছি। তাই শিÿার্থীকে যুক্তিবাদী, বুদ্ধিদীপ্ত, পরমত সহিষ্ণু এবং আত্মবিশ্বাসী ও রুচিশীল নাগরিক হিসাব গড়ে তোলার জন্য বিতর্ক অনুশীলন ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। আমরা অতি সহজে এবং স্বল্পব্যয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি শুরু করতে পারি। ইতোমধ্যে ব্র্যাক সারাদেশে ব্র্যাক শিÿা কর্মসূচিভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এই কাজটি শুরু করেছে। অন্যান্য বিদ্যালয়ও এই ব্র্যাক সহায়তাপ্রাপ্ত বিদ্যালয় থেকে বিতর্ক চর্চার প্রাথমিক ধারণা গ্রহণ করতে পারে। আমাদের শিÿার্থীদের আমরা সৃজনশীল লেখা চর্চার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে পারি। তাদের এই সৃজনশীল লেখার সমন্বয়ে বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ এবং জাতীয় বিভিন্ন দিবসে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করা যেতে পারে। এই লেখা চর্চা এবং পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে শিÿার্থীদের কল্পনাশক্তি, ভাষাজ্ঞান, চিন্তাশক্তি বাড়বে এবং তারা আত্মবিশ্বাসী ও বিকশিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। শিÿার্থী অভিভাবক: বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যলোচনার মাধ্যমে দেখা গিয়েছে একজন শিÿার্থীর সার্বিক অগ্রগতির জন্য বাবা-মা তথা অভিভাবকের ভ‚মিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রত্যেক বাবা-মা সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ বাবা-মা দরিদ্র, নিরÿর বা স্বল্পশিÿিত বিধায় কোন্ পথে চললে বা কী ধরনের পদÿেপ নিলে তার সন্তান বড় মানুষ হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে সেই দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হন। সেজন্য বাবা-মা’র দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে তাদেরকে ওরিয়েন্টেশন, অভিভাবকসভা করা, শিÿার্থীভিত্তিক ভালমন্দ বিষয়ে অভিভাবককে দ্রæত অবহিত করা, শিÿকের সাথে যোগাযোগ করার মরামর্শ দেয়া দরকার। অনেক ÿেত্রে নিজ সন্তানের ভাল ফল বা যেকোন সাফল্যের বেলায়ও বাবা-মা-এর গুরুত্ব বুঝতে পারেন না। এই ÿেত্রে অভিভাবকসভার মাধ্যমে তাদেরকে পরিচিত করানো এবং উৎসাহ প্রদান করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি পর্যবেÿণ: সরকারি ও বেসরকারি সমন্বয়ের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ঘনঘন বিদ্যালয় পরিদর্শন, ফিটব্যাক প্রদান, শিÿক-এসএসসি মিটিং করা, ভাল স্কুলকে পুরস্কৃত করা, প্রত্যেক পরীÿার ফল পর্যালোচনা করা এবং পুরস্কার ও তিরস্কারের ব্যবস্থা রাখা যেতে ব্যবস্থা যেতে পারে।
0 comments:
Post a Comment