Monday, March 12, 2018

উচ্চশিÿা কেন প্রতিবন্ধকতা হবে

উচ্চশিÿা কেন প্রতিবন্ধকতা হবে
আলী ফোরকান
আমাদের সমাজ কাঠামোই এমন যে, এখানে মেয়েদের একটা নির্দিষ্ট বয়সে বিয়ে দিতে হবে এই বিষয়টি সমাজে সব সময় কাজ করে। যদিও এখন মেয়েদের ÿেত্রে পূর্বে প্রচলিত ‘কুড়িতে বুড়ি’ ভাবনাটি তেমনভাবে আর গ্রহণযোগ্য হয় না। কিন্তু তবুও আদর্শগতভাবে এটি সমাজে শেকড় গেড়ে বসে আছে। তাই দেখা যায়, যেখানে একজন মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সেখানে রাষ্ট্র যখন সেটি পালনে ব্যর্থ হয়, তখন পরিবারগুলো বিয়েকেই মেয়েদের জন্য নিরাপদ বলে মনে করে। আর আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যেও জেন্ডার বৈষম্য প্রবলভাবে বিরাজমান। তাই এ ÿেত্রে পরিবারগুলোতে মেয়েদের ছোটবেলা থেকে এমনভাবে বড় করা হয়, যেন বিয়েই তার জীবনের সবচেয়ে প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আবার ছেলেরাও এ ÿেত্রে উদার মনোভাব দেখায় না। তারা মনে করে, উচ্চশিÿিত ও প্রতিষ্ঠিত মেয়েরা পরিণত ব্যক্তিত্বের অধিকারী, তারা তাদের শিÿা ও অভিজ্ঞতায় চারপাশকে বুঝতে শেখে। ফলে তাদের ওপর আধিপত্য বি¯Íার করা সেভাবে সম্ভব নয়। এ অবস্থায় যে মেয়েরা বিয়ের আগে লেখাপড়া আর ক্যারিয়ারকে প্রাধান্য দিচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদের যোগ্য পাত্র সংকটে পড়তে হয়।
প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের বিয়ের ÿেত্রে যোগ্য পাত্র সংকট ইদানিংকালের একটি সামাজিক সমস্যা। এ বিষয়টি নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।
দৃশ্যপট এক
মেধাবী ছাত্রী শাওন (ছদ্মনাম) ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা আর ক্যারিয়ারকে প্রাধান্য দিয়েছিলো। সে এখন এমবিএ শেষ করে খুব ভালো চাকরি করছেন। জীবনসঙ্গী হিসেবে শাওন চেয়েছিলো তার ক্যারিয়ারকে সহযোগিতা করবে, সমর্থন করবে এমন একজন শিÿিত ও প্রতিষ্ঠিত মানুষকে। কিন্তু এমন কাউকে এখন পর্যন্ত পাননি। তিনি বলেন, পাত্র প্রতিষ্ঠিত উচ্চশিÿিত হলেও চান শিÿিত অল্পবয়সী ঘরোয়া, অর্ন্তমুখী, সুন্দরী পাত্রী। তাই ছোটবেলা থেকে লালন করা স্বপ্ন, মেধা, প্রতিষ্ঠাকে ছেড়ে তিনি শুধু বিয়ের জন্য সবকিছু ত্যাগ করবেন তা মেনে নিতে পারেননি। ফলে দেরি হয়ে যায় শাওনের বিয়ের। ছাত্রাবস্থায় আসা অনেক বিয়ের প্র¯Íাব যেখানে এক কথায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন শাওন, সেখানে আজ তার বিয়ের জন্য যোগ্য পাত্রের দেখা নেই!
দৃশ্যপট দুই একটি প্রাইভেট ব্যাংকে উঁচু পদে কাজ করছেন সাথী শারমীন। ক্যারিয়ার গোছাতে ব্য¯Í সাথী শারমীন ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভাবার সময় পাননি। যখন পেলেন তখন আর্থ-সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও ত্রিশের ঘরে। জীবন সঙ্গী হিসাবে তিনি এমন কাউকে চান যিনি নিজেও হবেন প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু কাঙিÿত পাত্রের সন্ধান মেলেনি এখনো। যেসব প্র¯Íাব আসছে। তার অধিকাংশই কম যোগ্যতাসম্পন্ন। ফলে যোগ্য সঙ্গীর অভাবে বিয়ে করা হয়নি তার। তিনি শিÿা, প্রতিষ্ঠা সবÿেত্রে সফলতা পেলেও বিয়ের ÿেত্রে এগুলোই প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে কি লেখাপড়া আর ক্যারিয়ার মেয়েদের বিয়ের ÿেত্রে প্রতিবন্ধক? কী ভাবছে এ প্রজন্ম। প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের বিয়ের ÿেত্রে যোগ্য পাত্র সংকটÐ এ প্রসঙ্গে কথা হয় এ প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের সঙ্গে। এ বিষয়ে অনেক মেয়েই মনে করছে, এ বিষয়টি ঘটছে ছেলেদের সংকীর্ণ মানসিকতার কারণে। পরিবার ও সমাজের রÿণশীল মনোভাবকেও দায়ি করেছে অনেকে। এ প্রসঙ্গে বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্রী স্মৃতি বলেন, ‘একটি ছেলে যত প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিয়ে করতে চায় তার জন্য পাত্রী পাওয়া তত সহজ। কিন্তু কোনো মেয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিয়ে করতে চাইলে পাত্রী হিসেবে সে কম কাঙিÿত হয়ে পড়ে। কেননা সেই মেয়ের ওপর পুরোপুরি আধিপত্য বি¯Íার করা তো কঠিন হয়ে যায়। তাই ছেলের বউ হিসাবে কম বয়সের, প্রতিষ্ঠিত নয় এমন মেয়েই খোঁজে। তাই বলে মেয়েরা পড়াশোনা, ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা না করে বিয়ের পিঁড়িতে বসে যাবে এমনটা ভাবা ভুল। এÿেত্রে পরিবারের সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ’র ছাত্র নিয়ন বলেন, একজন মেয়ে শিÿিত, প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এটাতো খুবই ভালো দিক। আর আজকের দিনে তো এর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমি অন্তত বিয়ের ÿেত্রে উচ্চ শিÿিত, ক্যারিয়ারিস্ট কোনো মেয়েকেই বেছে নেবো। কেননা আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই না, আমি তার বন্ধু হতে চাই। এ বিষয়ে সমাজের বিভিন্ন পরিবার এখনো যথেষ্ট রÿণশীল দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। অনেক অভিভাকই মনে করেন, বেশি পড়াশোনা জানা ও প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের নিজস্ব মতামত তৈরি হয়ে যায়। এটা পছন্দ না, ওটা পছন্দ না করতে গিয়েই সময় চলে যায়, পেরিয়ে যায় বিয়ের বয়স, শুরু হয় পাত্র সংকট। তারা মনে করেন যে, মেয়ে যতই শিÿিত, আত্মনির্ভরশীল হোক না কেন বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত এটা পরিবারের চিন্তার বিষয়। তবে এর বিপরীত চিত্রও পাওয়া যায় আমাদের সমাজে। কিছু কিছু অভিভাবক এ বিষয়ে খুব উদার। এ সম্পর্কে একজন অভিভাবক বলেন, আমার মেয়ে শিÿিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমার মেয়ের যোগ্যতাই তার যোগ্য পাত্র সংকট তৈরি করবে না; বরং যোগ্য ভালো মনের আধুনিক ছেলে জীবনসঙ্গী হিসাবে এমন মেয়েই খোঁজে।এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন বলেনÐ এ বিষয়টি তো সমাজের বাইরে নয়। মানুষের কিছু সনাতন ধ্যান-ধারণা এ বিষয়টির জন্য দায়ী। তারা সনাতন ধ্যান-ধারণা থেকে বের হতে পারছে না, তাছাড়া আরেকটি কারণ হলো মেডিকেল সায়েন্স বলে মেয়েদের বয়সের একটা পর্যায়ের পর তারা আর বাচ্চাধারণ করতে পারে না। যদি এর প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। অন্যান্য সমাজের মতো বাংলাদেশের সমাজও বদলেছেÐ ছেলে-মেয়ে এক বয়সী হলেই বরং ভালো। মানসিক চাপের সমস্যাটা থাকে না। এর থেকে উত্তরণের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা প্রয়োজন। সেটা ধীরে ধীরে পরিবর্তন হবে। একটু সময় লাগবে। কিছু কিছু ছেলে আছে যাদের মনটা খুব উদার, ম্যাচিউরিটি আছে তারা এটা বুঝবেÐ ম্যাচিউরও মেয়েদের সাথে আন্ডারস্ট্যান্ডিং খুব ভালো হবে, সর্বোপরি প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের বিয়ের বয়সের ÿেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। রাষ্ট্র কর্তৃক ব্যক্তির সার্বিক নিরাপত্তা, নিশ্চিতকরণ, এ বিষয়ে পুরুষদের উদার মনোভাব পোষণঃ শৈশব থেকে মেয়েদের বিয়ে কেন্দ্রিক সামাজিকীকরণ প্রথায় পরিবর্তন, গণমাধ্যমগুলোর ইতিবাচক ভ‚মিকা পালন এবং সামগ্রিকভাবে পরিবারগুলোর সহযোগিতামূলক মনোভাব পোষণের একান্ত প্রয়োজন। প্রকৃত পÿে, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিশ্বায়নের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ছেলে-মেয়ে উভয়ই উচ্চশিÿিত প্রতিষ্ঠিত হয়ে সমাজের সব ÿেত্রে সক্রিয় অবদান রাখতে চায়। তাই শিÿা আর প্রতিষ্ঠাকে মেয়েদের বিয়ের ÿেত্রে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা উচিত প্রতিটি শিÿিত তরুণের, শিÿিত পরিবারের।এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ও কথাসাহিত্যিক ডা. মোহিত কামাল বলেনÐ আমাদের মনে একটি সনাতন চিন্তা-ভাবনা আছে। একটি গড়ে ওঠা এটিচিউড বিলিভ আছে যার আলোকে আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রিত হয়। একে বলা হয় পধৎব নবষরহব যেটা আমাদের মনের ভিতরে গেড়ে বসে আছে। কিছু ধারণা; সনাতন রীতিনীতি আমাদের জীবনধারার মধ্যে এমন একটি বিশ্বাস ঢুকিয়ে রেখেছে। যেমনÐ পাত্রীর বয়স কম হতে হবে। মেয়েদের বয়স বেশি হলে বৌ হিসেবে ভালো হয় না। বিশেষ করে ছেলেদের কাছে এই বিশ্বাসের পিছনে ২টি যুক্তি থাকেÐ এক. মেয়েদের যদি ছেলেদের চেয়ে কোয়ালিটি বেশি থাকেÐ সেÿেত্রে ছেলেদের মধ্যে এ নিয়ে হীনমন্যতা থাকে। নিজের স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে পাত্রীর স্ট্যান্ডার্ডের কথা তুলনা করে নিজের মধ্যে হীনমন্যতা কাজ করে। যেহেতু পুরুষরা আধিপত্য বাদী, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যে একটা আধিপত্যবাদের মনোভাব রয়ে গেছে। সেখান থেকে সে তার বৌ হিসাবে তার থেকে বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন মেয়েকে মেনে নিতে পারে না। যে কারণে তারা উচ্চ শিÿিত, প্রতিষ্ঠিত পাত্রীদের কাছ থেকে তারা দূরে থাকতে চায়। 
দুই. আরেকটি কারণ লÿ্য করি, ছেলেরা একটা ভুল ধারণা পোষণ করে তা হলো, বেশি বয়সী প্রতিষ্ঠিত পাত্রী (মেয়ে) দাম্পত্য জীবনে তারা ভালো হতে পারে না! দাম্পত্য জীবন ততটা সুখকর হয় না বেশি বয়সে মেয়েদের হরমোনের নিঃসরণ কমে যায়; ছেলেরা তখন আনন্দ পায় না। এটা ছেলেদের ভুল একটা ধারণা। ছেলেদের মধ্যে এই দাম্পত্য জীবন আনন্দময় করতে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে। স্ত্রীর সাথে মানসিক যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। আর এই জ্ঞান একটা এডুকেটেড ম্যাচিউরড মেয়ের মধ্যেও থাকে যার ফলে দাম্পত্য জীবন আনন্দময় হওয়াটা আবশ্যকীয়। কিন্তু আমরা দেখছি যে, অধিকাংশ ÿেত্রে কম বয়সী মেয়েদের জ্ঞানের পরিধি কম থাকে। সুতরাং তাদের শুধু বয়সটাকে পুঁজি করে বিয়ের ÿেত্রে ছেলেরা তাদের প্রাধ্যন দিতে চায় মাত্র একটা দিককে, বাকী দিকগুলো তারা পায় না। যার ফলে অল্প বয়সী মেয়েদের বিয়ে করার কিছুদিন পর ছেলেদের মাঝে হতাশা ও নানা ধরনের অশান্তি শুরু হয়ে যায়। সাময়িকভাবে তারা একটা অল্প বয়সী মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হতে চায় শুধু মাত্র অল্প বয়সের জন্য যেটা অবশ্যই ঠিক নয়। এই চিন্তাধারা থেকে ছেলেদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। বৈজ্ঞানিক নলেজ নিতে হবে। তাহলে দাম্পত্য জীবন ভালো হবে। পশ্চিমা দেশগুলোতে দেখা যায় অল্প বয়সী মেয়েরা বয়স্ক পুরুষদেরকে পছন্দ করছে আবার অল্প বয়সী ছেলেরা বয়স্ক মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। কারণ বেশি বয়স্কদের অনেক অভিজ্ঞতা থাকে। ঐ জায়গায় কিন্তু বিজ্ঞানটা প্রতিফলিত হচ্ছে সুতরাং আমরা যেটা ধারণা করে বসে আছি যে, অল্প বয়স হলে মনে হয় বেশি ভাল সেটা ঠিক নয়। অল্প বয়সীদের অভিজ্ঞতা কম সেখানে অনেক ঘাটতি থাকে। জ্ঞানের ঘাটতি থাকে, সুতরাং ছেলেদের মনটাকে আরো উদার করতে হবে। 
উচ্চ শিÿিত, প্রতিষ্ঠিত বয়স বেশি হলেই কারো কাছ থেকে দূরে সরে আসা উচিত নয়। বয়স বেশি হলে বোঝাপড়া ভাল নয়। ছাড় দেয়ার ÿমতা খুব বেশি থাকে সব কিছুতেই জ্ঞান থাকা জরুরি। শিÿিত ম্যাচিউরড মেয়েরা পরিবারকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখতে পারে, সন্তানদের ভালোভাবে লালন-পালন করতে পারে। যেটা একটা অল্প বয়সী মেয়েরা পরিপূর্ণভাবে পারে না। অল্প বয়সী মেয়েরা নিজেকেই যেখানে সামলে উঠতে পারে না সেখানে সে একটি পরিবারের দায়িত্ব নেবে কীভাবে? তাই আমি মনে করি উচ্চ শিÿা, প্রতিষ্ঠা কোন মানুষের বিয়ের ÿেত্রে প্রতিবন্ধকতা হতে পারে না। আমাদের দেশের ছেলেদের মন-মানসিকতা আমূল পরিবর্তন করতে হবে।

0 comments:

Post a Comment