Friday, March 2, 2018

শিশুর বিকাশঃ শারীরিক শা¯িÍ সহায়ক নয়


শিশুর বিকাশঃ শারীরিক শা¯িÍ সহায়ক নয়
 আলী ফোরকান 
বিদ্যালয়ে শিশুদের শা¯িÍ দান বন্ধ করার কাজটা কঠিন। তবে অসাধ্য নয়। এখানে শিক্ষকের ভূমিকা বেশি। শা¯িÍর বদলে মায়া-মমতা-ভালোবাসা দিয়ে শিশুর মন জয় করেই পড়াতে হবে। শিক্ষককে জানতে হবে শিশুর চাওয়া-পাওয়া। শিক্ষক-অভিভাবক সমন¦য়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এ ক্ষেত্রে জরুরি স্কুল ও কলেজগামী ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, দক্ষ শিক্ষক স্বল্পতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামো উন্নয়নে অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘসূত্রতা, লাল ফিতার দৌরাত্য, মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকর্ষণে দীর্ঘদিনের অসক্ষমতা সত্তে¡ও বাংলাদেশ শিক্ষাক্ষেত্রে যখন বিভিন্ন ইতিবাচক পরিবর্তনের উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষানীতি বা¯Íবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে আমাদের স্কুলগুলো এবং সমপর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু শিক্ষার্থীদের শারীরিক শা¯িÍ প্রদানের অকার্যকারিতার দিকটি নতুন আঙ্গিকে উঠে এসেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অমানবিক শা¯িÍ প্রদান অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ এবং ‘বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (বøাস্ট)’ সম্প্রতি হাইকোর্টে রিট আবেদন করে এর প্রতিবিধান প্রার্থনা করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে শিশুর আত্মহত্যাসহ ১৪টি ঘটনায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে এ পর্যবেক্ষণ করে আদালত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক শা¯িÍ প্রদান অবৈধ, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শা¯িÍর নামে নির্যাতন করাকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেন। একই সঙ্গে শারীরিক শা¯িÍ নিষিদ্ধ করে শিশুদের শৃ´খলার স্বার্থে কী ধরনের শা¯িÍ প্রদান করা যেতে পারে তা সুনির্দিষ্ট করা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে তৈরি করা নীতিমালা চূড়ান্ত করে তার বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের বেত্রাঘাত করা, আটকে রাখা, প্রহার করা, শিকল দিয়ে আটকে রাখাসহ এ জাতীয় শা¯িÍগুলো অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে। স্কুল ও মাদ্রাসা পরিদর্শনের মধ্যে সব ধরনের শারীরিক শা¯িÍ এ সংক্রান্ত অভিযোগ, তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তিদের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি এ ধরনের পরিদর্শনের ঘটনা গোপন রাখা ও নির্যাতিতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব নির্দেশনা সুষ্ঠুভাবে পালন হচ্ছে কি-না, তা তদারক করার জন্য সংশিøষ্ট প্রশাসকের অধীনে একটি পর্যবেক্ষণ (মনিটরিং) কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটিকে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে ছয় মাস পরপর আদালতে প্রতিবেদন পেশ করতে হবে। এ বিষয়ে গবেষণার জন্য নিরপেক্ষ কমিশনার নিয়োগ দিতে হবে।
একথা সত্য, শিক্ষা দর্শন ও শিক্ষার আধুনিক ধারণায় শিক্ষার্থীদের শা¯িÍ প্রদানের বিষয়টি সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু শা¯িÍদানের বিপক্ষে প্রবল মত থাকলেও বা¯Íবতা হলো, শিক্ষকদের একটি অংশ মনে করে শিক্ষায় পুরস্কার ও শা¯িÍ উভয়েরই প্রয়োজন আছে। পৃথিবীর উন্নত-অনুন্নত প্রায় সব দেশেই শিশু শিক্ষার্থীদের শা¯িÍ প্রদানের প্রচলন রয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শা¯িÍ যেমন নিষিদ্ধ হচ্ছে আবার শা¯িÍর মাত্রা ও প্রকারে পরিবর্তনও অব্যাহতভাবে হচ্ছে। এখন অধিকাংশ দেশেই শা¯িÍ নিষিদ্ধ।
বর্তমানে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধথ সব ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনের ধারা থেকে বিযুক্ত বা বিচ্ছিন্ন থাকা কোনো দেশের কোনো জনগণের পক্ষে আজ সম্ভব নয়। বিশ্বায়নের অভিঘাতে প্রযুক্তির অকল্পনীয় বিকাশ তা অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। যে পরিবর্তন আগে দুইশ’ বা তারও বেশি সময়ে হয়েছে, এখন তা সূচিত হচ্ছে এক দশকে অথবা তারও কম সময়ে। আমাদের দেশে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্কুলে শিক্ষার্থীদের শা¯িÍ দান প্রসঙ্গে বর্তমানে অভিভাবকদের মনমানসিকতায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। অতীতে ছেলেমেয়ের লেখাপড়া নিয়ে বেশি ভাবতেন বাবা। সন্তানকে শিক্ষকের হাতে তুলে দিয়ে বাবা বলতেন, লেখাপড়ার জন্য যে শা¯িÍ দরকার দেবেন, শুধু জানে বেঁচে থাকলে হবে! সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিশুর পাঠদানে মায়ের ভূমিকা বেড়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদৃত করে বলতে হয়, সন্তানের লেখাপড়া বা পরীক্ষার ফল নিয়ে মায়েদের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তার সবটা স্বাস্থ্যকর নয়। বিদ্যালয়ে শিশুদের শা¯িÍ দান বন্ধ করার কাজটা কঠিন, তবে অসাধ্য নয়। হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায় এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সহায়ক হবে। তবে এখানে শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত বেশি। শা¯িÍর বদলে মায়া-মমতা-ভালোবাসা দিয়ে শিশুর মন জয় করেই তাকে পড়াতে হবে। শিক্ষককে জানতে হবে শিশুর চাওয়া-পাওয়া খবর। শিক্ষক-অভিভাবক সমন¦য়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এ ক্ষেত্রে জরুরি। শিশু যাতে বইয়ের বোঝায় ভারাক্রান্ত না হয় তা দেখা দরকার। বইয়ের বিষয়বস্তু ও আকর্ষণীয় করতে হবে। জোর-জবরদ¯িÍ শা¯িÍ এ ক্ষেত্রে অকার্যকর। শিক্ষার্থীকে ভয় দেখানো বা তার আপাত দৃশ্যমান অক্ষমতাকে চূড়ান্ত মনে না করে, বড় করে না দেখে তার সাফল্য-সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরে আনন্দের মাধ্যমে অনুকূল পরিবেশে তাকে শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে শিক্ষকদের পালনের জন্য নির্দেশিকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠানো হয়েছে। তবে এ নির্দেশিকা খুব একটা কাজে দেবে না যদি শিক্ষক আন্তরিক না হন, পাঠদানে যুগোপযোগী ধারণা তার না থাকে। আশা করি আমাদের শিক্ষকরা সময়ের দাবি মেনে যথোপযুক্ত ভূমিকা নেবেন। শিক্ষার্থীকে শা¯িÍ দানের দীর্ঘদিনের অভ্যাস ক্রমেই বন্ধ হয়ে যাবে বলেও আমি আশাবাদী। কারণ শিক্ষক, অভিভাবক ও জাতীয় নীতি প্রণেতা সবার মধ্যেই আজ এ উপলব্ধি এসেছে যে, বিদ্যালয়ে শিশুদের শারীরিক শা¯িÍ তার কাঙ্ক্ষিত বিকাশে সহায়ক নয়, বরং প্রতিবন্ধক।

0 comments:

Post a Comment