গ্রীনহাউস প্রতিক্রিয়ার বিপদ
আলী ফোরকান
লসএঞ্জেলেস টাইমসের বরাত দিয়া বার্তা সংস্থা এনা পরিবেশিত এক সংবাদে বলা হয়, বাংলাদেশের উপক‚লীয় অঞ্চলে গ্রীনহাউস প্রতিক্রিয়া খুবই তীব্ররূপে দেখা দিতে শুরু করিয়াছে। বাড়িয়া চলিয়াছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। সেইসাথে বাড়িতেছে উষ্ণতা। উপক‚লীয় অঞ্চলের নদীর পানি লবণাক্ত হইয়া গিয়াছে, যদিও একদা এইসব নদীর পানি ছিলো মিষ্টি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র মানুষ অনবরত সে পানি ব্যবহার করিয়া শিকার হইতেছেন নানারোগের। অন্যদিকে, সামান্য বন্যাতেই নদীর দুই পাড় ছাপাইয়া সবকিছু সয়লাব হইয়া যায়। একই কারণে সুন্দরবনের চেহারাও ইতিমধ্যে বদলাইয়া গিয়াছে অনেকটা। সংবাদটি উদ্বেগজনক নিঃসন্দেহে। নূতন করিয়া বলার অপেÿা রাখে না যে, গ্রীনহাউজ এ্যাফেক্ট তথা পরিবেশ বিপর্যয়ের সমস্যাটি এখন বলিতে গেলে সারা দুনিয়ার। উষ্ণতা বৃদ্ধি লইয়া প্রাচ্য-প্রতীচ্য সবখানেই মানুষ উৎকণ্ঠিত। এই বিপত্তি কিন্তু মানুষই ডাকিয়া আনিয়াছে। তা সচেতন বা অসচেতন যেভাবেই হউক। শিল্পের সমূহ বিকাশ বিশ্ব অর্থনীতিতে স্পন্দন জাগাইয়াছে, এই কথা ঠিক। এও সত্য যে, শিল্প প্রসারের সাথে সাথে উন্নতি ঘটিয়াছে মানুষের জীবনমানের, বাড়িয়াছে জীবনের গতি। ব্যাপ্তি ঘটিয়াছে ভোগবাদী সুখের। কিন্তু প্রত্যেকটি অবস্থারই বিপরীত আছে। এভরি এ্যাকশন হ্যাজ ইটস ইকুয়েল রিএ্যাকশন। প্রত্যেক ক্রিয়ার অবশ্যই আছে প্রতিক্রিয়া। ইহা বৈজ্ঞানিক সত্য। যন্ত্রসভ্যতা বিকাশের যে গতি তার সাথে পালøা দিয়া প্রকৃতি বিরূপ হইতেছে। গ্রীনহাউস এ্যাফেক্টের একটি বড় কারণ হইল সিএফসি বা ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন। আর এই কার্বন ওজোন ¯Íরে গিয়া সমস্যার সৃষ্টি করিয়া চলিয়াছে। ইহারই পরিণতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড বাড়িয়া গিয়া উষ্ণতা বৃদ্ধি করিয়া চলিয়াছে। জমাটবাঁধা বরফ গলিতেছে। উত্তরমেরুর বরফও অধিক মাত্রায় গলিয়া বাড়াইয়া চলিয়াছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। যে হারে উচ্চতা বাড়িতেছে, তাহাতে তুলনামূলকভাবে নিচু অঞ্চলসমূহের ভবিষ্যতে পানির নিচে চলিয়া যাইবার আশংকা অমূলক নয়।
এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়া থাকেন গাছের ওপর। সভ্যতার এই সংকট সমন্বয়ে বৃÿ রাখিয়া যাইতে পারে ফলপ্রদ ভ‚মিকা। কারণ গাছ বাতাস হইতে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ বা শোষণ করিয়া নেয় এবং সে নির্গমন করে অক্সিজেন। কিন্তু সেই গাছও একালে নিরাপদ নয়। উন্নত বিশ্বে যেমন, তেমন বাংলাদেশসহ অনুন্নত এবং ঘনবসতিপূর্ণ দেশসমূহে বনজঙ্গল ক্রমাগত নিঃশেষ হইয়া যাইতেছে। যেকোনো দেশের মোট আয়তনের কমপÿে পঁচিশ শতাংশ বনভ‚মি থাকা দরকার। বাংলাদেশের ৮/৯ শতাংশ বন-জঙ্গল আছে কিনা সন্দেহ। এখানে প্রাচীন বন-বনানীর প্রায় সবই বৃÿ বিরল। যদিও উপক‚লীয় সবুজ বেষ্টনী এবং অংশগ্রহণমূলক সামাজিক বনায়ন কর্মসূচীর মাধ্যমে নূতন করিয়া বন সৃজন করা হইতেছে, তাহা হইলেও বিনাশের তুলনায় তাহা খুবই কম। তারপরেও স্বীকার্য, ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার কল্যাণে এদেশে বৃÿরোপণের ব্যাপারে বেশ জনসচেতনতা তৈয়ার হইয়াছে। মহাসড়ক, গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন রা¯Íার পার্শ্বে এবং বাড়ীর আশেপাশে এখন অনেক নতুন গাছ দেখিতে পাওয়া যায়। ইহা ভাল দিক। কিন্তু অন্যদিকে পুরাতন বনজঙ্গল সাফ করার প্রক্রিয়াও চলিতেছে বিরামহীনভাবে। সেইসাথে চলিতেছে পাহাড় কাটা। পাহাড়কাটা হইলে একদিকে যেমন ভ‚পৃষ্ঠে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়, তেমনই নষ্ট হয় জঙ্গল। বেশীরভাগ পাহাড়ই কিন্তু বৃÿ আচ্ছাদিত। পাহাড়কাটা এবং বনসংহার প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়া দরকার। এÿেত্রে আইনের কার্যকারিতার সাথে সাথে প্রয়োজন জনসচেতনতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ।
তবে একথাও মনে রাখা দরকার, পরিবেশ রÿার বিষয়টি এখন কেবল একটি দেশের ব্যাপার নয়। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি দেশ যতই প্রচেষ্টা চালাক না কেন, তাহাতে কাংÿিত ফল পাওয়া কঠিন। গ্রীনহাউস প্রতিক্রিয়া, বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়া যাইবার যে সমস্যা তাহা বিশ্বব্যাপী। স্বল্পোন্নত দেশগুলি যে কার্বন উৎপাদন করে তাহার চাইতে বহুশতগুণ বেশী কার্বন বায়ুমণ্ডলে নির্গমন করে শিল্পোন্নত বিশ্বে এবং তাহার প্রতিক্রিয়ায় ÿতির সম্মুখীন বিশ্ব সভ্যতা। বোধগম্য কারণেই কম উন্নত এবং অধিক জনসংখ্যা ভারাক্রান্ত দেশগুলি এখন কঠিন অবস্থার সম্মুখীন। এ পরিস্থিতিতে পরিবেশ রÿায় আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত এবং কার্যকর কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক।
0 comments:
Post a Comment