Sunday, March 4, 2018

আগ্রাসনের কবলে ৭০ নদী

আগ্রাসনের কবলে ৭০ নদী
আলী ফোরকান
নদী দখলের প্রতিযোগিতা শুধু বড় শহর-নগর-বন্দর-গঞ্জেই সীমাবদ্ধ নয়, দেশের সকল শহরাঞ্চলেই তা ঘটছে। বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলী, সুরমা, কীর্তনখোলা, রূপসাসহ শহর তীরবর্তী প্রায় ৭০টি নদী এই আগ্রাসনে পড়েছে। কেবল নদী নয়, শহরের ভেতরের বা পাশের খালগুলোও অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে দ্রæত। নদী থেকে ভ‚মি সৃষ্টির জন্যে নেয়া হচ্ছে বিচিত্র সব কলাকৌশল। সৃষ্টি করা হচ্ছে কৃত্রিম চর। নদীগ্রাস আগামী দিনে পরিবেশসহ সার্বিক পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি-বর্ষণে জলাবদ্ধতা, পানি-বর্জ্য নিষ্কাশনে শুধু সমস্যাই দেখা দেবে না, সাধারণ বন্যাকেও ভয়াবহ করে তুলবে। সে সঙ্গে শহরে-বন্দরে মারাত্মক নদী ভাঙ্গনও দেখা দেবে। এছাড়া নৌ-চলাচল পথ সঙ্কুচিত করে একটি বড় শহর বা বন্দরকে গুরুত্বহীন করে ফেলা ছাড়াও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কার্যকলাপকে ÿতিগ্র¯Í করবে। দ্রæত নগরায়ন নদী দখলের অন্যতম কারণ। 
নগরবিদ ডঃ আব্দুর রউফ জানান, গত দু’দশকে প্রধান শহরগুলোতেই কেবল জনসংখ্যা বাড়েনি, নতুন নতুন ÿুদ্র এবং মাঝারি শহর গড়ে উঠায় সেখানেও জনসংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে দেশে পৌরসভার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০০টি। রাজধানীসহ এ শহরগুলোয় বর্তমানে বাস করছে তিন কোটিরও অধিক লোক। এই জনসংখ্যা আগামী ২০ বছরে ৮ কোটিতে পৌঁছবে। ক্রমবর্ধমান লোকের সঙ্কুলান করতে গিয়ে নদী দখল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে যদি এখন থেকেই কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া হয়। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, নদী দখলে লিপ্ত ব্যক্তিরা সব সময়ই প্রধানত ÿমতাসীনদের ছত্রচ্ছায়ায় পুষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সন্ত্রাসী-মা¯Íান, কল-কারখানার মালিক, ব্যবসায়ী-আড়তদার, পুলিশ, আইনজীবীসহ সমাজের বিভিন্ন ¯Íরের ব্যক্তি। প্রধানত দুর্বল ও দুর্নীতিপরায়ণ প্রশাসনের যোগসাজশে নদী দখলের প্রক্রিয়া চলে। দখলকারীদের হাত থেকে দখল হয়ে যাওয়া নদীর অংশ উদ্ধারের ব্যাপক নজির এখনও সৃষ্টি হয়নি। যদিও কেরানীগঞ্জ, সাভার ও নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটি স্থানে অবৈধ দখলকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। শহরগুলোতে নদী দখলকারীদের সংখ্যা কয়েক হাজার ছিল বলে জানা যায়। গত বছর বিভিন্ন জেলার প্রশাসককে সরকার নদীগুলোর অবৈধ দখলদারদের তালিকা ও দখলীকৃত জমির হিসেব পাঠাতে বললেও সে নির্দেশ পুরোপুরি পালন হয়নি। 
পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপ সূত্রে জানা যায়, উলিøখিত ৫টি নদী ছাড়াও বর্তমানে যে নদীগুলো দখলদারের কবলে পড়েছে তার মধ্যে রয়েছে- নারায়ণগঞ্জের শীতলÿ্যা, যশোরের কপোতাÿ, ভৈরব ও বেতনা, সাভার-ধামরাইয়ে ধলেশ্বরী, বংশাই, চাঁদপুরে ডাকাতিয়া, গাজীপুরে ব্রহ্মপুত্র, তুরাগ, শীতলÿ্যা ও চিলাই, নড়াইলে মধুমতি, কালীগঞ্জে চিত্রা, ঝিনাইদহে নবগঙ্গা ও কুমার, সাতÿীরায় সোনাই ও ইছামতি, কুষ্টিয়ায় গড়াই। চুয়াডাঙ্গায় ইছামতি, মাথাভাঙা, মেহেরপুরে ভৈরব, মাগুরায় ফটকী, বগুড়ার করতোয়া, গোপালগঞ্জে মধুমতি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে মহানন্দাসহ বিভিন্ন জেলায় আত্রাই, ভদ্রা, শ্রীনদী, পুনর্ভবা, বড়াল, বাঙালী, ফুলকুমারী, মুক্তেশ্বরী, হলহলিয়া, গজারিয়া, নবগঙ্গা, কালীগঙ্গা প্রভৃতি। দখলের ফলে প্রশ¯Í ও খরস্রোতা নদী অনেক জায়গায় খালে পরিণত হয়েছে বা দিক পরিবর্তিত হয়েছে। আবার চারশ’-পাঁচশ’ ফুট চওড়া অনেক নদী মাত্র বিশ-ত্রিশ ফুটে এসে পৌঁছেছে। নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দখলের কবলে পড়েছে বুড়িগঙ্গা। এর দু’তীরে বিশেষ করে দÿিণ তীরের কিছু না কিছু অংশ বেআইনী দখল হচ্ছে, বুড়িগঙ্গা দখলকারীদের অনেককেই এখনও উচ্ছেদ করা যায়নি। ঢাকা মহানগরীর আশেপাশের অন্য নদীগুলোর অবস্থাও বুড়িগঙ্গার মতোই। ইতোমধ্যে শীতলÿ্যা নদীর দু’পারে শত শত একর জমি দখল করে নিয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন। রাজধানীর অদূরে ধলেশ্বরী ও বংশাই নদী। দখলদাররা কর্ণপাড়া সেতুর কাছে ধলেশ্বরীর মাঝখানেই পিলার বসিয়ে নদী ভরাট করছে। বগুড়ার শেরপুরে করতোয়ার মাঝখানে বাঁধ দিয়ে নদীর গতি পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে। খুলনা মহানগরীর কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া রূপসা নদী দখলদারদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ব্যক্তি। কর্ণফুলী নদীও এর বাইরে নয়।সিলেটে সুরমা ছাড়াও শহর এলাকার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত ছড়া অবৈধ দখলের কারণে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। প্রাচীন পৌরসভা শেরপুর শহরে ১৮৬৯ সালে পানি নিষ্কাশনের জন্যে কাটা ডনো খালটির অ¯িÍত্ব এখন নেই। দখলকৃত খালটির ওপর এখন বাড়িঘর-অফিস। বিভিন্ন স্থানে শুকিয়ে যাওয়া নদী দখল করে চাষাবাদ, মাছ চাষের খবর পাওয়া গেছে। নদী দখল নিয়ে শহর ও গ্রামাঞ্চলে অনেক সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। তুরাগ, শীতলÿ্যা, ব্রহ্মপুত্র ও চিলাই নদীর অধিকাংশ এলাকা এখন দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। দখলের পর এসব নদীর দু’ধারে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা ও ব্যবসা কেন্দ্র। বিআইডবিøউটিএ সূত্র জানায়, যে পরিমাণ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হচ্ছে, তার চাইতে কয়েকশ’ গুণ স্থাপনা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। যা উচ্ছেদ করতে কয়েক বছর লেগে যাবে। তাছাড়া স্থাপনা সরানো হলেও নদীর ভরাটকৃত মাটি না সরানোর ফলে মূল সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। 

0 comments:

Post a Comment