Friday, March 9, 2018

গ্যাস উৎপাদন ও শিল্প উন্নয়ন

গ্যাস উৎপাদন ও শিল্প উন্নয়ন
আলী ফোরকান
প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার দিন দিনই উলøম্ব ও আনুভূমিকভাবে বাড়ছে। বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে শুধু রান্নার কাজে গ্যাস ব্যবহৃত হতো। নতুন নতুন গ্যাসÿেত্র আবিষ্কৃত হতে থাকায় ইউরিয়া সার উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে এ মিথেন গ্যাস ব্যবহার শুরু হয়। তারপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি হিসেবে গ্যাস ব্যবহার চালু হয়। এখন গ্যাস ছাড়া কোনো শিল্প-কল-কারখানা চলেই না। বিগত এক দশক ধরে যানবাহনের জ্বালানি হিসেবে গ্যাস ব্যবহার বেড়েই চলেছে। লাইটার থেকে শুরু করে ছোটখাট অনেক কাজে এ গ্যাস ব্যবহৃত হয়। বিকল্প জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের এ ব্যবহার বৃদ্ধি অর্থনীতি ও বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসরণের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি কার্যকর উদ্যোগ। কয়লা, পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস এ তিনটি জীবাশ্ম জ্বালানির মধ্যে গ্যাসই সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণ করে, পেট্রোলিয়ামের তুলনায় প্রায় অর্ধেক এবং কয়লার তুলনায় প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
গ্যাস উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান। কারণ দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ৮০ শতাংশই গ্যাস-নির্ভর। গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভর করছে ইউরিয়া সার উৎপাদন। ২১ লাখ টন ÿমতাসম্পন্ন ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার সবগুলোর প্রধান কাঁচামালই গ্যাস। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিও অনেকটাই নির্ভর করে সময়মতো সুলভমূল্যে পর্যাপ্ত সার কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার ওপর। গ্যাসের ওপর নির্ভর করছে ম্যানুফেকচারিংসহ সব ধরনের শিল্পখাত। সিএনজি, গৃহস্থালি ও সেবাখাত তো আছেই। যেমন, বর্তমানে ঢাকার অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতে দিনের বেলায় গ্যাস থাকে না। এ নিয়ে হৈচৈ। যানবাহনে গ্যাস ব্যবহাহের ফলে অস্থিতিশীল আন্তর্জাতিক তেলের বাজার থেকে পেট্রোলিয়াম আমদানি কমে গেছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে। গ্যাস চাহিদার এ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই।
দেশে এখন দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২৪০০ এমএমসিএফ। গ্যাসের চাহিদার বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ। এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ২০০ এমসিএফ গ্যাস প্রয়োজন হয়। সে হিসেবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৮০০ এমএমসিএফ। সরবরাহ হচ্ছে ৬৭০ এমএমসিএফ। এক টন ইউরিয়া উৎপাদন করতে ২৪ এমএমসিএফ গ্যাস প্রয়োজন হয়। আমাদের সার কারখানাগুলো বেশ পুরোনো। প্রযুক্তিও আজকের মানের নয়। তাই গ্যাস বেশি লাগে। এর ফলে সার কারখানাগুলোতে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ২৫০-২৭০ এমএমসিএফ। সরবরাহ করা হয় ২০০-২১৫ এমএমসিএফ। শিল্প, গৃহস্থালি, যানবাহন ও সেবাখাতে দৈনিক ১২০০ এমএমসিএফ চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ১০৪০ এমএমসিএফ। এতদিন বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সার কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহে রেশনিং পদ্ধতি চালু ছিল। এখন বিভিন্ন এলাকার শিল্প-কল-কারখানায় রেশনিং শুরু হতে যাচ্ছে। তারপর আছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। তাহলে উৎপাদন হবে কখন? জাতীয় উৎপাদনশীলতা বাড়বে কীভাবে? কর্মসংস্থান ও রফতানি বাড়বে কীভাবে? কিন্তু উপায় নেই। গ্যাসের উৎপাদন শীঘ্রই বাড়ছে না। ভোলায় প্রায় এক ট্রিলিয়ন গ্যাস মজুদ আছে। দৈনিক ৮০ এমএমসিএফ গ্যাস অনায়াসে উত্তোলন করা সম্ভব। দুটো কূপ খনন করা হয়েছে। একটি থেকে ১০ এমএমসিএফ গ্যাস উত্তোলন করে ৩৪.৫ মেগাওয়াট ÿমতাসম্পন্ন একটি রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু ব্যবহার বাড়াতে পারলে, বিতরণ লাইন তৈরি করতে পারলে আরো ২/১ টি কূপ খনন করে এ গ্যাস জাতীয় চাহিদা মেটানোতে কাজে লাগানো যায়। এত সামর্থ্য বাপেক্সের নেই। বিনিয়োগকারী খুঁজতে হবে। 
অস্থিরতা আমাদের মজ্জাগত। সামর্থ্যরে সঙ্গে ভারসাম্যহীন এ আকাঙÿা পূরণে আমরা শর্টকাট পথ ধরি। দুর্নীতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার এটাই বড় কারণ। বাপেক্সের ÿেত্রে একই অবস্থা। গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন এ প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব। বাপেক্সের জনবল কাঠামো ও প্রযুক্তিগত অবস্থান তেমন দৃঢ় নয় যে রাতারাতি নতুন কূপ খননন করে গ্যাস উত্তোলনযোগ্য প্রমাণিত হলে আরো কয়েকটি কূপ খনন করে উত্তোলন শুরু করে দিল। আর বিস্ফোরণ, কম্পনের ফলে মাটির তলদেশের প্রকৃতির পরিবর্তনসহ বিভিন্ন রিস্ক থাকে বলে কূপ খননের কাজটি সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। বাপেক্সকে শক্তিশালী করার বদলে বিদেশী কোম্পানিগুলোর কাছে গ্যাসÿেত্র ইজারা দেয়া শুরু হলো এবং এখনো তা চলছে। বাপেক্সের জনবল ও কারিগরি সামর্থ্য বৃদ্ধির লÿ্যে দ্রæত ব্যবস্থা নেয়া উচিত যাতে ৫-১০ বছরের মধ্যে এটি একটি সমর্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। 
বলা হচ্ছে, এতে অনেক বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। উচ্চ কারিগরি প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়। এর কোনোটাই বাংলাদেশের নেই। গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে নাইজেরিয়ায়ও এ কথা প্রচলিত ছিল সে দেশের তেলÿেত্র নিয়ে। সরকার বিদেশী কোম্পানিগুলোর জন্য দরজা খুলে দেয়। হুমড়ি খেয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো। ২০/৩০ বছরের মধ্যে সব শুষে নিয়ে দ্রæত বর্ধনশীল নাইজেরিয়াকে দুর্বল অর্থনীতিতে পরিণত করা হয়েছে। বিনিময়ে সরকারের লোকজন বিশাল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছে। অপরদিকে মালয়েশিয়া, ভারত, ভিয়েতনাম, মায়ানমার প্রভৃতি দেশ গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য বৃদ্ধির চেষ্টা করে গেছে নিরলসভাবে। আজকে সেসব দেশের এ প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু দেশেই যে কাজ করছে তা নয়, অন্যান্য দেশেও তেল-গ্যাস উত্তোলন করছে। দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা বয়ে আনছে। বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়ছে। 
গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে সরকারকে আরো মনোযোগী হতে হবে। গ্যাস-বিদ্যুৎ দিতে না পারলে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হবে। পাশাপাশি দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানাগুলোতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন। যাতে কম গ্যাস ব্যবহারে উৎপাদন বেশি হয়। ইদানীং কার্বন নিঃসরণ কমানোর লÿ্যে উন্নত দেশগুলো জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। চীন, ভারত, ব্রাজিল প্রভৃতি দ্রæত বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোও অনুসরণ করছে। আমাদেরকেও প্রযুক্তি উৎকর্ষ করতে হবে। সম্পদ, সামর্থ্য ও বায়ুমণ্ডলের কার্বন ধারণ ÿমতার সীমাবদ্ধতাকে এভাবে মোকাবেলা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই

0 comments:

Post a Comment