Friday, March 9, 2018

দেশের বন ও বনজসম্পদ ধ্বংসের মুখে

 দেশের বন ও বনজসম্পদ ধ্বংসের মুখে 
   আলী  ফোরকান 
বাংলাদেশের বনাঞ্চল ও বন এখন এক কঠিন বিপর্যয়ের মুখোমুখি। বন সংরক্ষণের সরকারের ঘোষিত নীতিমালা বাস্তবায়ন হচেছনা। ফলে বনাঞ্চল ও বনজ সম্পদ এখন হুমকির সম্মুখীন। দেশের বনাঞ্চল ও বনজ সম্পদে একটি সংঘবদ্ধ দূর্বৃত্তচক্র দীর্ঘদিন সক্রিয় এবং বর্তমানে তাদের দৌরাতœ্য ভয়াবহ আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বনজ সম্পদ চুরি ও পাচারের মাধ্যমে সংরক্ষিত বনাঞ্চল কে কার্যত উজাড় করা হচেছ। বনজ সম্পদ পাচারের বিষয়টি কতৃপক্ষের গোচরের বাইরে নয়-একথা স্পষ্ট। সম্পুর্ণ বিষয়টি কতৃপক্ষ অনুধাবন করা সত্বেও দূর্বৃত্তচক্রের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচেছনা। এই সুযোগে সংঘবদ্ধ দূর্বৃত্তদের অপতৎপরতা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দেশের সর্বোচচ জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা  স্মারক নং/গো/৭-৯৯(শ্রম)৭/১০৩৫/২৯ গত ১১ডিসেম্বর২০০৩ ও স্মারক নং /গো/৭-৯৯(শ্রম)১০৭২ গত ২২ ডিসেম্বর ২০০৩ পর পর  দুটি  প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বন মন্ত্রণালয়ে দাখিল করে।প্রতিবেদনে বন বিভাগের দূর্নীতি,বনজ সম্পদ পাচারের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের নাম ও পরিচিতি এবং বনজ সম্পদ রক্ষার লক্ষ্যে বেশ কিছু প্রস্তাবসহ সুপারিশ রেখেছেন। প্রতিবেদনে বলাহয়,এক শ্রেনীর সংঘবদ্ধ বনজ সম্পদ পাচারকারীদল বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা/কর্মচারিদের যোগসাজসে দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে মূল্যবান বনজ সম্পদ পাচার করে আসছে। বনজ সম্পদ পাচারের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলের বনজ সম্পদের অস্তিত্ব হুমকির সম্মূখীন হয়ে পড়বে বলে আশংকা করা হয়েছে। সংঘবদ্ধ পাচারকারি দল দেশের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন থেকে সাধারণত বৈধ লট ও অকশনের কাগজের বিপরীতে অবৈধ ভাবে ৬/৭ গুণ বেশি কাঠ কেটে পাচার করছে বলে, উল্লেখ রয়েছে। অপরদিকে র্পাবত্য এলাকা থেকে জোত পারমিটের অপব্যবহারের  মাধ্যমে মূল্যবান বনজ সম্পদ পাচার অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৮/১৯ বছর যাবৎ র্পাবত্য এলাকায় বন বিভাগের সংরক্ষিত বনের নিলাম বন্ধ রয়েছে। কিন্তু বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের র্দূনীতির সুযোগ নিয়ে অবৈধ কাঠ পাচারকারি দল জোত পারমিটের বিপরীতে বনাঞ্চল উজাড় করে দিচেছ। দেশের বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে ঢাকা পর্যন্ত এক ট্রাক  অবৈধ কাঠ পাচারে প্রায় ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে উৎকোচ দিতে হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমতাবস্থায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মূল্যবান বনজ সম্পদ রক্ষার লক্ষ্যে কয়েক বছর জোত পারমিট বন্ধ রাখার প্রস্তাব ও রাখা হয়েছে। জোত পারমিট বন্ধ রাখা হলে একদিকে যেমন সরকারি বন্ঞ্চাল রক্ষা করা হবে,অন্যদিকে জোত পারমিট ইস্যু থেকে শুরু কওে কাঠ পাচারের ক্ষেত্রে পথে পথে উৎকোচ প্রদানের ক্ষেত্র ও রহিত হবে। ফলে বন বিভাগের কর্মকতাদের মধ্যে উৎ কোচ প্রদানের মাধ্যমে লোভনীয় স্থানে পোস্টিং বাণিজ্য ও বন্ধ হবে বলে ঐ প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিবেদনে বন বিভাগের দূর্নীতি পরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারি ও কাঠ পাচারকারিদের চিহিৃত করা হয়েছে। চিহিৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্থিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ ও করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ৩ বছরে ও রাষ্টীয় গোয়েন্দা সংস্থার সুপারিশ কে কার্যকর করা হয়নি। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার এ রিপোট দাখিলের পর বন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটিতে র্দূনীতি ও কাঠ পাচারকারি হিসেবে চিহিৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে,শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় । সংসদীয় কমিটির সে নির্দেশ ও গত তিন বছর ধরে কার্যকর হয়নি। সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্ত চক্র বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন থেকে বনজ সম্পদ পাচারের পাশাপাশি জেলে,মৌয়াল,বাওয়ালীদের অপহরণ করে মুক্তি পণ আদায় করছে বলে সংবাদ বেরিয়েছে। এক শ্রেনেীর বন কর্মকর্তা-কর্মচারিদের প্রত্যক্ষ মদদে মুল্যবান কাঠ-সম্পদই নয়,পাচার হচেছ নয়নাভিরাম হরিণ এবং অন্যান্য পশু সম্পদও। হরিণ শিকার ও পাচার স্মরণকালের নাজুক অবস্থায় পৌছেছে বলে খবরে জানা গেছে। সাতক্ষীরা ও বরগুনা জেলার বিভিন্ন হাট বাজারে গবাদি পশুর মাংসের মত হরিণের মাংস বিক্রি হচেছ। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে,বিয়ের ভোজেও হরিণের মাংস সহজলভ্য হয়ে উঠেছে বলে খবরে প্রকাশ। এর আগেও সুন্দরবনে চোরা শিকারীদের দ্ধারা রয়েল বেঙ্গল টাইগার হত্যা,পাচার এবং বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও চামড়া বিক্রির  খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কোষ্টগার্ড দ্ধারা এধরনের চুরি ধরা পড়লেও এনিয়ে প্রশাসনের কঠোরতা বা উদ্বিগ্নতা লক্ষ্য করা যাচেছ না। বন রক্ষায় নিয়োজিতরা সুন্দরবনকে উজাড় করে সম্পদের পাহাড় গড়ছে। বৃহত্তর খুলনার বাগের হাট,খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার সাতটি থানা এলাকা জুড়ে বেষ্টিত দূর্গম অরণ্য সুন্দরবন দূবৃত্তদের লুটপাটের র্টাগেট হয়ে উঠা ও শক্তিশালী চক্র কতৃক এর উপর ধবংসাতœক যজ্ঞ চালানোর বিষয়টি একেবারে নতুন না হলেও এর গুরুত্ব কম নয়। সুন্দরবন নিয়ে পত্রিকায়  প্রকাশিত রিপোটটিতে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে যে,সুন্দরবনেও বিশেষ জেলাভিত্তিক নিয়োগ দ্বারাই এবনটি বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচেছ। কর্তা-বড়কর্তাদের‘খুশী’ রাখার বিষয় দূর্নীতিকে প্রভাবিত করছে। বন বিভাগের এক শ্রেনীর কর্তা,কর্মচারি হউক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের মদদেই হোক সুন্দরবন নিয়ে এধরণের ভয়াবহ শংকাজনক কাজ বন্ধ করার ব্যাপারে কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ ছাড়া বিকল্প নেই। কোনো দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য ২৫%ভাগ বনাঞ্চল থাকার আবশ্যক রয়েছে। আর্ন্তজাতিক ভাবে স্বীকৃত এই হিসাবের অনেক নীচে আমাদের বনভুমির পরিমাণ। সরকারি হিসাব মতে দেশে বনভুমির পরিমাণ১৭.৫০% প্রায়। ঋ.অ.ঙ.এর মতে বাংলাদেশে বন ভুমির পরিমাণ ৯/১০%প্রায়।এটুকু সম্পদের পিছনেও ‘আতœস্বার্থান্বেষী অর্থলোভীদের’ হাত স¤প্রসারিত।তারা এই নিদিষ্ট পরিমাণ বনাঞ্চলকে ও র্নিবিচারে ধবংস করছে।ইতোমধ্যেই ছোট ছোট অনেক বনাঞ্চল লোপাট করে বৃক্ষশোভিত স্থানকে সমতল ভুমিতে পরিণত করেছে। সারাদেশের সংরক্ষিত অসংরক্ষিত সকল বনভুমির প্রতিই র্নিবিচার বর্বরতা প্রদর্শন করে একটি মহল দেশের প্রচলিত আইনকে অবজ্ঞা করে  চলেছে। এদের সাজার পরির্বতে অর্থের প্রতিপত্তির কাছে প্রশাসনের দুঃখজনক সর্মপণ ও লক্ষ্য করা গেছে।সুন্দরবনসহ বনাঞ্চল প্রশাসনের র্দুনীতির মরণ ব্যাধি-পরিবেশ ও বন সংরক্ষণের,বনের জীববৈচিত্রের মারাতœক বিপর্যয় ডেকে আনছে। সুন্দরবন ও বনাঞ্চল দেশের জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদ হেলায়, উদাসীনতায়, প্রভাবশালীদের, কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বিত্তলালসার কাছে উজাড় করে দেয়ার কোনো কারণ ও যুক্তি নেই। দেশের বনাঞ্চলের মুল্যবান বনজ সম্পদ, সুন্দরবনের ভয়ংকর ও নয়নাভিরাম বনজ এবং পশু সম্পদ নিয়েই তা জাতি ও বিশ্বের অমুল্য ধন। বনাঞ্চল, সুন্দরবন রক্ষা ও সংরক্ষণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং প্রকৃতির এদান বনাঞ্চল ও সুন্দরবন রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বনাঞ্চল ও সুন্দরবনে লুটপাট,অবৈধ নিধন,চুরি ইত্যাদি বন্ধ করে বন রক্ষায় উদ্যোগ গ্রহন করা অত্যন্ত জরুরী। যারা বনাঞ্চল ধবংসে সক্রিয় তাদের প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। আমাদেরও আগামী প্রজম্মের প্রয়োজনে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও সুন্দরবন রক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। এ বনাঞ্চল রক্ষা করা না গেলে দেশে বড় ধরণের  পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকা করছেন পরিবেশ বিজ্ঞাণীরা। এ মতাবস্তায় বনাঞ্চল রক্ষা করা এ কথাটি সকলকেই অনুধাবন করতে হবে।


                                                                                               
                                                                                                              

0 comments:

Post a Comment