চিংড়ি রপ্তানি বাণিজ্যে চ্যালেঞ্জ
আলী ফোরকান
বাংলাদেশে স্বর্ণের কোন খনি নেই। তারপরও ‘স্বর্ণ’ রপ্তানি করে বাংলাদেশ গত অর্থ বছর প্রায় সাড়ে ৫৩ কোটি মার্কিন ডলার আয় করেছে। দেশের দÿিণ ও দÿিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপক‚লবর্তী অঞ্চলে রয়েছে ‘স্বর্ণের খনি’। এই খনিগুলোতে পাওয়া যায় ‘শ্বেতস্বর্ণ’।
হিমায়িত চিংড়ি বাংলাদেশের সেই শ্বেতস্বর্ণ। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস। বৈদেশিক মুদ্রার দ্বিতীয় বৃহত্তম এই খাতটি এতটাই সম্ভাবনাময় যে, কয়েকটি বিষয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করে বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। কিন্তু সংবাদপত্রগুলোতে সর্বসম্প্রতি এই খাতের ÿুদ্র ÿদ্র নেতিবাচক খবর বের হচ্ছে। খবরগুলো সংশিøষ্ট সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের শীর্ষ পণ্য গার্মেন্টস। এর পরেই হিমায়িত চিংড়ির অবস্থান। বিশ্ব আর্থিক মন্দা পরিস্থিতিতে আমাদের গার্মেন্টস রপ্তানির চাহিদা হ্রাসের আশঙ্কা কম হলেও হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি হ্রাসের ঝুঁকি অধিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ (ইত্তেফাক-০২-০২-০৯) প্রকাশিত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে চিংড়ির ভবিষ্যৎ রপ্তানি বাণিজ্য সংকুচিত হয়ে পড়ার এমন আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের পÿ থেকেও অভিন্ন উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এসোসিয়েশনের নেতারা বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাদের উদ্বেগ এবং ÿতির চিত্র তুলে ধরেছেন (ইত্তেফাক ২৯-০১-০৯)। রপ্তানি হ্রাস পেলে কেবল রপ্তানিকারকরাই ÿতিগ্র¯Í হবেন না, সরকারের রাজস্ব আদায়ও হ্রাস পাবে। কাজেই বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ভাববার বিষয় বইকি? বাংলাদেশ ২০০৭-০৮ অর্থ বছরে রেকর্ড পরিমাণ হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক মূল্য হ্রাস এবং সিডরে দÿিণ পশ্চিমাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া সত্তে¡ও এই রপ্তানি খাতের অর্জন এবং অগ্রগতি উৎসাহব্যঞ্জক। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত অর্থ বছরে হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি করে ৫৩ কোটি ৪১ লাখ ডলার আয় হয়। পূর্ববর্তী অর্থ বছরের তুলনায় এই আয় ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশের বেশি। গত অর্থ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চিংড়ির মূল্য ৪০ শতাংশ কমে না গেলে রপ্তানি আয় ৬০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেত বলে সংশিøষ্টদের অভিমত। প্রশ্ন হলো বিশ্ব আর্থিক মন্দার পরিস্থিতিতে আমাদের সম্ভাবনাময় এই শিল্প কতটুকু বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বর্তমানে সংকটময় পরিস্থিতি এবং আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ কি একমাত্র বিশ্ব আর্থিক মন্দা? পশ্চিমানির্ভর আমাদের অর্থনীতি। সংগত কারণে সেখানকার ইতিবাচক-নেতিবাচক হাওয়া আমাদের দোলা দেবে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তার ওপর আমাদের রপ্তানিকৃত চিংড়ির সবচেয়ে বড় বাজার যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রসহ ইইউভুক্ত দেশগুলো, সেহেতু সেখানে আর্থিক মন্দার লু হাওয়া আমাদের প্রভাবিত করছে বটে। কিন্তু এখাতের সংকটময় এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা আমাদের থ্রাষ্ট এই সেক্টরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বটে, কিন্তু একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। বরং সেক্টরটি এখন ত্রিমুখী সংকট অতিক্রম করছে। সামাগ্রিকভাবে বিশ্ব মন্দার প্রভাব কাটিয়ে উঠে রপ্তানি ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, চিংড়ি শিল্পের শ্রমিকদের মুজুরি কাঠামো গঠনের সাম্প্রতিক সরকারি উদ্যোগ প্রক্রিয়া যথার্থভাবে সম্পন্নকরণ এবং এই প্রক্রিয়ায় স্বার্থান্বেষী মহলের যাবতীয় অপচেষ্ট প্রতিরোধই হবে এখাতের আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে শতর্কতার সঙ্গে। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, চিংড়ি শিল্প শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো হচ্ছে শীঘ্রই (ইত্তেফাক ২৭-০১-০৯)। ঢাকায় ২৫ জানুয়ারি চিংড়ি সেক্টরে নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে সরকার গঠিত বোর্ডের প্রথম সভায় এ বিষয়ে বেশ কিছু নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। চিংড়ি সেক্টরে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের লÿ্যে সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে গত বছর ১৭ নভেম্বর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রত্যাশা করা হচ্ছে এরই আলোকে আগামী ৬ মাসের মধ্যে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি মজুরি কাঠামো ঘোষিত হবে। মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় শ্রমিক-মালিকদের সঙ্গে মজুরি বোর্ডের লোকজন কথা বলবেন। এর ভিত্তিতেই কারখানাগুলোর জন্য একটি অভিন্ন অর্গানোগ্রাম এবং সে অনুযায়ী পদের নামকরণ করা হবে। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে শুভ এবং এই সেক্টরটি সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে উদ্যোগটা বা¯Íবায়নে সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং কৌশল গ্রহণে সামান্য ক্রটি হলেই হিতে বিপরীত হতে পারে। দেখা দিতে পারে শ্রমিক বিশৃঙ্খলা। কেননা এই সুযোগ গ্রহণের জন্য স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর জন্য ইতিমধ্যে তৎপর হয়ে উঠেছে। সরকার দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের লÿ্যে মৎস্য চাষকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বাড়ছে বিনিয়োগ। রপ্তানি বাণিজ্যের পাশাপাশি এখাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের আগ্রহের অন্যতম কারণ। যতটুকু জানি, এজন্য সরকার গত বছরের মাঝামাঝি সময় চিংড়ি খাতকে পৃথক একটি শিল্প কাঠামোয় দাঁড় করাতে জাতীয় চিংড়ি নীতিমালা প্রণয়ন করেন। তারই বা¯Íবায়নের অংশ হলো এ খাতের শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো গঠনের সাম্প্রতিক উদ্যোগ। ঠিক এ সময় ইত্তেফাকে ২ ফেব্রæয়ারি প্রকাশিত। অপর একটি খবর অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে। খবরটি এরকম: ‘খুলনায় মাছ কোম্পানীতে ছাঁটাই আতংক’। খবরে বলা হয়, সরকার চিংড়ি শিল্প শ্রমিকদের বেতন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করার প্রেÿপটে শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হচ্ছে বলে স্থানীয় বিশেষ কয়েকটি এনজিওর অভিযোগ। শ্রমিকদের সাদা কাগজে নাকি স্বাÿর রেখেই কাজে যোগ দিতে হচ্ছে। অভিযোগটি গুরুতর, কিন্তু ভিত্তি কতটুকু সেটাই প্রশ্ন। খবর নিয়ে জানা যায়, ফ্রেস ফুডসহ কয়েকটি কোম্পানীর বিরুদ্ধে একটি বিশেষ এনজিও অভিযোগ উত্থাপন করে যে, শ্রমিকদের ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্যে সাদা কাগজে স্বাÿর নেয়া হচ্ছে। কিন্তু একটি মানবাধিকার সংস্থা ঐ ঘটনা তদন্ত করে কোন সত্যতাই পায়নি। অথচ ঐ খবর ছড়িয়ে কারখানাগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত তারা। কয়েকজন কারখানা শ্রমিকের সঙ্গে আলাপ করে আমি নিজেও এনজিওর কথিত ঐ অভিযোগের ভিত্তি খুঁজে পাইনি। তাছাড়া কোম্পানীর অর্থনৈতিক ধারা বজায় রাখার স্বার্থে শ্রমিক ছাঁটাই যদি যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয় তাহলে সমস্যাটা কোথায়? অপ্রয়োজনীয় জনবল কি অভিযোগকারী ঐ এনজিওর প্রতিষ্ঠানে রাখতে চাইবে? সর্বোপরি বিশ্ব আর্থিক মন্দার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে উৎপাদন এবং রপ্তানি খরচ কমিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাটাই এ মুহ‚র্তে জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সরকারের সংশিøষ্ট বিভাগকেও এই দিকটা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুারোর তথ্য মতে, ১৯৭২-’৭৩ অর্থ বছরের হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি আয় ছিল প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ডলার। ২০০৭-’০৮ অর্থ বছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৫৩ কোটি ডলারে। জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে হিমায়িত চিংড়ি ও মাছের অবদান এখন ৪ শতাংশেরও বেশি। বেসরকারি খাত হিসেবে এই খাত যতটুকু বিকশিত হয়েছে, তা বিকাশমান এই খাতটি এখন সর্বোচ্চ সরকারি মনোযোগ এবং গুরুত্ব পাবার যোগ্য। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার প্রেÿাপটে ÿতিগ্র¯Í রপ্তানিকারকরা, চলতি অর্থবছর লÿ্যমাত্রা অর্জন ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সরকার প্রদত্ত ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা বৃদ্ধি করে ২০ শতাংশ করার দাবি করেছে। যৌক্তিকতার ভিত্তিতে এ বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সময়ের দাবি। পাশাপাশি এ খাতের শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো গঠনের সূত্র ধরে এনজিওদের অপতৎপরতা কঠোরভাবে মোকাবেলা করতে হবে। হিমায়িত খাদ্য চিংড়ি রপ্তানি বাণিজ্যে উদ্ভুত ত্রিমুখী এ সমস্যা জরুরি আমলে নেয়া অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
0 comments:
Post a Comment