Sunday, March 4, 2018

পাহাড় ধসে মানবিক বির্পযয়

পাহাড় ধসে মানবিক বির্পযয়
আলী ফোরকান 
পাহাড় আর সমুদ্র। এই দুই গর্বের জায়গা চট্টগ্রামের মানুষের। সমুদ্র মাঝেমধ্যে ফুঁসে উঠেছে। মানুষ মেরেছে সমানে। ক্ষতি হয়েছে অর্থ সম্পদ। কিন্তু পাহাড়ের ব্যাপক বিধ্বংসী রূপ দেখতে পাচ্ছে চট্টগ্রামের মানুষ। তবে এর আগেও পাহাড় ধসে মরেছে মানুষ। তা ছিল খুবই নগন্য। গবেষক আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ের এই শাপ এমনি এমনি নয়। পেছনে রয়েছে মানুষের কালো হাত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড.মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের পাহাড় কাটা ও ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের সেনানিবাস এলাকায় ঘটে যাওয়া পাহাড়ধসের একমাত্র কারণ অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা। অনেকে এ ঘটনার পেছনে অনেক কথা বললেও তিনি পাহাড় কাটাকে একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি আরো বলেন, যুগ যুগ ধরে আমরা এ ঝুঁকির কথা বলে আসছিলাম। এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে সেই আশঙ্কারই প্রতিফলন ঘটল’। একই প্রসঙ্গে স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ জেরিনা হোসেন বলেন, ‘পরিকল্পনা ছাড়া নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে পাহাড় কাটার কারণে বড় ধরণের পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাহাড় কাটার কারণে পাহাড় ক্রমশ ঢালু হয়ে পড়ছে এবং মাটি নড়বড়ে হয়ে যায়।  যার কারণে তা বৃষ্টির পানির সঙ্গে মাটি ধসে নিচের দিকে নেমে আসে। পাহাড়ের ঢালে বসতিকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আস্তে আস্তে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ও পুনর্বাসনের চিন্তা করার এখনই সময়। এত লাশ। এত মৃত্যু। এসবই পাহাড় ধস আর বৃষ্টির জন্য। কিন্তু দোষ কি সত্যি সত্যিই প্রকৃতির? তা কিন্তু নয়। পাহাড়খেকো মানুষের নির্বিচারে পাহাড় কর্তনের ফল এই পাহাড়ি ঢলে পাহাড় ধস। পাহাড়খেকো মানুষ যে বড়ই সাংঘাতিক । তারা লোভে ঢলে পড়ে প্রকৃতির সঙ্গে করে বিশ্বাস ঘাতকতা। আর সেই বিশ্বাস ঘাতকতার নিমর্ম বলি হয় অসংখ্য সাধারণ মানুষ। পত্রিকার খবরে প্রকাশ পাহাড়ধসে মৃত্যু কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান সরকারি-বেসরকারি বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কাছে পাওয়া যায়নি। তবে গত এক যুগে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্্রবাজার এলাকায় ১ হাজারের অধিক লোক পাহাড়ধসে মারা গেছে বলে স্থানীয় বিভিন্ন সুত্র জানায়। বন্দর নগরীর চট্টগ্রামের লালখান বাজার, মতিঝর্ণা, হামজার বাগ, নবীনগর পাহাড়, র্বামা কলোনি পাহাড়, এনায়েত বাজার জামতলা বস্তি, পলোগ্রাউন্ড পাহাড়, বাটালী হিল, জিলাপী পাহাড়, নাসিরাবাদ পাহাড়, এ কে খান পাহাড়, চন্দ্রনগর পাহাড়, রউফাবাদ পাহাড়, কুসুমবাগ, জালালাবাদ, সেনানিবাস, বায়েজীদ বোস্তামী, বন গবেষণাগারের পিছনে, খুলশী, ষোল শহর, ফৌজদারহাট এবং কুমিরাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের ওপর ও  পাদদেশে গড়ে উঠেছে শতাধিক বস্তি। সঠিক হিসাব পাওয়া না গেলেও এসব এলাকায় প্রায় ৫ লাখ মানুষ বাস করে বলে বিভিন্ন সংস্থার জরিপে দেখা যায়। একটি দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, সরকারি বিভিন্ন জমি ইজারা নিয়ে এবং জোর করে প্রথমে দখলে আনে। এর পর পাহাড় কেটে বসতি ঘর তোলা হয়। এলাকার প্রভাবশালীরা এসব জায়গায় ছোট ছোট ঘর তুলে ভাড়া দেন। নিম্ন আয়ের লোকজন কম খরচের কথা ভেবে এখানে বাস করে। এদের বেশির ভাগই রিকশা, অটোরিকশা, ঠেলাগাড়ি চালক, দিন মজুর ও ফেরিওয়ালা। মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড়ের কোলে বসবাসকারি রমজান আলী বলেন, এখানে পাহাড়ের পাদদেশে অন্তত ৩ হাজার পরিবার বসবাস করে। প্রতি বছরই পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। প্রবল বর্ষণে পাহাড়ধসের ঘটনা ক্রমান্বয়ে প্রতিবছর আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। তারপরও এব্যাপারে সরকারিভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের  অধ্যাপক ড.মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের পাহাড় কাটা ও ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন নিয়ে গবেষণা করছেন। স¤প্রতি নগরীর ছয়টি ওয়ার্ডে জরিপ চালিয়ে তিনি পাহাড়ের পাদদেশে ৬৫ টি বস্তির সন্ধান পেয়েছেন। তিনি বলেন, ৪১টি ওয়ার্ডের বেশির ভাগেই এধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটার কারণে এঝুঁকি দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। অবিলন্বে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা বন্ধ করার পাশাপাশি পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা লোকজনদের অন্যত্র পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করা দরকার বলে তিনি মনে করেন। পাহাড় কাটা নিয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করাও জরুরি বলে তিনি জানান। 
এ প্রসঙ্গে স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ জেরিনা হোসেন বলেন, পাহাড় কাটার কারণে পাহাড় ক্রমশ ঢালু হয়ে পড়ে এবং মাটি নড়বড়ে হয়ে যায়। যে কারণে বৃষ্টির পানির সঙ্গে মাটি ধসে নিচের দিকে নেমে আসে। পাহাড়ের ঢালের বসতিকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আস্তে আস্তে তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা দরকার। নগরীতে অবাধে পাহাড় কাটা চললেও এ ব্যাপারে কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই পরিবেশ অধিদফতরের। রাজনৈতিক নেতাদের মদদে দলীয় ক্যাডাররা পাহাড় কেটে জায়গা দখল করছে। এমনকি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পাহাড়  কেটেছে নির্বিচারে। ওই সব এলাকায় গড়ে ওঠা বস্তিগুলোর বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণ করে রাজনৈতিক ক্যাডাররা। কুসুমবাগ এলাকায় ১১ জুন পাহাড়ধসে মারাগেছে তিন পরিবারের আটজন। কিন্তু এখনো সেখানে মৃত্যুর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে বসবাস করছে অনেক পরিবার। সেখানের বাসিন্দাদের উদ্ধৃতি দিয়ে রিপোর্টে বলা হয় এখনও কুসুমবাগ এলাকায় ২’শয়ের বেশি পরিবার বসবাস করছে। 
পাহাড়ধসে মৃত্যু: ২০০৮ সালের ১৮ আগষ্ট চট্টগ্রাম মহানগরীর লালখান বাজার ওর্য়াড়ের মতিঝর্ণা এলাকায় ওয়সার পাহাড় ধসে নারী ও শিশুসহ ১১ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে।
২০০৪ সালের ১০ জুলাই লালখান বাজারে এক শিশুসহ তিন জন নিহত ও দুই শিশু আহত হয়। এসময় বায়েজীদ বোস্তামী এলাকায় পাহাড়ধসে মা মেয়ে মারা যায়। একই বছর কক্্রবাজারের কলাতলী পাহাড়ধসে একই পরিবারের মা শিশুসহ দুজন নিহত হয়। 
২০০৩ সালে চট্টগ্রামের মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড়ধসে শিশুসহ তিন জন নিহত হয়। এ বছর কক্্রবাজারের মহেশখালীর কালারমার ছড়া ইউনিয়নের নলবিলা গ্রামের বড়–য়াপাড়া গ্রামে পাহাড়ধসের ঘটনায় একই পরিবারের শিশু সহ ২ জন নিহত হয়। 
২০০২ সালে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের রাঙামটি রির্জাভ বাজারের সন্নিকটে পাহাড়ধসে একই পরিবারের শিশুসহ ২ জন মারা যায়। একই বছর বান্দরবন’র নাইক্ষংছড়িতে পাহাড়ধসের ঘটনায় একই পরিবারের দুজনসহ ৩ জন মারা যায়।
২০০১ সালে পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম একে খান পাহাড় এলাকায় শিশুসহ একই পরিবারের ২ জন মারা যায়। এ বছর কক্্রবাজার বাতিঘর সংলগ্ন এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনায় ১ শিশু মারা যায়। এছাড়া এ বছর চট্টগ্রামের বাশখালী উপজেলায় পাহাড়ধসের ঘটনায় একই পরিবারের জরিনা বেগম ও তার শিশুপুত্র নয়ন প্রান হারায়।
২০০০ সালের অপর এক পাহাড়ধসের ঘটনায় চট্টগ্রাম  বাঘঘোনার স্বপন মিয়ার ভাড়াটিয়া মনিরা বেগমের তিন শিশু মারা যায়। এ বছরের ২৪ জুন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ শহরের কয়েকটি জায়গায় ভুমিধসে শিশুসহ ১৩ জন প্রাণ হারায়। একই বছর কক্্রবাজারের উখিয়ার রাজাপালং এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনায় একই পরিবারের শিশুসহ ৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
১৯৯৯ সালে চট্টগ্রামের মতিঝর্ণার নুরুল আলম কুতুবীর ভাড়াটিয়া মাকছুদা বেগম ও তার শিশুপুত্র পাহাড়ধসে মারা যায়। এ বছর  কক্্রবাজার সদর থানায় কুতুবদিয়া পাড়ায় পাহাড়ধসের ঘটনায় একই পরিবারের ২ জন মারাযায়। এছাড়া এ বছররের ১১ ও ১৩ আগষ্ট  চট্টগ্রাম ও বান্দরবনে পৃথক ভুমিধসের ঘটনায় ১৭ ব্যক্তি প্রাণ হারায়।
১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে বান্দরবনের ছড়াই পাড়ায় বড় ধরনের ভুমিধস সংঘটিত হয়। 
১৯৯০ সালের ৩০ মে রাঙামাটিতে ভুমিধসের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় একই পরিবারের ৩ জন নিহত হয়।এই পরিসংখ্যান থেকে এটা স্পষ্ট যে, চট্টগ্রাম, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম, কক্্রবাজারসহ পাহাড়িয় এলাকায় পাহাড়ধসের  ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু এই পাহাড়ধসের ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি পাহাড় ধ্বংসকারি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বিবেকে নাড়া দিতে পারেনি। এর ফলে ১১ জুন পাহাড়ধসের ঘটনায় ১২৬ জন মানুষ প্রাণ হারায়।
আমরা আশাকরি বর্তমান সরকার পাহাড়খেকোদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারিদের পুর্নবাসনে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেবেন। 

0 comments:

Post a Comment