সীমান্তে চোরাচালান
আলী ফোরকান
এক দিকে পদ্মা। গ্রীষ্মে তার পানি তলানিতে এসে ঠেকেছে। দু’পাশে বড় বড় চর। তারই এক দিকে ভুখন্ডের পাশে তারকাটার বেড়া দেওয়ার কাজ চরছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বি¯Íীর্ণ এলাকা জুড়ে এই ফাঁকা জায়গাটাই হাতছানি দেয় লোভের।লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। সীমান্ত থেকে কোথাও দুই পাশেই পাঁচশো মিটারের মধ্যে গ্রামে। হারুডাঙ্গা সীমান্ত থেকে খালি চোখেই দেখা যায় ওপারের রাজশাহী। সন্ধ্যায় সেই শহরের আলো জকমক করে পদ্মাপাড়ের ভারতীয় গ্রামে। বৃদ্ধ এনায়েতউদ্দিন বলেন, ‘সোজা গেলে আমাদের গ্রাম থেকে রাজশাহী হাঁটা পথে আধ ঘন্টা। মাঝে কেবল পদ্মার চর।’’ আ¯Í শহর যদি নাও হয়, রয়েছে অনেক ছোট ছোট জনপদ। দুপারেই ভাষা এক, মানুষ এক, খাদ্যাভ্যাস এক, পোশাক এক। এদিকের মানুষ ওদিকে গেলে বা ওদিকের মানুষ এদিকে এলে, কারো বোঝার ÿমতা নেই, কে কোন দিকের বাসিন্দা। আগে এ পাড়া ও পাড়া যাতায়াতের মতোই মানুষ এ দেশ যাতায়াত করতো। প্রবীণ শামশুল হক বলেন, ‘‘আগে তো সবটাই এক দেশ ছিল। সেই স্মৃতি, সেই অভ্যাস মানুষের মধ্যে রয়েইে গেছে। অনেকেই মনে করতে চায় না, তার জন্মভ‚মি এখন আর তার মাতৃভ‚মি নয়।’ কিন্তু দু’পাশেই সেই যে যাতায়াত ছিল, তার সঙ্গে চোরাচালানের কাহিনী মেলে না। চোরাচালান এই জীবনযাপনের সঙ্গেই জড়িত একটি অন্ধকার দিক। দু’দেশেরই সীমান্ত লায়োয়া এলাকার মানুষের জীবন-যাপনের অভ্যাস এক। তাদের তাই চাহিদাও অনেকটা এক। কিন্তু দু’দেশের দামের ওঠাপড়াই চোরাচালানের পথ প্রশ¯Í করেছে। এ যেমন এ দেশে এক জোড়া গরুর যা দাম ও দেশে তার কয়েক গুণ বেশি। তাই কোনো চোরাচালানকারী জোড়া গরু পাচার করে পেয়ে যেতে পারে সাত থেকে আট হাজার টাকা। এর জন্য তাকে যা করতে হবে তা হল পদ্মার চর ধরে কয়েক কিলোমিটার পথ সতর্কভাবে পেরিয়ে যাওয়া। এ পার থেকে ও পারে সর্বÿণ নজরটা থাকতে হবে। চোরাচালানের পাণ্ডারা সকালেই খবর পাঠিয়ে দেয়। সেই মতো গরু কোথায় রয়েছে, জানিয়ে দেয়া হয়। তারপর রাত বাড়লে সীমান্তরÿী বাহিনীর চোখে ধূলো দিয়ে পেরিয়ে যেতে হবে দু’দেশের মধ্যবর্তী ভ‚খন্ডটুকু। কিন্তু সব সময় তা সম্ভব হয় না। আগের শনিবার রাতে রানিনগরের কাহারপাড়া ও হারুডাঙা সীমান্ত দিয়ে মোষ পাচার করার সময়ে মানিক মন্ডল ও সাজ্জাদ শেখ নামে দুই কিশোর পাচারকারীর মৃত্যু হয় বিএসএফের গুলিতে। সীমান্তরÿী বাহিনীর পÿ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের দু’জনকে থামতে বলা হয়েছিল, তারা সে কথা না শুনে পালানোর চেষ্টা করে, তখনই গুলি করা হয়। কেন তারা ধরা পড়েও থামল না? স্থানীয় বাসিন্দা রশিদুর রহমান বলেন, ‘‘টাকার লোভ। একবার পাচার করে দিতে পারলে, বহু টাকা লাভ। মাসে দু’বার পাচার করলেই চলে। হাতে কাঁচা টাকা চলে আসবে। তাতে ওদের সংসার চলবে। কিন্তু সীমান্তরÿী বাহিনীর দৌলতে দু’পারেই কড়াকড়িও রয়েছে। তার মধ্যেই এপাশ থেকে ওপাশে একবার যেতে পারলেই নগদানগদি লাভ হবে বেশ কয়েক হাজার টাকা। প্রশাসনেরও বক্তব্য তাই। লোভের বশবর্তী হয়েই জীবন পণ রেখে পাচার চলছে। গত তিন বছরে ডোমকল মহকুমার রানিনগর, ইসলামপুর এবং জলঙ্গি সীমান্তে প্রায় ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা জানিয়েছে। তারপরও প্রায় রোজ রাতেই দুর্গম সীমান্ত এলাকা পাড়ি দিয়ে চোরাপাচার চালায় কারবারিরা। সীমান্তের কাতলামারি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান মহম্মদ মোলøা বলেন, ‘‘ মানুষকে অনেকবার সচেতন করার জন্য আমরা বিভিন্ন আলোচনা সভা করেছি। তারপরও লোভের বশেই এমনটা সীমান্তের কিছু বাসিন্দা।’’ সীমান্তরÿী বাহিনীর অফিসারেরাও জানান, পাচারের প্রবণতা রোধ করতে যে সচেতনতা বাড়ানোর দরকার, তার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু চোরাচালানকারীদের পাণ্ডার টাকা দিয়ে বশ করছে এলাকর দরিদ্র মানুষকে। তথ্য সুত্র আনন্দবাজার পত্রিকা
0 comments:
Post a Comment